সমাধিস্তম্ভই মিশরীয়দের চিরস্থায়ী বাড়ি, সঞ্চয় দিয়ে গড়ত পিরামিড

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৮ ১৪২৭,   ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পর্ব ৪

সমাধিস্তম্ভই মিশরীয়দের চিরস্থায়ী বাড়ি, সঞ্চয় দিয়ে গড়ত পিরামিড

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৭ ২০ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩২ ২১ জুলাই ২০২০

ছবি: প্রাচীন মিশর

ছবি: প্রাচীন মিশর

প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনযাত্রা ছিল বেশ রহস্যময়। তাদের ধ্যান-ধারণা ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। বাস্তবে প্রাচীন মিশরীয় সব শ্রেণির জনগণ তাদের জীবনকে ভালোবাসত। প্রাচীন মিশরীয়রা অ-মিশরীদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখত। 

কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, তারাই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত জীবনযাপনকারী। প্রাচীন মিশরীয়রা নিজেদের জীবনধারাকে এতোটাই নিখুঁত মনে করত যে, তাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে পৃথিবীর জীবনের চিরন্তন ধারবাহিকতা হিসেবে কল্পনা করত। এর আগের পর্বগুলো মিশরীয় সভ্যতা ও তাদের জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আজ থাকছে পর্ব ৪।

আরো পড়ুন: মিশরীয়দের রহস্যময় জীবনযাপন, মৃত্যু নিয়ে ছিল অধিক ভয়

কৃষক এবং শ্রমিক শ্রেণি

প্রাচীন মিশরে সমাজের সর্বনিম্ন শ্রেণি ছিল কৃষকরা। যদিও চাষাবাদকৃত জমি এমনকি কৃষকদের বসত বাড়ির মালিকানা ছিল রাজা, বিচারকমণ্ডলী, আঞ্চলিক গভর্নর কিংবা পুরোহিতদের। সমাজের উচ্চ শ্রেণির লোকদের জন্য কাজ করার প্রত্যয় নিয়েই একজন কৃষকের দিন শুরু হত। সমাজের নিম্ন শ্রেণির বেশিরভাগই কৃষক ছিল। তারা ফসল রোপণ, মাড়াই সব নিজেরাই করে নিজেদের জন্য সামান্য অংশ রেখে জমির মালিককে সিংহভাগ দিতে বাধ্য ছিল। 

নিম্ন শ্রেণির নারীরা ব্যক্তি মালিকানা বাগানগুলোর পরিচর্যা করত। ৫২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পার্সিয়ানদের আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত মিশরের অর্থনীতি পরিচালিত হত পণ্য বিনিময় পদ্ধতিতে এবং কৃষির উপর ভিত্তি করে এটি গড়ে উঠেছিল। 
প্রাচীন মিশরের আর্থিক একক ছিল দেবেন। একটি দেবেনে আনুমানিক ৯০ গ্রাম তামা থাকত। মূল্যবান সামগ্রী বিনিময়ের জন্য রৌপ্য এবং স্বর্ণের দেবেনও ব্যবহৃত হত। নিম্ন শ্রেণির লোকেরাই পণ্য উৎপাদন করে সমগ্র সমাজকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখত। সমাজের নিম্ন শ্রেণির লোকেরা শ্রমিক হিসেবেও কাজ করত। পিরামিড এবং অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভ তাদের দ্বারাই নির্মিত। 

নিম্ন শ্রেণিরাই কৃষিকাজ করতনীল নদের তীর প্লাবিত অবস্থায় থাকার সময় কৃষি কাজ করা যেত না। এসময় নিম্ন শ্রেণি পুরুষ এবং নারীরা রাজার বিভিন্ন স্থাপত্য নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করত। তবে দাসে পরিণত হওয়া ব্যক্তিরাই মূলত এসব কাজে নিয়োজিত থাকত। পিরামিড, স্মৃতিস্তম্ভ, মন্দির এবং ওবেলস্কির মতো স্থাপনায় কাজ করার মধ্য দিয়ে নিম্ন শ্রেণির মানুষরা অবসর সময় পার করত।  

বিশেষত দক্ষ শিল্পী এবং খোদাইকারদের প্রাচীন মিশরে উচ্চ চাহিদা ছিল। তাদের বেতনও দেয়া হত উচ্চ হারে। তবে অদক্ষ শ্রমিকদের বেতন তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তারা শুধু স্থাপনা নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত পাথর আনা নেয়া করত। কৃষকরা বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় এবং সৌখিন জিনিসে কারুকার্য করেও উপার্জন করত। দক্ষ কাঠের মিস্ত্রিদেরও উচ্চ হারে বেতন দেয়া হত। 

আরো পড়ুন: ২৫০০ বছরে ধারাবাহিকভাবে ৩১টি রাজবংশ শাসন চালায় মিশরে 

সমাজের উচ্চ শ্রেণির লোকেদের প্রাসাদ, বসতবাড়ি, সমাধি এবং স্মৃতিস্তম্ভ সজ্জিত করার জন্য চিত্র শিল্পীদের প্রয়োজন হত। তাদের বেতনও তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। প্রাচীন মিশরে সুরা প্রস্তুতকারীরা অত্যন্ত সম্মানিত ছিল। সুরা বিক্রির কাজে মেয়েরাও যুক্ত ছিল। প্রথম দিকে সুরা প্রস্তুতের কাজ পুরোপুরি মেয়েরাই করত বলে ধারণা করে ইতিহাসবিদরা। সাধারণ মিশরীয়দের মধ্যে বিয়ার জনপ্রিয় পানীয় ছিল। যা শ্রমের বিনিময়েও দেয়া হত। 

জানা যায়, গিজা মালভূমিতে কাজ করা শ্রমিকদের দিনে তিনবার বিয়ার রেশন দেয়া হত। তাদের বিশ্বাস ছিল, দেবতা ওরিসিস মানুষকে এই পানীয়টি দিয়েছিলেন এবং সুরা প্রস্তুতের স্থান পরিচালনা করতেন দেবী টেনেনেট। বিয়ারকে মিশরীয়রা খুবই গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছিল। তার প্রমাণ পাওয়া যায় গ্রিক ফারাও সপ্তম ক্লিওপেট্রার (৬৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া থেকে। তিনি বিয়ারের উপর কর চাপিয়েছিলেন। এর ফলে তার জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছিল। 

উঁচু শ্রেণির মানুষের দালানঘরনিম্ন শ্রেণির লোকেরা ধাতব, রত্ন এবং ভাস্কর্যের মাধ্যমেও উপার্জন করত। প্রাচীন মিশরের অপূর্ব গহনা, রত্নের সাজসজ্জার বস্তুগুলো নিম্ন শ্রেণির মানুষেরাই তৈরি করেছিল। তাদের সামরিক বাহিনী কিংবা লিপিকার হওয়ার সুযোগ খুবই কম ছিল। সে সময় একজনের চাকরি বা অবস্থান সাধারণত তার ছেলের কাছে হস্তান্তর করা হত।

মিশরীয়দের বসতবাড়ি এবং গৃহসজ্জা

প্রাচীন মিশরীয় স্থপতি এবং শিল্পীরা উচ্চ শ্রেণির লোকেদের জন্য আড়ম্বরপূর্ণ প্রাসাদ, বসতবাড়ি, গৃহসজ্জা এবং সমাধিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য দায়বদ্ধ ছিল। তারা সমাধিস্তম্ভকে কোনো ব্যক্তির চিরস্থায়ী বাড়ি হিসেবে বিবেচনা করত। এজন্য তারা জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ব্যয় করে হলেও পিরামিড নির্মাণ করত। যদিও তাদের বসতবাড়িও ছিল কারুকার্য করা ও নান্দনিক। ফারাও, তার রানি এবং পরিবার প্রাসাদে বসবাস করত। এই প্রাসাদগুলো খুবই উন্নতভাবে সজ্জিত ছিল। তাদের সব চাহিদা দাসেরা পূরণ করত। 

আরো পড়ুন: দুই হাজার বছর ধরে সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগে যেভাবে পৌঁছায় মিশর

ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপ (১৩৮৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এর প্রাসাদ ৩০ হাজার বর্গমিটারেরে চেয়ে বেশি স্থান জুড়ে ছিল। এটি মালকাতা নামে পরিচিত। বিশাল এই প্রাসাদে প্রশস্ত অ্যাপার্টমেন্ট, কনফারেন্স রুম, অডিয়েন্স রুম, রিসিভিং রুম, স্টোর রুম, সিংহাসনের কক্ষ, গ্রন্থাগার, উৎসব কক্ষ, বাগান, রান্নাঘর, হারেম এবং দেবতা আমুনের একটি মন্দির ছিল। 

লিপিকাররা সমাধিস্থলের পার্শ্ববর্তী কিংবা মন্দিরের কমপ্লেক্সগুলোতে বসবাস করত। আর স্কিপটরিয়ামে কাজ করত। আঞ্চলিক গভর্নররা তুলানামূলকভাবে লিপিকারদের থেকে ছোট বাসস্থানে বসবাস করত। তবে তাদের বসত বাড়ির আকার-আকৃতি ও সাজসজ্জা নির্ভর করত তাদের সফলতার উপর। 

প্রাচীন মিশরীয়দের এক প্রাসাদঅপরাধ এবং শাস্তি

প্রাচীন মিশরীয় সমাজেই নয় বরং মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে কিংবা চুরি করার নজির পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে প্রাচীন মিশরে অপরাধীর দ্রুত শাস্তি দেয়ার আইন ছিল। নতুন রাজ্যের সময় মিশরে অপরাধীদের ধরার বাহিনী ছিল। এ সময়ের পূর্বেও অঞ্চলিকভাবে অপরাধের ধরণ অনুযায়ী শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল যা অনেকটা আধুনিক সময়ের মতো। 

কোনো স্থানীয় অপরাধের বিচারে রাষ্ট্র জড়িত হত না। অপরাধী সমাধিস্তম্ভ ভাঙচুর কিংবা লুট কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করলে তবে তার শাস্তির বিধান রাষ্ট্র করত। বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা করত ফারাওদের মুখ্যমন্ত্রী। সে বিচার কাজের জন্য অন্যান্যদের নিয়োগ দিত। 

নতুন রাজ্যের সময়ের পূর্বেও বিভিন্ন নগরে বিচারিক হল ছিল। ছোট শহর এবং গ্রামে সাধারণত বাজারে বিচার কাজ অনুষ্ঠিত হত। স্থানীয় আদালত কেনেবাট নামে পরিচিত ছিল এবং সেখানে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের নেতারা এর বিচারক ছিল। তারা নিরপেক্ষ বিচার করত। নতুন রাজ্যের সময় কেনেবাট এবং জাজমেন্ট হলের পরিবর্তে বিচার ব্যবস্থা আমুন দেবতা কেন্দ্রিক হয়ে যায়। 

একজন যাজক আমুন দেবতার মূর্তির কাছে বিচার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল দেবতার মূর্তির মাথা কিংবা অন্য অঙ্গ নাড়িয়ে সংকেত দিতেন। তার সংকেতের বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে যাজকরা বিচারের সিদ্ধান্ত নিত। অপরাধীর দোষ প্রমাণিত হলে দ্রুত তার শাস্তির বিধান করা হত। 

অপরাধীর শাস্তি দেয়া হত নানাভাবেছোট অপরাধের জন্য সাধারণত জরিমানা করা হত। তবে ধর্ষণ, ডাকাতি, হামলা, হত্যা এবং সামধি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে অঙ্গহানি, কারাবন্দি, দাসে পরিণত, কঠোর শ্রম প্রদানে বাধ্য করা কিংবা মৃত্যুর বিধান পর্যন্ত করা হত। অঙ্গহানির শাস্তিতে নাক, কান বা হাত কেটে নেয়া হত। থিবেসের গ্রেট প্রিজনে বন্দি থাকা দণ্ডিত অপরাধীদের কারনাকে আমুনের মন্দির এবং অন্যান্য নির্মাণ কাজে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হত। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা হত। 

পরিবার এবং অবসর সময়

প্রাচীন মিশরে নারী পুরুষ উভয়ই যাজক হতে পারত। ইসিস কাল্টের প্রধান ছিলেন নারী এবং আমুনের কাল্টের প্রধান ছিলেন পুরুষ। যাজকদের অন্যান্যদের মতো পরিবার থাকত। মৃত্যুর পর তাদের সন্তানরা যাজক হত। পিতামাতার পদ পদবি সন্তানেরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেত। প্রাচীন মিশরে নারীদের প্রায় সমান অধিকার থাকায় তারা নিজের ব্যবসা, জমি এবং বাড়ির মালিক হতে পারত। বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা পুরুষের সঙ্গে চুক্তিও করতে পারত নারীরা। 

মিশরীয় নারীরানারী পুরুষের এই সমতা খ্রিষ্টীয় ২০ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে আধুনিক সময়ে লক্ষ্য করা যায়। অন্তত চারজন নারী ফারাও প্রাচীন মিশর শাসন করেছেন। তাদের মধ্যে হাতশেপসুত (১৪৭৯ থেকে ১৪৫৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এবং সপ্তম ক্লিওপেট্রা ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। বেশিরভাগ ফারাও পুরুষ হলেও রাজকীয় নারীরা রাজ্য পরিচালনা সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহায়তা করতেন।  

উচ্চ শ্রেণির নারীদের সন্তানের যত্ন নেয়ার জন্য দাস-দাসি থাকত। তবে নিম্ন শ্রেণির নারীরাই নিজেদের সন্তানের লালন পালন করত। বিয়ের ক্ষত্রে ধর্ম খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। পিতা মাতাই সন্তানের বিয়ের ব্যবস্থা করত। তখন নারীদের ১২ আর ১৫ বছরের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যেত। পুরুষরা যদিও পরিবারের কর্তা থাকতেন তবুও নারীর কম সম্মান ছিল না। 

নারীরা অবশ্য কৃষি কাজ বরত না। তারা বাগানের পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত থাকত। মিশরীয় নারী ও পুরুষরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রুচিসম্মত জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিল। সব শ্রেণির নারী পুরুষই দিনে কয়েকবার গোসল করতে অভ্যস্ত ছিল। দৈনন্দিন কাজের বাইরেও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে অবসর কাটাত মিশরীয়রা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস