নারীদের শ্লীলতাহানী রুখতেই স্থেটোস্কোপের আবিষ্কার

ঢাকা, সোমবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৫ ১৪২৭,   ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নারীদের শ্লীলতাহানী রুখতেই স্থেটোস্কোপের আবিষ্কার

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:২১ ১০ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১১:২৮ ১০ অক্টোবর ২০২০

ছবি: রেনে লেনেক এবং স্থেটোস্কোপ

ছবি: রেনে লেনেক এবং স্থেটোস্কোপ

ডাক্তারদের গলায় এমন একটি যন্ত্র ঝুলতে দেখা যায়। যার নাম স্থেটোস্কোপ। স্থেটোস্কোপ কানে লাগিয়ে রোগীর হার্টের কম্পন পরীক্ষা করেন। স্টেথোস্কোপ কে ডাক্তারি পেশার প্রতীকী হিসেবেও দেখা হয়।  

স্টেথোস্কোপ হলো মানুষ অথবা প্রাণী দেহের হৃৎস্পন্দন কিংবা অন্যান্য অভ্যন্তরীণ শব্দ শোনার জন্য একটি ডাক্তারি যন্ত্র। এটি প্রধানত হৃৎস্পন্দন এবং নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস এর শব্দ শুনতে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি অন্ত্র, ধমনী এবং শিরাতে রক্ত বয়ে চলার শব্দ শোনার জন্যেও ব্যবহার করা হয়।

১৮৫১ সালে, আইরিশ চিকিত্সক আর্থার লেয়ার্ড একটি বাইনোরাল স্থেটোস্কোপ আবিষ্কার করেছিলেন এবং ১৮৫২ সালে জর্জ ফিলিপ ক্যামম্যান বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য স্থেটোস্কোপ যন্ত্রের (যা উভয় কানে ব্যবহার করেছিলেন) নকশা তৈরি করেছিলেন। তবে এর শুরুটা কীভাবে হয়েছিল জানেন কি?

স্থেটোস্কোপের আবিস্কারক রেনে লেনেক পারস্য চিকিৎসক রেনে লেনেকের হাত ধরেই স্থেটোস্কোপের জন্ম। এরও রয়েছে মজার ইতিহাস। নারীদের শ্লীলতাহানীর হাত থেকে বাঁচাতে এই যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। রেনে লেনেকের প্রতিদিনের ঠিকানা প্যারিসের নেকার হাসপাতাল। ফ্রান্সের এই প্রাণকেন্দ্র নগরীতে বেশ নামডাক লেনেকের। সাধারণ জ্বর থেকে শুরু করে, যক্ষ্মার মতো যে কোনো দুরারোগ্য রোগেই শেষ ভরসা লেনেক। তিনি হাল ছাড়েন না কোনো মতেই। চেষ্টা চালিয়ে যান শেষ মুহূর্ত অবধি। আর সব থেকে বড় কথা হল সম্ভ্রান্ত থেকে শুরু করে হতদরিদ্র, যে কোনো রোগীই সমান তার কাছে।

আরো পড়ুন: হরিণের নাভি থেকেই তৈরি হয় বিশ্বসেরা সুগন্ধি 

চিকিৎসা করতে গিয়েই কি তিনি পেরিয়ে যাচ্ছেন শ্লীলতার সীমারেখা? হৃদযন্ত্র বা ফুসফুস পরীক্ষা করতে নারী রোগীর বুকে কান পেতে শোনা, একপ্রকার হেনস্থাই তো। প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই ভাবছেন না, এভাবে হয় না। কিন্তু উপায়? চিকিৎসা ছাড়ার কথাও আগে বার বার ভেবেছেন তিনি। এমনকি কয়েকদিন যানওনি হাসপাতালে। কিন্তু রোগীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়াও যে অমানবিকতার সমতুল্য। চিকিৎসক হিসেবে নিজের দায়িত্বকে এড়িয়ে যাওয়া। সময়টা উনিশ শতকের শুরুর দিক।

এভাবেই রোগীর বুকে কান লাগিয়ে হৃদ কম্পন শুনতেন চিকিৎসকরা সেদিন রাস্তায় যেতে যেতেই খেয়াল করলেন ফুটপাথে দুটো ছোট্ট বাচ্চা খেলা করছে। হাতে একটা লম্বা কার্ডবোর্ডের চোঙ। চোঙের একদিক একজনের কানের কাছে ঠেকিয়ে, আরেকদিকে তার ছোট্ট বন্ধু কথা বলছে কিছু একটা। প্রথম জন ঠিকরে উঠছে তাতে। তারপর হাসির রোল। ছোটবেলায় এমনভাবে অভিজ্ঞতা হয়েছে লেনেকেরও। কত আস্তে বলা কথাও কী ভীষণ জোরালো শোনায়, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।

আরো পড়ুন: ত্বক নয় মার্বেলের মূর্তির উপর উল্কি এঁকেই বিখ্যাত তিনি

ছোটবেলার সেই স্মৃতিকেই যেন উসকে দিল বাচ্চা দুটো। খানিকটা এগিয়ে যেতেই বিদ্যুৎগতিতে তার মাথায় খেলে গেল এক বুদ্ধি। পেয়ে গেলেন বহুদিন ধরে তাকে অস্বস্তি দিয়ে চলা সেই সমস্যার সমাধান। যদি তার ধারণাই ঠিক হয়, তবে নারী রোগীদের আর হয়রান হতে হবে না। বাড়িতে ঢুকেই শুরু হল প্রতীক্ষার প্রহর গোনা। পরদিন হাসপাতালে গিয়ে এটা যে পরীক্ষা করে দেখতে হবে তাকে।

রেনের চোঙ দিয়ে রোগীর হৃদ কম্পন পরীক্ষা করা রাত যেন আর কাটেই না। অবশেষে পরীক্ষা করার সুযোগ এলো তার। যেমনটা চেয়েছিলেন তেমনটাই হল। হাসপাতালে পরদিন হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে হাজির হলেন এক স্থূলকায় তরুণী। লেনেক বসতে বললেন তাকে। তারপর টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিলেন ওষুধ লিখে দেয়ার নোটবুকটা। রোল করে চোঙ বানিয়ে ধরলেন তরুণীর বুকে। চোঙের আরেকদিকে কান।

লেনেকের এই কাণ্ড কারখানা দেখে বিস্মিত তরুণী। তার সঙ্গে আসা পরিবারের আত্মীয়রাও। কোন পাগলের পাল্লায় পড়ল তারা সেই ভেবেই অস্থির হয়ে পর রোগী আর সঙ্গের সবাই। অন্যদিকে হাসির রেখে ফুটে উঠেছে লেনেকের ঠোঁটে। তিনি ততক্ষণে স্পষ্ট শুনতে পেয়ে গেছে হৃদপিণ্ডের একটানা বাজতে থাকা বাদ্যযন্ত্রের তাল। এবার শুধু তাকে এই নোটবুকের বদলে বানিয়ে ফেলতে হবে একটা চোঙ।

আরো পড়ুন: হাজারো বছরের দাওয়াই বাবলার কষ, দাম শুনলে চমকে উঠবেন!

তেমনটাই হল। ১৮১৬ সালে প্যারিসের নেকার হাসপাতালেই জন্ম নিল এক অদ্ভুত যন্ত্র। যার মাধ্যমে দূর থেকেই শোনা যাবে হৃদযন্ত্র কিংবা ফুসফুসের শব্দ। বলে দেয়া যাবে রোগের কারণ। লেনেক নাম দিলেন সিলিন্ডার। আর এইভাবে শব্দ শোনার পদ্ধতিকে তিনি নাম দিলেন মিডিয়াম অসকাল্টেশন।

তবে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পরও বেশ সমস্যার মুখেই পড়তে হল তাকে। বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখলেন না তৎকালীন সমাজ, অন্য চিকিৎসকরাও। তবে বছর চারেকের মধ্যেই তার এই পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ল ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালিতে। ধীরে ধীরে পেল জনপ্রিয়তা। পরে লেনেক নিজেও বেশ কিছু বদল করেছিলেন সিলিন্ডার-এর।

স্টেথোস্কোপকে ডাক্তারি পেশার প্রতীকী হিসেবেও দেখা হয়এই আবিষ্কারের সাড়ে তিন দশক পর ১৮৫১ সালে আয়ারল্যান্ডে তৈরি হল আধুনিক স্থেটোস্কোপ। দিশা দেখিয়ে দিয়েছিলেন লেনেক। এবার আইরিশ চিকিৎসক আরথার লেয়ার্ড দুকানে শোনার মতো করেই রূপ দিলেন যন্ত্রটিকে। তবে তার আবিষ্কারের এই পরিণতি দেখে যেতে পারেননি লেনেক।

সিলিন্ডার আবিষ্কারের বছর দশেক পরেই মৃত্যু হয়েছিল তার। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে। ১৮২৬ সালে। সারাদিন যক্ষ্মা রোগীদের নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে করতে কখন নিজেই আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন মারণ ব্যাধিতে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এই যক্ষ্মাই কেড়ে নিয়েছিল তার মেয়ের প্রাণও। তাই সমাপ্তি টানতে চেয়েছিলেন এই রোগের ইতিহাসে। তা আর সম্ভব হল না। কিন্তু বাকি চিকিৎসকদের জন্য লিপিবদ্ধ করে গেলেন যক্ষ্মার যাবতীয় লক্ষণ এবং উপসর্গের প্রকৃতি। কী ধরণের শব্দ শোনা গেলে বোঝা যাবে যক্ষ্মাকে, তাও দেখিয়ে গেলেন লেনেক।

রেনের প্রথম আবিষ্কার চোঙ দিয়ে প্রায় এক দশক ডাক্তাররা কাজ চালিয়েছেন পাশাপাশি শবদেহের পার্শ্ব ব্যবচ্ছেদের পদ্ধতি এবং লিভার সিরোসিসের মতো রোগকেও সনাক্ত করে গেলেন তিনি। আজও লিভার সিরোসিসকে তাই বলা হয় ‘লেনেক সিরোসিস’। আর স্থেটোস্কোপ ছাড়া সত্যিই কি কোনো চিকিৎসকের চরিত্র ভেসে ওঠে আমাদের মনে? বোধ হয় না। তবে ১৮৫২ সালে জর্জ ফিলিপ ক্যামম্যান বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য স্থেটোস্কোপ যন্ত্রের (যা উভয় কানে ব্যবহার করেছিলেন) নকশা তৈরি করেছিলেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে