প্রতারণায় ঘেরা নাসিমের উত্থান

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১২ ১৪২৭,   ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রতারণায় ঘেরা নাসিমের উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৫৯ ১ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ২১:১৪ ১ অক্টোবর ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রাজধানীর রূপনগর এলাকা থেকে নাসিম রিয়েল এস্টেটের মালিক ৫৫ মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি কুখ্যাত প্রতারক নাসিমকে বিদেশি অস্ত্র, জালনোট ও মাদকসহ গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪। এ সময় তার স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমাকেও গ্রেফতার করা হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কারওয়ান বাজার র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

তিনি জানান, গতকাল বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকায় নাসিমের বাসায় ও চিড়িয়াখানা রোডের নাসিম রিয়েল এস্টেট-এর অফিসে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, তিন রাউন্ড গুলি, এক লাখ ৩৫ হাজার জাল নোট, ১৪০০ ইয়াবা, দুই বোতল বিদেশি মদ, ৪টি ওয়াকিটকি, ৬টি পাসপোর্ট, ৩৭টি ব্যাংক চেকবই ও ৩২টি সিমসহ গ্রেফতার করা হয়।

যেভাবে নাসিমের উত্থান

ইমাম হোসেন নাসিমের গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলার দৌলতখান থানার মেদুয়া গ্রামে। তার বাবা ১৯৫০ সালের দিকে ঢাকায় চলে আসেন। নাসিম ১৯৬০ সালে ঢাকার বাড্ডায় জন্মগ্রহণ করেন। এরপর আজিমপুরের একটি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর মিরপুরের একটি হাই স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকার ২টি কলেজ থেকে এইচএসসি ও গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে নাসিম তিন স্ত্রী ও চার সন্তানের জনক। ১৯৯৬ সালে প্রথম বিয়ে, ২০০৪ সালে দ্বিতীয় বিয়ে ও ২০১৩ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন।

প্রতারণার কৌশলে যেভাবে নাসিম

আসামি নাসিম ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠিকাদারির কাজ করলেও মূলত ২০০২ সাল থেকে অভিনব কৌশলে প্রতারণার মাধ্যমে নিজেকে কথিত নাসিম রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক পরিচয় দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙান। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্র প্রদর্শনপূর্বক ভয় ভীতি দেখিয়ে সাভারের কাউন্দিয়া এলাকায় অন্যের জমি, খাস জমি দখল করে আবাসিক শহর গড়ে দেয়ার নামে প্রায় ৫ হাজার সাধারণ মানুষের কাছে থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ২৫০ জনের সঙ্গে ভুয়া চুক্তিপত্র করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন নাসিম। এর পাশাপাশি তিনি ২০০৫ থেকে ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করেন। 

শাহ আলী থানার চিড়িয়াখানা রোডের নাসিম গ্রুপের অফিসে অভিযান চালিয়ে তার মালিকানাধীন ১৬টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। 

যতগুলো প্রতারণার অফিস গড়েন নাসিম

নাসিম রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, নাসিম ডেভলপার লিমিটেড, নাসিম এগ্রো ফুড লিমিটেড, নাসিম বাজার, এসবি ফাউন্ডেশন, ডা. বেলায়েত হোসেন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নাসিম পার্সেল ও কুরিয়ার সার্ভিস, সাপ্তাহিক ইমারত অর্থ, নাসিম শিপ বিল্ডার্স, নাসিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও কন্সাল্টেন্সি, নাসিম ট্রেডিং লিমিটেড, সাহানা আই হাসপাতাল, বাংলানিউজ ১৬, নাসিম ড্রিংকিং ওয়াটার, নাসিম রিফাইন্ড সুগার, নাসিম বেভারেজ।

আত্মগোপনের কৌশল

বিভিন্ন সময়ে নামে-বেনামে ৩২টি সিমকার্ড ব্যবহার করতেন প্রতারক নাসিম। অর্থ আত্মসাতের পর প্রতারণার শিকারদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতেন। সময়ে সময়ে অস্ত্র প্রদর্শন ও ওয়াকিটকি দেখিয়ে নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতেন তিনি। গ্রেফতার এড়াতে আন্ডারগ্রাউন্ডে গোপন সুরঙ্গ ও দরজায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট যুক্ত অফিসে বানিয়েছেন তিনি। নাসিমের অনুপস্থিতিতে তার তৃতীয় স্ত্রী হালিমা আক্তার প্রতারণার ব্যবসা দেখাশোনা করতেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‍্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেফাতাররা নিম্নোক্ত অভিনব প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করে জনগণকে ঠকাচ্ছিলো।

অস্ত্রধারী ভূমিদস্যু হিসেবে প্রতারণা

আসামি নাসিম অভিনব পন্থা অবলম্বন করে দীর্ঘদিন যাবত সাধারণ জনগণের কাছে প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে নিজেকে বিভিন্ন সময় রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক পরিচয় দিয়ে আবার ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্র প্রদর্শনপূর্বক জমি দখল করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করে আসছিলেন।

৩২টি সীমকার্ড ও ৪টি ওয়াকিটকি সেট দিয়ে প্রতারণা

আসামি নাসিম নামে-বেনামে ৩২টি সিমকার্ড ব্যবহার করে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে প্রতারণার কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করতেন এবং এ ওয়াকিটকি দিয়ে নিজের নিরাপত্তা ও রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত করতেন।

৫৫টি গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারক নাসিম ও তার স্ত্রী হালিমার বিরুদ্ধে প্রতারণা, ভূমিদস্যুতা, মাদক ও জাল টাকার মামলায় প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। 

শীর্ষস্থানীয় মাদক ও জালটাকার ব্যবসায়ী

আসামি নাসিম দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে স্ত্রী হালিমার সহযোগিতায় ইয়াবা ও বিদেশি মদ সংগ্রহ করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ডিলার ও খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতেন। এছাড়া তারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জাল নোটের ব্যবসা করতেন। 

ভুক্তভোগীরা নাসিম ও তার স্ত্রী হালিমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে শতাধিক মামলা করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ৫৫টি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা সংক্রান্ত অসংখ্য জিডি ও অভিযোগ রয়েছে।

গ্রেফতার নাসিম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, প্রতারণার মোট ৪টি মামলা প্রক্রিয়াধীন। অসংখ্য ভুক্তভোগী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের মধ্যে ১০-১২ জন প্রতারক নাসিমের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। যারা মামলা করতে ইচ্ছুক র‌্যাব-৪ তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/এমআরকে/এআর