দেশের প্রথম ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে

ঢাকা, সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

ঐতিহ্যবাহী সলিমুল্লাহ হল

দেশের প্রথম ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৫ ১২ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৫ ১২ অক্টোবর ২০২০

ছবি: ১৯৪০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হল

ছবি: ১৯৪০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের যাত্রা শুরু হয় তিনটি হল দিয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়তে আসা ছাত্রদের থাকার জন্যই হলগুলো তৈরি করা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী হল হচ্ছে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক আগে এটির উদ্বোধন করা হয়।   

নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুরের নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়েছে। এটি ১৯১৩ সালের ১১ আগস্ট উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর মধ্যে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ঐতিহ্যের কারণে একটি বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। বিখ্যাত এই হলের ইতিহাস নিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ "সলিমুল্লাহ মুসলিম হল" নামের একটি বই লিখেছেন।

বর্তমান সলিমুল্লাহ হল নিজস্ব ঐতিহ্য ও গৌরবে অনন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষা, গবেষণা ও জাতীয়ভাবে অবদানের ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথম স্থান দখল করে রয়েছে। ইতিহাস ঐতিহ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের যেকোনো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনন্য। কারণ পৃথিবীর বুকে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় আর খুঁজে পাওয়া যায় না, যেটি তার জাতিকে একটি নিজস্ব ভাষা ও মানচিত্র উপহার দিতে পেরেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রাবাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম শুরু করে। 

আরো পড়ুন: দেশের যে নদীবন্দরের হাজার বছরের ইতিহাস

১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত হয়েছিল তিনটি হল: ঢাকা হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল। পরবর্তী সময়ে ঢাকা হলের নাম হয় শহীদুল্লাহ হল এবং মুসলিম হলের নাম রাখা হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হল। হলের প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন স্যার এ এফ রহমান। ১৯২৯ সালের ২২ আগস্ট বাংলার তৎকালীন গভর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য স্যার ফ্রান্সিস স্ট্যানলি জ্যাকসন ঢাকার প্রয়াত নবাব বাহাদুর স্যার সলিমুল্লাহর নামানুসারে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

নবাব বাহাদুর স্যার সলিমুল্লাহ এই হলের উদ্বোধন করেন১৯১২ সালের ২৭ মে ব্রিটিশ সরকার আবাসিক হল-ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে "নাথান কমিটি" গঠন করে। মুসলিম শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম বজায় রাখার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন একটি হলের সুপারিশ করে। নাথান কমিটির প্রতিবেদন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে, ব্রিটিশ ভারত সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল প্রস্তুত করে। ১৯২০ সালের ২৩ শে মার্চ ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেল লর্ড রিডিংয়ের সঙ্গে একমত হলে ভারতীয় আইন পরিষদ কর্তৃক এই বিলটি পাস হয়। ১৯২১ সালের ১০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়। 

আরো পড়ুন: ঢাকার যে রেস্তোরাঁয় ৭০ বছর ধরে জনপ্রিয় ‘ক্রামচাপ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলটি মূলত সচিবালয় হাউজের প্রথম তলায় ছিল। নিচতলার বৃহত্তম কক্ষটি একটি ডাইনিং রুম, রান্নাঘর, সাধারণ ঘর, গ্রন্থাগার এবং অন্যান্য কক্ষে বিভক্ত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে মুসলিম হল মোট ১৭৮ জন আবাসিক এবং সংযুক্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৫ জন ছাত্রকে রেখেছিল। সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ ফজলুর রহমান সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট হিসাবে নিয়োগ পান। দুজন গৃহশিক্ষকও নিযুক্ত করা হয়েছিল। একজন ফখরুদ্দিন আহমেদ, যিনি ছাত্রদের তদারকি করেছিলেন এবং মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ধর্মীয় নির্দেশের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

পাখির চোখে সলিমুল্লাহ হল১৯২২-২৩ অধিবেশনে আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০১। শিক্ষার্থীদের জন্য আটটি অতিরিক্ত কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৩২-২৪ অধিবেশনে মুসলিম আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে ১২৭ হয়, এবং সচিবালয় হাউসে ৬১টি কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছিল। যেহেতু নিয়মিতভাবে বাসিন্দার সংখ্যা বাড়ছিল, তাই হাউস টিউটর এম.এফ. রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।  

তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, "মুসলিম সম্প্রদায় তাদের জন্য একটি পৃথক হল তৈরি করা উচিত বলে ইচ্ছা পোষণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় তার মূলধন অনুদানের একটি অংশ ব্যয় করতে রাজি হয়েছে এবং একটি সরকারী ঋণ চেয়েছে। যদি এটি করা হয় তবে সম্প্রদায়টি কৃতজ্ঞ হবে। এটি হবে একটি সন্তুষ্টিজনক যে মুসলিম যুবক যারা তাদের প্রজন্মের আসল রক্ষক তাদের জন্য একটি উপযুক্ত ভবন সরবরাহ করা হয়েছে।"

বিশ্ববিদ্যালয় একটি নতুন হল তৈরি করতে সম্মত হয়েছিল এবং একটি ভবন কমিটি গঠন করেছিল। কমিটি হলের পরিকল্পনা এবং নকশা করার জন্য স্থপতি গওয়াইথরকে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯২৭ সালে বেঙ্গল সরকার এই পরিকল্পনাটি সম্পাদনের জন্য তহবিল সরবরাহ করে। ১৯৩০-৩১ অধিবেশন চলাকালীন ঠিকাদার মেসার্স মার্টিন অ্যান্ড কো. ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করে। ১৯৩১-৩২ অধিবেশনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলটি সম্পূর্ণ হয়।

মাত্র ৭৫ জন ছাত্র প্রথম থাকতে শুরু করে এই হলে

দোতলা ভবনটি দক্ষিণ দিক মুখ করা। এর চারটি শাখা রয়েছে, যার মাঝে একটি আয়তক্ষেত্রে উঠোন রয়েছে যা উত্তর ও দক্ষিণমুখী ঢাকা হাঁটার রাস্তা দিয়ে বিভক্ত। বারান্দাগুলো ভবনের সম্মুখভাগে রয়েছে। যা উঠোনের দিকে মুখ করানো। দক্ষিণ শাখার কেন্দ্রে, প্রবেশদ্বারে তিনটি পয়েন্টযুক্ত খিলান রয়েছে যার পার্শ্বে দুটি বর্গাকার টাওয়ার রয়েছে, প্রতিটির মাথায় রয়েছে একটি করে কন্দাকার হলুদ টাইল গম্বুজ।

আরো পড়ুন: ১৫০ বছর পুরনো ঢাকার ‘ব্রাহ্ম লাইব্রেরি’: যেখানে মেলে দুর্লভ বই 

গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ তার বইয়ে ঐতিহ্যবাহী সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রথম যুগের ইতিহাস বিশদভাবে তুলা ধরেছেন। এই হল সাক্ষী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের। এই হ্লের অনেক ছাত্র সেসময় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। এছাড়াও দেশের সমাজ- সংস্কৃতিতে যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, ইতিহাস নির্মাণে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের অনেকেই ছিলেন ছাত্রজীবনে এই হলের আবাসিক। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে শিখা গোষ্ঠীর উদ্যোগে বাঙালি মুসলিম সমাজে যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সূচনা ঘটে, তার কর্মতৎপরতার কেন্দ্র ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। রবীন্দ্রনাথের ঢাকা সফরকালে এই সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের উদ্যোগেই তাকে সবচেয়ে সাড়ম্বর ও আকর্ষণীয় সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে