টাঙ্গাইলের ফজিলাতুন্নেছা যেভাবে ঢাবি’র প্রথম মুসলিম ছাত্রী

ঢাকা, শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৬ ১৪২৭,   ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

টাঙ্গাইলের ফজিলাতুন্নেছা যেভাবে ঢাবি’র প্রথম মুসলিম ছাত্রী

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৯ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি: ফজিলাতুন্নেসা

ছবি: ফজিলাতুন্নেসা

অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কড়াকড়ি অনেক নিয়ম-কানুন ছিল। যা বেশ অদ্ভূতও ছিল বটে! ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছেলে প্রক্টরের অনুমতি ছাড়া কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারত না। 

ওই ছেলেকে কারণ দর্শিয়ে প্রক্টর বরাবর দরখাস্ত দিতে হতো। প্রক্টর অনুমতি দিলেই সে কথা বলতে পারতো, অন্যথায় নয়। এমনকি তার ক্লাসের কোনো মেয়ের সঙ্গেও না।

ডিসেম্বর ১৯২৭, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় বছর পর একদিন কোলকাতা থেকে এক যুবক এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখবেন বলে। কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে তিনি ঘুরতে বের হলেন। 

তখন কার্জন হল ছিলো বিজ্ঞান ভবন। ঘুরতে ঘুরতে কার্জন হলের সামনে এলে সে যুবক দেখলেন দূরে থ্রি কোয়ার্টার হাতার ব্লাউজ আর সুতির শাড়ি পরা এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। 

কোলকাতা থেকে আসা ওই যুবক বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলেন, মেয়েটি কে?বন্ধুরা বললেন, তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম নারী ছাত্রী। যুবক তো অবাক বললেন সত্যি? আমি এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলব। তবে কথা বলার জন্য একটু এগিয়ে গেলে তার বন্ধুরা তাকে বাঁধা দেন। 

তাকে জানানো হয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি নেই। প্রক্টরের অনুমতি ছাড়া কোনো নারীর সঙ্গে কথা বললে তোমার শাস্তি হবে।

যুবক বললেন, আমি মানি নাকো কোন বাঁধা, মানি নাকো কোন আইন। তিনি হেঁটে হেঁটে সেই নারীর সামনে দাঁড়ান এবং বলেন, শুনেছি আপনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম নারী ছাত্রী। কি নাম আপনার? 

মেয়েটি মাথা নীচু করে বিনম্র গলায় জবাব দিলেন, ফজিলাতুন্নেছা। এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, কোন সাবজেক্ট? জবাব- গণিত। বাড়ি কোথায়? উত্তর-টাঙ্গাইলের করটিয়া। ঢাকায় থাকছেন কোথায়? উত্তর- সিদ্দিকবাজার। এবার যুবক বললেন, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম নারী ছাত্রী, আপনার সঙ্গে কথা বলে আমি খুব আপ্লুত হয়েছি।

আজই সন্ধ্যায় আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবো। এই সব কিছু দূরে দাঁড়িয়ে এসিস্ট্যান্ট প্রক্টর দেখছিলেন। তার ঠিক তিনদিন পর, ২৯ ডিসেম্বর ১৯২৭, কলা ভবন আর বিজ্ঞান ভবনের নোটিশ বোর্ডে হাতে লেখা বিজ্ঞপ্তি টানিয়ে দেয়া হলো যুবকের নামে। 

তার নামসহ তার বাবার নামও লেখা হয়ে সঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই যুবকের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারপর এই যুবক আর কোনোদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেননি। সেদিনের সেই যুবক, বৃদ্ধ বয়সে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরে তাকে শেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সমাধিস্থ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে।

ফজিলাতুন্নেসাসেই যুবকটি আর কেউ নন, নিপীড়িত মানবতার কবি, সাম্যের কবি, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অহংকার, আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার অমর গান ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ এ ব্যক্ত অন্তিম ইচ্ছে অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

এবার আসা যাক প্রথম মুসলিম নারীর বিষয়ে। তিনি ছিলেন ফজিলাতুন্নেসা জোহা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনার পর কবি নজরুল ইসলাম এই নারীকে নিয়ে ‘বর্ষা বিদায়’ কবিতাটি লেখেন। টাঙ্গাইলের সদর থানার নামদার কুমুল্লী গ্রামে জন্ম নেয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গণে মহিয়সী এক নারী বেগম ফজিলতুন্নেসা জোহা।

বেগম ফজিলতুন্নেসা জোহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান ছাত্রী ও ঢাকা ইডেন কলেজের অধ্যক্ষা ছিলেন (১৯৪৮-৫৭)। তিনিই প্রথম বাঙালি মুসলমান ছাত্রী যিনি উচ্চ শিক্ষার্থে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যান। বেগম ফজিলতুন্নেসা সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায় কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা থেকে-

‘বেগম ফজিলতুন্নেসা অসামান্য সুন্দরীও ছিলেন না অথবা বীনানিন্দিত মঞ্জুভাষিণীও ছিলেন না। ছিলেন অংকের এম এ এবং একজন উচুঁদরের বাক্‌পটু মেয়ে’। 

বেগম ফজিলতুন্নেসার জন্ম ১৮৯৯ সালে টাঙ্গাইল জেলার সদর থানার নামদার কুমুল্লী গ্রামে। পিতার নাম ওয়াজেদ আলী খাঁ, মাতা হালিমা খাতুন। তার পিতা স্কুল শিক্ষক ছিলেন।

৬ বছর বয়সে করটিয়ার প্রাইমারি স্কুল দিয়েই তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়। তিনি ১৯২১ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক ও ১৯২৩ সালে প্রথম বিভাগে ইডেন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ফজিলাতুন্নেছা ১৯২৫ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে বিএ পাস করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে গণিত শাস্ত্রে এমএ-তে ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট (গোল্ড মেডালিস্ট) হয়েছিলেন। অতঃপর তিনি ১৯২৮ সালে বিলেতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য গমন করেন। নিখিল বঙ্গে তিনিই প্রথম মুসলিম নারী গ্র্যাজুয়েট। 

তিনিই উপমহাদেশে মুসলিম নারীদের মধ্যে প্রথম যিনি বিদেশ থেকে ডিগ্রি এনেছিলেন। তার পড়াশোনার বিষয়ে করটিয়ার জমিদার মরহুম ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া) বিশেষ উৎসাহ ও অর্থ সাহায্য করেন। বিলেতে তার অবস্থান কালে ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে প্রথম ডিপিআই।

বিদেশে পড়ার সময় ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে খুলনা নিবাসী আহসান উল্ল্যাহর পুত্র জোহা সাহেবের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে উভয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। লন্ডন থেকে ফিরে ১৯৩০ সালে তিনি কলকাতায় প্রথমে স্কুল ইন্সপেক্টরের চাকুরিতে যোগদান করেন। 

১৯৩০ সালের আগস্টে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলিম সমাজ-সেবক-সংঘে’র বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে তার বক্তব্যটি নারী জাগরণের মাইল ফলক হয়ে আছে। 

এই অধিবেশনে তিনি বলেন ‘নারী-শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন ও বলেন। নারী সমাজের অর্ধাঙ্গ, সমাজের পূর্ণতা লাভ কোনোদিনই নারীকে বাদ দিয়ে সম্ভব হতে পারে না। সেই জন্যেই আজ এ সমাজ এতোটা পঙ্গু হয়ে পড়েছে। 

তিনি আরো বলেন, এ সমাজের অবনতির প্রধান কারণ নারীকে ঘরে বন্দি করে রেখে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ রুদ্ধ করে রাখা। নারী-শিক্ষা সম্বন্ধে এতোটা কথা আজ বলছি তার কারণ সমাজের গোড়ায় যে গলদ রয়েছে সেটাকে দূরীভূত করতে না-পারলে সমাজকে কখনো সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারা যাবে না।’

তিনি ১৯৩৫ সালে বেথুন কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। বেথুন কলেজে চাকুরিরত অবস্থায় দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে এসে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন ১৯৪৮ সালে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ইডেন কলেজের অধ্যক্ষা ছিলেন।

বেগম ফজিলাতুন্নেছার অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টায় বিজ্ঞান ও বাণিজ্যিক বিভাগসহ ইডেন কলেজ ডিগ্রি পর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৯৫২ সালে ইডেন কলেজের মেয়েরা রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে কলেজের অভ্যন্তর থেকে মিছিল বের করার প্রস্তুতি নেয়। তখন উর্দুভাষী এক দারোগা হোস্টেলে ঢুকে মেয়েদের ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে।

খবর পেয়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছা কলেজে এসে সেই দারোগাকে হোস্টেল থেকে বের করে দেন নিজের দৃঢ়তা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বলে। নারী শিক্ষা ও নারী মুক্তি সম্পর্কে সওগাতসহ অনেক পত্রিকায় তার বিভিন্ন প্রবন্ধ, গল্প প্রকাশিত হয়।

এই বিদুষী নারী ১৯৭৭ সালে ২১ অক্টোবর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। এই মহীয়সী নারীর স্মৃতি রক্ষার্থে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৭ সালে ফজিলাতুন্নেছার নামে একটি ছাত্রী হল নির্মাণ করা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস