এখনো রহস্যময় তিন হাজার বছর পুরনো ঢাকার এক সমাধি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

এখনো রহস্যময় তিন হাজার বছর পুরনো ঢাকার এক সমাধি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫০ ১৪ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৭:৫৪ ১৪ অক্টোবর ২০২০

ছবি: কলম্বো সাহেবের সমাধি

ছবি: কলম্বো সাহেবের সমাধি

হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও এই সমাধি নিয়ে রহস্যের জট খোলে নি। কলম্বো সাহেবের সমাধিটি মোঘল স্থাপত্যরীতিতে বর্গাকারভাবে তৈরি করা হয়েছে। অনেকটা সেসময়ের মসজিদের আদলে। আচ্ছা কোথায় এই সমাধিটি? তাই হয়তো ভাবছেন অনেকে। বেশি দূরে না ঢাকা শহরেই রয়েছে এটি। ওয়ারীর নারিন্দায় এখনো ঠাই দাঁড়িয়ে কলম্বো সাহেবের সমাধিটি। 

নারিন্দায় রয়েছে খ্রিস্টানদের কবরস্থান। ঢাকার তিনটি স্থানেই মূলত সমাধিস্থ করা হতে থাকে ইউরোপীয়দের- তেজগাঁও, আরমানিটোলা ও নারিন্দায়। এর মধ্যে নারিন্দার সমাধিক্ষেত্রটিই ছিল প্রধান ও সর্ববৃহৎ। প্রথম পর্তুগিজরা, এরপর একে একে ওলন্দাজ, ফরাসি, আর্মেনীয়, গ্রিক ও ইংরেজরা ঢাকার মাটিতে পা রাখেন ব্যবসায়ের উদ্দেশে। আর তাদের পথ ধরে মিশনারিরা আসেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপীয়দের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকা।

আরো পড়ুন: ১৫০ বছর পুরনো ঢাকার ‘ব্রাহ্ম লাইব্রেরি’: যেখানে মেলে দুর্লভ বই

এই ইউরোপীয়দের অনেকেই স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাসের নিয়ত নিয়ে এসেছিলেন। আর তাই নিজেদের প্রয়োজনেই তারা ঢাকায় গড়ে তুলতে শুরু করেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানা, কুঠি, উপাসনালয়, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। ঢাকাই জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন তারা। ঢাকার মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাসও ত্যাগ করতে শুরু করেন অনেকে। 

কলম্বো সাহেবের সমাধির এই ছবিটি তোলা হয় ১৯৬০ সালের দিকেএই ইউরোপীয়দের সমাহিত করা হবে কোথায়? ইউরোপীয় সম্মানীত ব্যক্তিত্বদের তো আর যেখানে সেখানে চিরশায়িত করা যায় না। আর তাই তাদের জন্য এই কবরস্থানগুলো তৈরি করা হয়। কবরস্থানের ভেতরের একটি ফলক থেকে জানা যায় ১৬০০ সালে এই জায়গাটিকে কবরস্থান হিসেবে তৈরি করা হয়। 

তবে ১৭০০ সালের আগে এখানে কাউকে কবর দেয়া হয়েছিল কিনা। তার কোনো প্রমাণ মেলে নি। সতেরো শতকের গোড়ার দিকে এই সমাধিক্ষেত্র গড়ে উঠলেও, সবচেয়ে পুরনো যে এপিটাফটির দেখা মেলে, সেটি ১৭২৪ সালের। সমাধিটি কলকাতার কোম্পানি চ্যাপলিন রেভারেন্ড জোসেফ পেজেটের। ১৭২৪ সালের ২৬ মার্চ ঢাকাতেই মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই সমাধিটির সামনেই রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড। তাতে এই সমাধিক্ষেত্রকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ বলে ঘোষণা দেয়া।

আরো পড়ুন: ঢাকার যে রেস্তোরাঁয় ৭০ বছর ধরে জনপ্রিয় ‘ক্রামচাপ’

যেহেতু জব চার্নক ১৬৯০ সালের পর কলকাতার গোড়াপত্তন করেছিলেন, তাই আমরা ধরে নিতেই পারি, কেবল এর পরের সময়কালের, অর্থাৎ আঠারো শতকের সমাধিগুলোতেই প্রথম এপিটাফ ব্যবহৃত হয়েছে। এর আগে সম্ভবত ঢাকায় স্থানীয়ভাবে পাথরের এপিটাফ তৈরি সম্ভব ছিল না বলে সমাধিগুলোতে এপিটাফ ব্যবহার করা হয়নি। কলকাতা থেকে তৈরি করা হয়েছিল পাথরের এপিটাফগুলো।

নারিন্দায় খ্রিস্টানদের অন্যতম এই কবরস্থানটি এখনো আছে একসময় এই পুরো সমাধিক্ষেত্রটিই ছিল প্রাচীরঘেরা, এবং মুসলিম রীতিতে নির্মিত গেট দিয়ে সাড়ে ছয় একরের উপর অবস্থিত মূল ভূখন্ডে প্রবেশ করতে হতো। এই সমাধিক্ষেত্রে মোট ছয় ধরনের সমাধির দেখা পাওয়া যায়।

টাইপ এ, টাইপ বি, টাইপ সি, ডি, ই এবং টাইপ এফ। টাইপ এ সমাধিগুলোর কোনো ধ্বংসাবশেষই আর চোখে পড়ে না। টাইপ বি সমাধির নকশা অনেকটা সমতলভূমির কেন্দ্রের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ তোরণের মত। টাইপ সি, ডি, ই - এ ধরনের সমাধির স্তৃতিস্তম্ভ আর কফিনের সঙ্গে কলকাতার সমসাময়িক ইংরেজ সমাধিগুলোর সাদৃশ্য দেখা যায়। এ সমাধিগুলো দেখতে অনেকটাই ভারতীয় পিরামিডের মতো, যা একটি পাকা ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পাকা ভিত্তিটি সমাধির উপর তৈরি হয়, আর সেটির স্মৃতিস্তম্ভ কোণাকুণিভাবে উপরে উঠে একটি চূড়ায় গিয়ে শেষ হয়।

টাইপ এফ - এ ধরনের সমাধিগুলো সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ও বিচিত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এই সমাধিগুলো বৃত্তাকার নয় বরং ডোরিক ও আয়ন কলামের দ্বারা অষ্টভুজ ও বর্গাকৃতির হয়। পরবর্তী অংশে এ ধরনের সমাধি সম্পর্কে আমরা আরও বিশদে জানব।

কলম্বো সাহেবের সমাধিটি ঠিক করে তৈরি করা হয়েছিল তা জানা নেই কারোকলম্বো সাহেব সমাধি ঢাকা জেলার সূত্রাপুরের ওয়ারীতে অবস্থিত একটি পুরাতন সমাধি ও বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। কলম্বো সাহেব সমাধি খ্রিস্টান সমাধিক্ষেত্রে অবস্থিত। খ্রিস্টান সমাধিক্ষেত্রে মূলত ছয় ধরনের সমাধির মধ্যে এর টাইপ হলো ‘এফ’। ১৭২৪ সালে কলম্বো সাহেব নামক জনৈক একজনকে এখানে সমাহিত করা হয়।  

কলম্বো সাহেব সমাধিটি মোঘল স্থাপত্যরীতিতে বর্গাকারভাবে তৈরি করা হয়েছে। এর চারদিকের প্রতিটি দেয়ালে ৪টি করে প্রবেশপথ রয়েছে। সমাধিক্ষেত্রটির সামনের অংশে নকশা অঙ্কিত পিলার রয়েছে। সামনে রয়েছে অষ্টাভুজাকৃতির একটি পিলার ও পিলারে একটি পরীর ছবি আঁকা রয়েছে।

আরো পড়ুন: ১৫০ বছরেও বদলায়নি আহসান মঞ্জিল, বদলেছে বুড়িগঙ্গার রূপ

সমাধিক্ষেত্রটিতে বেশ কয়েকটি শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায় যদিও সেগুলো কালের বিবর্তনে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পুরো সমাধিক্ষেত্রটি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সমাধির সমন্বয়ে তৈরি। যদি যখন সমাধিটি নির্মাণ করা হয়েছিল তখনকার কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান কাঠামোর অনেক পার্থক্য রয়েছে কারণ বিভিন্ন সময়ে সমাধিক্ষেত্রটির ক্ষতিসাধিত হয়েছিল।

এই সমাধিটি মুঘল আমলের তৈরি মসজিদের আদলে বানানো তিন তলা সমাধিনিশ্চই ভাবছেন, কে এই কলম্বো সাহেব? সবমিলিয়ে চোখ ধাঁধানো একটি সমাধিই বটে। কিন্তু কার সমাধি এটি? প্রশ্ন জেগেছিল হেবারের মনেও। বাকিটা তার নিজের বিবরণীতেই রয়েছে। "...the old Durwan of the burial ground said, it was the tomb of a certain 'Columbo Sahib, Company ka nuokur;' Mr Columbo, servant to the Company; who he can have been I know not; his name does not sound like an Englishman's, but as there is no inscription, the beadle's word is the only accessible authority." 

বোঝাই যাচ্ছে, বুড়ো দারোয়ানের মুখে কলম্বো সাহেবের পরিচয় কোম্পানির চাকুরে শুনেও হেবারের মনের সংশয় কাটেনি। ফলে কে যে আসলে এই কলম্বো সাহেব, তা আজও একটি অনুদ্ঘাটিত রহস্য হিসেবেই রয়েছে গেছে। রহস্যভেদের চেষ্টাচরিত্র কিন্তু কম করা হয়নি। কিন্তু সবই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

আরো পড়ুন: ষাটের দশকেও ঢাকায় ছিল আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স

তবে কোথাও পাওয়া যায়নি কলম্বো সাহেবকে। ১৯১৭ সালে Bengal Past and Present নামক সাময়িকীর পঞ্চদশ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেখানে ওয়াল্টার কে ফারমিঙ্গার রচিত Some old graves at Dacca নামক একটি নিবন্ধও ছিল। কিন্তু সেই নিবন্ধেও লেখক নারিন্দা সমাধিক্ষেত্রের সমাধিগুলোর যে তালিকা সংযুক্ত করেছিলেন, সেখানে কোনো পরিচয় ছিল না কলম্বো সাহেবের।

তবে যেহেতু বুড়ো দারোয়ানের মুখে একবার কলম্বো সাহেবের পরিচয় হিসেবে কোম্পানির চাকুরে শব্দদ্বয় উচ্চারিত হয়েছে, তাই আমরা যাচাই করে দেখতে পারি এই সমাধিক্ষেত্রে ব্রিটিশ কোম্পানির আর কোনো চাকুরের সমাধি রয়েছে কি না। আলবৎ রয়েছে। বেশ অনেকগুলো সমাধি বা পরিত্যক্ত এপিটাফই পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি নাথানিয়েল হলের। ১৭২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি।

কলম্বো সাহেবের সমাধির ছাদ অপর একটি নিকোলাস ক্লেরেম বল্টের। তিনি মারা যান ১৭৫৫ সালের ১৬ নভেম্বর। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত যে, তাদের কেউই আমাদের কলম্বো সাহেব নন। কারণ তাদের এপিটাফ কলম্বো সাহেবের সমাধিগৃহে পাওয়া যায়নি। আর কলম্বো সাহেবের সমাধিগৃহের তিনটি সমাধিই শূন্য, কোনো এপিটাফ নেই সেখানে। এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সম্ভবত কলম্বো সাহেবের সমাধিতে কোনোকালেই এপিটাফ বসানো হয়নি।

কলম্বো সাহেবের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া না গেলে কী হয়েছে, তাতে তার গ্রহণযোগ্যতা এতটুকুও কমছে না। কারণ ইউরোপীয় কোনো শিল্পীর আঁকা ঢাকার প্রাচীনতম চিত্রকর্মেই রয়েছে দেখা পাওয়া যায় তার সমাধির। ইউরোপীয় চিত্রশিল্পী জোহান জোফানির ১৭৮৭ সালে তেলরঙে আঁকা 'নাগাপন ঘাট' নামে একটি চিত্রকর্ম রয়েছে। 

সেই চিত্রকর্মে দেখা যায়, ছোট্ট একটি নদীর পাড়ে দুর্গের মতো দেখতে একটি স্থাপনা। বাংলাদেশ ফোরাম ফর হেরিটেজ স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও গবেষক ওয়াকার এ খানের মতে, ঐ স্থাপনাটিই হলো নারিন্দা সমাধিক্ষেত্রে কলম্বো সাহেবের সমাধি। এ থেকে আরও একটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, কলম্বো সাহেবের মৃত্যু অবশ্যই ১৭৮৭ সালের আগে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে