সদরঘাটের আতঙ্ক মিঠু ও পাপন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১৩ ১৪২৭,   ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সদরঘাটের আতঙ্ক মিঠু ও পাপন

জাফর আহমেদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:১৯ ২৪ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:২৯ ২৫ নভেম্বর ২০২০

মিঠু ও পাপন- ফাইল ছবি

মিঠু ও পাপন- ফাইল ছবি

রাজধানীর সদরঘাটে এখন আতঙ্কের নাম মিঠু ও পাপন বাহিনী। ‘ক্যাসিনো সম্রাটের’ অন্যতম সহযোগী এই সহোদর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই এলাকায় অঘোষিত চাঁদার রাজায় পরিণত হয়েছেন।

আগে দলের কোনো পদ-পদবি না থাকলেও টাকার জোরে বাগিয়ে নিয়েছেন পদ-পদবিও। রাতারাতি হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। পুরো সদরঘাট এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন তারা দুই ভাই।

জানা গেছে, জাবেদ হোসেন পাপন বর্তমানে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি এবং মিঠু কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সদস্য। তবে পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাদের বড় ভাই সোহাগ সদরঘাটের কুলির সরদার হিসেবে থেকে এখনো কুলির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। আর ছোট ভাই মিহির এখনো বিএনপির শ্রমিক দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। লঞ্চে ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন মিহির।

চাঁদাবাজি, দখল বাজি, অবৈধভাবে আবাসিক হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে গত ১০ বছরের ব্যবধানে তাদের জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা দেখে মনে হয় তারা দুই ভাই আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন।

তাদের চাঁদাবাজি থেকে বাদ যায়নি সদরঘাট হর্কাস মার্কেটের পাবলিক টয়লেটও। যেখানে তিনটি পাবলিক টয়লেট থেকে প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নেন তারা।

জাবেদ হোসেন পাপনের সম্পত্তি বিবরণ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেন্ডারিয়া ভাট্টিখানা এস কে দাস রোড ৭৯ মান্নান টাওয়ার তৃতীয় তলার ৮০০ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাট আছে, যার বর্তমান মূল্য ৩০ লাখ টাকা।

কেরানীগঞ্জ নাজিরাবাদ বালুর মাঠের পশ্চিম পাশে সাড়ে চার শতাংশের জমির উপরে ষষ্ঠ তলা নির্মাণাধীন বাড়ি রয়েছে, যার বর্তমান মূল্য ৪ কোটি টাকা। সেই বাড়ির নিচতলায় ছোট বউ ও দুইতলায় থাকেন বড় বউ। নিচতলায় সিঙ্গেল একটি রুম আছে। সেই রুমে বসে পাপনের জুয়ার আড্ডা খানা। এ বাড়ি দেখভালের দায়িত্বে আছেন পাপনের শ্বশুর মামুন খান এবং পাপনের জুয়া খেলার অপকর্মের সহযোগিতা করেন স্থানীয় যুবক রুমান। 

এছাড়া বিল কাঠুরিয়া ৫ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি আছে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। ওয়ারীতে আরো একটি ফ্ল্যাটে তার বউ থাকেন, যার মূল্য ৭০ লাখ টাকা। 

সদরঘাটে ওয়াইজঘাট সাউথ প্লাজা আপন কালেকশন নামে জুয়ার বোর্ড চালানো হয়। এই জায়গা তার নিজের কেনা। প্রতিরাতে এখানে লাখ লাখ টাকার জুয়া খেলা হয়। তার টাকা আয়ের অন্যতম একটি উৎস এই জুয়ার বোর্ড।

জুতার ফুটপাত, কাপড়ের ফুটপাত, চোরা মোবাইল বিক্রির ফুটপাতে দোকান থেকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নেয়া হয়। এ টাকা তুলেন পাপনের লোক নুরু।

সদরঘাটের ফুটপাতের ফলের দোকান থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা এবং চাঁদপুর ঘাট, পটুয়াখালী ঘাটে তিনটি হকার বসিয়ে প্রতিদিন ৩ হাজার করে টাকা চাঁদা তুলেন ছোট আজিজুল ও মনা মিয়া। এদের সবার নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন পাপন ও মিঠু।
 
বিক্রমপুর গার্ডেন সিটিতে যে বন্ড কাপড়ের গাড়িতে করে ঢুকে তার কাছ থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা এবং কাপড়ের যে নকল সিল মারা হয় এজন্য মাসে ১ লাখ টাকা করে চাঁদা পান পাপন। এ টাকা তুলে পৌঁছে দেন বিক্রমপুর গার্ডেন সিটি সেক্রেটারি ও দিপু হোটেলের মালিককে।

লঞ্চের যাত্রী নেয়ার জন্য সকালে সদরঘাটে যেসব বাস ঢুকে সেখান থেকে চাঁদা তুলেন আলাউদ্দিন, রুমন। এখানে প্রতি মাসে লাখ টাকা মাসোহারা পান মিঠু ও পাপন। আলাউদ্দিন বিএনপির দলের লোক আর মনা হচ্ছে সাউথ সিটির পিয়ন। তাছাড়া এই দুই সহোদর জুয়ার বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। 

যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার মধ্যে নিউ পপুলার আবাসিক হোটেলের চারতলা কিনেছেন পাপন। এর বর্তমান বাজার মূল্য ৮ কোটি টাকা। বিকেল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত চলে রমরমা দেহ ব্যবসাসহ সব অপকর্ম। এই অপকর্ম থেকে বাঁচতে হোটেলের পিছনে গোপন রাস্তাও রাখা হয়েছে। 

পাপনের বেশ কয়েকটি গাড়িও আছে। এর মধ্যে এসআই সানড্রপ ঢাকা মেট্রো চ ১৯-০৫৯৫ .প্রাইভেট প্রিমিও জি সুপার ঢাকা মেট্রো গ ৩৭-৭৩৮০.এছাড়া ইয়ামাহা মোটরবাইক আছে। 

পাপনের ভাই জাবেদ হোসেন মিঠুর সম্পত্তির বিবরণ

চঞ্চলরাজের দশতলা ঋষি কে দাস কলরেডি রোডে দুই হাজার ১০০ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাট আছে, যার বর্তমান মূল্য দেড় কোটি টাকা। সদরঘাট ইস্ট বেঙ্গল মার্কেটের ১৪ তালায় সম্পূর্ণ ফ্লোর কিনেছেন মিঠু, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। গ্রেটওয়াল শপিং সেন্টারের প্রথম তলায় দক্ষিণে জেরিন ফ্যাশনের জন্য সাড়ে ৩০০ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাট কিনেছেন, যার বর্তমান মূল্য ১ কোটি। 

এছাড়া সদরঘাট মায়াকাটারা মার্কেটে এক কোটি টাকা মূল্যের একটি দোকানও আছে। সদরঘাট মানিক ও সাব্বির লঞ্চে জোর খাটিয়ে ক্যান্টিন স্থাপন করেছেন মিঠু। 

ওয়াইজ ঘাট মদিনা হোটেল নির্মাণ কাজের সময় ১ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন শাকিল ও কালা শওকত।

ওয়াইজ ঘাটে একটি পান দোকান নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। সেখানে থেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে এক ভাইকে দোকান দেন মিঠু। মিঠুর ব্যক্তিগত একটি নোহা গাড়িও আছে। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে মিঠু প্রায় অবৈধভাবে ১০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এর আগে সাধারণভাবে জীবনযাপন করতেন তিনি। কখনো বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান হোটেলে আবার কখনো ফুটপাতের হোটেলে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন মিঠুসহ তার ভাই পাপন। 

এসব অপকর্মের টাকার লেনদেন ও অফিসিয়াল ব্যাংকিং কার্যক্রম করেন তার ব্যক্তিগত লোক কায়েস।

মিঠু ও পাপন বাহিনী' নামে সদরঘাট এলাকায় একটি বাহিনীও আছে। এরাই এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করেন এবং চাঁদা তোলেন।  

এ বাহিনীর সদস্যরা হলেন- নুরু ইসলাম, শাকিল, মাসুদ, শহিদুল বিল্লাল, খোকন, রতন, শওকত, ছাত্রদলের তিতাস, সাগর, লিটন কাল্লু। র‌্যাবের কথিত সোর্স ও মহানগর যুবলীগের উপ অর্থ-সম্পাদক রাজিব হত্যা মামলাসহ ১২টি মামলার আসামি নুরু ইসলাম এবং সোহরাওয়াদী কলেজের সাবেক ছাত্রদলের নেতা।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, মিঠু-পাপনদের মূল গডফাদার দুইজনই আওয়ামী লীগ বিরোধী নেতা। এরা দুইজন তেল ও লঞ্চ ব্যবসায়ী। মূলত তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে উভয়ের ক্ষমতার জানান দেয়া। যে সরকার ক্ষমতা থাকুক তাদের লোকজন নিয়ে সদরঘাট নিজের ক্ষমতা প্রভাব দেখায় তারা। এই দুইজন গডফাদারদের অর্ধ শতাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট আছে। এরা রাতারাতি একেকজন হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আছে এক ডজন করে লঞ্চ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াইজ ঘাট ফুটপাতে এক জুতার দোকানদার বলেন, টাকা দিলে এইখানে দোকানদারি করতে পারি। এছাড়া তো বসতেই দেয় না। আপনাদের সঙ্গে কথা বলা আমাদের নিষেধ। চলে যান, না হলে আমাদের সমস্যা করবে।

পরিচয় গোপন করা শর্তে সদরঘাট ফুটপাতে বাচ্চাদের কাপড় বিক্রেতা বলেন, দোকান খুললে টাকা দিতে হয়। একজন এসে টাকা নিয়ে যায়। পরে মার্কেটের নেতারা ভাগ করে এ টাকা খায়। প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হয়। টাকা না দিলে দোকান বসাইতে দেবে না। তখন পোলাপাইন নিয়ে খামু কি?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৩৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রিপন বেপারী বলেন, পাপন ও মিঠু বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারবো না। 

তিনি বলেন, এদের কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি ছিল না, রাজনীতি করতো না। এখন এরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। তাদের কারণে দলের ত্যাগীরা কোনঠাসা হয়ে আছে। ভয়ে কথা বলতে পারে না। এক সময় তাদের কিছুই ছিল না। এখন তারা কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক। আমি এই বিষয় আর কোনো কথা বলতে চাই না।

৩৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিল আব্দুর রহমান মিয়াজি বলেন, আমি ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম। মিঠু ও পাপনের লোকজন আমার অফিসে এসে লোকদের মারধর করেছে। তাদের বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। আপনারা এলাকার এসে খোঁজ নেন, সব কিছুই পেয়ে যাবেন। 

চাঁদাবাজির কথা বার বার জিজ্ঞাসা করলে তিনি ভয়ে কোনো কথা বলতে চাননি। 

তিনি বলেন, এই বিষয় কোনো কথা বলতে চাই না, পরে ওরা আমার সমস্যা করবে। আপনারা এসে খোঁজ নেন, তাহলে সব দেখতে এবং জানতে পারবেন। আমি এভাবে কিছুই বলতে পারবো না।

ওয়াইজ ঘাট বুলবুল ললিতো কলা একাডেমির পাশে জেনারেটর ব্যবসা করতেন আলাউদ্দিন। তার সেই ব্যবসা দখল করে নেয়া হয়েছে। এখন সেই জেনারেটরের ব্যবসা করেন রতন ও খোকন। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আলাউদ্দিন বলেন, আমার জেনারেটর ব্যবসা ছিল। এখন নাই, দখল করে নিয়েছে । এখন এ জেনারেটরের ব্যবসা করে রতন ও খোকন। কোনো রকমে আমার জীবনটা নিয়ে ফিরে এসেছি। আমার ছেলে মেয়েদের জন্য শুধু বেঁচে আছি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাবেদ হোসেন পাপন বলেন, আমার কোনো বাড়ি-গাড়ি নেই। শুধু কেরানীগঞ্জে একটি বাড়ি আছে। তা আমি খুব কষ্ট করে করেছি। 

তিনি বলেন, আমি চাঁদাবাজি করি এমন কোনো প্রমাণ নেই। আমার কিছু দলের লোক আছে, তারাও চাঁদাবাজি করে না। সাউথ প্লাজায় আমার যদি জুয়ার বোর্ড থাকে সেখানে তো মার্কেটের সভাপতি আছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সভাপতিকে বলেন। 

তিনি আরো বলেন, স্থানীয় রাজনীতির কারণে আমার বিরুদ্ধে এসব কথা বলছে। আমার যা সম্পত্তি আছে তা রাজনীতিতে ঢুকার আগেও ছিল। এখন আমি ব্যবসা করি, সেখান থেকে আমার সম্পত্তি হয়েছে। 

আবাসিক হোটেলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই হোটেলের ফ্লোর আমার একার কেনা নয়। কয়েকজন মিলে সেটা কিনেছি। 

চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলো জাবেদ হোসেন মিঠু বলেন, সদরঘাটের কোনো একটা লোকও বলতে পারবে না আমি চাঁদাবাজি করি। আমার যত সম্পত্তি আছে সব কষ্ট করে উপার্জন করেছি। আমি ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকি। কয়েকটি দোকান আছে, তার দাম বেশি হবে না। কিছু লোক ইচ্ছে করে রাজনৈতিক কারণে এসব করেছে। আমি ভালো বলেই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আমাকে কমিটির সভাপতি বানিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিউজ হয়েছে। এর প্রতিবাদে আমার পক্ষে মানববন্ধন করেছে ব্যবসায়ীরা।

আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেন, পাপনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। যুবলীগে অন্যায় করে কেউ দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করলে এটা যুবলীগ সহ্য করবে না। যুবলীগে কোনো অন্যায়কারী, চাঁদাবাজের ঠাঁই নেই।

কোতোয়ালি থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, কয়েকদিন আগে ওয়াইজ ঘাট সাউথ প্লাজায় জুয়া খেলার কারণে রাতে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। আমি থানায় যোগদানের পর এখনো পাপন, মিঠুর নামে মামলার অভিযোগ নিয়ে কেউ আসেনি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ/এমকেএ