ক্লুলেস এক হত্যাকাণ্ডের রহস্য যেভাবে উদঘাটিত হলো

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

ক্লুলেস এক হত্যাকাণ্ডের রহস্য যেভাবে উদঘাটিত হলো

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:২৭ ১৯ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৬ ১৯ অক্টোবর ২০২০

হাতিরঝিলে উদ্ধার হওয়া মেহেদীর মরদেহ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

হাতিরঝিলে উদ্ধার হওয়া মেহেদীর মরদেহ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধা অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ। পুরো শরীর ছিল বেডশিট, মশারি ও পলিথিন দিয়ে মোড়ানো। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় যাতে শনাক্ত করা না যায়, সেজন্য হাতের আঙ্গুল বিকৃতকরণের পাশাপাশি মুখমণ্ডলও বিকৃত করে হত্যাকারীরা। এভাবেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মেহেদীকে। 

গত ১২ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্ত থেকে মেহেদীর প্যাঁচানো মরদেহ উদ্ধার করে হাতিরঝিল থানা-পুলিশ।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, হত্যা সম্পর্কিত কোনো একটি ক্লু’র খোঁজে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মরদেহের চারপাশ খুঁজতে থাকে হাতিরঝিল থানা-পুলিশ। সে সময় লেকের যে স্থানে মরদেহটি ভেসে ছিল সেখান থেকে প্রায় ৫০ মিটার উত্তরে হঠাৎ একটি ছেঁড়া কাগজ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশ। ছেঁড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে মরদেহের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের গ্রেফতার করা হয়।

তিনি জানান, গত ১৩ অক্টোবর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের এডিসি হাফিজ আল ফারুকের নেতৃত্বে একটি টিম রাত দেড়টা থেকে ভোর সাড়ে ৬টা পর্যন্ত অভিযান চালায়। এ সময় খিলক্ষেত থানার উত্তরপাড়া এলাকা থেকে আহসান ও তামিম, হাতিরঝিল থানার মহানগর আবাসিক এলাকা থেকে আলাউদ্দিন এবং রামপুরা এলাকা থেকে রহিমকে গ্রেফতার করে।

অভিযানে অভিযুক্তদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে হাফিজ আল ফারুক জানান, গ্রেফতারের পর অজ্ঞাত মরদেহ সম্পর্কে তারা জানায়, মৃত ব্যক্তির নাম আজিজুল ইসলাম মেহেদী। বয়স ২৪ বছর। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। লেখাপড়া শেষ করে কানাডায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। লেখাপাড়ার পাশাপাশি পরিচিতজনদের পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিংয়ে সহায়তা করতেন মেহেদী।

তিনি জানান, নিহত মেহেদীর বাল্যবন্ধু হলো আহসান। সে গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে চাকরি করতো। করোনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়ে আহসান। তখন সে আলাউদ্দিনের কাছে কিছু টাকা ধার চায়। আলাউদ্দিন পেশায় ড্রাইভার হলেও পাসপোর্ট অফিসে দালালি ও পরিবহন পুলের পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। আলাউদ্দিন টাকা ধার না দিয়ে পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজ (নামের বানান সংশোধন, জন্ম তারিখ সংশোধন, বয়স বাড়ানো কমানো) দিতে বলে আহসানকে। এ কাজে যে টাকা পাওয়া যাবে, সেই টাকা দুজনে ভাগ করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

হাফিজ আল ফারুক আরো জানান, এরপরই বাল্যবন্ধু মেহেদীকে পাসপোর্টে সমস্যা সংক্রান্ত কোনো কাজ থাকলে সমাধান করে দেয়ার আশ্বাস দেয় আহসান।

পরে চট্টগ্রামের তিনটি পাসপোর্টের নাম ও বয়স সংশোধনের জন্য ১২ আগস্ট ঢাকায় আহসানের কাছে আসে মেহেদী। দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনটি পাসপোর্টের নাম ও বয়স সংশোধন করে দেয়ার বিনিময়ে আলাউদ্দিনকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও আহসানকে ১ লাখ টাকা দেয় মেহেদী।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট সংশোধন করতে না পারায় ভিকটিম মেহেদী তাদের  চাপ দিলে তারা এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেয়। এই সময়েও পাসপোর্ট সংশোধনের কাজ করতে না পারায় পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত চায় মেহেদী। এতে তারা টাকা ফেরত না দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। একপর্যায়ে মেহেদী এ দুজনকে জানায়, পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত না দিলে ঢাকায় এসে তাদের অফিসে অভিযোগ করবে।

পরে চাকরি হারানোর ভয়ে মেহেদীকে হত্যার পরিকল্পনা করে আহসান ও আলাউদ্দিন। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহসান ও আলাউদ্দিন পাসপোর্ট নেয়ার জন্য মেহেদীকে ১০ অক্টোবর ঢাকায় আসতে বলে।

যেভাবে হত্যা করা হয় মেহেদীকে :

১০ অক্টোবর ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১১টা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছায় মেহেদী। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা মোতাবেক মেহেদীকে খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় অবস্থিত তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায় আহসান। খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় মেহেদীকে। ব্যক্তিগত কাজের কথা বলে বাসার বাহিরে চলে যায় আহসান।  রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে ঘুমন্ত মেহেদীকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে হাত ও পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে বেডশিট, মশারি ও পলিথিনে মুড়িয়ে ফেলে আলাউদ্দিন। এরপর সে আহসানকে মোবাইল ফোনে হত্যার পর বিষয়টি নিশ্চিত করে।

যেভাবে গুম করা হয় মরদেহ:

আহসানের পাশের রুমের ভাড়াটিয়া তামিম (রেষ্টুরেন্টে কর্মরত কলিগ) আকস্মিকভাবে আহসানের রুমে ঢুকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারে। আহসানের অনুরোধের তামিম বিষয়টি কাউকে না বলার এবং মরদেহটি সুবিধাজনক স্থানে ফেলে দিতে আহসানকে সহায়তা করবে বলে জানায়।

সেই রাতে মরদেহ সরাতে না পেরে বিছানার নিচে রেখে দুপুর বারোটার দিকে রেষ্টুরেন্টে ডিউটিতে যায় আহসান ও তামিম। কাজ শেষে দুজন একসঙ্গে বাসায় ফেরে। রাত একটার দিকে আলাউদ্দিনের নির্দেশে তারই নোয়া মাইক্রোবাসটি ড্রাইভার রহিম চালিয়ে মরদেহ গুম করতে আহসানের বাসায় যায়।
 
মেহেদীর মরদেহ আহসান ও তামিম মাইক্রোবাসে উঠিয়ে হাতিরঝিল এলাকায় প্রবেশ করে। পথে তামিম নেমে যায়। হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে লোকজনবিহীন ও অন্ধকারচ্ছন্ন দেখে ড্রাইভার রহিম গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দেয়। আহসান মরদেহটি গাড়ি থেকে পানিতে ফেলে দেয়।

গ্রেফতারদের কাছ থেকে যা কিছু উদ্ধার করা হয়:

গ্রেফতারদের কাছ থেকে তিনটি পাসপোর্ট, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার জন্য ব্যবহৃত মেহেদীর বাসের টিকিট উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি যে মাইক্রোবাসটি ব্যবহার করে মেহেদীর মরদেহ হাতিরঝিলে ফেলে দেয়া হয়েছে, সেই মাইক্রোবাসটিও উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার আহসান, আলাউদ্দিন ও রহিম এরইমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান- এটি একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড। ছেঁড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত চার আসামিকে গ্রেফতার ও সব আলামত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। এই মামলাটি পুলিশি তদন্তের উৎকর্ষতার প্রমাণ।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/জেডআর