সৌন্দর্য দেখিয়ে বিষাক্ত নখে শত্রুকে ঘায়েল করত এই নারীরা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৭ ১৪২৭,   ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সৌন্দর্য দেখিয়ে বিষাক্ত নখে শত্রুকে ঘায়েল করত এই নারীরা

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৩ ২১ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৬:১৯ ২১ এপ্রিল ২০২০

ছবি: নারী নিনজা

ছবি: নারী নিনজা

নিনজা শব্দটি শুনলেই নিশ্চয় কল্পনায় ভেসে ওঠে কালো পোশাক পরা অস্ত্রধারী মানুষের কথা! এই কালো মুখোশ পরা যোদ্ধাদের সম্পর্কে হয়তো আপনি উপন্যাস বা কমিক বইয়ে পড়েছেন। আবার নিনজাদের নিয়ে গত কয়েক দশক ধরে প্রচুর সিনেমা তৈরি হয়েছে।

যা নিনজা সম্পর্কে আমাদের একটি ভাবনার জগত তৈরি করেছে। বেশিরভাগ মানুষই নিনজা বলতে ভাবেন তলোয়ারযুক্ত কালো মুখোশযুক্ত পুরুষ। তবে জানেন কি? শুধু পুরুষরাই নয় নারী নিনজাও ছিল। অনেক নারীই তখন নিনজার প্রশিক্ষণ নিত। 

কুনোচিনিনজা, শিনোবি এবং কুনোচি 

নিনজা হলেন গুপ্তচরভিত্তিক সামিনিক কৌশল যারা নিনজুতু নামে পরিচিত। নিনজা বা পুরুষ নিনজা শিনোবি নামে পরিচিত ছিল। আর নারী নিনজাদের নাম ছিল কুনোইচি। মধ্যযুগীয় সময়ে জাপানের শিনোবি বংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই নিনজা। এই বংশের সদস্যরা নিনজুতসুর অনুশীলনকারী ছিলেন। এরা গুপ্তচর এবং ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করত।

নারীরাও সমানতালে পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধ, ছদ্মবেশ এবং চৌর্যবৃত্তির বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হত। যদিও তাদের মিশন এবং কাজের ধরণ এবং উপায় পুরুষ শেনোবি থেকে কিছুটা পৃথক ছিল। গুপ্তচর এবং ঘাতক হিসেবে শিনোবিদের বেশিরভাগই দায়িত্ব পালনের সময় প্রাণ হারিয়েছেন। তারপরও তারা এ কাজ করে যেতেন। মধ্যযুগীয় সময়ে জাপানের সমাজে ছিল পুরুষদের আধিপত্য। তখন নারীরা সাধারণত স্ত্রী, উপপত্নী বা দাসীর মতো নিরীহ ভূমিকা পালন করত। 

সব বিষয়েই পারদর্শিতা অর্জন করতে হত তাদেরতবে কয়েকজন নারী পুরুষদের পাশাপাশি গুপ্তচর এবং ঘাতক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। দেখা গেল নারীরা পুরুষদের তুলনায় ভালো কাজ করছে। তারা পুরুষদের চেয়ে বেশি কৌশল অবলম্বন করতে পারে। এছাড়াও শত্রুদের অঞ্চলে খুব সহজে অনুপ্রবেশ করতে পারত। তাদের ধূর্ততা এবং বুদ্ধিমত্তা ছিল বেশ ভয়াবহ। এরপর থেকে নিনজাতে নারীদের চাহিদা বাড়তে থাকে। ধারণা করা হয়, ১৬ শতাব্দী থেকে নারী নিনজাদের প্রচলন শুরু হয়।  

নারী নিনজা যোদ্ধাদের অস্তিত্বের কথা ১৭ শতকের একটি বই বানসেনশুকাইতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নিনজা প্রশিক্ষণের বিষয়ে জ্ঞান এবং গোপনীয়তার বিষয়ে অনেক তথ্য দেয়া আছে। ১৬৭৬ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে লেখক অ্যান্টনি কিউমিনস নারী নিনজাদের কাজ করার কৌশল প্রকাশ করেছিলেন। কুনোইচি যেখানে কাজ করবে প্রথমে সেই গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে। তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। সে শত্রু অঞ্চলে নির্দ্বিধায় চলাফেরা করত এবং তাদের লক্ষ্য পূরণে পরিকল্পনা মতো কাজ শেষ করত। নিনজাদের মার্শালার্টের পাশাপাশি অভিনয়েও বেশ দক্ষ হতে হত। 

বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ নিত তারামধ্যযুগে জাপান সামুরাই শ্রেণির পুরুষদের দ্বারা শাসিত ছিল। সামুরাই সু-রক্ষিত জীবন যাপন করত। এছাড়াও তারা খুব কমই অচেনা লোককে বিশ্বাস করত। তবে নারীদের প্রতি তাদের আলাদা দুর্বলতা ছিল। এর কারণ নারীদের সৌন্দর্য এবং সমাজে তাদের নিরীহ ভূমিকা। কারণ সেসময় নারীদের পরিচয় স্ত্রী, উপপত্নী কিংবা দাসী। এর বাইরে কিছু ছিল না। 

তাই কুনোইচি প্রায়ই দাসী বা উপপত্নীর ছদ্মবেশে সামুরাইদের দূর্গে প্রবেশ করত। আবার অনেক সময় তারা মন্দিরের পুরোহিত, বাবুর্চি, প্রহরী বিভিন্ন চরিত্রে ছদ্মবেশ ধারণ করত। এসব কাজে অনেক সময় পুরুষের চেয়ে নারীরাই খুব সহজে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারত। এরপর তথ্য সংগ্রহ করা এবং হত্যা করা অর্থাৎ তাদের পরিকল্পনা মতো কাজ শেষ করে ফিরে আসত। আর এজন্যই নারী নিনজার প্রসার ঘটতে থাকে। 

অস্ত্র চালাতে পারদর্শী নিনজা নারীরাজাপানের ইতিহাসে কুনোচি বা নারী নিনজা

নারী নিনজা কোনো পৌরাণিক কাহিনী নয়। এটি প্রাচীন যুগেও বিদ্যমান ছিল। এডোর সময়কালে অর্থাৎ ১৬০৩ থেকে ১৮৬৮ এর মধ্যবর্তী সময়ও তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নারী নিনজারা খুব কমই মারামারিতে অংশ নিত। তারা বেশিরভাগ নজরদারি বা গুপ্ত হত্যাকাণ্ড চালাত। এদের সাধারণ দায়িত্ব ছিল শত্রুদের দাসীদের মতো থাকা। আর তাদের অন্যান্য দাসী বা চাকরদের সঙ্গে নৈমিত্তিক কথোপকথনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। বেশিরভাগ কুনোইচি শত্রুদের উপপত্নী হিসেবে থাকত। সংক্ষেপে বলতে গেলে কুনোইচিদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল যৌনতা। 

নারী নিনজাদের অস্ত্র 

নারী পুরুষ উভয় লিঙ্গদের জন্য শিনোবি প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়। তবে মধ্যযুগীয় জাপানে একজন নারী নিনজার তার অন্যান্য দক্ষতার পাশাপাশি সৌন্দর্যের জন্য বেশি মূল্যায়ন করা হত। একজন কুনোইচির সৌন্দর্য ছিল তার অন্যতম মূল্যবান এবং মারাত্মক অস্ত্র। তবে এর অর্থ এই নয় যে নারী নিনজা কেবল তার চেহারার উপরই নির্ভর করে। সৌন্দর্যের পাশাপাশি তাকে হতে হবে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ নিনজা। 

বিষাক্ত নখের ন্যায় অস্ত্রএকটি মিশন শেষ করতে অনেক সময় বছরের পর বছর সময় লেগে যেত। তাই অন্যান্য দক্ষতার পাশাপাশি একজন নিনজাকে অনেক ধৈর্যশীল হতে হত। নিনজার প্রধান অস্ত্র ছিল তলোয়ার। তবে শত্রুদের এলাকায় তলোয়ার লুকিয়ে রাখা সম্ভব হত না। তাই ছোট আকারের বিভিন্ন সরু ছুরি ব্যবহার করত। এছাড়াও তাদের আরেকটি জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র হলো বিষযুক্ত নখ। চামড়ার সঙ্গে ধাতব ফলা লাগিয়ে বানানো হত এই নখগুলো। এই অস্ত্রটির নাম ছিল নেকো। 

অস্ত্রটি বাঘের নখের মতো দৈর্ঘ্য। যা এক থেকে তিন ইঞ্চি পর্যন্ত প্রসারিত এবং মানুষের মাংস ছিঁড়ে দেয়ার মতো ধারালো। অস্ত্রটিকে শক্তিশালী করতে এবং মৃত্যু যাতে তাড়াতাড়ি ঘটে এজন্য নেকোতে বিষ লাগিয়ে নেয়া হত। এছাড়াও হেয়ারপিনস, পিন, টেসন বা গোপন ব্লেডযুক্ত পাখা রাখত। যেগুলো ভাঁজ করা যায় এমন অস্ত্র তারা সঙ্গে রাখত।   

বিখ্যাত কুনোইচিমোচিজুকি চিয়োম, জাপানের সর্বাধিক বিখ্যাত কুনোইচি 

তার সম্পর্কে ইতিহাসে খুব কমই তথ্য পাওয়া যায়। মোচিজুকি চিয়োম নামে একজন কুনোইচিকে ইতিহাসে পাওয়া গিয়েছিল। যিনি জাপানের সর্বাধিক বিখ্যাত কুনোইচির মধ্যে একজন। মোচিজুকি চিয়োম ষোড়শ শতাব্দীর একজন বিত্তশালী সামুরাই যোদ্ধার স্ত্রী ছিলেন। তবে গুজবও ছিল যে তিনি মূলত কোগা নিনজা বংশের সদস্য। তিনি নারী গুপ্তচরদের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছিলেন। যেখানে প্রায় ৩০০ নারী ছিলেন। তারা বেশিরভাগই ছিলেন এতিম, যুদ্ধাহত এবং পতিতা। এ ধরনের অবহেলিত নারীদের নিয়েই তিনি তৈরি করেছিলেন এক গুপ্তচর বাহিনী।     

শিনশু অঞ্চলের নাজু গ্রামের স্থানীয়দের দৃষ্টিতে আভিজাত্য নারী কেবল একটি অনাথ আশ্রম চালাচ্ছিলেন। তবে এর আড়ালে তিনি নারীদের গুপ্তচরবৃত্তি প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন সে তথ্য গোপনই ছিল। নারী নিনজার এই গোষ্ঠীগুলো তাদের দেহ এবং জীবনকে বাজি রেখে কাজ করেছে চিয়োমের জন্য। তারা  চিয়োমের প্রয়াত স্বামী টেকেদা শিংগেনের চাচার নেতৃত্বে টেদা বংশের সেবা করেছে। ১৫৭৩ সালে শিংগেনের মৃত্যুর পরে চিয়োম এবং তার গোয়েন্দারা জাপান থেকে হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেল।

টেকদা বংশের সেবা দেয়ার পর গোপন এ গোষ্ঠীর কী হয়েছিল তা কেউ জানে না। কেনই বা তারা হঠাৎ করে সবার আড়ালে চলে গেল তার কারণও অজ্ঞাত। একসময় জাপানি নারীরা স্ত্রী, উপপত্নী এবং দাসীর পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে কুনোইচি হয়েছিল। শিনোবিতে তাদের পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে তাদের গুরুত্বও কিন্তু কম ছিল না। পুরুষদের পাশাপাশি এই মারাত্মক এবং সাহসী কাজের জন্য তারা অত্যন্ত সম্মানিত হয়েছিলেন। তারা জাপানি শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। 

সূত্র: বিঅয়ান্টসাইন্স, ক্রিমিলানইলিমেন্ট, অ্যানসাইন্টঅরিজিন, মিস্ট্রিট্রিউবন

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস