নৃশংস প্রথা! সদ্য ঋতুমতী কিশোরীকে সঙ্গমে লিপ্ত হতে বাধ্য করে সমাজ

ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৪ ১৪২৭,   ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নৃশংস প্রথা! সদ্য ঋতুমতী কিশোরীকে সঙ্গমে লিপ্ত হতে বাধ্য করে সমাজ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১২ ১৩ জুলাই ২০২০  

ছবি: মালাউয়ের কিশোরীরা

ছবি: মালাউয়ের কিশোরীরা

পৃথিবীতে মানুষ জাতির ভাগ হতে হতে নানা উপজাতি তৈরি হয়েছে। একেক দেশে নানা ধরনের উপজাতির বাস। বিশেষ করে আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলোতে উপজাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। 

এসব উপজাতিদের ভাষা, আচার, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাসের রয়েছে অনেক অমিল। কারো সঙ্গেই কারো মিল পাবেন না। তাদের মধ্যে রয়েছে নানা কুসংস্কার, রয়েছে ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির নামে অমানবিক আচার ব্যবস্থা। যার অনেক আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বিশ্ববাসী জেনেছে। বারবার হয়তো শিউরে উঠেছেন এসব জেনে। 

আজ তেমনই এক জাতির কথা জানাবো। যারা যুগ যুগ ধরে অমানবিক আর নিষ্ঠুর কিছু আচার পালন করে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণ্য আর দুঃখের একটি হলো কোনো মেয়ে যুবতী হলেই তাকে পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করা হয়। তাও আবার সমাজের বেঁধে দেয়া নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে। 

এই প্রথার মাধ্যমে তাদের শুচীকরণ করা হয়শুধু যে শারীরিক সম্পর্কই করতে হবে তা নয়। এর জন্য ওই ব্যক্তিকে পারিশ্রমিকও দিতে হয় সেই মেয়ের পরিবারকে। এসব ভাবতেই গা শিউরে উঠছে নিশ্চয়! তবে একবার ভাবুন তো সেখানকার মানুষদের কথা। না চাইলেও এসব মেনে চলতে হচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে। বলছি সাউথ-ইস্ট আফ্রিকার দেশ মালাউই-এর দক্ষিণের গ্রামগুলোর কথা। 

ওই এলাকার মানুষেরা আজব এই রীতি মেনে চলে। কোনো মেয়ে ঋতুবতী হলেই তাকে সঙ্গমে লিপ্ত হতে হবে পিতার বয়সী বৃদ্ধ লোকের সঙ্গে। এখানকার সমাজের কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি আছেন। যারাই এই কাজগুলো করে থাকেন। তাদের স্থানীয় ভাষায় ডাকা হয় হায়না বলে। দিনের পর দিন সেখানকার মেয়েরা এদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। শুধু যে নিজের সম্ভ্রম হারাচ্ছে তা নয়, ক্ষতির মুখে পড়ছে আর্থিক দিক থেকেও। 

অন্যদিকে এই হায়নার দল প্রাপ্তবয়স্ক ও মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিগুলো এই প্রথার সুযোগ নিয়ে লাগাতার কুমারী মেয়েদের লাঞ্ছনা করে চলেছে, একইসঙ্গে ঘরে তুলছে পয়সাও। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই প্রথা চলে আসছে হাজারো বছর ধরে। বর্তমানে এসব হায়নার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন যৌনরোগ এমনকি এইডসও। 

হায়না এরিক আনিভামালাউইয়ের দক্ষিণের জেলা নাসানজেতে একজন কুখ্যাত হায়নার বাস। লোকটির নাম এরিক আনিভা। এলাকার কোনো মেয়ের প্রথমবার ঋতুবতী হলেই শারীরিক সম্পর্কের জন্য ভাড়া করা হয় তাকে। এমনকি কোনো নারীর স্বামী মারা গেলেও মৃতদেহ কবর দেয়ার আগে ওই বিধবা নারীকে একবার বাধ্যতামূলক শারীরিক সম্পর্ক করতে হয় আনিভার সঙ্গে। এমনকি ওই নারী যদি তখন গর্ভবতী হয় তবুও এই নৃশংস প্রথা মানতে হয়। 

এই বর্বর প্রথাকে বলা হয়, মেয়েদের ‘শুচিকরণ’। এই গোষ্ঠীর মানুষদের ধারণা, এই প্রথার মধ্য দিয়ে শুদ্ধ হয় কিশোরীরা। কোনো মেয়ের প্রথমবার ঋতুস্রাব হওয়ার পর শিশু থেকে তার যৌবনে উপনীত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে পরপর তিনদিন মেয়েটিকে হায়নার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে হয়। কোনো মেয়ে এই জঘন্য কাজে রাজি না হলে ধরে নেয়া হয়, ওই মেয়েটির পরিবার বা গোষ্ঠী বা গ্রামের জন্য মহামারী অথবা ভয়ংকর কোনো পরিণাম অপেক্ষা করছে। 

হায়নাদের সঙ্গে শারীরিক সংসর্গ নিয়ে দুই ধরনের প্রথা প্রচলিত আছে মালাউইয়ে। প্রথমবার ঋতুস্রাব হওয়ার পর কিশোরীদের সঙ্গে যে শারীরিক সংসর্গ, তাকে বলা হয় কুসাসা ফুম্বি। আর বিধবা নারীর স্বামীকে সমাধিস্থ করার আগে বিধবাকে শুদ্ধ করে তারা। বিধবার সঙ্গে যে শারীরিক সংসর্গ, তাকে বলা হয় কুলোয়া কুফা।

আনিভা ও তার স্ত্রীরামধ্য বয়স্ক হায়না আনিভা গর্ব করে বলে থাকে, আমি যাদের সঙ্গে শারীরিক সংসর্গ করেছি তাদের বেশিরভাগই স্কুলে যাওয়া মেয়ে। এর মধ্যে কোনো কোনো মেয়ের বয়স ১২ থেকে ১৩। আনিভা জানায়, সে ছাড়াও এখানে আরো ১০ জন হায়না আছে। প্রতিবার শারীরিক সম্পর্কের জন্য তাদের রেট চার থেকে সাত ডলার। 

তবে শুধু শারীরিক সম্পর্কেই শুদ্ধ হওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নয়। এটা এই প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ। এর আগে অন্য অনেক নিয়ম মানতে হয়। প্রথমে গ্রামের কিছু বয়স্কা নারী সদ্য ঋতুমতী হওয়া মেয়েদের জঙ্গলের মধ্যে একটি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের বেশ কিছুদিন ধরে যৌন বিষয়ে বিভিন্ন কিছু শেখানো হয়। এর মধ্যে একজন পুরুষকে কীভাবে যৌন আনন্দ দিতে হয় সেটাই মুখ্য বিষয় থাকে। শেষ ধাপে মেয়েদের একজন হায়নার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে দেয়া হয়। শুদ্ধ হওয়ার পুরো প্রক্রিয়ার আয়োজন করে মেয়েটিরই পরিবার। 

এই পুরো প্রক্রিয়ায় অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ রোধ করার বা রোগের সংক্রমণ এড়ানোর কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয় না। তাই ভয়ানক যৌনরোগে আক্রান্ত হয় সদ্য ঋতুমতী ও বিধবা নারীরা। আনিভা নিজেও এইডস আক্রান্ত। আর এইডসে আক্রান্ত হওয়ার পরও অবাধ ও অসুরক্ষিত শারীরিক সংসর্গ চালিয়ে গেছে সে। চল্লিশোর্ধ আনিভার রয়েছে দুজন স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তান। এ পর্যন্ত ১০৪ জন কিশোরী ও নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছেন বলে দাবি তার।  

অমানবিক প্রথার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এই কিশোরীদের২০১২ সালে এ নিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে কিছুদিনের জন্য এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর মালাউই সরকার তাদের দেশের এই ঘৃণ্য ও অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। মালাউই এর প্রেসিডেন্টের আদেশে আনিভাকে গ্রেফতার করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকি হায়নাদেরও একই হাল হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হলে প্রকাশ পায় আরো অনেক ভয়ংকর তথ্য।  

বর্তমানে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন মানবাধিকার কর্মী নাতাশা অ্যানি টনথলা। তিনিও সেখানকার বাসিন্দা এবং ভুক্তভোগী। এই ঘৃণ্য প্রথা বন্ধের উদ্দেশ্যে প্রজেক্ট ডিগনিটি নামে একটি সংগঠনও শুরু করেছেন তিনি। ১৩ বছর বয়সে প্রথম ঋতুস্রাব হওয়ার পর তাকেও একজন হায়নার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে হয়।

নাতাশা জানান, হায়নার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের সময় মেয়েদের চোখ বাঁধা থাকে। তাই ঠিক কার সঙ্গে তাদের শারীরিক সম্পর্ক হলো, তা মেয়েরা জানতে পারে না। নাতাশা বলেন আমি আশাবাদী, আমরা এই ভয়ংকর প্রথা নির্মূল করতে পারবো। কারণ আমরা কিশোরী ও বিধবা নারীদের লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছি।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস