যেভাবে প্রতারণা করতেন নবাবের বংশধর পরিচয়দানকারী সেই আসকারী

ঢাকা, শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৭,   ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

যেভাবে প্রতারণা করতেন নবাবের বংশধর পরিচয়দানকারী সেই আসকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩৫ ৩০ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৬:১৬ ৩০ অক্টোবর ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নবাবী গেছে বহু আগে। কিন্তু বাংলা ভাষায় ‘নবাবী চাল’ প্রবাদ সার্থক করে চলেছেন তিনি। কুরসিনামায় টিকিটি পর্যন্ত নেই, অথচ নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন নবাব বংশের উত্তরসূরি।

শুধু তাই নয় নবাব বংশের বেহাত হওয়া সম্পত্তি উদ্ধারেও ‘আদা-জল’ খেয়ে নেমেছেন। বিভিন্ন সংগঠন গঠন করে তাদের অনুষ্ঠানে হাজির হচ্ছেন, নবাবী তাশরিফ দিচ্ছেন। যতটা না বাস্তবে, তার চেয়ে বেশি সক্রিয় ফেসবুকে। নাম তার নবাব আলী হাসান আসকারী।

নামের সঙ্গে নবাব জুড়ে দিয়ে প্রতারণার বিশাল ফাঁদ পাততেন হাসান আসকারী নামের এই ব্যক্তি। নিজেকে নবাব সলিমুল্লাহ খানের বংশধর খাজা আমানুল্লাহ আসকারীর ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতেন এই প্রতারক। আর তার সেই ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে ভুক্তোভোগী হয়েছেন শত শত মানুষ।

তবে নবাব বংশের তালিকায় আলী হাসান আসকারী নামে কেউ নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকার নবাব পরিবারের বংশধরেরা। ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা তালিকা ঘেটে দেখেছেন, আলি হাসান আসকারী নামে ঢাকার নবাব বংশে কেউ, কখনই ছিলেন না।

ঢাকার নবাব পরিবারের যাবতীয় সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে থাকা মতিঝিলের ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি সংস্কার বোর্ডের তালিকাতেও আলি হাসান আসকারী নামে নবাব পরিবারের কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে আলী হাসান আসকারীসহ তার প্রতারক চক্রের ৬ জনকে গ্রেফতার করে সিটিটিসির ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং টিম। 

প্রতারক হাসান আসকারীর কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত তার ভুয়া কোম্পানির প্রচারপত্র, নবাব পরিবারের অ্যামবুশ সিল, ওয়াকিটকি সেট, ভিওআইপি সরঞ্জাম, বিদেশে পাঠানোর নামে তৈরি করা সাড়ে ৩০০ মেডিকেল সনদ, ল্যাপটপ ও কয়েকটি মুঠোফোনের সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে আসকারী ও তার চক্রের প্রতারণা করার অবাক করা সব চিত্র। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসকারী স্বীকার করেছেন, তার ভয়াবহ সব প্রতারণার গল্প। 

পাঁচ বছর আগে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেন নবাব। ঢাকার শেষ নবাব পরিচয়ে শুরু করেন প্রতারণা। নবাব সলিমুল্লাহ খানের বংশধর খাজা আমানুল্লাহ আসকারীর ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এই প্রতারক।

নামের শুরুতে নবাব লাগিয়ে নবাব পরিবারের বংশধর ও সহায়-সম্পত্তির জাহির করতেন তিনি। সব জায়গায় প্রচার করতে থাকেন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের শেয়ার রয়েছে তার। সেই সঙ্গে আরো প্রচার করতে থাকেন, তিনি মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে বিনামূল্যে কর্মচারী নিয়োগ দিচ্ছেন। তবে মেডিক্যাল সার্টিফিকেটের জন্য ৮০০ টাকা করে লাগবে। 

পুলিশ জানায়, শুধু মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালই নয়, পোলান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর নামেও টাকা নিয়েছেন আসকারী।

তার এই প্রচারে উদ্বুদ্ধ হয়ে আবেদন করেন বহু মানুষ। আবেদনের টাকা নিয়ে কেটে পড়তেন তিনি। তাকে ফোন দেয়া হলে ফোন রিসিভ করতেন না। তবে কেউ বাড়াবাড়ি করলে বিভিন্ন হুমকি দিতেন। শুধু তাই নয়, কারণে-অকারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলতেন তিনি। এ ছবি তুলেই তিনি তার প্রভাব বিস্তার করতেন। 

আলি হাসান আসকারী নিজেকে খাজা আমানুল্লাহ’র ছেলে হিসেবে বরাবরই পরিচয় দেন। আমানুল্লাহ নবাব খাজা হাসান আসকারীর ছেলে। নবাব হাসান আসকারী ছিলেন নবাব হাবিবুল্লার জ্যেষ্ঠ পুত্র। হাসান আসকারী স্বাধীনতার পর পাকিস্তান চলে যান এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। ১৯৮৪ সালের ৯ আগস্ট করাচিতেই হাসান আসকারী মারা যান।

নবাবী কুরসিনামায় যা আছে:

খাজা আবদুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের বংশ তালিকায় দেখা গেছে, সেখানে ১৯৫৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত নবাব পরিবারের প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই তালিকার কোথাও আলি হাসান আসকারীর নাম নেই।

নবাবদের বংশ তালিকায় নবাব হাসান আসকারীর ছেলে হিসেবে খাজা আমানুল্লাহর নাম রয়েছে ঠিকই। তবে সেখানে আমানুল্লার কোনো ছেলে সন্তান নেই বরং দুটি মেয়ের কথা উল্লেখ আছে। তারা হলেন- আয়শা আসকারী ও সাহেব জাদি।

এদিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসকারী স্বীকার করেছেন, তার এই প্রতারণার কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগী ছিল রাশেদ, আহাম্মদ ও বরকত। এরা আপন তিন ভাই। বড় ভাই আহাম্মদ তার ম্যানেজার ছিল। রাশেদকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। আর ছোট ভাই বরকত ছিল বডিগার্ড।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর