চলতি পথে এই রেলগাড়িতেই খুন হয় শত শত মানুষ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১২ ১৪২৭,   ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পেশোয়ার এক্সপ্রেস

চলতি পথে এই রেলগাড়িতেই খুন হয় শত শত মানুষ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:০৬ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি: পেশোয়ার এক্সপ্রেস

ছবি: পেশোয়ার এক্সপ্রেস

দেশভাগের সময়ের ঘটনা। ১৯৪৭ সালের, ১৯ সেপ্টেম্বর। দিল্লি থেকে মুসলমান শরণার্থীরা চলেছে পাকিস্তানের উদ্দেশে। সবে ভাগ হয়ে গেছে দেশ। ভাগ হয়ে গেছে মানুষের ভাগ্যও। এপারের মানুষ ওপারে ছুটছে। ওপারের মানুষ এপারে। সবার হাতে বাক্স ও বস্তা। তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে যে যেভাবে পারে। 

পথে অনেকের আগলে রাখা জিনিসগুলোও ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। প্রাণটাও রক্ষা পাচ্ছে না। একজন দুজন নয়, প্রাণ হারাচ্ছে লাখো মানুষ। ধর্ম পরিচয়ে তাদের কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম। ঘাতকও তারাই। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম নৃশংসতায় ভিজে যাচ্ছে মাটি।

এইসব দাঙ্গা আর খুনোখুনির কবলে পড়ে নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে লেখকদেরও নিজ দেশ ছাড়তে হয়। সবই ঘটে তাদের চোখের সামনে। ফলে দেশভাগের পর যখন এ উপমহাদেশের লেখকরা থিতু হলেন, লিখলেন সে বেদনার কথা। গল্পে, উপন্যাসে, স্মৃতিতে উঠে এলো এক বেদনার অধ্যায়। ১৯৪৭ সালের আগে আর পরের সাহিত্যে দেখা গেল বড় পরিবর্তন। 

এইসব হত্যা আর অনিশ্চিত যাত্রার বড় স্বাক্ষী দেশভাগের পরপর দু দেশের ভেতর চালু হওয়া ৩০টি স্পেশাল ট্রেন। এই স্পেশাল ট্রেনগুলো নিয়ে নানা লেখকেরা গল্প, উপন্যাস আর আত্মজৈবনিক লিখেছেন। 

পেশোয়ার এক্সপ্রেসে মানুষের ঢলভৈরবের সন্তান লেখক মলয় কৃঞ্চ ধর তার ট্রেন টু ইন্ডিয়া গ্রন্থে তুলে ধরেছেন তার সে বেদনাধায়ক রেলভ্রমণের স্মৃতি। খুশবন্ত সিংয়ের ট্রেন টু পাকিস্তানের নাম শুনেনি এমন পাঠক পাওয়া মুশকিল। ১৯৫৬ সালে প্রকাশের পর এটি ঔপন্যাসিকের সেরা কাজ বলে সমালোচকরা মনে করেন। খুশবন্তের এ উপন্যাসটার নাম শুরুতে ছিল মানো মাজরা। 

মানো মাজরা একটি গ্রামের নাম। সীমান্তবর্তী ছিমছাম একটি গ্রাম। সত্তুরটি পরিবারের বসত এ গ্রামে। শতবর্ষী এ গ্রামে হিন্দু, মুসলিম ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা পরস্পরের সৌহার্দ্য নিয়ে বসবাস করে আছেন। নানা সময়ে অখণ্ড ভারতের নানা জায়গায় দাঙ্গা আর সাম্প্রদায়িক লড়াই বাঁধলেও এ গ্রামটিকে তা স্পর্শ করতে পারেনি। 

এ গ্রামের একমাত্র হিন্দু পরিবারটি জমিদার লালা রাম লালের। গ্রামের চারপাশের জমিজমা শিখদের। মুসলমানরা বর্গাদার। কয়েকটি মেথর পরিবারও আছে বটে, কিন্তু ধর্ম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। এ গ্রামটি আরো একটি কারণে আলাদা। এ গ্রামে আছে ছোট একটি রেলব্রিজ। আছে একটি নদী। 

রেললাইন বসানোর জন্য দুপাশে পাথরের বাঁধ। রেলসেতুটি অন্যসব গ্রাম থেকে আলাদা করে রেখেছে মানো মাজরাকে। এখানকার রেল স্টেশনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রেলগাড়ি বিরতি দেয় না। সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার আগে সবাই ঘরে ঢোকে এবং এক্সপ্রেস ট্রেন আসার আগেই শুয়ে পড়ে। অবশ্য ট্রেন আসার নিশ্চয়তা থাকে না কোনো। 

অসহায় মানুষ১৯৪৭ সালের পর সব আর আগের মতো থাকে না। প্ল্যাটফর্মে সেনা টহল বসে। দিল্লি থেকে আগত ট্রেনের চালক ও গার্ড বদলানো হয় পাকিস্তানে রওয়ানা হওয়ার আগে। আবার পাকিস্তান থেকে যেসব ট্রেন আসে সেগুলো এখানে এসে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। 

একদিন ব্যতিক্রম ঘটলো। পাকিস্তান থেকে আসা ট্রেন থেকে এলো ভীষণ দুর্গন্ধ। সৈন্যরা লোকজনদের হটিয়ে দিলো। সেনারা হুকুম দিলো লাকড়ি আর কেরোসিন নিয়ে আসতে। ট্রেনভর্তি লাশ আগুনে পোড়ানো হলো। গ্রামবাসীর শান্তি উবে গেল সেই থেকে। একটা পর্যায়ে নিজেদের সৌহার্দ্যও আর টিকিয়ে রাখা গেল না। 

শিখদের লাশ দেখে মুসলমানদের উপর নির্দেশ জারি হলো গ্রাম ছাড়ার। বহুদিনের একত্রবাসের মায়া উড়ে গেল। গ্রামের মুসলমানদের তাড়ানোর পর তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হলো এক চোরকে। চোখের সামনে সব লুটপাট চলল। এরপর ট্রেন থামতে দেখলেই আতঙ্কিত হয় এ গ্রামের মানুষ। তাদের স্ব-ধর্মের কারো লাশ বুঝি এলো। 

এখানেই শেষ নয়। একদিন সন্ধ্যায় গুরুদোয়ারায় শিখরা যখন প্রার্থনারত তখন দামি গাড়িতে কয়েকজন যুবক আসে। তারা খবর দিলো আগামীকাল এক ট্রেন মুসলমান শরণার্থীকে এ পথ দিয়ে পাকিস্তানে পাঠানো হবে। তাদের সবাইকে হত্যা করবে এই শিখ জোয়ানরা। 

সে মতে ফন্দিও আঁটা হয়। সলাপরামর্শ মতো সেদিন রাতে সজাগ থাকাও হয় যথারীতি। তবে একটি মানুষ এসে সে ফাঁদ ভেঙে দেয়। বিনিময়ে গুলি করে তাকে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়। বেঁচে যায় ট্রেন টু পাকিস্তান।

পেশোয়ার এক্সপ্রেসদেশভাগের বেদনা সবচেয়ে মর্মান্তিকভাবে উঠে এসেছে উর্দু গল্পকার কৃষণ চন্দরের পেশোয়ার এক্সপ্রেস গল্পে। এখানে পেশোয়ার এক্সপ্রেস নামক রেলগাড়িটি নিজেই উত্তম পুরুষের ভাষায় ঘটনার বর্ণনা দিয়ে যায়। পেশোয়ার শহর থেকে হিন্দু শরণার্থীভরা বগি নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ ট্রেন। 

পেশোয়ার, মর্দান, কোহাট, চরসদ্দা, খাইবার, লান্ডিকোটাল, নওশেরা ও মানশেরার বাসিন্দা এসব হিন্দু মানুষ। পাকিস্তানে আর জানমালের নিরাপত্তা নেই বলে তারা এবার ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। ভারত এমন দেশ যে দেশ আগে কোনোদিন দেখেনি তাদের অনেকে। সুরক্ষিত এ স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু হয়। 

পশতু আর পাঞ্জাবী ভাষী এসব নাগরিক ভারতের দিকে রওয়ানা হওয়ার আগ পর্যন্ত পেশোয়ার এক্সপ্রেসে নিরাপদই ছিলেন। এসব যাত্রীর সঙ্গে হাসান আবদাল স্টেশন থেকে আরো একদল শরণার্থী যোগ দেয়। এরা শিখ। চোখেমুখে ভয়। ডাগর ডাগর চোখের শিশুগুলো পর্যন্ত ভয়ে কম্পমান। 

স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারা পেশোয়ার এক্সপ্রেসে ঢুকে পড়ে। তক্ষশীলা স্টেশনে এসে এক্সপ্রেসকে থামতে হয় খানিকটা। স্টেশন মাস্টার জানালেন একদল হিন্দু শরণার্থী আসছেন। কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। এক ঘণ্টা পর ঢোলের শব্দ শোনা গেল। যাত্রী হিন্দু শরণার্থীদের একটি দলকে দেখতে পেল পেশোয়ার এক্সপ্রেস। দলটা স্টেশনের কাছে এলেই এক ঝাঁক গুলির শব্দ হলো। 

জানালা খুলে বসা তরুণীর দল মুহুর্তে জানালা বন্ধ করে দিল। এ দলটি ছিল হিন্দু শরণার্থীর দল। মুসলমানদের আশ্রিত। এখন প্রতিটি মুসলমানের কাঁধে একেকজন গ্রাম ছেড়ে পালানোর চেষ্টারত হিন্দুর লাশ। এ রকম ২০০ মৃতদেহ স্টেশনে এনে বালুচ সৈন্যদের হাতে সোপর্দ করা হলো। 

সেনা টহলমুসলমান জনতার দাবি, এদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে ভারতে পৌঁছে দিতে হবে। সৈন্যরা প্রতিটি বগির মাঝ বরাবর ২০০ লাশ ভাগ করে রেখে দিল। এরপর আকাশে গুলি ছুঁড়ে মুসলমান জনতা স্টেশন মাস্টারকে ট্রেন ছাড়ার নির্দেশ দেয়। 

ট্রেনটি মাত্র চলা শুরু করেছে অমনি একজন চেইন টেনে থামিয়ে দিলো। এবার দলনেতা বললেন, ২০০ হিন্দু বাসিন্দা চলে যাওয়ায় তাদের গ্রাম শূন্য হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ট্রেন থেকে ২০০ হিন্দু ও শিখ যাত্রীকে নামিয়ে দিতে হবে। তাই করা হলো। বালুচ সৈন্যরা বিভিন্ন বগি থেকে পছন্দমত ২০০ যাত্রীকে নামিয়ে তাদের হাতে তুলে দিলো। 

শরণার্থীরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বালুচ সৈন্যরাই গুলি করল। জায়গাটা ছিল তক্ষশীলা। যেখানে ছিল এশিয়ার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। সভ্য মানুষদের কেন্দ্র। পেশোয়ার এক্সপ্রেসের প্ল্যাটফর্মে রক্তের স্রোত বয়ে গেল। এরপর সে পিচ্ছিল পথ ধরেই এগুতে লাগল কৃষণ চন্দরের পেশোয়ার এক্সপ্রেস। 

ছুটতে ছুটতে রাওয়ালপিন্ডি এসে থামল গাড়ি। এখানে কোনো শরণার্থী নেই। আছে মাত্র ১৫-২০ জন পর্দানশীন নারী। তাদের সঙ্গে কয়েকজন যুবক পেশোয়ার এক্সপ্রেসের বগিতে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে রাইফেল আর কয়েক বাকসো গোলাবারুদ। ঝিলাম আর গুজরখাঁর মাঝামাঝি স্থানে রেল থামিয়ে দিয়ে নারীদের নিয়ে যুবকের দল নামতে শুরু করে। নারীরা ঘোমটা সরিয়ে আচমকা চিৎকার করতে থাকে,আমরা শিখ, আমরা হিন্দু, ওরা জোর করে আমাদের নিয়ে এসেছে। 

যুবকেরা হেসে উঠে, তোরা তো আমাদের লুঠের মাল। ঘর থেকেই ধরে এনেছি। যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করব। কে বাধা দেবে আমাদের? দু জন হিন্দু পাঠান এগিয়ে গেলে বালুচ সেনাদের গুলি তাদের ঝাঁঝরা করে দেয়। এভাবে ১৫-২০ জন যুবকের প্রাণ যাওয়ার পর মেয়েগুলোকে নিয়ে ওরা নেমে পড়ল। 

পেশোয়ার এক্সপ্রেসে মানুষের ভীড়লালামুসা স্টেশনে এসে বগির ভেতরে থাকা পচা লাশের দুর্গন্ধে টেকা মুশকিল হলে বালুচ সেনারা সিদ্ধান্ত নেয় লাশগুলোকে বাইরে ফেলে দেয়া হবে। যেসব যাত্রীদের পছন্দ নয় তেমন যাত্রীদের ডেকে লাশগুলো দরজার কাছে এনে বাইরে ফেলে দেয়ার নির্দেশ দেয় সেনারা। এরপর সেইসব যাত্রীদেরও বাইরে ফেলে দেয়া হয় চলন্ত ট্রেন থেকে। 

লালামুসা থেকে পেশোয়ার এক্সপ্রেস পৌঁছে ওয়াজিরাবাদে। প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো ছিটানো মৃতদেহ। স্টেশনে কাছে শোনা যাচ্ছে কাসর-ঘণ্টাধ্বনি। অট্টহাসি আর উন্মত্ত জনতার করতালি। এরপর দেখা গেল একদল উলঙ্গ মেয়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে জনতা। বৃদ্ধা-তরুণী, বাচ্চাকাচ্চা সবাই দিগম্বর। মেয়েদের সবাই হিন্দু, শিখ আর পুরুষগুলো মুসলমান। 

এবার পেশোয়ার এক্সপ্রেস থামে লাহোর প্ল্যাটফর্মে। দু নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে অমৃতসর থেকে ছেড়ে আসা আরেকটি ট্রেন। পূর্ব পাঞ্জাব থেকে ট্রেনটি মুসলমান শরণার্থীদের নিয়ে এসেছে। জানা গেল এ ট্রেনটিকে পথে থামিয়ে ৪০০ শরণার্থীকে খুন করা হয়েছে। 

নিয়ে যাওয়া হয়েছে জনাপঞ্চাশেক মুসলমান স্ত্রীলোককে। বাকিদের লুন্ঠন করা হয়েছে ইচ্ছেমতো। এবার সে ট্রেন থেকে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী এসে পেশোয়ার এক্সপ্রেসের ৪০০ যাত্রীকে নামিয়ে নিয়ে গেল। ৫০ জন শিখ ও হিন্দু নারীকে একইভাবে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বদলা নেয়ার জন্য। 

মোগলপুরায় এসে সৈন্যবদল হলো। বালুচদের জায়গায় এলো শিখ ও ডোগরা সেনা। আটারি স্টেশন থেকে দৃশ্য পুরোপুরি পাল্টে গেল। হিন্দু ও শিখ শরণার্থীরা অসংখ্য মুসলিম শরণার্থীর লাশ পড়ে থাকতে দেখতে পেল। এবার খুশিতে তারা আত্মহারা। বোঝা গেল স্বাধীন ভারতের সীমানায় এসে গেছে পেশোয়ার এক্সপ্রেস। এরপরের গল্প শুধু মুসলমানদের হত্যার। ঠিক পাকিস্তানের গল্পটা যেমন ছিল হিন্দু হত্যার। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস