দেশের যে নদীবন্দরের হাজার বছরের ইতিহাস

ঢাকা, শনিবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ০৯ সফর ১৪৪৩

দেশের যে নদীবন্দরের হাজার বছরের ইতিহাস

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৫ ৯ অক্টোবর ২০২০  

ছবি: ১৯৮১ সালের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল

ছবি: ১৯৮১ সালের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল

সদরঘাটের গোড়াপত্তন ঠিক কবে নাগাদ হয়েছে তার সঠিক তথ্য ইতিহাসে নেই। তবে এর বয়স প্রায় হাজার বছর বলেই মনে করেন ইতিহাসবিদরা। 

সদরঘাট বাংলাদেশের আদি ঢাকা শহরের একটি নদীবন্দর যাকে ঘিরে ১৯ শতকে একটি ব্যবসায়িক জনপদ গড়ে ওঠে। এই নদীবন্দরটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। 

মূলত জনপদ, প্রাচীন সভ্যতাগুলোর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নদীকে কেন্দ্র করে এবং সভ্যতার অগ্রগতিও হয়েছে নদীর গতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই। 

নদী তীরে যেমন গড়ে উঠেছে জনপদ, গড়ে উঠেছে নগর-রাষ্ট্র, সৃষ্টি হয়েছে বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকা নগর হিসেবে গড়ে উঠেছিল ‘ডাক্কা’। বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাচীনত্বের উল্লেখ পাওয়া যায় ‘বৃদ্ধগঙ্গা’ নামের দুই হাজার বছর আগে রচিত কলিকা পুরাণে। 

সদর ঘাট লঞ্চ টার্মিনালমূল ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে নদীটির অবস্থান এবং সারাদেশের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগের পথ সহজতর হওয়ায় সেই সময়ের নগর স্থপতিরা বেছে নেন এই স্থানটি। 

প্রতিরক্ষা, প্রশাসনিক, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের রাজকীয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বুড়িগঙ্গা নদীর ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্ব বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা।

নগর স্থপতিরা জানতেন ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’। এ কারণে নগরটি মধ্যযুগের ভারতবর্ষে মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘আকবরনামা’ গ্রন্থে ঢাকা একটি থানা বা সামরিক ফাঁড়ি হিসেবে এবং ‘আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে সরকার বাজুহার একটি পরগনা হিসেবে ঢাকার উল্লেখ রয়েছে। 

বুড়িগঙ্গা১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খান চিশিত সুবাহ্ বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সম্রাটের নামানুসারে এর নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। প্রশাসনিকভাবে জাহাঙ্গীরনগর নামটি ব্যবহৃত হলেও সাধারণ মানুষের মুখে ঢাকা নামটিই থেকে যায়। 

সব বিদেশি পর্যটক এবং কোম্পানির কর্মকর্তারাও তাদের বিবরণ এবং চিঠিপত্রে ঢাকা নামটিই ব্যবহার করেন। বুড়িগঙ্গা ও এর উত্সনদী ধলেশ্বরী অন্য বড় বড় নদীর মাধ্যমে বাংলার প্রায় সবক’টি জেলার সঙ্গে ঢাকার সংযোগ স্থাপন করেছে। 

ঢাকা ছিল ভাটি (নদীবেষ্টিত নিম্নভূমি) অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন ঢাকা শহরটি পুকুরতলীর (বর্তমান বাবুবাজার এলাকা) সীমিত এলাকা ঘিরে গড়ে ওঠে। তবে মুঘল সুবাহ্র রাজধানী হওয়ার পর এর পরিধি বৃদ্ধি পায়। এ সময় বুড়িগঙ্গা তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরটি পশ্চিমের দুর্গ থেকে শুরু করে পূর্বদিকে বর্তমান সদরঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। 

নদীবন্দরে ভীড়মুঘল আমলের বহু আগেই বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। আর সদরঘাট এলাকাটি পূর্ব থেকেই ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখানে নদীপথে আমদানি রফতানি ছাড়াও যাত্রীবাহী বিভিন্ন জলযান অহরহ যাতায়াত করত। ১৭৬৫ সালে বুড়িগঙ্গা নদী তীরে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। 

১৮৫৭ সালের কিছুকাল পর তদানীন্তন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার সিটি বাক্ল্যান্ড বাঁধটি সম্প্রসারণ করে আরও পোক্তভাবে ফরাশগঞ্জ থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেন। তখন থেকেই এই বাঁধটি ‘বাকল্যান্ড বাঁধ’ নামে পরিচিত হয়ে আসছে। আর সদরঘাট হয়ে ওঠে সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র। 

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে যে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ৯ হাজার। কালের সাক্ষী বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের সেই ঢাকার লোকসংখ্যা আজ প্রায় দুই কোটি। আয়তন এখন ৯০০ বর্গ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। 

যাত্রী ভর্তি লঞ্চলোকসংখ্যা ও আয়তন বেড়েছে। আর সংকুচিত হয়ে আসছে বুড়িগঙ্গা, সদরঘাট। সদরঘাট কেন্দ্রিক ছিল এককালে মানুষের জীবন-জীবিকা। সদরঘাট নিয়ে মানুষের আবেগ ছিল অভাবনীয়। এনিয়ে রচিত হয়েছে কবিতা-গান। কিছুকাল আগেও রসিকজনের মুখে মুখে ফেরা গান ছিল:‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, সদরঘাটের পানের খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম’...

একবিংশ শতকের শুরুতেও এটির গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রয়েছে। এর সন্নিহিত এলাকা পুরনো ঢাকা নামে প্রসিদ্ধ। এর অতি নিকটে রয়েছে পুস্তক প্রকাশনার ঘাঁটি বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বলধা গার্ডেন এবং আহসান মঞ্জিল এবং, সর্বোপরি, বিভিন্ন নদী পরিবাহিত পণ্য, বিশেষ করে মাছ ও ফলের সুবিশাল সব আড়ত। 

বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চসারাদেশ, বিশেষ করে, দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা শহরের নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকেন্দ্র এই সদরঘাট। অসংখ্যা লঞ্চ ঘাটে ভীড় করে আছে। ডিঙ্গি নৌকাগুলো যাত্রী নিয়ে এপার-ওপার করছে, কুলিদের শোরগোল- সব কিছু মিলে সদরঘাট এমন একটি জায়গা যা কখনো নীরব থাকে না।

ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে সর্বমোট ৪৫ টি রুটে নৌযান চলাচল করে। এই নদীবন্দর থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের এলাকাগুলো যেমন, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠী, মাদারীপুর, চাঁদপুর, খুলনা, হাতিয়া, বাগেরহাট প্রভৃতি গন্তব্যে লঞ্চ ও স্টিমার ছেড়ে যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস