হরিণের নাভি থেকেই তৈরি হয় বিশ্বসেরা সুগন্ধি

ঢাকা, সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

হরিণের নাভি থেকেই তৈরি হয় বিশ্বসেরা সুগন্ধি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১৬ ৮ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৭:৩১ ৮ অক্টোবর ২০২০

ছবি: হরিণের নাভি থেকেই তৈরি হয় এই সুগন্ধি

ছবি: হরিণের নাভি থেকেই তৈরি হয় এই সুগন্ধি

পৃথিবীতে যত দামী এবং জনপ্রিয় সুগন্ধি আছে, তার মধ্যে অন্যতম কস্তুরী। সুগন্ধি ফুলের মতোই যুগ যুগ ধরে মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে কস্তুরী মৃগ। এই সুগন্ধি কীভাবে তৈরি করা হয় জানেন কি?

হরিণের নাভি থেকেই উৎপন্ন হয় কস্তুরী। তবে নারী নয় , পুরুষ হরিণের নাভিতে পাওয়া যায় এই মৃগ। কস্তুরী বিশেষ ধরনের প্রাণীজ সুগন্ধি। হরিণের নাভি থেকে পাওয়া যায় এই কস্তুরী, এটি মহামূল্যবান সুগন্ধি হিসেবে পরিচিত। কথিত আছে, কস্তুরীর এক তিল পরিমাণ কোনো বাড়িতে পড়লে বহু বছর সেখানে এর ঘ্রাণ থেকে যায়। তিন হাজার ভাগ গন্ধহীন পদার্থের সঙ্গে এক ভাগ মেশালে সমস্ত পদার্থই সুবাসিত হয় কস্তুরীর ঘ্রাণে। বর্তমান বাজার-দরে কস্তুরীর দাম একই ওজনের সোনার প্রায় তিনগুণ।

কস্তুরীহরিণের দশ বছর বয়সে নাভির গ্রন্থি পরিপক্ব হয়। এ সময় হরিণটিকে হত্যা করে নাভি থেকে তুলে নেয়া হয় পুরো গ্রন্থিটি। তারপর রোদে শুকানো হয়। একটা পূর্ণাঙ্গ কস্তুরী গ্রন্থির ওজন প্রায় ৬০-৬৫ গ্রাম।  

কস্তুরি আর কস্তুরীমৃগ বা মৃগনাভী নিয়ে কত শত কথা, কত শত কবিতা আর গান। হেমন্ত মুখার্জি  যেমন দূর হতে দেখা প্রিয়তমার রূপ তুলে ধরেছেন গানের ভাষায় "যেন কস্তুরী মৃগ তুমি , আপন গন্ধ ঢেলে এ হৃদয় ছুঁয়ে গেলে সে মায়ায় আপনারে ঢেকেছি"

এছাড়াও কস্তূরী বা মৃগনাভি ব্যবহার করলে তার গন্ধে নাকি রাজ-রাজারা অন্দরমহলের খাস মহলে রানির কাছে বারবার ছুটে আসতেন। মোগল সম্রাটরা এ মূল্যবান সুগন্ধি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। কস্তুরী দেহ সৌরভ ছাড়াও ঔষধ তৈরীতে ব্যবহার হয়। এর বাইরেও আছে বহুবিধ ব্যবহার। স্বাস্থ্য, শক্তি-উদ্যম ও যৌন উদ্দীপনায় কস্তুরী অনন্য।

আরো পড়ুন: চৌচিল্লা, মৃতদেহ সৎকারের অদ্ভুত প্রথা তাদের

কস্তুরী ভগ্ন স্বাস্থ্য ও শক্তি পুনরুদ্ধার করে রক্ত উত্তেজক এবং বেদনানাশক হিসেবে কাজ করে। কস্তুরী জ্বরজনিত খিঁচুনী, সন্ন্যাস রোগ বা স্নায়ুবিক চেতনাহীনতা, পেটে তীব্র ব্যথা, আঘাত জনিত ক্ষতের তীব্র ব্যথা, স্পর্শজ্ঞান শূন্যতা বা অসাড়ত্ব, শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের তীব্র ব্যথা সারাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

এই হরিণের ঠোঁটের বাইরে দুইপাশে দুটি দাঁত থাকে তবে এর পেছনে রয়েছে খুবই মর্মান্তিক কাহিনী। কস্তুরী পাওয়া যায় এক প্রজাতির পুরুষ হরিণ থেকে। এর ইংরেজী নাম "মাস্ক ডিয়ার"। স্বভাবে লাজুক, টানা টানা চোখ আর নির্জনতাপ্রিয় এ হরিণের দেখা মেলে হিমালয়ের উঁচু পার্বত্যভূমিতে, পামীর মালভূমির উঁচু তৃণভূমিতে, সবুজ উপত্যকায়। এরা খুব লাজুক স্বভাবের বলে তাই নিরিবিলি  বিচরণ করে একান্ত নির্জনে। হরিণের নাভীতে সৃষ্ট গ্রন্থি নিঃসৃত সুগন্ধিই কস্তুরী ,খুবই মূল্যবান। এ ঘ্রাণকে বলা হয় যোজনগন্ধ্যা।   

হিমালয় পর্বতমালার উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে উৎকৃষ্ট কস্তুরীমৃগ পাওয়া যায়। এছাড়াও সাইবেরিয়া, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া এবং নেপালে এই হরিণগুলোর দেখা মেলে। ওই অঞ্চলে এক প্রকার ছোট আকারের হরিণ আছে। এরা ছাগলের চেয়ে বড় নয় কিন্তু দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। এদের পা অতি সরু, মাথা সুন্দর এবং চোখ চমৎকার উজ্জ্বল। কস্তুরী মৃগের উপরের মাড়ি থেকে গজদন্তের মতো দুটি দাঁত ছোট আকারে বের হয়। এ ধরনের দাঁত সব প্রজাতির হরিণের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এই দেখেই কস্তুরী মৃগ সনাক্ত করা হয়। অত্যন্ত শীতল পার্বত্য পরিবেশে বাস করায় এদের লোম সরু না হয়ে অত্যন্ত মোটা ও পালকের মতো হয়।

শুকানো হয় কস্তুরী অল্পবয়সেই নাভিমুখের গ্রন্থিতে জন্ম নেয়া সুগন্ধি কোষ পরিপক্ক হয় হরিণের দশবছর পূর্ণ হলে। ছড়িয়ে পড়ে তীব্র সৌরভ । তখন তার পরিপূর্ণ যৌবন। বুঝতে পারেনা তার শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া সুগন্ধির উৎস। গন্ধে পাগলপ্রায় হরিণ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। প্রজনন ঋতুতে ছড়িয়ে পড়া বনসৌরভে আকৃষ্ট হয় হরিণী। আর তখনই ঘটে ট্র্যাজেডি। আত্মরক্ষায় পটু এ হরিণের দুর্বলতা শরীরের সুগন্ধি। প্রতিটি পুরুষের সাধারণত এক থেকে তিনটি স্ত্রী থাকে। নিজেকে লুকাতে পারেনা তীব্র ঘ্রাণের জন্য। সুগন্ধির উৎস ধরে তাকে খুঁজে পায় শিকারী।

আরো পড়ুন: মমির পেটে মিলল ৬০০০ বছর আগের তেলাপিয়ার রেসিপি  

যদিও এরা আত্মরক্ষায় বেশ পটু। সরু পায়ের সাহায্যে কস্তুরী মৃগ তীব্র তটস্থ গতিতে ছুটতে পারে এবং এক এক লাফে চল্লিশ ফুট স্থান অতিক্রম করতে পারে। এই আশ্চর্য লাফের কথা বিশ্বাস হওয়া কঠিন। কিন্তু অনেক বিখ্যাত শিকারীরা এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। তবে এই প্রজাতির সকল হরিণের নাভিতে একই পরিমাণে কস্তুরী উৎপন্ন হয় না। হরিণের বয়স এবং পরিবেশভেদে কস্তুরীর পরিমাণেরও তারতম্য হয়।দেখা গেছে, এক কিলোগ্রাম কস্তুরী পাওয়ার জন্য প্রায় দুই হাজার হরিণ শিকার করতে হয়।  

মায়ের সঙ্গে এক কস্তুরী শাবককস্তুরী যখন সংগ্রহ করা হয় তখন এর গন্ধ এত উগ্র থাকে যে হরিণের নাভিকোষ কেটে নেয়ার সময় শিকারিরা মোটা কাপড় দিয়ে নিজেদের নাক বেঁধে নেয়। অনেক সময় এ গন্ধ সহ্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারো কারো চোখ, নাক থেকে জল ও মুখ থেকে লালা ঝরা শুরু হয়। এমনকি জীবনহানিও ঘটে।

আরো পড়ুন: ১৩৭ মিলিয়ন বছর আগে মানুষের তৈরি প্রথম গুহা থিওপেট্রা 

কস্তুরী কোষের বাইরের দিকটায় থাকে এলোমেলো কিছু লোম। সেগুলো ছাড়িয়ে শুকনো কোষটিকে যখন পানিতে ভেজানো হয়, আর তখনই পরিষ্কার কস্তুরী বেরিয়ে আসে। শুকনো হলে কস্তূরীর উগ্রতা কম হয়। শুকনো কস্তূরী ধোঁয়াটে কালো রঙের, ঈষৎ দানাবিশিষ্ট এবং স্বাদে তেঁতো। গরম পানিতে কস্তূরীর ৯০ ভাগ গলে যায়। কস্তুরী-সংগ্রহকারকেরা কস্তুরীকে প্রায় প্রকৃত অবস্থায় রাখে না। 

অত্যন্ত দামী এই সুগন্ধি মুঘল আমলে রানিরা ব্যবহার করতেন সচরাচর অন্য পদার্থের সঙ্গে মিশ্রিত করে বিক্রয় করে। ঐ অন্য পদার্থের মধ্যে রক্ত একটি বিশেষ উপাদান, যেহেতু শুষ্ক রক্তের সঙ্গে কস্তুরীর বিশেষ সাদৃশ্য আছে। কস্তুরীর সুবাসেও আছে বৈচিত্র্যতা এবং আছে  ভিন্ন ভিন্ন নামেও। প্রাচীন ভারতীয় বিভিন্ন গ্রন্থে ভারতের তিন প্রকার কস্তূরীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যথা- কামরূপী, নেপালী, এবং কাশ্মীরী। তারমধ্যে কামরূপী উন্নত ও কাশ্মীরী অনুন্নত হয় ।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে