সেই মোহর, আশরাফি আজ রূপ বদলিয়ে টাকা

ঢাকা, শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৭,   ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

সেই মোহর, আশরাফি আজ রূপ বদলিয়ে টাকা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৫ ১৯ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৭:২২ ১৯ অক্টোবর ২০২০

ছবি: সোনার মুদ্রা ও কাগজের টাকা

ছবি: সোনার মুদ্রা ও কাগজের টাকা

বিনিময় প্রথা আজকের নয়, আদিকাল থেকেই চলে আসছে। সেকালে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য পাওয়া যেত। প্রাচীনকালে বিনিময় প্রথার মাধ্যমে মানুষ জিনিসপত্র কেনাবেচা করত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক লেনদেনও বিনিময় প্রথাই ছিল একমাত্র উপায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনিময় প্রথার বদলে মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়।  

বর্তমানে আমরা লেনদেনে কাগজের টাকা ব্যবহার করি। তবে এই বাংলাতেই একসময় ব্যবহার হতো সোনা, রুপার মোহর। আশরাফি সহ কতশত নামের মুদ্রা। আজ সেই ইতিহাসই জানাবো আপনাদের। মোহর, আশরাফি থেকে আজকের টাকা। এই দীর্ঘ পরিবর্তনের ইতিহাস। জানেন কি? আমাদের দেশে কিন্তু মুদ্রা জাদুঘর আছে। সেখানে গিয়ে দেখতে পারেন বিভিন্ন সময়কার মুদ্রা। তবে চলুন আজ জেনে নিন কোন যুগে কীভাবে এসেছিল সোনা, রুপার মোহর। আর তা থেকে আজ টাকা কীভাবে এলো- 

টিপু সুলতানের আমলের সোনার মোহর

এখন যেখানে তুরস্কের অবস্থান, ওই প্রদেশে খ্রিস্ট জন্মের আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে থেকেই মুদ্রা ব্যবহারের ঐতিহাসিক তথ্যের হদিশ পাওয়া গেছে। আর খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকেই ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস আরম্ভ হয়। চীনা ইয়েন এবং লিডিয়ান ষ্টেটারের সঙ্গে প্রাচীন ভারত মুদ্রার প্রারম্ভিক প্রচলনকারী দেশসমূহের অন্যতম। মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের প্রত্ন ইতিহাস রচনায় মুদ্রা এবং শিলালিপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। 

আরো পড়ুন: শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুরের করুণ পরিণতি, আশ্রয় জোটেনি বাংলাতেও

বাংলার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সুলতানি আমলে সোনার মোহর, রুপার তঙ্কা এবং তামার জিতল ব্যবহারের প্রবণতা। এগুলো সবই মুদ্রার এক একটি নাম। এই আমলের শেষে রুপা এবং তামা মেশানো একধরনের মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। শের শাহ মুদ্রাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন, তার সময় থেকেই সোনা, রুপা এবং তামা এই তিনধরনের মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়, যা মোঘল সম্রাটেরা অনুসরণ করেছিলেন।

আশরাফিশের শাহ শূরী তার পাঁচ বছরের শাসনকালে (১৫৪০-১৫৪৫) ১৭৮ রতি ওজনের রুপার মুদ্রা রুপিয়া নামে প্রচলন করেছিলেন। মোগল তথা মারাঠাদের রাজত্বকালের সঙ্গে ইংরেজশাসিত ভারতে রুপার মুদ্রা প্রচলিত ছিল। শের শাহ শূরীকে ভারতীয় টাকার (রুপি) প্রথম প্রচলনকারী বলে মানা হয়। প্রাচীন বাংলায় হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজত্বকালে যেরকম মুদ্রা প্রচলিত ছিল, তা ছিল সমচতুষ্কোণ। কোনো কোনো রাজার সময়ে সমষটকোণ মুদ্রাও তৈরি হত। 

বাবর এবং হুমায়ুনের শাসনামলে প্রচলিত মুদ্রার নাম ছিল শাহরুখি মুদ্রা। এই মুদ্রা ছিল রুপার তৈরি। এই মুদ্রাতে পবিত্র কোরআনের কলেমা খোদাইয়ের রীতি ছিল। তার সঙ্গে একপিঠে ইসলামের প্রথম চার খলিফা এবং সম্রাটের নাম এবং অপর পিঠে যে টাঁকশালে মুদ্রাটি তৈরি হয়েছে তার নাম ও তারিখ লেখা থাকত। পরবর্তী সময়ে হুমায়ুন অপেক্ষাকৃত ভারী মুদ্রার প্রচলন করেন যা ‘মোহর’ নামে পরিচিতি পায়।

সম্রাট আকবরের আমলের মুদ্রা প্রত্নবিদদের গবেষণা অনুসারে মোঘল আমলে প্রচলিত সোনার মুদ্রার নাম ছিল ‘মোহর’ বা ‘আশরফি’। এ যুগে প্রধান মুদ্রা অবশ্য ছিল রুপা দিয়ে তৈরি, নাম ‘রূপায়া’। এটা দিয়েই সে সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। প্রজারা কর দিয়ে থাকত। তামা দিয়ে তৈরি একপ্রকার মুদ্রার নাম ছিল ‘দাম’। দক্ষিণভারতে বিজয়নগরে সোনা দিয়ে তৈরি ‘হোন’ ছিল প্রধান মুদ্রা। এই মুদ্রা ভারতের অন্যান্য স্থানেও বিশেষভাবে প্রচলিত হয় পরবর্তী সময়ে।

আরো পড়ুন: এখনো রহস্যময় তিন হাজার বছর পুরনো ঢাকার এক সমাধি  

সম্রাট আকবরের শাসনামলে মুদ্রা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। সিংহাসন জয়ের পরে প্রথম তিন বছর শাহরুখি মুদ্রাই চালু ছিল। ধীরে ধীরে অবশ্য আকবর অবশ্য মুদ্রার ডিজাইন তৈরি করতে বিশেষভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আকবরি মুদ্রাতে তার ব্যক্তিগত চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। সম্রাট আকবর ‘দীন-ই-ইলাহি’ ধর্মমত প্রবর্তন করেছিলেন। এই মতের অনুসরণেই আকবর ‘ইলাহি মুদ্রা’ চালু করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় জানিয়ে রাখি আপনাদের।

আকবরের সময়কার সোনার মুদ্রা এটিমোঘল আমলে যে তিনধরনের মুদ্রা প্রচলিত ছিল তার ব্যবহারেও ছিল সূক্ষ্ম বিভাজন। স্বর্ণমুদ্রাগুলো প্রধানত সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহার করা হত। উচ্চপর্যায়ের লেনদেন অবশ্য হত তামার মুদ্রার মাধ্যমে। আওরঙ্গজেবের সময়ে তামার সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে মুদ্রার ওজন প্রায় ১/৩ কমে যায়। তামার সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে দামও বেড়ে যায়। খুচরো বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সেই সময়ে সাম্রাজ্যে কড়ি ব্যবহার করা হত। 

ভাষাবিদগণের মতে, সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভুত ‘টাকা’ শব্দটি। সংস্কৃত শব্দ ‘টঙ্ক’, যার অর্থ রৌপ্যমুদ্রা, থেকে এসেছে টাকা। আবার অনেকের মতে, মোঘল রাজ্যারম্ভে সর্বপ্রথম গোলাকার মুদ্রা প্রচলিত হয়। তুর্কী ভাষায় গোল টাকাকে 'তঙ্কা' বলে। সেই তঙ্কা শব্দের অপভ্রংশে বর্তমানে টাকা শব্দটি উৎপন্ন হয়েছে। আগে যেকোনো ধরনের মুদ্রা বা ধাতব মুদ্রা বুঝাতে টাকা শব্দটির প্রচলন ছিল। 

বিভিন্ন আকারের মুদ্রা ছিল অর্থাৎ টাকা দ্বারা সবসময়ই অর্থকে বোঝানো হয়েছে। বাংলায় এর প্রচলন শুরু চতুর্দশ শতকে। বাংলা ভাষার একটি অংশ হিসেবে বাঙালিরা সব ধরনের কারেন্সি বা নোট বা মূলধন বোঝাতে ‘টাকা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় ভারতীয় রূপিকেও প্রশাসনিকভাবে টাকাই বলা হয়।

দেশিয় কিছু মুদ্রা বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে হলেও শুরুটা ছিল ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে। তখন দেশে পাকিস্তান রূপির প্রচলন ছিল, যেটিকে কাগজে-কলমে টাকাও বলা হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা বেসরকারিভাবে পাকিস্তানি টাকার একপাশে ‘বাংলা দেশ’ এবং অপর পাশে ‘Bangla Desh’ লেখা রাবার স্ট্যাম্প ব্যবহার করতেন। ১৯৭১ সালের ৮ জুন পাকিস্তান সরকার এই রবার স্ট্যাম্প যুক্ত টাকাকে অবৈধ এবং মূল্যহীন ঘোষণা করে। জানা যায় এরপরেও ১৯৭৩ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত এই রাবার-স্ট্যাম্পযুক্ত পাকিস্তানি টাকা চলেছিল সারা দেশে।

পাঁচ টাকার নোট ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় আওরঙ্গজেবের সময়ে সাম্রাজ্যে ‘সরাফ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরা আজকের ব্যাংকের মতো সেকালে টাকা বিনিয়োগের কাজ করত। কাগজের ব্যাংক নোটের সর্বপ্রথম প্রচলনকারীর মধ্যে ছিল ব্যাঙ্ক অফ হিন্দুস্তান (১৭৭০-১৮৩২)। ধাতুর মুদ্রা ঠিক কতখানি খাঁটি তাও দেখে নেয়া যেত সেসময়। তুর্কি শাসকদের আমলে কাগজের ব্যবহার শুরু হলে সরাফরা ‘হুন্ডি’ নামে একধরনের কাগজ চালু করেছিল। 

বণিকরা কোনো এক জায়গায় সরাফকে টাকা জমা দিয়ে সেই কাগজ কিনে অন্য জায়গায় তা প্রয়োজনে ভাঙিয়ে নিতে পারত। এতে বণিকদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা নিয়ে যেতে সুবিধা হয়েছিল। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত টাকশাল বা কোষাগার থেকে মুদ্রাগুলো মুদ্রিত হত।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে