শেখ কামাল, আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের জাগ্রত এক সত্তা 
15-august

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ আগস্ট ২০২২,   ৩ ভাদ্র ১৪২৯,   ১৯ মুহররম ১৪৪৪

Beximco LPG Gas
15-august

শেখ কামাল, আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের জাগ্রত এক সত্তা 

আরিফুল হক বিজয় ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৩ ৫ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১৬:২১ ৫ আগস্ট ২০২২

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু তখন দেশ পুননির্মাণে ব্যস্ত। দীর্ঘ ৯ মাসের তাণ্ডবলীলায় ক্ষয়ে যাওয়া দেশের মেরুদণ্ডটা মেরামতে কাজ করছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়ায় ব্যস্ত, একজন তখন মনোনিবেশ করলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গন পুনর্গঠনে। একটা দেশের ক্রীড়াসত্তাকে জাগ্রত করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। 

তিনি শেখ কামাল, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র। যার হাত ধরে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন রূপ নিয়েছিল আধুনিকতায়, এসেছে সাফল্য। 

শৈশব থেকেই নিরহংকার ও বন্ধুবৎসল ছিলেন কামাল। খেলাধুলার প্রতি তার ছিল অগাধ টান। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলায় তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। স্কুল জীবন থেকেই দেখা মেলে শেখ কামালের ক্রীড়াপ্রেম। 

শাহীন স্কুলে মাধ্যমিকে পড়ার সময়ই তিনি ক্রিকেট, ফুটবল ও বাস্কেটবলে নিজের দক্ষতার জানান দেন। প্যাশনকে বলা হয় সংগঠক হওয়ার পূর্বশর্ত। খেলার প্রতি এই প্যাশনই শেখ কামালকে করেছে দক্ষ সংগঠক।

ক্রিকেটে তিনি ছিলেন ফাস্ট বোলার। দীর্ঘদেহী শেখ কামাল নিখুঁত লাইন-লেন্থ আর প্রচণ্ড গতিতে সহজেই প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের কাবু করে ফেলতেন। অবিভক্ত পাকিস্তানের উদীয়মান পেসার হিসেবে তখন খুব নামডাক ছিল তার। 

দীর্ঘদিন আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তার ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠলো বাস্কেটবল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাস্কেটবল দলের নেতৃত্বেও ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী বঙ্গবন্ধুর এই পুত্রটি। ফুটবলেও ছিল তার নামডাক।

সব পরিচয় ছাপিয়ে শেখ কামালের প্রথম পরিচয়টা হতে পারতো তৎকালীন পাকিস্তানের একজন তুখোড় ফাস্ট বোলার। তবে সেটা হয়নি স্রেফ বাঙালি এবং বঙ্গবন্ধুর পুত্র হবার কারণে। যেমনটা বঞ্চিত হয়েছিলেন জুয়েল, মুশতাক, রকিবুলের মতো খেলোয়াড়রা। শুধু খেলাধুলাই নয়, পড়াশোনা, সঙ্গীতচর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবার চেষ্টা - সবখানেই ছিল শেখ কামালের প্রাণবন্ত উপস্থিতি।

ক্রীড়াঙ্গনকে একপাশে রাখলে শেখ কামালের আরেকটা পরিচয় বেরিয়ে আসে, সেটা হলো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। দেশের সংস্কৃতির জন্যও তার লড়াই হয়ে থাকবে চির ভাস্বর। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের সামরিক সরকার রবীন্দ্র সংগীতের উপর নিষেধাজ্ঞার দেয়াল টেনে দিলো। ক্ষেপে গেলেন শেখ কামাল। রবীন্দ্র সঙ্গীতই হয়ে উঠল তাঁর প্রতিবাদের ভাষা। তিনি ছিলেন ছায়ানটের ছাত্র, মঞ্চ নাটকও করে বেড়াতেন। তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা হয় আজকের ঢাকা থিয়েটার। 

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন যখন গ্রীষ্মের দাবদহে ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া জমিনের মতো খাঁ খাঁ করছে, শেখ কামাল ছড়িয়ে দিলেন একরাশ ভারি বর্ষন। তাতে জন্ম নিলো দেশের ইতিহাসে অমর ক্লাব 'আবাহনী ক্রীড়া চক্র'। এই ক্লাবের মাধ্যমে ক্রিকেট, ফুটবল ও হকিকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।

শেখ কামালের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশও একদিন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সে লক্ষ্য নিয়ে এগোতে গিয়ে তার সূচনাটা ছিলো চমক জাগানিয়া। শুরুটা করেছিলেন ফুটবল দিয়ে। দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালে আবাহনীর জন্য নিয়ে এসেছিলেন নামি বিদেশি কোচ বিল হার্টকে। তখন ক্লাব তো দূরের কথা, এই উপমহাদেশে কোনো জাতীয় দলেরই বিদেশি কোচ ছিল না।

এই কোচের অধীনেই ১৯৭৪ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘আই এফ এ’ শিল্ড টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়ে ভারতীয়দের চমকে দেয় আবাহনী। চমক বাকি ছিলো আরও অনেক। যার জন্য জীবনসঙ্গীনি বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও ক্রীড়াঙ্গনের একজনকেই পছন্দ করেছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী এই মানুষটি।

একটি প্রবাদ আছে, প্রত্যেক পুরুষের স্বপ্ন পূরণের পেছনে একজন নারীর হাত বিদ্যমান। ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে নিজের সুদূর পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও শেখ কামাল জীবনসঙ্গীনি হিসেবে বেছে নিয়েছেন একজন ক্রীড়াপ্রেমী নারীকে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু অ্যাথলেট সুলতানা কামাল খুকু। ১৯৭৫ সালে খুকুর সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। কিন্তু, একসাথে কাটাতে পারলেন মাত্র কয়েক মাস।

১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট এদেশের ইতিহাসে যে নির্মম কালো রাত নেমে এসেছিলো। সে রাত কেড়ে নিয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বৈপ্লবিক সূচনা এনে দেওয়া মানুষটিকেও। সে রাতে ঘাতকদের বুলেটে প্রথম শহিদের নাম শেখ কামাল। 

১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ কামালের জন্ম। বেঁচে ছিলেন মাত্র ২৬ বছর। দুই যুগেরও কিছু বেশি সময়ের জীবনে মাত্র কয়েক বছরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে যে বৈপ্লবিক কীর্তি কামাল গড়ে গেছেন, তা আজও ইতিহাসের পাতায় হয়ে আছে চির অমর। আজ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে লাল সবুজের যে পদচারণা, তার পেছনে কালো ফ্রেমের সদাহাস্য ঐ তরুণটি জ্বলজ্বল করবেন চিরকাল।

বাংলাদেশে ক্রীড়াঙ্গনে নব বিপ্লবের সূচনা এনে দেয়া শেখ কামালকে আধুনিকায়নের পথিকৃৎ হিসেবে আজীবন স্মরণ করবে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। 

যতকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে ধানমন্ডি পাড়ার টিনের চালের 'আবাহনী ক্রীড়া চক্র'।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল। ৫ আগস্ট,  দেশের আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের এই রুপকার আজ ৭৩তম জন্মবার্ষিকী। এই শুভ দিনে আমাদের পক্ষ তাকে জানাই প্রাণ ঢালা শুভেচ্ছা ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএল/আরআই

English HighlightsREAD MORE »