ভয়ঙ্কর এসব কারাগারে বন্দিদের উপর চলে অমানবিক নির্যাতন!

ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৩ ১৪২৭,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভয়ঙ্কর এসব কারাগারে বন্দিদের উপর চলে অমানবিক নির্যাতন!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৫৫ ২১ জুলাই ২০২০   আপডেট: ২০:১৫ ২১ জুলাই ২০২০

ছবি: কারাগারে বন্দিরা

ছবি: কারাগারে বন্দিরা

অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে, এই কথার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করার জো নেই অপরাধীদেরও। দুনিয়া জুড়ে অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার একেক বিধান রয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে শাস্তির সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো অপরাধীকে কারাবন্দি রাখা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, পৃথিবীর অনেক দেশের কারাগারেই অপরাধীদের উপর অমানবিক অত্যাচার করা হয়।

সেখানে কয়েদিরা তাদের অপরাধের চেয়েও হাজার গুণ বেশি শাস্তি পায়। এমনকি তিনবেলা পেট ভরে খাবার ও পানিও জোটে না তাদের ভাগ্যে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিনের পর দিন কাটাতে গিয়ে কয়েদিরা আরো অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠেন। চলুন তবে জেনে নেয়া যাক এমন কিছু ভয়ঙ্কর কারাগার সম্পর্কে- 

ব্যাংকক কারাগার, থাইল্যান্ড 

কারাবন্দিদের ছোটখাটো ভুল-ত্রুটির কারণে, নির্মম সাজা প্রদানের জন্য এই কারাগারটির বিশ্বজুড়ে কুখ্যাতি রয়েছে। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ আসামিদের এই কারাগারে রাখা হয়। ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারাগারে কয়েদিদের ধারণ ক্ষমতা মাত্র তিন হাজার। তবে বর্তমানে এই কারাগারে বন্দির সংখ্যা আট হাজারের চেয়েও অনেক বেশি। এখানকার বেশিরভাগ কারাবন্দি ২৫ বছর বা তার থেকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি। 

এর মধ্যে ১০ ভাগ রয়েছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এই কারাগারের আসামিদের হাত, পা এবং গলায় থাকে লোহার শিকল। অবশ্য নতুন আসামিদের প্রথম তিন মাস শিকল পরিয়ে রাখা হয়। ব্যাংককের এই কারাগারটি কারাবন্দিদের সংখ্যার তুলনায় অনেক কম অর্থায়নে চলে। যে পরিমাণ অর্থ সরকার থেকে বরাদ্দ দেয়া হয় তার বেশিরভাগই ব্যয় করা হয় কারা কর্তৃপক্ষের ভরণপোষণের জন্য। বাকি অর্ধেক দিয়ে কারাবন্দিদের ন্যূনতম মানবিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া সম্ভব হয় না। 

দিনে কেবলমাত্র একবেলা খাবার দেয়া হয় কয়েদিদের। তাও কেবলমাত্র এক বাটি স্যুপ আর ভাত। এই খাবারে যদি কারাবন্দিদের না হয়, তবে তাদেরকে ক্যান্টিন থেকে কিনে খেতে হয়। যদিও কিনে খাওয়ার মতো সচ্ছলতা সব কারাবন্দিদের থাকে না। ফলে তাদেরকে নানাভাবে পরিশ্রম করতে হয় অর্থ উপার্জনের জন্য। 

ব্যাংকং কারাগারগরিব কয়েদিরা জেলে থাকা ধনী ব্যক্তিদের বিভিন্ন রকম কাজ করে দিলে তবেই দুই পয়সা পায় তারা। সেই অর্থ দিয়ে তারা ক্যান্টিন থেকে শুধু খাবার খেতে পারেন। ব্যাংককের এই কারাগারের পরিবেশ পৃথিবীর নোংরা বস্তিরগুলোর মতো। এখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে প্রায়ই তা নষ্ট হয়ে নানা রকম দুর্গন্ধ ছড়ায়। 

এই কারাগারটি নোংরার রাজ্য হওয়ায় তেলাপোকা এবং ইঁদুরের ব্যাপক উপদ্রব রয়েছে। তাছাড়া এই কারাগারে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির স্বল্পতা। এ কারণেই বন্দিদের বড় একটি অংশ কারাগারে সারাবছরই অসুস্থ থাকেন। কলেরা, ডায়রিয়া বা পানিবাহিত রোগ নিয়েই সবার এখানে বেঁচে থাকতে হয়। 

সেইসঙ্গে রয়েছে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর তাণ্ডব। এসব রোগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে এই কারাগারটিতে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে কারাগারে কারারক্ষীদের দল। নারী-পুরুষ কেউই রেহাই পায় না তাদের হিংস্রতা থেকে। 

সাবানেতা কারাগার, ভেনেজুয়েলা

গত বছরের শুরুর দিক থেকেই ভেনেজুয়েলা বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়ে ওঠে। কারণ কিছু বছর আগে থেকেই দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ নাজুক। দেশটিতে তীব্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ২০১৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মানুষ খুনের ঘটনা ঘটে ভেনেজুয়েলায়। 

এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই ভেনেজুয়েলার কারাগারে বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি। আর এসব কারাগারগুলোতে বন্দিরা সবসময় বিশৃঙ্খলা করে থাকে। আর এই বিশৃঙ্খলা হওয়ার মূল কারণ হলো, ভেনেজুয়েলার এই জেলে বন্দি থাকা কয়েদির ৮০ শতাংশই পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। এসব কয়েদিদের নিয়ন্ত্রণ করে বেশ কিছু গ্যাং মাফিয়া। 

ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সাবাতেনা কারাগার। এটি তৈরি করা হয়েছিল মাত্র ৭০০ কয়েদির জন্য। তবে বর্তমানে এই কারাগারটিতে রয়েছে সাড়ে তিন হাজারেরও অধিক কয়েদি।সেখানে গিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করে এসব কয়েদিরা।

সাবানেতা কারাগারএই কারাগারটিতে কারারক্ষীর সংখ্যাও একেবারে কম। প্রতি ১৫০ জন কয়েদির বিপরীতে মাত্র একজন কারারক্ষী রয়েছেন এই কারাগারটিতে। তাই স্বাভাবিকভাবেই কয়েদিরা বিশৃঙ্খলা করার অনেক সুযোগ পায়। 

কারাগারের মধ্যে বন্দিরা মারামারি করে রক্তারক্তি করে ফেললেও কারারক্ষীদের ওপাশ থেকে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। অবস্থা বেশি খারাপ হলে বা খুনাখুনি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত পুলিশ পৌঁছানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয় নামমাত্র কর্তৃপক্ষকে। কারণ এই কারাগারটি নিয়ন্ত্রণ করে একাধিক শক্তিশালী গ্যাং। 

নতুন কয়েদিকে এই গ্যাংগুলো বেশ অত্যাচার করে। তাদের দাসে পরিণত করে। আর কারাগারে এরকম বিশৃঙ্খলা থাকার ফলে অহরহর দাঙ্গা বাঁধে। এর মধ্যে সব থেকে বড় দাঙ্গা হয়েছিলো ১৯৯৪ সালে। এই দাঙ্গায় কারাগারের মধ্যে ১০৮ জন বন্দি মারা গিয়েছিল। 

রিকারর আইল্যান্ড কারাগার, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম কারাগার হলো রিকারর আইল্যান্ড। যেখানে বেশিরভাগ অল্প মেয়াদের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরকে বা বিচার চলছে এমন আসামীদেরকে রাখা হয়। বলা হয় এটি বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত একটি কারাগার। কুখ্যাত কারাগারগুলোর তালিকায় নাম থাকা অনেকটা দুর্ভাগ্যজনকও বটে। 

কেননা এই কারাগারে কেবল ছোটখাটো অপরাধে অভিযুক্ত কয়েদিদেরকে রাখা হয় এবং সেটাও সাময়িক সময়ের জন্য। তবে কারাগারে নির্মল পরিবেশের কারণে বেশিরভাগ কৃতকর্মের সাজার চেয়ে অতিরিক্ত সহ্য করতে হয়। এই কারাগারের পুলিশ এবং কারারক্ষীরা সেখানকার গ্যাংদের চেয়েও বেশি হিংস্র। 

বন্দিদের সংশোধনের নামে তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালায় কারা কর্তৃপক্ষ। ২০০৯ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বন্দিদের পরিবার কারা কর্তৃপক্ষ বিরুদ্ধে সাতটি শারীরিক নির্যাতনের মামলা করেছে। আর এই প্রতিবেদনের পরই কারাগারটি আলোচনায় আসে। 

রিকার আইল্যান্ড কারাগার২০১৩ সালে আরো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। যেখানে সর্বশেষে এক বছরের স্বাভাবিক বন্দিদের আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পর্যন্ত পাওয়া যায়। তবে রিকার আইল্যান্ডের হিংস্র রূপ প্রকাশ পেয়েছিল, কালি ব্রাউজারের উপর নির্যাতনের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস হওয়ার পর। 

কালি ব্রাউজার যখন চুরির দায়ে অভিযুক্ত হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। আদালতের তার মামলা চলমান ছিল তাই তাকে এই কারাগারে রাখা হয়। অথচ ছোট এই অপরাধের কি সাজাই না ভোগ করলেন এই কালি ব্রাউজার? সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আসামীদের গ্যাং বিনা উস্কানিতে কালি ব্রাউজারের উপর অমানবিক অত্যাচার চালাচ্ছে। 

অথচ কালি ব্রাউজারকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে নির্জন কারাবাসে রাখা হয় দুই বছরের জন্য। এই সময় একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন কালি ব্রাউজার। তিন বছরের মাথায় তার বিরুদ্ধে করা মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এই তিন বছরের কালি ব্রাউজারের উপর যে পরিমাণ অত্যাচার করা হয়েছে। তা পৃথিবীর অন্য কোনো কারাগারে হওয়া সম্ভব নয়।

ট্যাডমোর কারাগার, সিরিয়া

ট্যাডমোর কারাগারসিরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মরুভূমিতে এ কারাগারটি অবস্থিত। কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা ও অমানবিক নির্যাতন এই কারাগারের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। রক্ষীদের কাছ থেকে বিরূপ আচরণ সহ্য করতে হয় কয়েদিদের। নানা কারণে এই কারাগারে প্রায় প্রতিদিনই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। খাবার এবং বিশুদ্ধ পানিরও অভাব রয়েছে এই কারাগারে। অস্বাস্থ্যকর খাবারই চেটে-পুটে খেতে হয় কয়েদিদের। এই কারাগারের রক্ষীরা বন্দিদের প্রতি সবসময় পৈশাচিক আচরণ করে থাকে।

পেটাক আইল্যান্ড কারাগার, রাশিয়া

পেটাক আইল্যান্ড কারাগারবিশ্বের অন্যতম অমানবিক এক কারাগার হলো পেটাক আইল্যান্ড কারাগার। এখানকার কয়েদিদের দিনে মাত্র দেড় ঘণ্টার জন্য কারাগারের নির্ধারিত খোলা জায়গায় বের হওয়ার সুযোগ মেলে। বাকি সময় তাদের কাটে ছোট্ট ঘুপচি ঘরে, যেখানে দু’জন মানুষও ঠিকভাবে থাকতে পারে না। সপ্তাহে মাত্র একদিন গোসলের সুযোগ পায় কয়েদিরা। 

রাশিয়ার এই কারাগারে কয়েদিরা কিছুদিন থাকলেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই এই কারাগারে অন্যান্য চিকিত্‍সকের চেয়ে মানসিক রোগের চিকিত্‍সকের সংখ্যাই বেশি। এই কারাগারের মধ্যে যদি কয়েদি নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তবে তাকে ১৫ দিন টানা অন্ধকার ঘরে রেখে দেয়া হয়। কতটা নির্মম এসব কারাগার, একটু ভেবে দেখেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস