নকল স্ত্রীকে মারল চিকিৎসক স্বামী, মরদেহের পাশের চিরকুটেই মিলল রহস্য

ঢাকা, রোববার   ১৮ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৬ ১৪২৮,   ০৫ রমজান ১৪৪২

নকল স্ত্রীকে মারল চিকিৎসক স্বামী, মরদেহের পাশের চিরকুটেই মিলল রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:২৪ ৮ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৭:৪৬ ৯ মার্চ ২০২১

চিকিৎসক ইমরান ও চিকিৎসক সোমার ফাইল ফটো

চিকিৎসক ইমরান ও চিকিৎসক সোমার ফাইল ফটো

সত্য হাজারো চাপায় পড়ে থাকলেও উপযুক্ত মুহূর্তে প্রকাশ্যে চলে আসে। তেমনি একটি গোপন সত্য লুকাতে নকল শিক্ষানবিশ স্ত্রী সিরাজুম মনিরা সোমাকে মেরে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছিলেন অপর শিক্ষানবিশ চিকিৎসক এস এম রাকিবুল আজাদ ইমরান। কিন্তু চিরকুটের সূত্র ধরে হত্যার মূল রহস্য ভেদ করে আসল সত্য বের করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরই মধ্যে হত্যার বিষয়ে রোববার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত ইমরান।

গত ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর খিলক্ষেতের আমতলীর অন্বেষা গলির ১৯২/৬-এ নম্বর বাসার চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে সোমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন মরদেহের শয্যার পাশে ছিল একটি চিরকুট। তাতে লেখা- ‘বিদায় ডাক্তার সাহেব। আমি হাল ছেড়ে দিচ্ছি।’ সেখানে ঘুমের ওষুধের খালি পাতাও পাওয়া যায়।

পুলিশ সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়েই ওই ফ্ল্যাটে সোমাকে নিয়ে থাকতে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ইমরান। ঘটনার দিন সকালে ইমরান বাড়ির মালিকের কাছে গিয়ে দাবি করেন, তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। রাতে দুইজনের মধ্যে ঝগড়া নিয়ে অভিমান করে আত্মহননের পথ বেছে নেন সোমা। 'আত্মহত্যার চিরকুট', ঘরের দরজা ভেঙে ঢোকার আলামত ও ইমরানের ভাষ্য দেখে এটি সত্যিই আত্মহত্যা বলে প্রথমে সবাই মেনে নেয়। 

কিন্তু ঘটনাস্থলের আলামতের সঙ্গে অন্তত চারটি জায়গায় ইমরানের বক্তব্যের অমিল পাওয়ায় মামলাটির তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে স্থানান্তর করা হয়। তাদের তদন্তে উঠে আসে, কেন কী কারণে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে সোমাকে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজান ইমরান।

পুলিশ সূত্র বলছে,  চীনের নানচাং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পাস করেছেন সোমা ও ইমরান। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায় তাদের পরিচয় হয়। ২০১৭ সালে দেশে ফিরে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন তারা। সোমা প্রথমে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। তবে কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। ওই সময় প্রায়ই সোমার সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে আসা-যাওয়া করতেন ইমরান। সোমাকে মানসিক শক্তি জোগাতে গিয়ে ইমরান ও সোমার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এরপর বিএমডিসি পরীক্ষায় পাস করার পর ২০২০ সালের মার্চ থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ শুরু করেন তারা। তখন থেকেই স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে খিলক্ষেতে বাসা ভাড়া নেন।

তদন্ত সূত্র বলছে, তারা দুইজন অবিবাহিত ছিলেন। কিন্তু একই বাসায় স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতেন। এর মধ্যে অন্য কারো সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক রয়েছে বলে দুইজন দুইজনকেই সন্দেহ করতেন। গত ২৩ জানুয়ারি একটি পরীক্ষা দেয়া ও সোমার যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়। 

জিজ্ঞাসাবাদের সময় ইমরান জানায়, উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ায় সোমাকে ইমরান বলতেন, লন্ডনে গিয়ে আমার মতো অন্য কারো সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্কে জড়াবে। সোমাও ইমরানকে বলতেন, আমি লন্ডন চলে গেলে তুমিও তো দেশে আরেকজনের সঙ্গে সময় কাটাবে।

২৪ জানুয়ারি তাদের মধ্যে তখন তুমুল ঝগড়া শুরু হলে একপর্যায়ে ইমরানের গালে সজোরে চড় মারেন সোমা। সেই অপমানের জেদ থেকে সোমাকে হত্যার চূড়ান্ত মনস্থির করেন চিকিৎসক ইমরান। ২৫ জানুয়ারি তারা আলাদা কক্ষে ঘুমান।

যেভাবে সোমাকে হত্যা করা হয়

তদন্ত সূত্র অনুযায়ী, ভোরে সোমার কক্ষের দরজা খুলে ইমরান দেখেন, তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন সোমা। শয্যার পাশে ঘুমের ওষুধের খালি পাতা। তখনই ইমরানের মাথায় ভূত চাপে। পলিথিন ব্যাগ দিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় সোমার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত ঢেকে কালো স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে দেন। সোমার দুই হাতও প্যাঁচানো হয় স্কচটেপে, যাতে হাত দিয়ে মুখে প্যাঁচানো পলিথিন খুলতে না পারেন। 

হত্যাকে আত্মহত্যা রূপ দিতে ইমরানের নাটক 

নিজেকে বাঁচাতে সোমার হাতের অক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে একটি সাজানো আত্মহত্যার চিরকুট লেখেন ইমরান। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা মরদেহের সঙ্গে কাটানোর পর বাড়ির মালিককে গিয়ে তার কথিত স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেন।

সোমার বাবা রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, খিলক্ষেতের বাসার সব খরচ আমরা দিতাম। সেখানে অন্য কাউকে নিয়ে মেয়ে থাকার বিষয়টি জানা ছিল না। চীনে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে ইমরান দু-একবার রাজশাহীতে এসেছিল। 

তিনি আরো বলেন, একমাত্র মেয়েকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন বুনেছিলাম। ফেব্রুয়ারিতে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল তার। তার আগেই...!

ডিবির ক্যান্টনমেন্ট টিমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম রেজাউল হক বলেন, সোমার মরদেহ মাথা থেকে গলা পর্যন্ত পলিথিনে মোড়ানো, স্কচটেপে আবার হাত বাঁধা ছিল। হাত বাঁধা মানুষ কীভাবে আত্মহত্যা করতে পারে। এছাড়া চিরকুটের লেখার সঙ্গে সোমার হাতের লেখার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছিল না। ওই চিরকুটে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘বাই ডাক্তার সাহেব। আই এম গিভিং আপ। এ সন্দেহ থেকে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ/এনকে/মাহাদী