ডা. সাবিরাকে ব্রুটালি হত্যা: ধুরন্ধর ঠাণ্ডা মাথার খুনিকে খুঁজছে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৫ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ২১ ১৪২৮,   ২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

গ্রিন লাইফ হাসপাতালের চিকিৎসক

ডা. সাবিরাকে ব্রুটালি হত্যা: ধুরন্ধর ঠাণ্ডা মাথার খুনিকে খুঁজছে পুলিশ, মিলছে না ‘ক্লু’

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৪ ১০ জুন ২০২১   আপডেট: ১৪:০৮ ১০ জুন ২০২১

ডা. সাবিরা লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, ইনসেটে ডা. সাবিরা - সংগৃহীত

ডা. সাবিরা লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, ইনসেটে ডা. সাবিরা - সংগৃহীত

রাজধানীর কলাবাগানে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাবিরা রহমান লিপি (৪৬) হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর থেকে সন্দেহভাজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের স্বজনদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো ক্লু মিলছে না। 

ঘটনার আলামত বিশ্লেষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ‘খুনি অত্যন্ত ধুরন্ধর এবং সে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে পালিয়েছে।’ 

এ ঘটনায় থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব, পিবিআইসহ সবাই ‘ক্লু’ উদ্ধারে কাজ করছে। সবার ভাষ্য একটাই, হত্যাকাণ্ডটি ক্লু লেস ও জটিল।

কলাবাগানের ১ম লেনের ৫০/১ নম্বর বাড়ি - সংগৃহীত

সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তারা বলছেন, ডা. সাবিরার কোনো পরকীয়া প্রেমিক আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সন্দেহ রয়েছে সহভাড়াটিয়া কানিজ সুবর্ণা ও নুরজাহানের প্রতিও। তবে নুরজাহান ঈদের দিন থেকে গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করায় তার দিকে সন্দেহটা কম। এরপরও নুরজাহানকে ডেকে নিয়ে নানান বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত রোববার (৬ জুন) ও সোমবার (৭ জুন) নুরজাহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই।

তবে কলাবাগানের ১ম লেনের ৫০/১ নম্বর বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি ডা. লিপির বাসায় যাতায়াত করতেন। চেহারায় শ্যাম বর্ণের ও শরীরের গঠন হালকা পাতলা ওই ব্যক্তিকে এখনো চিহ্নিত করতে পারেনি। মূলত ঘাতক নিহতের পূর্বপরিচিত -এটা নিশ্চিত পুলিশ। ফ্ল্যাটে প্রবেশ দরজার সামনে যে দুটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে তা ঘাতকের কি না-তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কলাবাগানের ১ম লেনের ৫০/১ নম্বর বাড়ি - সংগৃহীত

কলাবাগান থানার ওসি পরিতোষ চন্দ্র জানান, আমরা মামলার ক্লু উদঘাটনের চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত খুনের মোটিভ জানা যায়নি। যাদের সন্দেহ হচ্ছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ভিকটিমের মামাতো ভাই ও মামলার বাদী রেজাউল হাসান মজুমদার জুয়েল জানান, মামলার তদন্তকারীদের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। তারা খুনিকে চিহ্নিত করে আইন আওতায় আনবে বলে আশা করি।

ঘটনাস্থলে যা হয়েছিল
নিউমার্কেট যেতে কলাবাগান সড়কের হাতের বাম পাশে ফার্স্ট লেনের গলি। মূল সড়ক থেকে কয়েকশ গজ গেলেই হাতের বাম পাশে ফার্স্ট লেনের ৫০/১ ভবন। সাততলা ভবনটির তৃতীয় তলায় তিন কক্ষের একটি ফ্ল্যাটের প্রথম কক্ষটিতে থাকতেন নিহত চিকিৎসক ডা. সাবিরা। দ্বিতীয় কক্ষে থাকতেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী। আর তৃতীয় কক্ষে থাকতেন আরও একজন শিক্ষার্থী, তবে তিনি মডেল হিসেবে পরিচিত বলে জানান স্থানীয়রা। অর্থাৎ ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে ডা. সাবিরা একাই থাকতেন এবং বাকি দুইটি কক্ষ সাবলেট হিসেবে বাড়ির মালিকের অজান্তেই ভাড়া দিয়েছিলেন তিনি।

ওই ফ্ল্যাটে সাবলেট হিসেবে থাকা একজন ঈদের আগে বাড়ি গিয়ে ফেরেননি। অপরজন ভোরে বাসা থেকে বের হন শরীর চর্চা করতে। তার নাম কানিজ সুবর্ণা। তিনি সকাল পৌনে ১০টায় ঘরে ফিরে দেখেন চিকিৎসকের কক্ষ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এই তরুণী একজন মডেল। স্নাতক পাস করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এই কক্ষেই তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের পর বিছানায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় - সংগৃহীত

ওই ভবনের নিচতলায় দারোয়ান থাকেন। তার নাম রমজান আলী। সকালে কেউ বাসায় ঢুকেছেন, এমনটি দেখেননি বলে দাবি করেছেন তিনি। তাকেও নিয়ে গেছে ডিবি। সেই মডেলের এক ছেলেবন্ধু যার নাম মাহাথির মোহাম্মদ স্পন্দন তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ।

ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাবিরা তার কর্মস্থল গ্রিন লাইফ হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল। সেখান থেকে কয়েকজনের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল বলে জানিয়েছেন একজন স্বজন। তবে কাদের সঙ্গে কোথায় যাওয়ার কথা ছিল, তা এখনো জানা যায়নি। সাবিরা আট থেকে নয় বছর ধরে গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চাকরি করছেন। বছর পাঁচেক আগে তার চাকরি স্থায়ী হয়। কাজ করতেন রেডিওলজি বিভাগে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পড়া শেষ করে ঢাকায় এসে কয়েকটি হাসপাতালে চাকরির পর তিনি যোগ দেন গ্রিন লাইফ হাসপাতালে।

যেভাবে ঘটনা জানতে পারে পুলিশ
কলাবাগান থানার ওসি পরিতোষ চন্দ্র পাল বলেন, ডা. সাবিরার পাশের রুমে একজন মডেল থাকতেন। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মেয়েটি এই বাসায় সাবলেটে ওঠেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জেনেছি, সেই মডেল সকাল ৬টা ১০ মিনিটের দিকে ধানমন্ডি লেকে শরীর চর্চা করতে যান। সকাল আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটে বাসার প্রধান গেট খুলে ভেতরে ঢুকে ধোঁয়া ও পোড়া গন্ধ পান। তিনি তখন বাসার দারোয়ানকে জানান। এরপরে ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা আরেক নারীকে জানান।

ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ চলছে - সংগৃহীত

তিনি বলেন, লোক জানাজানি হলে বাসার পাশের এক মিস্ত্রিকে এনে রুমের দরজার লক খুলে ভেতরে গিয়ে তারা দেখেন ধোঁয়াচ্ছন্ন। যারা আসছিল তখন তারা আগুন মনে করে পানি মারে। এরপরে তারা ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দেয় বলে জানায়। এরপর পুলিশ খবর পায়। প্রথমে বাসায় যায় কলাবাগান থানা-পুলিশ। পরে তারা খবর দেয় সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটকে। এরপরে ঘটনাস্থলে আসে ডিবি, র‌্যাব, তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ের সদস্যরা।

ঘটনাপ্রবাহ
ওইদিন প্রথমে আগুনের খবরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বাসায় আগুনের ধোঁয়া দেখতে পান। নিহত চিকিৎসকের শরীরের কিছু অংশ দগ্ধ ছিল বলে জানান তারা। মরদেহ উদ্ধারের পর পিঠে দুটি ও গলায় একটি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পায় পুলিশ।

খবর পেয়ে সোমবার ঘটনাস্থলে যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট। তারা মরদেহ থেকে আলামত সংগ্রহ করে। ক্রাইম সিন ইউনিট জানায়, সাবিরাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা (ব্রুটালি কিলড) করা হয়েছে। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের পর বিছানায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। দাহ্য পদার্থ না থাকায় আগুন তেমন ছড়ায়নি। তবে সাবিরার শরীরের কিছু অংশ এতে দগ্ধ হয়।

মধ্যরাতে কোনো এক সময় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় - সংগৃহীত

সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের ইন্সপেক্টর শেখ রাসেল কবির বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাবিরার শ্বাসনালী কেটে ফেলা হয়েছে। তার দেহে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও পোড়ার ক্ষত আছে। আমরা আপাতত নিশ্চিত হয়েছি- এটি হত্যাকাণ্ড। আলামত দেখে মনে হয়েছে, মধ্যরাতে কোনো এক সময় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে।

নিহত চিকিৎসক সাবিরার এক ছেলে ও এক মেয়ে আছেন। দুই ভাই ও এক বোনের মাঝে সাবিরা ছিলেন সবার বড়। তার বাড়ি কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানার ভরসার বাজার এলাকায়।

ফরেনসিক বিভাগ যা বলছে
পহেলা জুন দুপুর আড়াইটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে ডা. কাজী সাবিরা রহমান লিপির মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফরেনসিক বিভাগের একটি সূত্র জানায়, তার গলায় ও শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা দেখে মনে হয়েছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার। তবে ধর্ষণের আলামত আছে কি-না সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে কিছু বোঝা যায়নি বলে জানায় ওই সূত্র। ধর্ষণ হয়েছে কি-না জানার জন্য ডিএনএ পরীক্ষার আলামত সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ - ফাইল ছবি

ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ মামাত ভাই রেজাউল হাসান মজুমদার জুয়েলের কাছে বিকেল সাড়ে ৩টায় হস্তান্তর করা হয়। আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সাবলেটের মডেল নারীসহ ডিবি হেফাজতে ৪ জন
সাবিরার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে হেফাজতে নিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ওই ফ্ল্যাটের সাবলেটে থাকা মডেল কানিজ সুবর্ণা, তার ছেলেবন্ধু মাহাথির মোহাম্মদ স্পন্দন, বাসার দারোয়ান রমজান আলী ও বাসার কাজের বুয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে পুলিশ।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আজিমুল হক বলেন, ‘সবাই ভেবেছিলেন ডা. সাবিরা আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। পরে ডিবি পুলিশ এসে তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পায়। আমরা তদন্ত করছি। চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত রহস্য উদঘাটন করতে পারব।’

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ