মিনারটি উঁচু না হওয়ায় সুলতানের নির্দেশে প্রাণ যায় মিস্ত্রীর!

ঢাকা, শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৭,   ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

মিনারটি উঁচু না হওয়ায় সুলতানের নির্দেশে প্রাণ যায় মিস্ত্রীর!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৯ ১৯ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৩:৪০ ১৯ অক্টোবর ২০২০

ছবি: ফিরোজ শাহ মিনার

ছবি: ফিরোজ শাহ মিনার

গৌড় বাংলার এককালীন রাজধানী এবং অধুনা ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি নগর যার অবস্থান বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। এটি লক্ষণাবতী নামেও পরিচিত। 

প্রাচীন এই দুর্গনগরীর অধিকাংশ পড়েছে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদা জেলায় এবং কিছু অংশ পড়েছে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। 

তবে ইতিহাসের স্মৃতি বিজড়িত এই শহর বড়ো সোনা মসজিদ, দাখিল দরোয়াজা, লোটন মসজিদ, চিকা মসজিদের মতো বিখ্যাত সব স্থাপত্যের জন্য পর্যটক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। 

এর মধ্যেই মালদা রেল স্টেশন থেকে ১৭ কিলোমিটার এবং দাখিল দরোয়াজা থেকে মোটামুটি এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুতুব মিনারের মতো দেখতে ফিরোজ মিনার এক অন্যতম স্থাপত্য।

এই মিনারটি বিজয় মিনার হিসেবে ১৪৮৫ থেকে ১৪৮৯ সালের মধ্যে হাবসি বংশের সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ নির্মাণ করেন। 

মিনারটি পরে আবার উঁচু করা হয়হাবসি শাসনকালে তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ সুলতান। রাজত্ব করেছিলেন ১৪৮৭ থেকে ১৪৯০ সাল পর্যন্ত। যদিও এই ফিরোজ শাহ বাংলায় হাবসি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বারবক শাহকে হত্যা করেন। তার আসল নাম ছিল মালিক আনদিল। 

ইলিয়াস শাহি বংশের শেষ সুলতান জালালউদ্দিন ফতে শাহর নাবালক ছেলেকে সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে ফতে শাহর বিধবা স্ত্রী তাতে সম্মত না হওয়ায় তিনি নিজেই সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ নাম নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন। 

এই মিনার থেকে পরে মাজানা বা আজান দেয়া জায়গা এবং বিজয় মিনার হিসেবে তিনি ফিরোজ মিনার তৈরি করিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকেরা চিরাগ মিনারও বলে থাকেন এটিকে। 

নামাজের সময়ে নির্দেশ দিতে কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য মাজানায় এক সময়ে প্রদীপ জ্বালানো হত। সম্ভবত, সেখান থেকেই এই নামটি এসেছে। পীর আশা মিনার নামেও এটি পরিচিত।

এই মিনার নিয়ে লোকমুখে একটি আশ্চর্য গল্পের প্রচলন আছে। মিনারটি প্রথমে এত উঁচু ছিল না। মিনার তৈরির সময় সুলতান ফিরোজ শাহ কাজ দেখতে গিয়ে মিনারের উচ্চতা দেখে বিরক্ত হন। 

মিস্ত্রিকে জিজ্ঞেস করেলেন, মিনার আরও উঁচু হওয়া সম্ভব কিনা। মিস্ত্রি বললেন, অনেক উঁচু করা সম্ভব। এতে ভীষণ রেগে গেলেন সুলতান। প্রশ্ন করলেন, তাহলে উঁচু করা হয়নি কেন? 

মিস্ত্রি জবাব দিলেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র ছিল না। এতে সুলতান আরও রেগে গেলেন। বললেন, এই ব্যাপারে তাকে কেন জানানো হয়নি? মিস্ত্রি আর কথার উত্তর দেন না। চুপ করে থাকেন। সেই মিস্ত্রিকে মিনারে চূড়া থেকে নিচে ফেলে দেয়ার আদেশ দিলেন। মিস্ত্রিকে প্রাণ হারাতে হলো।

সুলতান মিনার থেকে নেমে পরিচারক হিঙ্গাকে মোরগাঁও যাওয়ার হুকুম দেন। যদিও কারণ জানাননি। সঙ্গে হিঙ্গাও মালিকের আদেশ মান্য করে সেখানে যান। সেখানে হিঙ্গার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সনাতন নামে ব্রাহ্মণ যুবকের। 

হিঙ্গার সমস্যার কথা শুনে সে মোরগাঁও থেকে দক্ষ রাজমিস্ত্রি নিয়ে সুলতানের কাছে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। কারণ মোরগাঁও ছিল রাজমিস্ত্রিদের জন্য বিখ্যাত। সনাতনের কথা মতো, রাজমিস্ত্রি নিয়ে হিঙ্গা সুলতানের কাছে হাজির হয়ে সুলতানকে সনাতনের কথা জানান।

সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ তখন সনাতনকে রাজ দরবারের এক উঁচু পদে নিয়োগ করলেন তাকে। তারপর সমাপ্তি হলো এই ফিরোজ মিনার নির্মাণ। আজও তা অমলিন হয়ে সেই সাক্ষ্য বয়ে চলেছে।

মিনারটি উচ্চতায় পাঁচতলা বিশিষ্ট। নিচের দিক থেকে তিনটি তলায় বারোটি পার্শ্বদেশ রয়েছে। বাকি উপরাংশে প্রস্তরনলের মাধ্যমে ক্রমে সরু হয়ে উপরে উঠে গিয়েছে। 

উপরের দিকের শেষ তলাটি, যার অস্তিত্ব বর্তমানে নেই, আদিতে ছিল একটি উন্মুক্ত প্যাভিলিয়ন। এ প্যাভিলিয়ন একটি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। 

ঐতিহাসিক মিনারনিচের দিক থেকে মিনারটির বৃত্তাকার অংশে প্রস্তরনল যুক্ত করা হয়েছে এবং প্রতি তলার বারোটি পার্শ্বদেশের একটির সঙ্গে অন্যটিকে পৃথক করা হয়েছে অনুভূমিক পাথর দিয়ে। 

মিনারের ভেতরের দিকে সর্পিল সিঁড়ি উপরে উঠে গিয়েছে। সিঁড়িতে রয়েছে মোট তিয়াত্তরটি ধাপ। এ ধাপ পেরিয়ে মিনারের চূড়ায় উঠা যেত। 

তবে বর্তমানে সমতল ছাদ দিয়ে চূড়াটি ঢেকে দেয়া হয়েছে। প্রবেশ দরজার সঙ্গে সাদৃশ্য রক্ষা করে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে প্রতি তলার জানালা।

 মিনারটির নিচের তলাটিতেই শুধু অলঙ্করণ করা হয়েছে। দেওয়ালগুলো খোপকৃত এবং এ খোপগুলো খাজ বিশিষ্ট খিলান নকশায় অলঙ্কৃত এবং এর সঙ্গে রয়েছে ঝুলন্ত শিকল ও ঘন্টার অলঙ্করণ। 

পাথরের দড়ি নকশার বন্ধনীতে আছে জাফরি নকশা, পাতা, গোলাপ নকশা এবং দন্ত নকশা। প্রবেশ দরজার স্প্যান্ড্রিলে আছে তিনটি বড় আকারের গোলাপ এবং এ দরজার উপরে রয়েছে পাথর। 

উপরে দরজার ফ্রেমে দুটি অনুভূমিক দড়ি নকশার বন্ধনী আছে। এগুলোর শীর্ষে রয়েছে সচ্ছিদ্র নকশা। দরজার নিচের পাথর খন্ডটি সম্ভবত কোন মন্দির থেকে আনা হয়েছিল। 

কারণ পাথরটিতে রয়েছে বন্যশূকর শিকারের ছবি। তুঘলকি শৈলীতে নির্মিত পাঁচ তলা এই মিনারের দেওয়াল জুড়ে আছে পোড়ামাটির কাজ। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস