৬০ লাখ মানুষের মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে আছে ‘প্যারিস’ 

ঢাকা, বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৭ ১৪২৭,   ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৬০ লাখ মানুষের মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে আছে ‘প্যারিস’ 

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২২ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি: স্বপ্নের নগরী প্যারিস

ছবি: স্বপ্নের নগরী প্যারিস

প্যারিস নামটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুউচ্চ আইফেল টাওয়ার। মনমুগ্ধকর লুভঁর মিউজিয়াম, নটরডেম ক্যাথিড্রাল, ঝকঝকে রাস্তা-ঘাট, সুন্দরী বিদেশিনী, রাস্তায় রাস্তায় গান-নাচ ইত্যাদি নানা ছোট ছোট দৃশ্যের সমারোহ। 

তবে যদি বলি এই মনোরম প্যারিস শহরের নীচেই বছরের পর বছর ধরে শায়িত আছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মৃতদেহ! চমকে উঠবেন? নাকি অবাক হবেন? আজ্ঞে হ্যাঁ! প্রায় কয়েকশো কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা সুড়ঙ্গের নীচে এক সময় প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে কবর দিতে বাধ্য হয়েছিলো সে দেশের সরকার। তবে কেন? আজ শুনবো সেই শিহরণ জাগানো ঐতিহাসিক গল্প।  

আইফেল টাওয়ারতখন ১৩০০ সলে। ফ্রান্সের বুকে অবস্থিত প্যারিসকে তখন গ্রামাঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা চলছে জোরকদমে। তবে গোটা গ্রামকে শহরে পরিণত করার জন্য যে পরিমাণ পাথরের প্রয়োজন, তা তখন প্যারিসে মজুত ছিলো না। তাই শুরু হলো সুড়ঙ্গ খোঁড়া। 

মাটির অনেক গভীর অবধি সুড়ঙ্গ খুঁড়ে যা পাথর পাওয়া যেতো। সেটা দিয়েই তৈরি করা শুরু হলো ঘর-বাড়ি, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপত্য। এভাবেই কিলোমিটারের পর কিলোমিটার একের পর এক সুড়ঙ্গ খুঁড়ে, তা থেকে প্রয়োজনীয় পাথর বের করে চলতে থাকে পৃথিবীর অন্যতম মনমুগ্ধকর শহর প্যারিসের নির্মাণকার্য। 

আজকের প্যারিসতবে কয়েক দশক পর শহর বানানো শেষ হলেও, এই সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ করেননি তৎকালীন রাজা। ফলে সুড়ঙ্গগুলো যেমনই ছিলো তেমনই খোলা অবস্থায় রয়ে যায়। এই ঘটনার প্রায় ৪০০ বছর পর, ১৭০০ সালে প্যারিসের বুকে নেমে আসে একের পর এক সাংঘাতিক বিপদ। 

প্রথমে প্লেগের মতো মহামারী আর তারপর সেই মহামারির ফলে সৃষ্টি হওয়া দুর্ভিক্ষে মরতে থাকলো একের পর এক মানুষ। মৃত মানুষের সংখ্যার পরিমাণ এতোটাই বেড়ে গেলো যে, শহর ও তার আশেপাশের বিভিন্ন কবরস্থানেও আর জায়গা থাকলো না মানুষকে কবর দেয়ার। 

অতীতের প্যারিসরাস্তার বাঁকে বাঁকে ছোট ছোট ঢিবির মতো জমতে শুরু করে মৃতদেহ। দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে পড়ে জীবিত মানুষরাও। সরকার তখন সিদ্ধান্ত নেয়। মৃতদেহগুলো শহর থেকে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে হয় পুড়িয়ে ফেলা হবে, আর নয়তো কবর দেয়া হবে। তবে ধর্ম উপাসকগণ সরকারের এই সিদ্ধান্তে কিছুতেই সায় দেননি। তারা জানান যা করার শহরের ভেতরেই করতে হবে। 

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ঠিক সেই সময়ই প্রচণ্ড বৃষ্টির ফলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় প্যারিসে। সেই পানিতে পচা-গলা সারি সারি মৃতদেহ ভাসতে থাকে শহরের অলিতে গলিতে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকার থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো শহরের বিভিন্ন জায়গায় মাটি খুঁড়েই কবর দেয়া হবে মৃতদেহগুলোকে। 

সুড়ঙ্গএমতাবস্থায় মাটি খোঁড়া শুরু হলো। আর তখনই আবিষ্কার হলো ৪০০ বছরের পুরনো একটি সুড়ঙ্গের, যা খোঁড়া হয়েছিলো শহরের নির্মাণকাজের জন্য। খুঁজতে খুঁজতে উদ্ধার হলো একটার পর একটা সুড়ঙ্গ। এভাবেই প্রায় ২০০ মাইল এলাকা জুড়ে পাওয়া গেল বিরাট বিরাট সুড়ঙ্গের হদিস। 

এতোটা এলাকা জুড়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার ফলে যাতে শহরের ভিত দুর্বল না হয়ে পড়ে, সেজন্য আগে সেগুলোকে মেরামত করে, তার মধ্যে একটার পর একটা মৃতদেহ সাজিয়ে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মৃতদেহ কবর দেয়া হলো তার ভেতরে। 

প্যারিস ক্যাটাকম্বএই সুড়ঙ্গই আজ প্যারিস শহরের অন্যতম জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট ‘প্যারিস ক্যাটাকম্ব’ নামে পরিচিত। পর্যটকদের এর ভেত্রের কিছুটা অংশ অবধি যাওয়ার অনুমতি আছে। শিল্প, স্থাপত্য, সংস্কৃতির পীঠস্থান ফ্রান্সের প্যারিস শহর দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষের মৃতদেহের উপর! ভাবা যায়?

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস