সাহসী এক নায়িকা, ‘লাক্স’ সাবানের প্রথম তারকামুখ তিনিই
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=205752 LIMIT 1

ঢাকা, সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৭ ১৪২৭,   ০৪ সফর ১৪৪২

সাহসী এক নায়িকা, ‘লাক্স’ সাবানের প্রথম তারকামুখ তিনিই

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৮ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৪:০২ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: লীলা চিটনিস

ছবি: লীলা চিটনিস

ডিভোর্সি ও চার সন্তানের জননী তিনি। শুধু মনের জোর দিয়ে একা লড়াই করে বলিউডের প্রথম সারির নায়িকা হন তিনি। তাও আবার আজ থেকে সাত থেকে আট দশক আগে। তখনকার সময় তিনি ছিলেস সিঙ্গেল মাদারদের অনুপ্রেরণা। তার নাম লীলা চিটনিস, ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের যুগে এক সাহসী নায়িকা।

কেমন ছিল তার জীবন সংগ্রাম? কেনই বা মিডিয়ায় এলেন? শুধু কি পেটের দায়ে? 

তৎকালীন আর পাঁচ জন নায়িকার থেকে লীলা চিটনিস ছিলেন অনেক উচ্চশিক্ষিতা ও সভ্রান্ত পরিবারের কন্যা। সেই সঙ্গে অভিজাত পরিবারের বধূও। মিডিয়ায় আসার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। কর্নাটকের ধরওয়াদে এক মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারে লীলার জন্ম ১৯০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। তার পিতা ছিলেন সে যুগে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। লীলা নিজেও ছিলেন গুণবতী ও বিদূষী।

লীলাতবে সমাজের ও পরিবারের রীতি মেনে মাত্র ১৫ বছরে লীলার বিয়ে হয়। তার স্বামী চার চেয়েও অনেক বেশি বয়স্ক এক চিকিৎসক গজানন চিটনিসের সঙ্গে। তার স্বামীও ছিল উচ্চশিক্ষিত। তারা ব্রিটেনে সংসার পাতেন কিছুদিন। এই দম্পতি স্বাধীনতা সংগ্রামী মানবেন্দ্রনাথ রায়কে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন ব্রিটেন থেকে। অল্প সময়েই চার-পুত্র সন্তানের জননী হয়ে যান লীলা। এরপরেই নানা বিষয়ে অশান্তি বাড়ে সংসারে। শেষ পর্যন্ত বিবাদ থেকে বিচ্ছেদ। ভেঙে যায় লীলার সংসার, ছাড়তে হয় স্বামীর ঘর।

আরো পড়ুন: ‘নারীর যৌনতা’ স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে তিনিই প্রথম গবষণা করেন

এক কাপড়ে সন্তানদের নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন লীলা। তার আত্মসম্মান ছিল প্রখর। তাই কারো সঙ্গে আর আপস করেননি। না খুঁজেছেন দ্বিতীয় কারো আশ্রয়। নিজ পায়ে দাঁড়ানোর জন্য লড়াই শরু করেন লীলা। ব্রিটেন থেকে চলে আসেন নিজের দেশে, নিজের জায়গায়। প্রথমে কিছুদিন স্কুল শিক্ষিকা হিসেবে একটি স্কুলে যোগ দেন। এরপরে হঠাৎই জেগে ওঠে অভিনয়ে সুপ্ত বাসনা। কখনো অভিনয় করবেন ভাবেননি লীলা। 

লীলা ও অশোক কুমারএরপর মারাঠি নাট্যদলে যোগ দেন তিনি। তবে তাতে করে চার সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই লীলা চলে এযান মুম্বায়ে। বলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ‘এক্সট্রা’ হিসেবে যোগ দেন তিনি। বেশিরভাগ ধর্মীয় ছবি ও স্টান্ট মুভিতে তিনি কাজ করতেন দক্ষতার সঙ্গে। ১৯৩৭ সালে ‘জেন্টলম্যান ডাকু’ ছবি লীলা চিটনিসের জীবনে অন্যতম। শুরু থেকেই লীলা সমাজের মিথ ভেঙেছেন বারবার। এই ছবিতে ক্রসড্রেস পোশাক পরে, পুরুষের সাজে, নারী অভিনেত্রীকে চুম্বনের দৃশ্যে অভিনয় করেন দর্শকরা। এই ছবির পোস্টারে বড় করে লীলার ক্রসড্রেস লুকের ছবিও হিট হয়। এখন তো কতো ক্রসড্রেস নিয়ে হৈচৈ, অথচ এমন একটা পদক্ষেপ সেই যুগেই করতে পেরেছিলেন লীলা।

আরো পড়ুন: রুপকথা নয়, বাস্তবের রাজকুমারীরা যেমন হয়

১৯৩৯ সালে লীলার ভাগ্য ফিরল বলিউডের প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান ‘বম্বে টকিজ’ এ যোগদান করে। অশোক কুমারও তখন নবাগত অভিনেতা। অশোক কুমারের বিপরীতে নায়িকার রোল পেলেন লীলা। ছবির নাম ‘কঙ্গন’। ছবিটা বক্স অফিসে সুপারহিট করল এবং অশোক কুমার ও লীলা চিটনিস জুটি হিসেবে আরো ছবির অফার পেলেন। এরপরে ‘আজাদ’, ‘বন্ধন’, ‘ঝুলা’- একের পর এক অশোক-লীলা জুটি সুপারহিট। অশোক কুমার পরবর্তীকালে বলেছিলেন, রোম্যান্টিক অভিনয়ের সারসত্য তাকে শিখিয়েছিলেন লীলা চিটনিস। লীলা তাকে বলেছিলেন, হৃদয় খুলে অভিনয় করার আগে চোখ খুলে চোখে চোখ রেখে প্রেমের অভিনয় করো। লীলার সেই টিপস আজীবন মনে রেখেছিলেন অশোক কুমার।

লীলাতখনকার সময় প্রথম সেলিব্রিটি এনডোর্সমেন্ট সম্ভবত লাক্স সাবানের কোম্পানিই শুরু করে। তাই সে যুগ থেকে এ যুগ, সমস্ত প্রথমা বলিউড ও টলিউড নায়িকারা লাক্স সাবানের বিজ্ঞাপন মুখ হয়েছেন। এটা একটা সম্মান বা কৃতিত্ব হিসেবে নায়িকাদের বিবেচিত হয় নায়িকাদের ক্যারিয়ারে। তবে লাক্স সাবান প্রথম কাকে বিজ্ঞাপনী মুখ করেছিল জানেন? এই লীলা চিটনিসকেই। প্রথম থেকেই লাক্স সাবানের বিজ্ঞাপনের মডেল বদলে বদলে যেত বছর বছর। সেটা দেখে বোঝা যেত, কে সেই সময়ের এক নম্বর তারকা। 

লাক্সের বিজ্ঞাপনে লীলালাক্স শুরু করে ১৯২৯ সালে লীলা চিটনিসকে দিয়ে। তিনিই প্রথম লাক্স সাবান কোম্পানির তারকামুখ। তারপরে মীনা কুমারী‚ সুচিত্রা সেন‚ সায়রা বানু‚ আশা পারেখ‚ শর্মিলা ঠাকুর থেকে এখনকার রাইমা সেন, ক্যাটরিনা কাইফ, দিপীকা পাড়ুকোন- সেই ধারা চলে আসছে। চল্লিশের দশকের শেষে লীলা বুঝে গেলেন, তার নায়িকা ক্যারিশমার পড়তি যুগ আসতে চলেছে। তাই পথ বদলে তিনি চরিত্রাভিনেত্রীর রোলে বিশেষত মায়ের রোলে বলিউডে নতুন মাত্রা যোগ করলেন। 

মায়ের চরিত্রে লীলাশহীদ, আওয়ারা, নয়া দৌড়, মা, সাধনা, কালা বাজার, গঙ্গা যমুনা, গাইড, সত্যম শিবম সুন্দরম প্রভৃতি ছবিতে মায়ের রোলে আজও নজর কাড়েন লীলা চিটনিস। রাজ কাপুর, দেব আনন্দ, দিলীপ কুমার- সবার মায়ের ভূমিকায় কাজ করেছেন লীলা চিটনিস। লীলা চিটনিস পরে ছবির পরিচালনা ও প্রযোজনাও করেছেন। ১৯৪২ সালে ‘কিসিসে না ক্যাহেনা’ ছবি প্রযোজনা করেন তিনি। ১৯৫৫ সালে পরিচালনা করেন ‘আজ কি বাত’। সে ছবিতে তার দুই পুত্রও অভিনয় করেছিলেন।

আরো পড়ুন: পুরুষ বেশে সিংহাসনে, মিশরের নারী ফারাওদের বৈচিত্র্যময় জীবন

এছাড়াও লীলা ছিলেন রাজনৈতিক জগতের এর দৃঢ় কর্মী। স্বাধীনতা সংগ্রামী মানবেন্দ্র নাথ রায়কে সাহায্য একদিন লীলাই করেছিলেন যে। আশির দশকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন লীলা। তার শেষ ছবি হল ‘দিল তুঝকো দিয়া’। ছেলেরা থাকত আমেরিকায়। তাই শেষ বয়সে সেখানেই ফিরে যান লীলা চিটনিস। রুপোলি পর্দাকে চিরবিদায় জানান তিনি। তবে শেষ জীবনে সব কিছু গন্ডগোল হয়ে যায়। গ্ল্যামার ও লড়াইয়ের যৌথরূপে এক সময়ে দাঁপিয়ে জীবন কাটালেও, বৃদ্ধবেলায় সঙ্গী হয় নিদারুণ অনটনে। পুত্ররা সেভাবে মায়ের পাশে দাঁড়ায়নি বলে শোনা যায়। অথচ এই পুত্রদের বুকে করেই লড়াই শুরু করেছিলেন লীলা।

সিগারেট মুখে লীলা২০০৩ সালের ১৪ জুলাই আমেরিকার কানেক্টিকাটে লীলা চিটনিস প্রয়াত হন ৯৩ বছর বয়সে। কখনো ঠোঁটে সিগারেট, কখনো বা ক্রসড্রেস পরে মহিলাকে চুম্বন করে, কখনো আবার নায়কের বাহুলগ্না হয়েও নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখা স্টার লীলা চিটনিস। তবে সাহসী দৃশ্যে ঝড় তুললেও তাতে শিক্ষিত রুচির ছাপ রেখেছিলেন তিনি। নগ্নতাকে কখনো প্রশয় দেননি। শিল্প আর অশ্লীলতার লক্ষণরেখাটা বুঝতেন অতদিন আগে। অথচ সময়ের থেকে কত আধুনিক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। 

আরো পড়ুন: ক্লিওপেট্রা মিশরীয় ছিলেন না, রইল আরো অজানা রহস্য

যেকোনো শিল্পীর জীবনে তো চড়াই-উতরাই থাকেই। তবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেই প্রথম দিকে ছকভাঙা সাহসী নারী হিসেবে তার নাম লেখা থাকবে আজীবন। সদ্য ১১০তম জন্মবার্ষিকী পেরোলেন তিনি। এ প্রজন্মের কাছে তিনি বিস্মৃত হলেও ইতিহাস সব কিছুই মনে রাখে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস