টি-শার্টে লেখা তিন শব্দের সূত্রে বেরিয়ে এলো হত্যার রহস্য

ঢাকা, রোববার   ২৪ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৯ ১৪২৮,   ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

টি-শার্টে লেখা তিন শব্দের সূত্রে বেরিয়ে এলো হত্যার রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৫৩ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সিগারেট কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করায় মোটা অঙ্কের টাকা সঙ্গে থাকতো মো. জুয়েল রানার (২৯)। তার পরিচিত দুধ বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি মো. মিরাজের হঠাৎ টাকার বিশেষ প্রয়োজন হয়। তিনি জানতেন জুয়েলের কাছে নগদ টাকা আছে। সেই টাকা হাতিয়ে নিতেই মিরাজ দুই সহযোগীকে নিয়ে জুয়েলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি (মিরাজ) মো. রাসেল (১৯) ও আরেকজনকে (অপ্রাপ্তবয়স্ক) সঙ্গে নেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর তারা প্রথমে গাবতলীতে একটি কাভার্ডভ্যানে উঠে তিন দফায় ইয়াবা সেবন করেন। এরপর রাত ১০টার দিকে জুয়েলকে ডেকে কাভার্ডভ্যানে উঠিয়ে ইয়াবা সেবন করান। 

এক পর্যায়ে মুখ চেপে ও রশি দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টায় তারা শ্বাসরোধে জুয়েলের হত্যা নিশ্চিত করেন। পরে তারা সেই কাভার্ডভ্যানেই আগে থেকে কেনা ড্রামে জুয়েলের লাশ রেখে গাবতলী থেকে মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকেন। এ সময়ে দুধের ডেলিভারিও করেন মিরাজ। রাত সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর লাভ রোডের পাশে রাস্তায় জুয়েলের লাশভর্তি ড্রাম ফেলে পালিয়ে যান।

স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে রাত আনুমানিক ২টায় ঘটনাস্থলে যায় মিরপুর মডেল থানা পুলিশ। উপস্থিত হন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য তা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। পরে নিহতের গায়ে থাকা ‘সাফল্যের পথে একসাথে’ লেখা টি-শার্টের সূত্র ধরে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত ও খুনিদের শনাক্ত করে পুলিশ। তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জড়িত তিন যুবককে গ্রেফতার করে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ।

রোববার বিকেল পাঁচটার দিকে ডিসি মিরপুর বিভাগের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপ-কমিশনার (ডিসি) আ স ম মাহতাব উদ্দিন বলেন, লাশ উদ্ধারের পর আমরা নিহতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও নিহতের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। তবে নিহতের গায়ে থাকা গেঞ্জিতে ‘সাফল্যের পথে একসাথে’ লেখা দেখে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, ওই স্লোগান সম্বলিত টি-শার্টটি একটি টোবাকো কোম্পানির। ওই কোম্পানির লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ও নিহতের ছবি দেখিয়ে জানা যায়, নিহতের নাম মো. জুয়েল রানা (২৯)। তার বাড়ি ভোলা সদরে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছবি দেখালে তারাও পরিচয় নিশ্চিত করেন।

নিহতের স্ত্রী মোসা. সালমা আক্তার (২২) পুলিশের খবরে ঢাকা আসেন। পরদিন তিনি মিরপুর মডেল থানায় বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলাটির তদন্ত করছিলেন মিরপুর মডেল থানার এসআই (নিরস্ত্র) মো. খোকন মিয়া। তদন্তভার নিয়ে তিনি ঘটনাস্থলের আশেপাশে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেন, জড়িতদের নাম-পরিচয় শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চালান। 

এক পর্যায়ে শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে দারুস সালাম থানার গৈদারটেক এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ঘটনায় জড়িত ও তদন্তে শনাক্ত মো. মিরাজকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার মিরাজ রাজবাড়ীর কালুখালীর মো. রওশন মন্ডলের ছেলে। অভিযানকালে তার কাছ থেকে নিহত জুয়েল রানার কাছ থেকে নেয়া কোম্পানির সিগারেট বিক্রির নগদ ৩৮ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

উপ-কমিশনার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মিরাজের তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে মিরপুর সেকশন-২ এর এফ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ১৪  নম্বর বাসা থেকে হত্যায় ব্যবহৃত সিলভার রংয়ের কাভার্ডভ্যান, জুয়েল রানার ছবি সম্বলিত সিগারেট কোম্পানির আইডি কার্ড, চার কার্টুন সিগারেট উদ্ধার করা হয়। পরে পল্লবী থানার সেকশন-১১ কাঁচা বাজার এলাকা থেকে হত্যার ঘটনায় জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে সিগারেট বিক্রির নগদ ৭ হাজার টাকা ও ভিভো ব্র্যান্ডের অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল উদ্ধার করা হয়।

তাদের দুজনের তথ্যমতে একই এলাকা থেকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মো. রাসেলকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বরিশাল হিজলার কায়েসমা (রাঢ়ী বাড়ী) এলাকার আব্দুল সত্তারের ছেলে।

জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে মিরপুর বিভাগ পুলিশের উপ-কমিশনার মাহতাব উদ্দিন বলেন, টাকার বিশেষ প্রয়োজন ছিল মিরাজের। তিনি টাকা সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে রাসেলকে জানান। রাসেলের পরামর্শ ও পরিকল্পনায় জুয়েল মিয়াকে হত্যার ছক কষেন তারা।

শুধু টাকার জন্যেই জুয়েল হত্যার শিকার, নাকি মাদক নিয়ে তাদের দ্বন্দ্ব ছিল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিগারেট কোম্পানিতে বিক্রয় প্রতিনিধির কাজ করায় জুয়েলের কাছে বিক্রয় বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা মজুদ থাকদো, এটা জানতেন মিরাজ। তিনজন মিলে ওই টাকা হাতিয়ে নিতেই হত্যার পরিকল্পনা করেন।

রাসেলের পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা প্রথমে ড্রাম কেনেন। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে গাবতলীতে জুয়েলকে আসতে বলেন। জুয়েল ঘটনাস্থলে এলে তিনজন মিলে ইয়াবা সেবন করেন। তিন দফা ইয়াবা সেবনের এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় রাসেলও। তিনজন মিলে কাভার্ডভ্যানের ভেতরে বসে পেছন থেকে রশি দিয়ে জুয়েল রানাকে গলাসহ নাক-মুখ পেঁচিয়ে ফেলে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মিরাজ পা-মুখ চেপে ও শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে নিহত জুয়েলের কাছে থাকা সিগারেট কোম্পানির মালামাল বিক্রির ৭৬ হাজার টাকা ভাগ করে নেন তারা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ