বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান, যার নেই দ্বিতীয় কপি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৮ ১৪২৭,   ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান, যার নেই দ্বিতীয় কপি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:২৩ ২৬ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৯:০২ ২৬ জুলাই ২০২০

ছবি: অ্যান্টোনভ এন-২২৫ বিমানটি

ছবি: অ্যান্টোনভ এন-২২৫ বিমানটি

রাইট ভাতৃদ্বয়ের উড়োজাহাজ তৈরির গল্পটা নিশ্চয় সবারই জানা! ১৯০৩ সালে প্রকৌশলী দুই ভাই মিলে তৈরি করেন প্রথম উড়োযানটি। এর আগে অনেকেই উড়োজাহাজ তৈরির চেষ্টা করলেও সফল হতে পারেননি।

১৯০৩ সালে নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হকে রাইট ভাতৃদ্বয়ের তৈরি প্রথম নিয়ন্ত্রিত ও শক্তিসম্পন্ন উড়োজাহাজ ১২০ ফুট পথ পাড়ি দেয়। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিমানের কথা জানেন কি? এটি এতোটাই বিশালদেহী যে এর কার্গোর এক কোণায় রাখা যাবে রাইট ভাতৃদ্বয়ের প্রথম উড়োযানটি।    

আশির দশকে সোভিয়েত শাসনামলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিমান অ্যান্টোনভ এন-২২৫ তৈরি করা হয়। সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যান্টোনভ ডিজাইন ব্যুরো নামের একটি কোম্পানি ওই বিমানটি তৈরি করে। ১৯৮১ সালে মহাকাশ গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা হয়। নাসা প্রথম পুনঃব্যবহারযোগ্য মনুষ্যবাহী মহাকাশযান তৈরি করে। মিলিটারি স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয়। তখনই সোভিয়েত ইউনিয়ন একই ক্ষমতাসম্পন্ন মহাকাশযান তৈরির পরিকল্পনা করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তৈরি হয় মহাকাশযান 'বুরান'। তবে সমস্যা বাধে মহাকাশযানটি বহনের ক্ষেত্রে। তখন অ্যান্টোনভ ডিজাইন ব্যুরোকে বলা হয় বুরান মহাকাশযানটি পরিবহনে সক্ষম একটি বিমান তৈরি করতে।

 বিশালদেহী এই বিমানের নেই কোনো দ্বিতীয় কপি তারা এন ১২৪ নামের আরেকটি বড় বিমানের গঠনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেন এন- ২২৫। ১৯৮৮ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। একই বছরের ২১ ডিসেম্বর আকাশে প্রথমবারের মতো উড়াল দেয় বিমানটি। নির্মাণের পর সামরিক কাজে বিমানটি ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। এন ১২৪ এর চেয়ে কার্গোর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় দ্বিগুণ, ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়িয়ে মোট ৬টি করা হয়। বিশালাকৃতির এই বিমানের নাম দেয়া হয় এন-২২৫ ম্রিয়া। ইউক্রেনিয়ান ভাষায় `ম্রিয়া` শব্দটির অর্থ হচ্ছে স্বপ্ন। এটিই প্রথম সোভিয়েত বিমান যার নামকরণ হয়েছে ইউক্রেনিয়ান শব্দে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিমানটি ইউক্রেনের মালিকানায় আসে। তখন থেকেই ইউক্রেনে রয়েছে এই বিমান।   

৬টি টার্বোফ্যান ইঞ্জিন সমৃদ্ধ, ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট উইংস্প্যানের এই বিমানটি বিশ্বের যেকোনো বিমানের চেয়ে বেশি ওজন বহন করতে পারে। বিমানবন্দরে এন-২২৫ ওঠানামার সময় প্রায়ই দর্শনার্থীদের ভীড় লেগে যায়। অ্যান্টোনভের এই বিমানটি ২৫০ টন ওজন বহনে সক্ষম। এর নিজেরই ওজন দুই লাখ ৮৫ হাজার কেজি। দৈর্ঘ্য ৮৪ মিটার, ডানার বিস্তার ছিল ৮৮.৪ মিটার। এই বিমান মাত্র একটিই তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি বিশ্বে এ ধরণের বিমান আছে মাত্র এই একটি। অ্যান্টোনভ এন-১২৪ মডেলের আদলে নির্মিত হয়েছে অ্যান্টোনভ এন-২২৫ ম্রিয়া।      

বিমান বিশেষজ্ঞ ও বাফালো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইলিয়া গ্রিনবার্গ বলেন, বিমানটির উড্ডয়ন ও অবতরণের দৃশ্য দেখার মতো।এর বিশাল আয়তনের জন্যই মনে হয় ধীরে ধীরে আকাশে ভেসে ওঠে। প্রকৌশল বিদ্যার বিস্ময়কর সৃষ্টি এটি।

১৯৮৮ সালের ২১ ডিসেম্বর এটি প্রথম আকাশে উড়াল দেয় ১৯৮৯ সালে প্যারিস এয়ার শো তে সবার নজড় কাড়ে অ্যান্টোনভ এন-২২৫। বার্লিন প্রাচীরের পতনের মাত্র এক বছর আগে ১৯৮৮ সালে প্রথম যাত্রা শুরু করে এন-২২৫ ও বুরান। এর এক বছর পরেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন শুরু হওয়ায় বুরানের প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যায়। এন-২২৫ এর কয়েকবার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলে। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর দেশটি আর্থিক সংকটে পড়ে। যার ফলে মহাকাশ গবেষণায়ও ভাটা পড়ে। বোরান স্পেস শাটল পরিবহনের জন্য নির্মিত হলেও, প্রয়োজন ফুরিয়ে আসায় অ্যান্টোনভ এন-২২৫ কে পরবর্তীতে মালামাল পরিবহনের কাজে লাগানো হয়। পরবর্তীতে বিমানটিকে স্যুট, সুইমিংপুলসহ বিলাসবহুল উড়ন্ত হোটেল বানানোর প্রস্তাবনা নেয়া হয়। তবে তা কখনো বাস্তবের মুখ দেখেনি। 

২০০১ সালে বিভিন্ন সংস্কার ও নতুন সরঞ্জামাদি সংযোজনের পর বিমানটিকে আবার চালু করা হয়।  সে বছরই বিমানটি ১২৪টি বিশ্বরেকর্ড স্থাপন করে। সেসময় নাইন ইলেভেনের কারণে এ ঘটনা খুব একটা মানুষের নজর কাড়েনি। অ্যান্টোনভ এয়ারলাইনস এন-১২৪ এর ধারণ ক্ষমতার অধিক মালামাল বহনের অর্ডার আসায় অবশেষে এন-২২৫ চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আবার উড়াল দেয় বিমানটি। এন-২২৫ এর কার্গো বগির ধারণক্ষমতা ৯৫০ কিউবিক মিটার। এর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ২৫০ টন।

নিত্য নতুন যন্ত্রাংশ সংযোজন হচ্ছে এই বিমানে  সবচেয়ে ভারী, দীর্ঘতম বস্তু পরিবহনের রেকর্ড কুড়িয়েছে বিমানটি। মাটি থেকে ৩৩ হাজার ফুট উপরে ইউক্রেনের ১২০ জন শিল্পীর ৫০০টি চিত্রকর্মের প্রদর্শনীর মাধ্যমে গিনিজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড স্থাপন করে। এবছর  এপ্রিলে বিমানটি আরেকটি রেকর্ড স্থাপন করে। চীন থেকে পোল্যান্ডে ১০০ টন কোভিড-১৯ সুরক্ষা সরঞ্জামাদি পরিবহন করে। চীন থেকে বিভিন্ন জায়গায় এসব সরঞ্জামাদি পরিবহনের জন্য আড়াই মাসে দশবার বিমানটি ব্যবহৃত হয়েছে। এন-২৫৫ পানির টারবাইন, পারমাণবিক জ্বালানি, নির্মাণ যানবাহন, হালকা বিমান এবং ম্যাগলেভ ট্রেনও পরিবহন করেছে। 

এন-২২৫ বিমানটি খুবই সীমিত আকারে ব্যবহৃত হয়। প্রতি ঘন্টায় এর জ্বালানি খরচ ছয় হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। অ্যান্টোনভের কাছে দ্বিতীয় আরেকটি বিমান বানানোর সরঞ্জামাদি থাকলেও তাদের আপাতত এই পরিকল্পনা নেই। বর্তমান চাহিদাও মেটানো সম্ভব হচ্ছে একটি এন-২২৫ দিয়েই। চীন একবার কিনে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও পরিবহনের সীমাবদ্ধতার জন্য তা সম্ভব হয়নি।

এটিকে দেখতে ভীড় করে দর্শনার্থীরা এন-২২৫ প্রজেক্টের প্রধান প্রকৌশলী নিকলে কালাশনিকোভ জানান, তার কর্মজীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছেন এটি নির্মাণে। এটি তার কাছে একটি স্বপ্নের প্রজেক্ট ছিল যা তাকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গিয়েছে । ৮০ এর দশকে এতো বড় একটি বিমান আকাশে উড়তে পারে তা মানুষের কল্পনাতীত ছিল বলেও জানান কালাশনিকোভ।

অ্যান্টোনভ এয়ারলাইনস এর সিনিয়র উপ পরিচালক ভিটালি শোস্ত বলেন, বিমানটি আমাদের গর্বের বিষয়, ইউক্রেন ও অ্যান্টোনভ কোম্পানি উভয়ের জন্য । আমি স্কুলে পড়াকালীন বিমানটি দেখে অবাক হয়েছিলাম, এটি উড়তে পারতো বিশ্বাস করতে পারিনি। এখন আমিই বিমানটির উড়তে পারা নিশ্চিত করি।

আন্তর্জাতিক বিমান নীতিমালা অনুসরণ করে অ্যান্টোনভ প্রতিনিয়তই বিমানটির নিত্যনতুন পরিবর্তন করছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে বিমানটি আরো অন্তত ২৫ বছর উড়তে পারবে। কেবল মালামাল পরিবহনেই নয়, সংস্কার ও আধুনিকায়ন করলে মহাকাশ গবেষণায় আবারো কাজে লাগানো যাবে এটিকে। সাধারাণত যে কোনো মহাকাশযানের ভূমি থেকে প্রথম ১০ কিলোমিটার উড্ডয়নের জন্য জ্বালানির ৯০ শতাংশ খরচ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যদি প্রথম ১০ কিলোমিটার এন-২২৫ এর ভেতরে করে মহাকাশযান নেয়া হয় এবং সেখান থেকে উড্ডয়নের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে খরচ অনেক কমে আসবে। 

সূত্র: সিএনএনট্রাভেল

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস