বাংলায় পঞ্চায়েত প্রথা শুরু হয় যেভাবে

ঢাকা, রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১০ ১৪২৭,   ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বাংলায় পঞ্চায়েত প্রথা শুরু হয় যেভাবে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:২০ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:২৫ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: সালিশি চলছে এক পঞ্চায়েতে

ছবি: সালিশি চলছে এক পঞ্চায়েতে

বিচার চাইতে পূর্বে কাজীর দরবার আর এখন কোর্টই ভরসা। তবে এর মধ্যবর্তী সময়টাতে ছিল পঞ্চায়েত প্রথা। পঞ্চায়েত বলতে পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদকে বোঝায়। স্মরণাতীত কাল থেকে পঞ্চায়েত শব্দটি বাংলাসহ উত্তর ভারতের সমগ্র অঞ্চলে প্রচলিত ছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত এক ধরনের শাসন ব্যবস্থা যা প্রধানত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কায় বিদ্যমান। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় সরকারের প্রাচীনতম ব্যবস্থা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে ২৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই এ প্রথার প্রচলন ছিল।  

প্রাচীনকালে গ্রাম-সংসদ অথবা পঞ্চায়েত রাজা কর্তৃক মনোনীত বা কোনো গ্রামের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতো। গ্রাম প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এ সংসদ ছিল বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত। পঞ্চায়েতগুলোতে সকল শ্রেণি ও বর্ণের লোকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। পঞ্চায়েতগুলো  গ্রামবাসীদের মধ্যে ভূমি বন্টন করত এবং তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করে সরকারের প্রাপ্য অংশ পরিশোধ করত।

নারীদের অধিকার আদায়ে কাজ করেন তারাঢাকার ইতিহাস ঘাটলেই সরদারি প্রথার কথা চলে আসে। একটা সময় পঞ্চায়েতে বিভক্ত ছিল ঢাকা। ৪০০ বছরের পুরনো শহর ঢাকার শাসনভার সমসময় ঢাকার হাতে ছিল না। কখনো দিল্লীতে বসে মুঘলরা শাসন করেছেন কখনো সোনারগাঁয় বসে বার ভূঁইয়ারা শাসন করেছেন। মুঘল আমল থেকে প্রচলিত পঞ্চায়েতের বিচার ব্যবস্থাটি ছিল ন্যায় এবং সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আরো পড়ুন: অর্থের বিনিময়ে মৃত ব্যক্তির না বলা কথা জানান তিনি  

মিথ্যা বা পক্ষপাতিতার কোন স্থান ছিল না এই ব্যবস্থায়। পঞ্চায়েতগুলোতে একজন করে সরদার থাকতো। ঢাকার নবাবদের মাধ্যমে এই প্রথা গড়ে উঠেছিল, যা সরকারি স্বীকৃতিও পেয়েছিল। মুসলিম শাসকগণ এমন এক ধরনের শাসনব্যবস্থায় প্রবর্তন করেন যা বৈশিষ্ট্যগতভাবে ছিল কমবেশি কেন্দ্রাভিমুখী। এমনকি তখনও জমিদারগণ যতদিন রাজকীয় পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করতেন ততদিন গ্রামের প্রশাসনে শাসকরা কোনো হস্তক্ষেপ করতেন না।

ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করা হয় ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নে বাংলার গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার প্রচলিত পদ্ধতি বহাল রাখা হয়। এ প্রথা অনুযায়ী ঢাকা নগরীর প্রতিটি মহল্লা বা পঞ্চায়েত পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং এই পরিষদের নেতা হিসেবে যিনি নির্বাচিত হতেন, তাকেই সরদার বলে গণ্য করা হতো। ঘুষ, মিথ্যা স্বাক্ষী বা প্রতারণা করে বিচারকে প্রভাবিত করা কঠিন ছিল। এছাড়া বিচার অমান্য করে একই সঙ্গে বসবাস করাও কঠিন ছিল। ফলে বিচারটি হতো সুষ্ঠ। ঈদ রোজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করা হয়। সামাজিক কোনো সমস্যা বা পারস্পারিক বিরোধের নিস্পত্তি প্রথমে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে করার চেষ্টা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতের অনুমতি ছাড়া পুলিশ কাউকে আটকও করতে পারত না।    

খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ সালে 'সভা' নামক গ্রামীণ স্ব-শাসিত সংস্থা থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্থাই পরবর্তীতে পঞ্চায়েতে (পাঁচ জনের পরিষদ) পরিণত হয়। প্রায় প্রতিটি গ্রামে তৃণমূল শাসনের জন্য পঞ্চায়েত ছিল একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান। গ্রাম পঞ্চায়েত বা নির্বাচিত পরিষদের নির্বাহী ও বিচারিক উভয়ই ক্ষমতাই ছিল। পঞ্চায়েতে জমি বণ্টনের কাজও করা হত এবং খাজনা সংগ্রহ করে গ্রামের পক্ষ থেকে সরকারকে তার প্রাপ্য অংশ প্রদান করতো। এই গ্রাম পরিষদগুলোকে তত্ত্বাবধান এবং প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করার জন্য একটি বৃহত্তর পঞ্চায়েত বা পরিষদ ছিল। আর মধ্যযুগের মুসলিম শাসকগণ মোটামুটি কেন্দ্রাভিমুখী শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। 

জমিদারের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং বর্ণ-কাচারি নামে পরিচিত পঞ্চায়েত কেবল ছোটখাটো দীউয়ানি ও ফৌজদারি মামলা এবং বর্ণবিষয়ক মামলা যেমন বর্ণচ্যূতি বা বিবাহ সংক্রান্ত বিবাদ নিষ্পত্তি করত। পঞ্চায়েত তখনও প্রশাসনের বিচারবিষয়ক রাজনৈতিক ইউনিট হিসেবে গড়ে উঠতে পারে নি। কারণ জমিদারই ছিলেন গ্রামগুলোতে বিচার ও পুলিশ প্রশাসনের একক কর্তৃত্বের অধিকারী। ১৮৭০ সালে ‘বেঙ্গল ভিলেজ চৌকিদারি অ্যাক্ট’ পাস করে গ্রাম্য চৌকিদারদের পঞ্চায়েতের অধীনে ন্যস্ত করে এককালের প্রায় নির্জীব পঞ্চায়েতকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়। এ সত্ত্বেও পঞ্চায়েত কোনো জনপ্রিয় সংস্থা ছিল না। এটি গ্রামের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিতও ছিল না অথবা গ্রামের কোনো কল্যাণমূলক দায়িত্বও এর উপর বর্তায় নি।

পুরনো আমলের এক পঞ্চায়েত  বাংলার স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ইতিহাসে ১৮৮৫ সাল এক নবযুগের সূচনা করে। তখন থেকে ব্রিটিশ সরকার গ্রামীণ প্রশাসন পরিচালনার জন্য নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন এবং বাংলার মাটিতে তা বাস্তবায়নের চেষ্টায় রত ছিল। ১৮৮৫ সালের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন দ্বারা প্রতি জেলায় একটি করে জেলা বোর্ড এবং প্রতি মহকুমায় একটি করে লোকাল বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমদিকে গ্রাম-পঞ্চায়েত সম্পর্কে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয় নি। 

কিন্তু গ্রামে কোনো কল্যাণমূলক দায়িত্ব ছাড়া গ্রাম-পঞ্চায়েতের সার্থকতা নিয়ে অচিরেই ব্রিটিশ জনগণের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তদনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার রয়্যাল কমিশনের বিকেন্দ্রীকরণ সুপারিশ গ্রহণ করে। এ সুপারিশ অনুসারে চৌকিদারি ও গ্রামের পুরো দায়িত্ব সমন্বিত করে গ্রাম পর্যায়ে গ্রাম-পঞ্চায়েতের স্থলে ইউনিয়ন বোর্ড নামে একটি নতুন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১৯ সালের ‘বেঙ্গল ভিলেজ সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট’ পাসের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার পঞ্চায়েত প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে