দেবতাকে খুশি করতে নীলনদে বীর্যদান করত মিশরীয়রা

ঢাকা, শুক্রবার   ৩০ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৫ ১৪২৭,   ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৫ম পর্ব

দেবতাকে খুশি করতে নীলনদে বীর্যদান করত মিশরীয়রা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০২ ২৩ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৪:২৭ ২৩ জুলাই ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

বিশ্বের সবচেয়ে সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস মিশরের। সভ্যতার প্রাচীন যুগের ইতিহাস পড়তে গেলে যে দেশের নাম সবার আগে আসে তা হলো পিরামিডের দেশ মিশর। আদিযুগ থেকেই সেখানে এক আশ্চর্য সভ্যতা তৈরি হয়েছিল। যা এখনো ঐতিহাসিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতিদের অবাক করে। 

প্রাচীন মিশরীয়দের জীবন যাপন প্রক্রিয়া ছিল বেশ রহস্যময়। তারা মৃত্যুকে অধিক ভয় করত, ভাবত মৃত্যুর পরেও জীবন রয়েছে। এজন্য গড়ত পিরামিড, তাতে রাখা হত মমি করা মৃতদেহ। সঙ্গে দেয়া হত মহামূল্যবান সব সম্পদ। এছাড়াও তারা বিশ্বের অন্যদেরকে নিজেদের চেয়ে তুচ্ছ বলে ভাবত।  

আরো পড়ুন: সমাধিস্তম্ভই মিশরীয়দের চিরস্থায়ী বাড়ি, সঞ্চয় দিয়ে গড়ত পিরামিড

শ্রেণিবিভেদ কড়াকড়িভাবে মানা হত প্রাচীন মিশরীয় সমাজে। নিম্ম শ্রেণিরা সবসময় নিযুক্ত থাকত উচ্চ শ্রেণির সেবার কাজে। আগের পর্বগুলোতে মিশরীয় সভ্যতার নানা বিষয় সম্পর্কে জেনেছেন। আজ থাকছে পঞ্চম পর্ব। মিশরীয়দের অদ্ভূত দেবতা ভক্তি, উৎসব, খাদ্য এবং পোশাক সম্পর্কিত চমকপ্রদ সব তথ্য- 

দেব-দেবীর প্রতি সম্মান জানাত তারাদেব-দেবী ও মিশরীদের উৎসব

মিশরীয়রা সব দেব-দেবীর জন্মদিন পালন করত। তাদের মধ্যে এতোটাই দেব-দেবী ভক্তি ছিল যে, মৃত্যুর পরও মমির পাশে দেব-দেবীর প্রতিকৃতি স্থান পেত পিরামিডে। ফারাওরা বিভিন্নভাবে দেব-দেবীর সম্মানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করত।  

নতুন শিশু জন্মালে বা মৃতের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার আচার অনুষ্ঠান পালিত হত। যদিও উপলক্ষ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের রীতিনীতির ভিন্নতা ছিল। তবে সব অনুষ্ঠানেই সুরাপান এবং ভোজের ব্যবস্থা থাকত। অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে প্রাচীন মিশরীয়রা কালো পোশাক পরত। তবে পুরোহিতরা সাদা পোশাক পরত। জন্মদিন এবং অন্যান্য উৎসবে ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোনো রঙের পোশাক ব্যবহার করতে পারত। 

আরো পড়ুন: মিশরীয়দের রহস্যময় জীবনযাপন, মৃত্যু নিয়ে ছিল অধিক ভয়

থিবেসে আমুন দেবতার সম্মানে বিশেষ অনুষ্ঠান পালিত হত। মেম্ফিসের দেন্দেরায় হাথর দেবী, ইসিস দেবীর সম্মানে বুসিরিসে এবং বাস্তেস দেবীর সম্মানে বুবাস্তিসে অনুষ্ঠানের অয়োজন করা হত। এই সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান সাধারণত চন্দ্র বছরের দিনপঞ্জি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হত। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাদেও প্রাচীন মিশরে অন্যান্য উৎসব পালিত হত। যেগুলো তাদের প্রচলিত সংস্কৃতির অংশ ছিল। বাস্তেত দেবীর অনুষ্ঠানে মেয়েরা পরত শুধু ছোট একটা কিল্ট।  

হাজারো দেব-দেবীর ভক্তি করত তারাতিন হাজার বছরেরও কিছু বেশি সময় ধরে মিশরে পৌরাণিক ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। মিশরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি তার পুরানও বিবর্তিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে যুগ ভেদে বিভিন্ন ভূমিকায় দেখা যায়। পৌরাণিক ধর্মে মূলত- বহু দেব-দেবীর অস্তিত্ব ছিল। মিশরতত্ত্ববিদ জেমস পি অ্যালেন অনুমান করেন যে মিশরীয় গ্রন্থে প্রায় ১৪০০ টিরও বেশি দেবতাদের। 

তবে প্রাচীন সাম্রাজ্যের কালে আখেনআতেনের (চতুর্থ আমেনহোতেপ) শাসনামলে কিছুকালের জন্য সূর্যদেব আতেনকে কেন্দ্র করে একেশ্বরবাদ চর্চা করতে দেখা যায়। তবে আখেনআতেনের মৃত্যুর সঙ্গে এই চর্চাও লোপ পায়। পুনরায় মিশরবাসী আগের বহু দেব-দেবী সম্বলিত পৌরাণিক ধর্ম চর্চা করতে থাকে।  

আরো পড়ুন: ২৫০০ বছরে ধারাবাহিকভাবে ৩১টি রাজবংশ শাসন চালায় মিশরে 

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দেবতাকে তুষ্ট করতে প্রাচীন মিশরীয় পুরুষরা নীলনদে গিয়ে মাস্টারবেশন বা বীর্যদান করতেন। মিশরীয়রা মনে করতেন, দেবতা অটাম স্বমেহনের মাধ্যমে বিশ্বকে সৃষ্টি করেন। আর নীল নদীও এভাবেই সৃষ্টি। আর সেই কারণে তখনকার ফারাওদের নীলনদে বছরের একটি বিশেষ সময়ে হস্তমৈথুন করাটা বাধ্যতামূলক ছিল।  

এমন অনেক নিদর্শন মিলেছেসেই সময় দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে ফারাওরা নীলনদের ধারে উপস্থিত হতেন। বিভিন্নরকমের অনুষ্ঠানের সঙ্গে পূজা পাঠের আয়োজন করা হত। নীলনদের ধারে হাজির হয়ে নিজেদের সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ খুলে ফেলতেন ফারাওরা। আর তখনই দেবতা অটামকে খুশি করতে নীলনদে বীর্যদান করতেন তারা।    

এতে নীলনদের জলধারা বজায় থাকবে এই বিশ্বাসের পাশাপাশি তারা মনে করতেন এতে চাষাবাদও খুব ভালো হবে। মিশরের বিভিন্ন শিলালিপিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন প্রাচীন ছবিতেও এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। পিরামিডের গায়েও এই নিয়ে ছবি দেখা যায়।আসলেই এই বিষয়টি হাজারো রহস্যের জন্ম দেয়।   

আরো পড়ুন: দুই হাজার বছর ধরে সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগে যেভাবে পৌঁছায় মিশর 

তবে মিশরের ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, প্রাচীন মিশরে পুরুষের স্বমেহনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হত। কেননা তাদের ধারণা ছিল, মিশরীয় দেবতা অটাম স্বমেহন করার নিরিখেই নীলনদের জলস্রোত চালিত হয়। তবে এই প্রথা এখন অবলুপ্ত।  

উচ্চ শ্রেণির লোকেরাই ভালো খাবার খেতমিশরীয়দের খাদ্য

প্রাচীন মিশরীয়রা সাধারণত নিরামিষ ভোজী ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শস্য (গম) এবং শাকসবজি। মাংস ব্যয়বহুল ছিল। অভিজাত শ্রেণির লোকেরাই এই ব্যয় বহন করতে পারত। মিশরের শুষ্ক জলবায়ুতে মাংস রাখাও বেশ কঠিন ছিল। তবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সবার জন্যই মাংস খাওয়ার সুযোগ থাকত। 

মিশরীয়দের পোশাক-পরিচ্ছদ 

প্রাচীন মিশরীয়দের পোশাক তুলা থেকে বোনা কাপড় ছিল। প্রাক রাজবংশীয় এবং রাজবংশীয় যুগের প্রথম দিকে নারী এবং পুরুষ সাধারণত লিলেন কিল্ট পরত। জন্মের পর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শিশুদেরকে কোনো পোশাকই পরানো হত না। নতুন রাজ্যের সময় নারীরা লিলেনের পোশাক পরত। এই পোশাকটি তাদের বুক থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আবৃত রাখত। আর পুরুষরা পরত ছোট কিল্ট। তবে সময় বিশেষে উপরের অংশেও পোশাক পরত পুরুষেরা। 

মিশরীয় নারী ও পুরুষের পোশাক এমনই ছিল অতীতেনিম্ন শ্রেণির এবং কৃতদাস নারীরা নতুন রাজ্যের সময় পর্যন্ত শুধু একটা কিল্ট পরত। এসময় অভিজাত নারীরা কাঁধ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত গাউনের ন্যায় পোশাক পরত। শীতের সময় তারা শাল ব্যবহার করত বলে জানা যায়। সেসময় সমাজের বেশিরভাগ মানুষই খালি পায়ে থাকত। তবে বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা দীর্ঘযাত্রার সময় জুতা ব্যবহার করত। 

চামড়ার তৈরি জুতার ব্যবহার ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা সময় বিশেষে বা উৎসবে তা ব্যবহার করত। মূলত প্রাচীন মিশরের মধ্য এবং নতুন রাজ্যের সময়ের পূর্বে তাদের কাছে জুতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তবে মধ্য এবং নতুন রাজ্যের সময় জুতা সামজিক মর্যাদারও অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ধনী ব্যক্তিদের জুতায় বিভিন্ন নকশা থাকত। দরিদ্রদের বেশিরভাগই জুতা পরত না। 

মমি করা হত মৃতদেরমিশরীয়দের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

মিশরীয়দের কাছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মৃত্যুকে তারা চিরন্তন জীবনের পরবর্তী অংশে প্রবেশের উপায় হিসেবে বিবেচনা করত। মৃতদের যথাযথ রীতিনীতি পালন করে সমাধিস্থ করা প্রাচীন মিশরীয়দের সব শ্রেণির মানুষের কাছেই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মৃতদেহ পরিষ্কার করে মমিকৃত করে সমাধিস্থ করা হত। 

তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সমাধিতে প্রয়োজনীয় এবং মূল্যবান বস্তুও মৃতদেহের সঙ্গে দেয়া হত। ধনী ব্যক্তিদের সমাধিগুলো অনেক বড় হত এবং অনেক সম্পদে ঠাসা থাকত। নিম্ন শ্রেণির ব্যক্তিরা সাধ্য অনুযায়ী মূল্যবান বস্তু মৃতদেহের সঙ্গে সমাধিস্থ করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, যথাযথভাবে সমাধিস্থ না করলে কেউই হল অব ট্রুথ এর দিকে যেতে পারবে না। ওসিরিস দেবতার বিচারে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। 

পিরামিডএছাড়াও তাদের বিশ্বাস ছিল, কোনো মৃত ব্যক্তির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং সমাধিস্থ না করলে তার আত্মা ফিরে এসে পরিবারের জীবিত সদস্যদের ক্ষতি করতে পারে। এজন্যই মৃত ব্যক্তির প্রতি মিশরীয়রা সম্মান দেখাত। এর মূল কারণ ছিল দেব-দেবীকে সন্তুষ্ট করা।

বিভিন্ন যুগে মিশরে বহু দেব-দেবী সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন সৌর দেবতা রা, রহস্যময় দেবতা আমুন এবং মাতৃ দেবী আইসিস। সর্বোচ্চ দেবতাকে সচরাচর বিশ্বের স্রষ্টা মনে করা হত। তাকে যুক্ত করা হত সূর্যের জীবনদায়ী শক্তির সঙ্গে। সেকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন, দেবদেবীরা সমগ্র জগতে উপস্থিত রয়েছেন এবং তারা প্রাকৃতিক ঘটনা ও মানুষের জীবনের গতিপথকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস