বাংলার এই বিশ্বাসঘাতক ছিলেন শ্রেষ্ঠ ব্যাংকার, দেউলিয়া হতেও সময় লাগেনি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৮ ১৪২৭,   ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বাংলার এই বিশ্বাসঘাতক ছিলেন শ্রেষ্ঠ ব্যাংকার, দেউলিয়া হতেও সময় লাগেনি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৯ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:১০ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

বিশ্বাসঘাতক জগৎ শেঠ

বিশ্বাসঘাতক জগৎ শেঠ

বাংলার ইতিহাসের পাতা উল্টালেই সামনে আসে নবাব সিরাজউদ্দৌলার নাম। আর সেই সঙ্গে মীর জাফরের নাম এমনিতেই সামনে চলে আসে। এই বিশ্বাসঘাতকের নাম বাংলার মানুষ গভীর ঘৃণাভরে স্মরণ করে এখনো। মীর জাফরের সঙ্গে আরো যারা যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে জগৎশেঠ অন্যতম। তবে  বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মীরজাফরের নাম যতবার উঠে এসেছে, জগৎশেঠের নাম ততবেশি শোনা যায় না।

আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ‘জগৎ শেঠ’ বা বিশ্বের ব্যাংকার উপাধি প্রদান করা হয়। সেসময় তিনি ছিলেন  বাংলার অত্যন্ত ধনী ব্যাংকার ফতেহ চাঁদ। তবে দেউলিয়া হতেও সময় লাগেনি তার। জগৎ শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানিক চাঁদ। তিনি আঠারো শতকের প্রথম দিকে পাটনা থেকে ঢাকা আসেন এবং এখানে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাংলার দীউয়ান মুর্শিদকুলী খান তার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে, মানিক চাঁদ তার সঙ্গে নতুন রাজধানীতে চলে যান। মুর্শিদাবাদে তিনি ছিলেন নওয়াবের খুবই প্রিয়ভাজন এবং পরে নওয়াবের ব্যাংকার ও  অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ লাভ করেন।

আরো পড়ুন: সুন্দরী হতে কেউ ব্যবহার করে লতা-পাতা, কেউবা ফায়ার থেরাপি 

আচ্ছা আরেকটু আগে থেকে ঘুরে আসি। মোঘল আমলে মাড়োয়াররা ভারতীয় উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। মাড়োয়ারের পালি বাজার ছিল পশ্চিম ভারতের সমুদ্র উপকূল ও উত্তর ভারতের ব্যবসার সংযোগস্থল। সেখান থেকেই ইউরোপীয়রা ভারতীয় পণ্য এবং ভারতীয়রা ইউরোপীয়, আরব, আফ্রিকা ইত্যাদি দেশের পণ্য আমদানি রফতানি করত। মাড়োয়াররা ছোট বেলা থেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে থাকায় ভালোভাবে বুঝতে পারত। কিন্তু বিরূপ, শুষ্ক আবহাওয়া ও অনুর্বর অঞ্চলের কারণে তারা নিজেদের জন্মভুমিতে টিকতে পারেনি। ১৬৫২ সালে হিরানন্দ সাহু নাম একজন মাড়োয়ার বাংলার পাটনায় এসে বসবাস শুরু করেন।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও পলাশীর যুদ্ধ হীরানন্দের ব্যবসার অর্থের যোগান কীভাবে হয়েছিল তা নিয়ে ছিল নানা কল্প কথা। এ নিয়ে কাহিনীও প্রচলিত আছে। তেমনই একটি কাহিনী হলো, ১৬৫২ সালে হীরানন্দ সাহু পাটনায় ভাগ্যান্বেষণে আসেন। ব্যবসা করার মতো তেমন পুঁজি ছিল না। পাটনায় তার দেশীয়রাও তেমন কোনো সহযোগীতা করতে পারছিল না। এভাবেই কিছুদিন কেটে যায়। একদিন ঘুরতে পথ হারিয়ে এক বনে ঢুকে পড়েন। এমন সময় মানুষের আওয়াজ শুনতে পান করুণ কাতরোক্তি। তিনি এগিয়ে যান।

একটি ভাঙা বাড়ি দেখতে পান। ভেতরে একজন মৃতপ্রায় বৃদ্ধ ব্যক্তিকে দেখতে পান। আপ্রাণ সেবা করেন। কিন্তু তাকে বাঁচাতে পারেননি। মারা যাওয়ার আগে ঘরের কোনে আবর্জনার স্তুপ দেখিয়ে কিছু বলতে চান। কিন্তু কিছু বলার আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। হীরানন্দ তার সৎকার করে সেই ঘরে ফিরে আসেন। আবর্জনার দিকে এগিয়ে যান। আবর্জনা সরিয়ে সেখানে অনেক সোনা দেখতে পান। এ সোনা নিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। আর এর মাধ্যমেই তার ব্যবসায়ী জীবনের সূত্রপাত।

এটি প্রচলিত কাহিনী। তবে ইতিহাসে এর কোনো যথার্থ প্রমাণ নেই। পরবর্তীতে হীরানন্দ পাটনা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হন এবং একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তখন থেকেই তারা ছোট খাটো ধার দিয়ে ব্রিটিশদের ব্যাবসায় বিনিয়োগ করতো। ভারতবর্ষে তখনো তারা পরিচিত হয়ে ওঠেনি। সেসময় এ শহরটি বাণিজ্যের দিক দিয়ে অনেক উন্নতি করেছিল। তিনি এখানে ব্যাংকিং ব্যবসা শুরু করেন এবং উত্তরোত্তর উন্নতি করতে থাকেন।

জগৎ শেঠ তবে শুরুতে হিরানন্দ সাহুর ব্যবসা ছিল ব্যবসায়ীদের অর্থ ধার দেয়া ও টাকা ভাঙানো। ঢাকার এই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্তই ছিল সময়মতো টাকা ধার পাওয়া ও পরিশোধ করা। যার ফলে হিরানন্দ সাহুর ব্যবসা রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। সর্বত্র তার ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি তার ব্যবসা  সাত ছেলের মধ্যে বন্টন করে দেন।  

বড় ছেলে ছিলেন মানিকচাঁদ। তিনি ঢাকার ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। মূলত তার মাধ্যমেই জগৎশেঠ পরিবারের জগৎশেঠ হয়ে ওঠার শুরু হয়। পরবর্তীতে ফতেচাঁদ, মহাতপচাঁদ এ বংশের উন্নতির ধারাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান। তারা একইসঙ্গে সম্রাট, নবাব, ইংরেজ সকলের সঙ্গেই ব্যবসা করেছিলেন এবং তাদের সবার উপরই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। এ পরিবার যেমন উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিল, তেমন করেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষাবলম্বন করায় আজো ইতিহাসে ঘৃণিত হয়ে আছে।  

১৭১২ সালে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণের পর পরই সম্রাট ফররুখ সিয়ার ‘নগর শেঠ’ (নগরের ব্যাংকার) উপাধি প্রদান করে মানিক চাঁদকে সম্মানিত করেন। ১৭১৪ সালে মানিক চাঁদের মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র (দত্তক পুত্র) ও উত্তরাধিকারী ফতেহ চাঁদের নেতৃত্বে পরিবারটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করে। ১৭২৩ সালে সম্রাট মাহমুদ শাহ ফতেহ চাঁদকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি প্রদান করলে এ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি দেশে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। এর সদর দফতর ছিল মুর্শিদাবাদে এবং ঢাকা, পাটনা ও দিল্লিসহ বাংলার গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বাংলার বাইরে এ ব্যাংকের শাখা ছিল।  

সমকালীন দলিল দস্তাবেজে জগৎ শেঠের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কারবার, যেমন ঋণগ্রহণ, ঋণ পরিশোধ, সোনারুপার ক্রয়-বিক্রয় ও অন্যান্য লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে। রবার্ট ওর্ম লিখেছেন যে, এ হিন্দু ব্যবসায়ী পরিবারটি মুগল সাম্রাজ্যে সর্বাধিক ধনবান ছিল। মুর্শিদাবাদ সরকারের উপর এ পরিবার প্রধানের ছিল প্রচন্ড প্রভাব। তিনি অধিকাংশ জমিদারের পক্ষে নিরাপত্তা জামিনদার হতেন এবং তার প্রতিনিধিরা ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতেন। রাজ্যের কোথায় কি ঘটছে তা তিনি অন্যদের চেয়ে বেশি জানতেন এবং প্রতিটি জরুরি ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে তার সহায়তার প্রয়োজন হতো।

মীর জাফর ও মিরন এ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের লেনদেনের সঙ্গে তুলনা করা হত। আঠারো  শতকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ব্রিটিশ সরকারের জন্য যেমন আর্থিক কর্মকান্ড ও দায়দায়িত্ব পালন করত, এ প্রতিষ্ঠানটিও বাংলার সরকারের পক্ষে অনুরূপ দায়িত্ব সম্পাদন করত। এর আয়ের উৎস ছিল বহুমুখী। এ প্রতিষ্ঠানটি ছিল সরকারি রাজস্ব জমা গ্রহণকারী ও জিম্মাদার। জমিদারগণ এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারে রাজস্ব জমা দিতেন এবং নওয়াবরাও এর মাধ্যমেই তাদের বার্ষিক প্রদেয় অর্থ দিল্লিতে প্রেরণ করতেন। এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠান মুদ্রা তৈরি করত এবং বাংলায় আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ সোনারুপা ক্রয় করত। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রচুর মুনাফা করত।

ফতেহ চাঁদের পর তার পৌত্র মাহতাব চাঁদ ১৭৪৪ সালে উত্তরাধিকারসূত্রে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি লাভ করেন। তিনি ও তার সম্পর্কিত ভাই মহারাজা স্বরূপ চাঁদ নওয়াব আলীবর্দী খান এর সময়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। এর ও একটি কারণ আছে, ১৭১৭ সাল থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত শেঠদের ব্যবসা ছিল খুবই জাকজমকপূর্ণ। ১৭৪০ সালে সিংহাসন লাভের লড়াইয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা আলীবর্দী খাঁকে সাহায্য করেছিল। এমনকি সরফরাজ খানের মৃত্যুর পর তারা আলীবর্দী খাঁয়ের জন্যে দিল্লির ফরমানেরও ব্যবস্থা করেছিল। সেই থেকে নবাব পরিবারে তাদের প্রভাব। তবে আলীবর্দীর উত্তরাধিকারী সিরাজউদ্দৌলা এ পরিবারের দুভাইকে বৈরী করে তোলেন। ফলে তারা তার বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং পলাশীর যুদ্ধ এর আগে ও পরে তাদেরকে বিপুল অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। বাংলার জনগণ বিশ্বাস করে যে, জগৎ শেঠের অর্থ আর ইংরেজদের তলোয়ার মিলে বাংলায় মুসলিম শাসনের পতন ঘটিয়েছে।

জগৎ শেঠের বাড়ি মীরজাফর এর নওয়াবী আমলেও তাদের শক্তি ও প্রভাব অব্যাহত ছিল। তবে তারা তার উত্তরাধিকারী মীর কাসিমের বিরাগভাজন হন। মীর কাসিম ১৭৬৩ সালে শেঠ পরিবারের নেতৃস্থানীয় এ দুভাইকে হত্যার নির্দেশ দেন। এ ঘটনার পরই নওয়াবের কাছ থেকে ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে যায়। আঠারো শতকের শেষের দিকে এ পরিবারের পতনের সূচনা হয়। 

জগৎ শেঠদের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এ পরিবার বেশ কয়েক বছর কোম্পানির ব্যাংকার ছিল। তবে ১৭৭৩ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় কোষাগার স্থানান্তরিত হলে কোম্পানির ব্যাংকার হিসেবে জগৎ শেঠ পরিবারের কার্যক্রমের অবসান ঘটে। তখনো পরিবারটির সুবিধাজনক হারে মুর্শিদাবাদে মুদ্রা প্রস্তুতের  সুযোগ ছিল। তবে পূর্বপুরুষদের তুলনায় তাদের ধনসম্পদ এত হ্রাস পেয়েছিল যে তারা এ সুযোগের যথার্থ ব্যবহার করতে পারে নি। মাহতাব চাঁদের উত্তরাধিকারীরা ছয় পুরুষ ধরে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি লাভ করে এসেছেন। জগৎ শেঠ উপাধিধারীদের মধ্যে সর্বশেষ বংশধর হলেন ফতেহ চাঁদ। তার মৃত্যুর পর এ উপাধির আর নবায়ন হয় নি।

আরো পড়ুন: ব্যস্ত নগরীতেই রয়েছে ভবনজুড়ে বন 

বর্তমানে জগৎ শেঠের বাড়িটি একটি সংগ্রহশালা। সেখানে রয়েছে সেকালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এই বাড়িতে এখনো রয়েছে পুরনো আসবাবপত্র, অস্ত্র-শস্ত্র, সেকালের ব্যবহার্য তৈজসপত্রসহ নানা জিনিসপত্র। সংগ্রহশালার প্রবেশমুখ থেকেই দেখা যায় গোপন সুড়ঙ্গে ঢোকার পথ। সত্যিই এই সুড়ঙ্গ পথটি কাঠগোলা বাগানের সঙ্গে সংযুক্ত।  এই সুড়ঙ্গ পথে দর্শনার্থীরাও প্রবেশ করতে পারে।

জগৎ শেঠের বাড়িতে রয়েছে এক রহস্যময় আয়নাজগৎ শেঠের বাড়িতে রয়েছে এক রহস্যময় আয়না। যেখানে কিছুতেই মুখ দেখা যায় না। মুখ ছাড়া পুরো শরীরই দেখা যায় আয়নাটিতে। এর রহস্য ভেদ করা বেশ কঠিন। এছাড়াও ঢাকাই মসলিনের একটি কাপড় রয়েছে জগৎ শেঠের বাড়িতে। উল্লেখ্য, জগৎ শেঠরা ঢাকাতেও ব্যবসা করতেন। জগৎ শেঠের বাড়িতে আরো রয়েছে লর্ড ক্লাইভের ব্যবহারকৃত এক পোশাক। যা ইংরেজদের সঙ্গে তার সুসম্পর্কের নিদর্শন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে