প্রত্যন্ত এই দ্বীপের বাসিন্দাদের দিন কাটে যেভাবে

ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭,   ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রত্যন্ত এই দ্বীপের বাসিন্দাদের দিন কাটে যেভাবে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০৩ ১ অক্টোবর ২০২০  

ছবি:  ত্রিস্তান ডি কুনহা দ্বীপ

ছবি: ত্রিস্তান ডি কুনহা দ্বীপ

পৃথিবীতে অনেক দ্বীপ এবং ব-দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট দ্বীপ হিসেবে পরিচিত বিশপ রক। তবে এরচেয়ে ছোট দ্বীপ হচ্ছে নাউরু। মাত্র আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের এটি আলাদা কোনো দেশ নয়। একটি ছোট্ট দ্বীপ। তবে আজ বলছি ত্রিস্তান ডি কুনহায় দ্বীপের কথা। অত্যন্ত প্রত্যন্ত এই দ্বীপ। 

অন্যান্য দ্বীপগুলো ছোট হলেও ধন সম্পদে স্বয়ং সম্পূর্ন। তবে ত্রিস্তান ডি কুনহায়একেবারেই তেমন নয়। খুবই সাধাসিধা এখানকার মানুষজন। মাত্র ২৪৫ জনের বাস এই দ্বীপে। তাদের মধ্যে ১৩৩ জন নারী এবং ১১২ জন পুরুষ। তারা সবাই সেভেন সিজের এডিনবরায় বসবাস করেন। দ্বীপটি স্থানীয়দের কাছে টিডিসি নামে পরিচিত।

দ্বীপটি আকারে ছোট্ট হলেও সেখানে একটি আধুনিক হাসপাতাল আছে, আছে তার চেয়েও ছোট এক স্কুল। রয়েছে একটি কফি শপ, সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একটি হল, একটি পোস্ট অফিস এবং একটি পাব। পাবটির নাম অ্যালবেট্রোস। এখানকার ব্যাপারগুলো বেশ অদ্ভুত। এখানকার শিশুরা যার সঙ্গে স্কুলে বন্ধুত্ব করছে। তার সঙ্গে তার সারাজীবনটাই কাটাতে পারবে।

ছোট্ট একটি দ্বীপ এই ত্রিস্তান ডি কুনহাআচ্ছা আরেকটু সহজ করে বলি, সাধারণত ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব হয় না। তবে এই দ্বীপে এটি খুবই সহজ। কেননা ছোট এই দ্বীপেই তাদের জন্ম আর মৃত্যু পর্যন্ত বেশিরভাগ বাসিন্দা এখানেই থাকেন। খুব কম বাসিন্দাই এই দ্বীপ ছেড়ে যান। 

এখানকার যার সঙ্গে যার বিয়ে বলা যায়, বহুকাল আগেই তাদের শুভদৃষ্টি পর্ব শেষ হয়। এখানকার বাসিন্দাদের নামের সঙ্গে ছয়টি পদবীর যেকোনো একটি থাকে। হয় লাভারেল্লো, না হয় রেপেত্তো, রজার্স, সোয়েইন, গ্রিন কিংবা গ্লাস। অধিবাসীদের মধ্যে মাত্র দুজন আছেন যারা এই দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেননি। তাদের একজন পুরুষ, আরেকজন নারী। কয়েক বছর আগে তারা দুজনই দ্বীপের বাসিন্দাদের বিয়ে করেন। এরপর  প্রত্যন্ত এই দ্বীপটিতে তাদের পরিবারের সঙ্গে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। 

এখানে একজন ডাক্তার এবং একজন শিক্ষকও আছেন যাদেরকে ব্রিটেন থেকে সেখানে পোস্টিং দেয়া হয়েছে। এই দ্বীপটি ব্রিটেনের বাইরে ব্রিটিশ-শাসনাধীন এলাকা বা ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি। দ্বীপের পরিবেশ এতোটাই শান্ত যে সেখানে ঘাস বড় হওয়ার শব্দও আপনি শুনতে পাবেন। আর জায়গাটি এতোই নিরাপদ যে এখানে তালা বলে কিছু নেই।  

তবে এখানে এলে বর্হিবিশ্ব থেকে বিছিন্নই থাকতে হবে আপনাকে। কেননা দ্বীপের ইন্টারনেট সংযোগের অবস্থা খুবই খারাপ। খুব বেশি দিন হয়নি। এখানকার মানুষ এই সুবিধা পাচ্ছেন। তবে স্পিড খুবই কম। তবে ভালো দিক হচ্ছে এখান থেকে বিদেশে যতো ফোন করা হয়, যদি সংযোগ ঠিক থাকে, সেগুলো ফ্রি।

গবাদি পশুগুলো বার বি কিউ খাওয়ার জন্যই পালন করা হয়দ্বীপটির উপকূল-জুড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তাও আছে। এই সড়ক ধরে খোলা একটি জায়গায় যাওয়া যায়। সেখানে জমির পর জমি।এর চারপাশে পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তীব্র বাতাস থেকে লোকজনকে রক্ষা করতে এসব প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে চাইলে আপনি কিছু সবজি চাষ করতে পারেন। বিশেষ করে আলু। গ্রীষ্ম কালে শহরের বাইরে ছুটি কাটানোর এটাই একমাত্র জায়গা।

দ্বীপের লোকজনের কাছে বারবিকিউ বা ব্রাই সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন। আগুনে মাংস ঝলসে খাওয়াকে ব্রাই বলা হয়। যা ত্রিস্তান ডি কুনহার (সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশি) দক্ষিণ আফ্রিকার সংস্কৃতি থেকে এসেছে। 

দ্বীপের গবাদি পশুগুলো মূলত একাজেই ব্যবহৃত হয়। তবে তাদের খাদ্য তালিকায় শাকসবজিও আছে। যেগুলো প্রতিবেশী দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেই বেশি আসে। তবে এই মহামারি কালে পণ্য নিয়ে জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে যায়। তাদের ফল-মূল, শাক-সবজি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এটা যে খুব অস্বাভাবিক ঘটনা তাও নয়। তবে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে কবে যে আবার সেখানে এসব যেতে পারবে কেউ বলতে পারে না।

কুয়াশা কেটে গেলেই দেখা যাবে ছোট্ট দ্বীপটি তাতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে যে এমনও না।  সেখানে ত্রিস্তান লবস্টার বা বড় বড় চিংড়ির অভাব নেই। সমুদ্রের ঠাণ্ডা পানিতে এই চিংড়ি প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। এটাই তাদের উপযুক্ত পরিবেশ।দ্বীপের বাসিন্দারা সমুদ্র থেকে এই লবস্টার ধরে সেগুলো হিমায়িত করে রেখে দেয়। এগুলো রপ্তানি করে প্রচুর অর্থ আয় করে দ্বীপের বাসিন্দারা। এই অর্থের পরিমাণ টিডিসির মোট রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশ। 

তবে অন্যদিকে মহামারি কিন্তু এই দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য আশির্বাদ হয়ে এসেছে। কেননা মহামারির ফলে ত্রিস্তান ডি কুনহা দ্বীপে গত কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম সেখানে একটি শিশুর জন্ম হয়েছে।

জটিলতা এড়াতে সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য নারীরা সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকাতে চলে যায়। কিন্তু সেদেশে লকডাউন জারি করার কারণে সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়। একারণে ত্রিস্তানেই ওই শিশুটির জন্ম হয়েছে। দ্বীপের লোকজন নতুন এই বাসিন্দাকে পেয়েও খুব খুশি।

লোকজন অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ত্রিস্তান দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে সেখানে বসতি গড়ে তুলতে শুরু করে। তার পর থেকে সেখানে জনসংখ্যা কখনো কমেছে, কখনো বেড়েছে। তবে গত কয়েক দশকে তাদের সংখ্যা কমতির দিকে।  

দ্বীপের বাতাসের শীস এবং গরু ডাক ছাড়া এই দ্বীপে তেমন বেশি কিছু শোনা যায় না। তবে দ্বীপপুঞ্জের যেখানেই যাবেন সেখানেই আপনি প্রচুর পাখি দেখতে পাবেন। তবে তাদের কাউকে গান গাইতে শোনা যায় না।

বিরল প্রজাতির পাখি ইনঅ্যাকসিসেবল আইল্যান্ড রেলএটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। চার পাশে এতো পাখি। কিন্তু পাখির কোন গান শোনা যায় না। এর কি কারণ কেউই বলতে পারেন না। হয়তো একসময় পাখি শিকার করা ছিল দ্বীপের বাসিন্দাদের নেশা। শিকারিদের কাছ থেকে বাঁচতে নিঃশব্দতাকেই করেছে রক্ষাকবচ। তবে এখন শিকার করার মতো পাখিও খুব একটা নেই এই দ্বীপগুলোতে।

ফলে কিছু পাখি আছে যারা উড়াল না দিয়েও বেঁচে থাকতে পারে। এরকম একটি বিরল প্রজাতির পাখি ইনঅ্যাকসিসেবল আইল্যান্ড রেল।পেঙ্গুইনের কোনো প্রজাতি হবে এগুলো। কেননা মাথার ঝুঁটিটা ছাড়া পেঙ্গুইনের মতোই দেখতে এগুলো। 

দ্বীপের বাসিন্দারা বলছেন, একটা সময় ছিল যখন তাদের জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সঙ্গীত। বাদ্যযন্ত্র বাজানো এবং গান গাওয়াই ছিল তাদের বিনোদনের উপায়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এখন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

সুশ্যামল এই দ্বীপে ট্রেকিং বা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানোও আরো একটি বড় বিনোদন। দ্বীপটি কখনোই ১০ কিলোমিটারের বেশি প্রশস্ত ছিল না। গভীর উপত্যকা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ৬২ মিটার উপরে খাড়া পাহাড়ের কিনার ধরে হেঁটে যাওয়াও বাসিন্দারা উপভোগ করেন।

আসলে এই দ্বীপে সমতল ভূমি খুব কমই আছে। চারপাশে দুই-তৃতীয়াংশ ঘিরে আছে পাথরের প্রাচীর যা খাড়া নেমে গেছে উত্তাল সমুদ্রের গভীরে।

ত্রিস্তান ডি কুনহাতে যাওয়া অথবা ফিরে আসা খুবই কঠিন। ত্রিস্তান ডি কুনহাকে অনেকেই শুধু ত্রিস্তান নামেই চেনে। একগুচ্ছ আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে এটিই মূল দ্বীপ। এসব দ্বীপের মধ্যে একটির নাম নাইটিঙ্গেল আইল্যান্ডস যেখানে ত্রিস্তানিয়ানরা মাঝে মাঝে ছুটি কাটাতে যায়। সেখানে তীব্র স্রোতের বিরুদ্ধে হাঙরের পাশাপাশি সাঁতার কাটা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ।

 
সেখানে আরো কিছু দ্বীপ আছে যেগুলোতে সাধারণত মানুষের যাওয়া আসা নেই। তবে এরকম একটি দ্বীপ, লোকজন যার নাম দিয়েছে ইনঅ্যাকসিসেবল আইল্যান্ড, সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা একটি আবহাওয়া স্টেশন স্থাপন করেছে। ওই স্টেশনে কয়েকজন আবহাওয়াবিদ সারা বছর ধরে পালাক্রমে কাজ করেন।

মানুষের মনে একটা ধারণা আছে যে দ্বীপের জীবন বুঝি অনেক রোমান্টিক। কিন্তু সেখানে বসবাসের অনেক বিপদও আছে। এটা অবশ্যই সুন্দর একটি জায়গা। তবে এটি কোন স্বর্গ নয়।

শিক্ষার দিক থেকেও এই দ্বীপের বাসিন্দারা পিছিয়ে নেই। বর্তমানে দ্বীপের তিনটি মেয়ে ব্রিটেনে পড়ালেখা করার জন্য আছে। দুইজন মাধ্যমিক স্কুলের লেখাপড়া শেষঙ্করতে। আর একজন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। 

এই মেয়েটি হবে এই দ্বীপের প্রথম কোনো নারী যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করবে। যদিও একজন ত্রিস্তানিয়ান এর আগে দূর-শিক্ষণ পদ্ধতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। 

আপনি যদি প্রত্যন্ত এলাকার জীবন উপভোগ করতে চান তাহলে চলে যেতে পারেন এই দ্বীপে। তবে ত্রিস্তান ডি কুনহাতে যাওয়া অথবা সেখান থেকে ফিরে আসা খুবই কঠিন।

উদাস মনে হাঁটছে এক ইনঅ্যাকসিসেবল আইল্যান্ড রেলকীভাবে যাবেন? তার বেশ লম্বা একটি দিক নির্দেশনা দিচ্ছি। চাইলে প্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে আসুন। যাওয়া আসায় যতই ভোগান্তি পোহাতে হোক না কেন দ্বীপের পরিবেশ আপনাকে পিছুটান কাটাতে পারে। 

জেনে নিন তাহলে কীভাবে যেতে হবে এই দ্বীপে- 

প্রথমে বিমানে করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে যেতে হবে। সেখান থেকে উঠতে হবে একটি নৌকায়। তার পর ১৮ দিন ধরে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে উত্তাল সমুদ্র। পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদসংকুল সমুদ্রপথের একটি এই পথ। তার পর কোন এক সময় কুয়াশা উঠে গেলে আপনি এই দ্বীপটির দেখা পেতে পারেন।

নৌকা নিয়ে টিডিসি দ্বীপের দিকে অগ্রসর হবেন। নৌকাটি কূলে ভেড়ানোর জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে কখন বাতাসের গতি একটু দুর্বল হয়ে আসে তার জন্য।নৌকাটি ডাঙায় তুলে রাখতে হবে। তা নাহলে সমুদ্রের ঢেউ এটিকে দূরে কোথাও ভাসিয়ে নিতে পারে। আবার ঢেউ-এর আঘাতে পাথরের সঙ্গে সংঘর্ষে নৌকা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

দ্বীপে যেতে নৌকায় ১৮ দিন ধরে পাড়ি দিতে হবে উত্তাল সমুদ্রএরপরই আপনি দেখা পাবেন ত্রিস্তান ডি কুনহার রাজধানী সেভেন সিজের এডিনবরা এলাকার যেখানে লোকজনের বসতি। অবশ্য আপনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দ্রুত গতির নৌকাও নিতে পারেন। সুবিধা হচ্ছে এই নৌকায় সমুদ্র পথে দুই হাজার ৮১০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র ছয় দিন। কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও আছে আর তা হচ্ছে এই নৌকাটি বছরে মাত্র একবার ছাড়ে। এর যাত্রী সংখ্যাও সীমিত। 

এছাড়াও এই পথে মাছ ধরার যে সামান্য কয়েকটি জাহাজ চলাচল করে সেগুলোর কাছেও আপনি লিফট চাইতে পারেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে