কূপ খুঁড়েই বাংলায় প্রথম ফাঁসি দেয়া হয় যে অভাগাকে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৬ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১২ ১৪২৭,   ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২

কূপ খুঁড়েই বাংলায় প্রথম ফাঁসি দেয়া হয় যে অভাগাকে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০১ ২১ অক্টোবর ২০২০  

ছবি: এই কূপেই ফাঁসি দেয়া হয় তাকে

ছবি: এই কূপেই ফাঁসি দেয়া হয় তাকে

মধ্যযুগ থেকেই পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই মৃত্যুদণ্ড দানের ক্ষেত্রে ফাঁসির পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। হোমারের ওডিসি গ্রন্থেও ফাঁসি দ্বারা মৃত্যুর পন্থা বর্ণিত আছে। আধুনিক যুগে সামরিক আইনের বিচারে ফায়ারিং স্কোয়াড, সাধারণ আইনে ইলেকট্রিক শক।

ইসলামি শরিয়তি বিধানে প্রস্তর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধান থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ দেশে মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত অপরাধীকে ফাঁসির মাধ্যমে সাজা দেয়া হয়ে থাকে।

স্বাধীন বাংলা অর্থাৎ ভারতে প্রথম ফাঁসি দেয়া হয়েছিল নাথুরাম গডসেকে। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার দায়ে তার ফাঁসি হয়। তবে জানেন কি? ভারত উপমহাদেশে প্রথম ফাঁসি কাকে এবং কবে দেয়া হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে কিন্তু বাংলাদেশ ভারত পুরোটাই চক্সহিল ভারত মহাদেশ। সব মিলিয়েই ছিল বাংলা। সেসময়ের কথাই বলছি।

আরো পড়ুন: স্যুপ খেতে ডলফিন হত্যা করে উৎসব পালন করে যে দেশ 

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের কথা নিশ্চয় কেউ ভোলেন নি। সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যু, বাংলায় স্বাধীনতার পতন, ব্রিটিশদের শাসন শুরু। ১৭৫৭ সালের জুন ২৩ তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা হয়েছিলেন ষড়যন্ত্রের শিকার। তার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তাদের শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানা আছে সবারই। মীর জাফর হিন্দুদের দেবীর পা ধোয়া পানি খেয়েও প্রাণ রক্ষা হয়নি। মিরন মারা গিয়েছিলেন বজ্রপাতে। আরেক বিশ্বাসঘাতক নন্দকুমার। 

মহারাজা নন্দকুমার তাদের মতোই হতভাগ্য পুরুষ মহারাজা নন্দকুমার। নবাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তিনি পুরস্কৃত হয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজশক্তির কাছে। কিন্তু সেই ব্রিটিশ আদালতের বিচারেই তার ফাঁসি হয়। দিনটা ছিল আজ থেকে ঠিক ২৪৫ বছর আগে ৫ আগস্ট, ১৭৭৫। আর সেটাই ছিল একটা পরিপূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনে ভারত উপমহাদেশে প্রথম ফাঁসি। কথায় বলে, প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের শাস্তি পান। তারই যেন জলজ্যান্ত উদাহরণ এটি।

খিদিরপুরের কাছে কুলিবাজার অঞ্চল। আজ যেখানে হেস্টিংস সেখানেই ছিল লোকালয় বর্জিত। সেদিন সেই রাজপথেই ছিল লোকে লোকারণ্য। এর আগে ফাঁসি অনেকেই দেখেছেন। ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে ফাঁসি দেয়া হত রাস্তার ধারে গাছের উপর থেকে। প্রত্যেকে যাতে অপরাধীর অন্তিম পরিণতি প্রত্যক্ষ করেন, তাই এই ব্যবস্থা ছিল। নন্দকুমারের ফাঁসিও হয়েছিল প্রকাশ্যে। তবে তার জন্য খোঁড়া হয় একটা আস্ত কূপ।

সেই কূপটি এখনো সংরক্ষিত আছেকেননা এ সাধারণ জমিদারি মামলা নয় একেবারে হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে তাকে। তাই এমন ঘটনার সাক্ষী থাকতে মানুষ এসেছিলেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে। এমনকি ব্রাহ্মণ হত্যার সাক্ষী থাকার অপরাধ মেনে নিয়েছিল ধর্মপ্রাণ হিন্দুরাও। শাস্ত্রমতে অবশ্য গঙ্গাজলে স্নান করলেই সেই দোষ কেটে যাবে। তাই অনেকেই বাড়ি ফেরার সময় গঙ্গাস্নান সেরে ফিরেছিলেন। 

তবে নন্দকুমারের বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অনেক শঠতা, কপটতা এবং ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। এমনকি দেশীয় শাসকদের স্বাধীনতা রক্ষার শেষ চেষ্টাও নিভে গিয়েছিল সেইসঙ্গে। পলাশির যুদ্ধে সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকে অনেকেই একটা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছিলেন।

তারা ভেবেছিলেন ব্রিটিশদের প্রথমে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে প্যাঁচে ফেলে জব্দ করবেন। তাদের মধ্যেই ছিলেন মহারাজা নন্দকুমার। শেষ পর্যন্ত তাদের আশা সফল হয়নি। ব্রিটিশ শক্তিই বরং তাদের প্রত্যেককে একে একে চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

 লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসনন্দকুমারের মামলাটি ছিল অতি সাধারণ। সামান্য একটি জালিয়াতির মামলায় তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। ব্রিটিশ আদালতে অবশ্য জালিয়াতির শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এদেশের চিরাচরিত আইনে এমন কঠোর শাস্তির কথা কেউ কল্পনাও করতে পারতেন না। তবে ঘটনার বীজ লুকিয়ে ছিল অনেক গভীরে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নন্দকুমার নানাভাবে দেশীয় রাজশক্তিকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ তার প্রমাণ পেয়েছে বহুবার। কিন্তু কিছুতেই তাকে বাগে আনতে পারেননি। আর তাই এই জালিয়াতির মামলার সূত্রে তারা পেয়ে গেলেন শেষ মোক্ষম অস্ত্র।

আরো পড়ুন: শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুরের করুণ পরিণতি, আশ্রয় জোটেনি বাংলাতেও

নন্দকুমার ছিলেন নবাবি আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের দেওয়ান। ১৭০৫ সালে বর্তমান বীরভূম জেলার নলহাটি থানার ভদ্রপুর গ্রামে নন্দকুমার জন্মগ্রহণ করেন। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ১৭৬৪ সালে নন্দকুমারকে ‘মহারাজা’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। তবে নন্দকুমারের সঙ্গে মূল দ্বন্দ্ব ছিল লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের। এদেশের গভর্নর জেনারেল হয়ে আসার আগে তিনি ছিলেন কোম্পানির সামান্য একজন কর্মচারী। সেই সূত্রে তার দায়িত্ব ছিল বর্ধমান, নদীয়া এবং হুগলির খাজনা আদায় করা। 

১৭৬৩ সালে মহারাজ নন্দকুমার অভিযোগ করেন যে, হেস্টিংস তাকে দশ লক্ষ টাকার এক-তৃতীয়াংশ ঘুষ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি এও দাবি করেন যে, হেস্টিংসের বিরুদ্ধে তার অভিযোগের প্রমাণস্বরূপ একটি চিঠি রয়েছে। কোম্পানির কাছে সমস্ত প্রমাণ দাখিল করলেন। আর তার ফলে হেস্টিংসকে সেই পদ থেকে সরিয়ে নন্দকুমারকে কালেক্টর নিযুক্ত করা হয়।

এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশ রেগে যান হেস্টিংস। তবে সেসময় তার কিছুই করার ছিল না। কারণ লর্ড ক্লাইভ নন্দকুমারকে স্নেহ করতেন। পরে অবশ্য বিভিন্ন দেশীয় রাজার সঙ্গে নন্দকুমারের গোপন পত্র বিনিময়ের কথা জানতে পেরে সেই সম্পর্ক তিক্ত হয়। তবু সাধারণ মানুষের কাছে কিন্তু নন্দকুমার ক্রমশ একজন নির্ভীক, সৎ এবং জনহিতৈষী ব্যক্তি বলেই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। এমন সময়েই এল সেই জালিয়াতির মামলা।

সিরাজউদ্দৌলানন্দকুমারের সঙ্গে জহরতের কারবার চলত বোলাকিদাস জহুরির। নবাব মীর কাশিমের আমলে একবার নন্দকুমার তাকে একটা মুক্তার হার, একটা কলকা, একটা শিরপেচ এবং চারটি হীরার আঙটি বিক্রি করতে দেন। কিন্তু যুদ্ধের সময় কাশেমবাজার লুঠ হওয়ায় বোলাকিদাসের নিজের জিনিসের সঙ্গে এগুলোও লুঠ হয়ে যায়। অতঃপর বোলাকিদাস নন্দকুমারকে ৪ হাজার ২১ টাকা পরিশোধ করবেন বলে অঙ্গীকারপত্র লিখে দেন। সেইসঙ্গে ৪ শতাংশ হারে সুদ দেবেন বলেও জানান। বোলাকিদাসের মৃত্যুর পর পদ্মমোহন দাস সেই টাকা পরিশোধও করেন।

আরো পড়ুন: সেই মোহর, আশরাফি আজ রূপ বদলিয়ে টাকা 

তবে পদ্মমোহনের মৃত্যুর পর বোলাকির এক আত্মীয় গঙ্গাবিষ্ণু সেই টাকার হিসাব নিয়ে নন্দকুমারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। নন্দকুমার তখন তার কাছে থাকা অঙ্গীকারপত্রের জোরে মুক্তি পান। ঠিক এই সময়ই ১৭৭৩ সালে আবার কলকাতায় আসেন  হেস্টিংস। এবার তিনিই গভর্নর জেনারেল। সেইসঙ্গে রেগুলেটিং অ্যাক্ট অনুসারে কলকাতায় তৈরি হল হাইকোর্ট। তখন হেস্টিংসের পরামর্শে গঙ্গাবিষ্ণু হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন এবং বোলাকিদাসের অঙ্গীকারপত্রটি জাল বলে দাবি করেন। এই মর্মে মামলা শুরু হয় ১৭৭৫ সালের ১২ মে।  

শোনা যায় নিজের সপক্ষে যাবতীয় যুক্তি নন্দকুমার পেশ করেছিলেন। কিন্তু বিচারপতি এলিজা ইম্পে তার কোনো কথাতেই কর্ণপাত করেননি। স্যার এলিজা ইম্পে ছিলেন তার স্কুলের বন্ধু। হেস্টিংসের প্রাণের বন্ধু এলিজা শুধু ভেবেছিলেন, কী কী ভাবে নন্দকুমারকে শাস্তি দেয়া যায়। অবশেষে ১৬ জুন ফাঁসির রায় বেরোল এবং ৫ আগস্ট ফাঁসির দিন স্থির করা হল। তবে এরপরেও নাকি মামলা গড়িয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে।

মহারাজা নন্দকুমার ও  লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসসেখানে হেস্টিংস এবং এলিজা দুজনকেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কেননা যে মামলায় নন্দকুমার শাস্তি পেলেন সেটি শুরু হয়েছিল হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার আগে। অতএব আইন মোতাবেক তা হাইকোর্টের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। এছাড়াও ইংল্যান্ডের আইনে জালিয়াতির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও ভারতের হিন্দু আইন বা মুসলমান আইনে তা নয়। বরং তৎকালীন আইন অনুযায়ী কোনো ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যেত না। কিন্তু এইসব প্রশ্ন যখন ওঠে তখন পুনরায় বিচার করার আর কোনো সুযোগই নেই।

এর অনেকদিন আগেই মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি হয়ে গেছে। ষড়যন্ত্রকারী হয়েছিলেন আরেক ষড়যন্ত্রের শিকার। তাই তো গুণীজনদের কথায় প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের শাস্তি পান কিংবা বলতে পারেন পাপ তার বাপকেও ছাড়ে না। একদিন না একদিন পাপের শান্তি ভোগ করতেই হবে। সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধের যথার্থ শাস্তিই পেয়েছিলেন নন্দকুমার।  

তবে যাই হোক মহারাজ নন্দকুমার সমাজে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাই তার ফাঁসি স্থানীয় জনসাধারণের মনে আতঙ্কের সঞ্চার ঘটায়।এর ফলে বহু বাঙালি কলকাতা ছেড়ে বেনারসের মতো জায়গায় চলে যায়। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় এখনো তার নামে অনেক স্কুল , রাস্তা, মন্দির রয়েছে। তার জীবনী নিয়ে কয়েকটি বই ও লেখা হয়েছিল বিভিন্ন সময়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে