ভুতুড়ে জমিদার বাড়ির রহস্যময় এক দিঘী, প্রচণ্ড খরাতেও শুকায় না পানি!

ঢাকা, শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৬ ১৪২৭,   ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভুতুড়ে জমিদার বাড়ির রহস্যময় এক দিঘী, প্রচণ্ড খরাতেও শুকায় না পানি!

লক্ষীপুর প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩৯ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৯ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: খোয়া সাগর দীঘি ও দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি

ছবি: খোয়া সাগর দীঘি ও দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি

লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার জমিদার বাড়ি সম্পর্কে অনেকেরই জানা আছে! বৃহত্তর নোয়াখালীর অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি বর্তমানে দর্শনার্থীদের দারুণ আকর্ষণের জায়গা। কালের সাক্ষী হয়ে এই জমিদার বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছর ধরে। ভুতুড়ে জমিদার বাড়ি বলেও পরিচিত এটি। সেখানেই রয়েছে রহস্যময় এক দীঘি। যেখানকার এক অংশের পানি প্রচণ্ড খরাতেও শুকায় না। 

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে লক্ষ্মীপুরের ইতিহাস অনেক পুরনো। যার প্রমাণস্বরূপ জেলার বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন দেখা যায়। এর মধ্যে অন্যতম দালাল বাজার ‘জমিদার বাড়ি’। এর পাশেই রয়েছে ইতিহাস বিজড়িত বিশাল এক দীঘি। যার নাম ‘খোয়া সাগর দীঘি’। প্রায় শত বছর ধরে অযত্নে আর অবহেলায় পড়ে থাকা ঐতিহাসিক এ দু’টি নিদর্শন হতে পারে লক্ষ্মীপুরের সম্ভাবনাময় একটি পর্যটন কেন্দ্র। 

আরো পড়ুন: সাতলা বিলের শাপলা বেচেই চলে তাদের সংসার

এ নিয়ে জেলাবাসীর মাঝেও দারুণ আগ্রহ ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। অবশেষে লক্ষ্মীপুর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন শিল্প উন্নয়নে ঐতিহ্যবাহী দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘিকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর ও পর্যটন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে। এই স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর।  

দালাল বাজার জমিদার বাড়িলক্ষ্মীপুরের অন্যতম প্রাচীন জমিদার বাড়ি দালাল বাজার জমিদার বাড়ি। দালাল বাজার সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে লক্ষ্মীপুর মৌজায় অবস্থিত প্রাচীন এই জমিদার বাড়িকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। পাঁচ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত রাজ গেইট, জমিদার প্রসাদ, অন্দর মহল, অন্দর পুকুর, শান বাঁধানো ঘাট এসবই পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

জানা যায়, লক্ষ্মী নারায়ন নামে জনৈক ব্যক্তি কাপড়ের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে দালাল বাজার আসেন। তার পুত্র ব্রজবল্লভ স্বীয় দক্ষতা গুণে ব্যবসার প্রসার ঘটান। ব্রজবল্লভ পুত্র গৌরকিশোর কলিকাতায় লেখাপড়ার সুবাদে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহচর্যে আসেন এবং জমিদারী খরিদ করেন। গৌরকিশোর ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা উপাধী লাভ করে। গৌরকিশোর রায় ও রানি লক্ষ্মী প্রিয়া ছিলেন নিঃসন্তান। তারা ঢাকার বিক্রমপুর থেকে গোবিন্দকিশোরকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করে। 

আরো পড়ুন: মানুষ ছাড়াও পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত যেসব প্রাণীরা

গোবিন্দ কিশোর পুত্র নলীনি কিশোর রায় চৌধুরী তাদের জমিদারীর খাজনা আদায়, তদারকী ও প্রসারে দক্ষতার পরিচয় দেয়। দালাল বাজার এন.কে উচ্চ বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ঠাকুর মন্দির এ পরিবারের অবদান। জমির বাড়ির প্রাচীর, অন্দর মহল, নির্মাণ সামগ্রী বিশেষ করে কয়েকটন ওজনের লোহার ভীম, বিশালাকার লোহার সিন্দুক, নৃত্যশালা, বহিরাঙ্গণ দেখতে আজো মানুষ দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে।

জমিদার বাড়িআনুমানিক ১৭৫৫ সালে দালালবাজারের জমিদার ব্রজ বল্লভ রায় মানুষের পানীয় জল সংরক্ষনে এ দিঘীটি খনন করেন। এই দীঘির ঠিক পাশেই রয়েছে দালাল বাজার মঠ। খোয়া মানে কুয়াশা অর্থাৎ দীঘিটি আয়তনে এতই দীর্ঘ যে এর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তাকালে কুয়াশাময় মনে হয় বলে এর নামকরণ হয় খোয়াসাগর। ২০০ বছর পূর্বে আশপাশের এলাকা মাটি ভরাট এবং মানুষের জন্য ব্যবহারিক পানি সংরক্ষণের প্রয়োজনে দালালবাজারের জমিদার ব্রজবল্লভ রায় দীঘিটি খনন করান। এ দীঘিতে জমির পরিমাণ প্রায় ২২ একর। 

এ দীঘির সঙ্গে একটি রূপকথার গল্প জড়িয়ে আছে। জানা যায়, একবার এক বরযাত্রী তাদের নববধূকে নিয়ে দীঘির পাড় দিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় বর যাত্রীদের পানির পিপাসা পেলে তারা যাত্রা বিরতি দিয়ে দিঘীতে নেমে পানি পান করেণ, নববধূও নেমেছিল পানি পান করার জন্য। যখন নববধূ অঞ্জলি ভরে পানি পান করতে যাচ্ছিল-অমনি তার পা দুটি ধরে কে যেন তাকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়। বধূটি আর ফিরে আসেনি। সেই থেকে ওই স্থানটিতে গভীর গর্ত হয়ে আছে। প্রচণ্ড খরাতেও সারা দীঘি শুকিয়ে গেলেও ওই স্থানটি শুকায় না। খোয়া সাগরদিঘীর অল্প পশ্চিমে কোদাল ধোয়া দীঘি নামে আরেকটি দিঘী আছে। কথিত আছে, খোয়া সাগর দিঘী খনন করে শ্রমিকরা কোদাল ধুতে এসে দৈনিক এক কোপ মাটি কেটে ওই দিঘী খনন করে।

অনেকদিন আগে থেকেই লক্ষ্মীপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা প্রায়ই এখানে ঘুরতে আসছেন। চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের ক্ষেত্রে নির্মাতাদের অনেকে এ স্থানটি পছন্দ করেছেন বলেও জানা গেছে। লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে দালাল বাজার যেতে সিএনজি কিংবা বাসে জন প্রতি ভাড়া মাত্র ১০ টাকা। বাজার থেকে প্রায় ১৫০ গজ পূর্বে ঢাকা-রায়পুর মহাসড়কের উত্তর পাশে ‘খোয়া সাগর দীঘি’। দীঘি বরাবার মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে জমিদার বাড়ির মঠ, স্থানীয়দের কাছে যা মঠবাড়ি বলে পরিচিত। 

দিঘীসেখান থেকে দালাল বাজার ডিগ্রি কলেজের পেছন দিয়ে ‘জমিদার বাড়ি’ যাওয়া যাবে। পায়ে হেঁটে পাঁচ মিনিটের রাস্তা এটি। দালাল বাজার থেকে দক্ষিণ দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কের পাশেই পুরোনো জমিদার বাড়িটি। প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর নির্মিত এ জমিদার বাড়িতে রয়েছে পরিত্যক্ত রাজ গেইট, রাজ প্রাসাদ, অন্দরমহল প্রাসাদ, শান বাঁধানো ঘাট, নাট মন্দির, পূঁজা মণ্ডপ, বিরাটাকারের লোহার সিন্দুক, কয়েক টন ওজনের লোহার ভীম, বিশাল বাগান ও জমিদার বাড়ির প্রাচীর প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে ছোট-বড় তিনটি পুকুর। দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকায় বিচার আসন ও নৃত্য আসনটি চুরি হয়ে যায় বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানায়, প্রায় ৪০০ বছর আগে জনৈক লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণব কলকাতা থেকে লক্ষ্মীপুরে কাপড়ের ব্যবসা করতে আসেন। তার উত্তর পুরুষরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বাণিজ্যিক এজেন্সি এবং পরে জমিদারী লাভ করেন। ১৭৬৫ সালে সর্বপ্রথম লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণবের নাতি (পুত্রের সন্তান) গৌর কিশোর রায় রাজা উপাধী লাভ করেন। সেই সময় ‘খোয়া সাগর’ নামক দীঘিটি খনন ও জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। তবে তৎকালীন স্থানীয় লোকেরা জমিদারদেরকে ব্রিটিশদের ‘দালাল’ বলে আখ্যায়িত করেন। এ কারণে জমিদার বাড়ি সংলগ্ন এলাকাটি দালাল বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার আগ পর্যন্ত জমিদার বংশধররা এ অঞ্চলে বসবাস করতেন। জানা গেছে, ২০১৫ সালে দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দীঘি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। তবে স্থানীয় একটি মহল উচ্চ আদালতে রিট করলে উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ওই মহল বিভিন্নভাবে জমিদার বাড়ি ও দীঘিটি ভোগদখল করে আসছিল। 

জমিদার বাড়িসর্বশেষ গত বছরের ২৯ আগস্ট আদালত ‘জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দীঘি’ সংক্রান্ত রিটটি খারিজ করে দেন। এরপরই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রাচীন এ দুটি নিদর্শনের সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ শুরু হয়। এদিকে প্রত্মতাত্ত্বিক অধিদফতর ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি দালাল বাজার জমিদার বাড়ি সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশ করে। সেখানে ঐতিহাসিক নিদর্শন বিবেচনা করে দালাল বাজার জমিদার বাড়িকে সংরক্ষণযোগ্য ভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পরিকল্পিতভাবে দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দীঘিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।  প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) হান্নান মিয়া সম্প্রতি দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘি পরিদর্শনে এসে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক (চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) ড. মো. আতাউর রহমান, লক্ষীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রিদোয়ান আরমান শাকিল, উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মামুনুর রশিদ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রফিকুর ইসলাম, রিফাত হোসেন প্রমুখ।

আরো পড়ুন: মাটির নিচে আলো ঝলমলে অবিশ্বাস্য এক গুহা

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালক হান্নান মিয়া বলেন, চলতি অর্থ বছরের মধ্যেই দালাল বাজার জমিদার বাড়ির চারপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর থেকে সরকারের কাছে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন প্রকল্প দাখিল করা হবে। এরপর সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করলে পুরোদমে কাজ শুরু করা যাবে। 

তিনি আরো বলেন, দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘি প্রত্নতত্ত্বিক জাদুঘর ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত একটি স্থান। তবে আমাদের হস্তক্ষেপ না থাকায় অযত্ন-অবহেলা ও দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে ঐতিহ্যবাহী এই নিদর্শনটি বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। তবে দেরিতে হলেও জায়গাটি সংরক্ষণ করে সৌন্দর্য বর্ধন করায় জেলা প্রশাসনকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালক হান্নান মিয়া।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সড়কপথে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর স্টেশন যেতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি অথবা অটোরিকশায় দালাল বাজার নামলেই পূর্ব পাশে তাকালেই দেখা যাবে খোয়া সাগর দীঘি।

নদীপথে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে চাঁদপুর পৌঁছাতে হবে। এরপর রায়পুর। তারপর আবারও লক্ষ্মীপুর শহরমুখী সিএনজিতে উঠে দালাল বাজারে এলেই চোখে পড়বে খোয়া সাগর দীঘি। লঞ্চে খরচ হবে যাওয়া-আসা ৫৮০ টাকা। আর বাস বেছে নিলে খরচ পড়বে ৮২০ টাকা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস