বেওয়ারিশ কুকুর স্থানান্তরের পক্ষে বেশিরভাগ মানুষ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১২ ১৪২৭,   ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বেওয়ারিশ কুকুর স্থানান্তরের পক্ষে বেশিরভাগ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৪ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:২৪ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

বেওয়ারিশ কুকুরের কারণে নানা ধরণের সমস্যায় পড়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকার বাসীন্দারা। ছবি: সংগৃহীত

বেওয়ারিশ কুকুরের কারণে নানা ধরণের সমস্যায় পড়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকার বাসীন্দারা। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আহসান জুবায়ের। থাকেন পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করায় প্রায়ই তাকে রাত ১১টায় বাসায় ঢুকতে হয়। কিন্তু তখনই বাঁধে বিপত্তি! কারণ বাসায় প্রবেশের গলিতেই থাকে ডজনখানেক বেওয়ারিশ কুকুর। সেগুলোকে টপকে বাসায় ঢোকা অনেক সময় অসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে সারাদিন ভ্যান চালিয়ে রাতে গুলিস্তান মাঝারের পাশেই ঘুমান আজিজ মিয়া। কিন্তু বেওয়ারিশ কুকুরের ভয়ে ঠিকমতো ঘুম হয় না তার। তিনি বলেন, কুকুর অনেক সময় মশারি কামড়ে ছিঁয়ে ফেলে। কয়েকজনকে ঘুমের মধ্যে কামড়ও দিয়েছে। সারারাতই ভয়ের মধ্যে থাকি।

বাস্তবে পুরো রাজধানীর চিত্রই এমন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বেওয়ারিশ কুকুরের কারণে নানা ধরণের সমস্যায় পড়ার কথা জানিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বলছে, ঢাকা শহরের আনুমানিক ৬০ হাজারের মতো বেওয়ারিশ কুকুর থাকতে পারে। যদিও এই সংখ্যার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তারা বলছে, ঢাকার দুই সিটিতে মোট ৩৭ হাজার কুকুর রয়েছে।

কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে শুধু ২০১৮ সালেই ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকা থেকে ৮১ হাজার মানুষ জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সেবা নিয়েছে। ২০১৯ সালে রোগী ছিল ৭৬ হাজার। এদিকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত কুকুরে আক্রমণের শিকার ৩৬ হাজার লোক সেবা নিয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন। জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। ছবি: সংগৃহীত

বেওয়ারিশ কুকুরের ভয়ে এলাকা ছেড়েছেন, এমন ঘটনাও ঢাকা শহরের অনেক। ঢাকার পূর্ব রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দা নাদিরা জাহান জানান, এর আগে কাঁঠালবাগান এলাকায় থাকতেন তিনি। সেখানে বাসায় ফেরার পথে কুকুরের কামড়ের ভয়ে বাসা পরিবর্তন করে পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় উঠেছেন তিনি। তবে এখানেও সেই একই অবস্থা। তাই কুকুরের ভয়ে যাতায়াতের পথই পরিবর্তন করে নিয়েছেন তিনি।

রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা ফারজানা জেরিন শ্রাবন্ত। তিনি জানান, এমনিতেই কুকুর ভয় পান তিনি। তার উপর তার বাসার গলিতে ১০-১২টি কুকুর সারাক্ষণই থাকে। বাজার করে ফিরতে গেলে, হাতে ব্যাগ থাকলে এই কুকুরগুলো প্রায়ই পিছু নেয়। বাজারের ব্যাগগুলো ধরার চেষ্টা করে। এছাড়া সন্ধ্যার পর বাসায় ঢোকাটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি চলতি রিকশা বা যানবাহনেও কুকুর লাফিয়ে উঠে পড়ে বলে জানান তিনি।

প্রাণিপ্রেমীদের তীব্র আপত্তি আর প্রতিবাদের পরও সম্প্রতি বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুকুর ধরে নেয়ার ভিডিও এবং ছবি দেখা যাচ্ছে। এসব নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মানবন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হচ্ছে।

ঢাকা নগরীতে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাতে যারা বিরক্ত; তাদের মতে, বিভিন্ন অলিগলি ২০-৩০টি পর্যন্ত কুকুর দল করে দখল নিয়েছে, যা অত্যন্ত ভীতিকর বিষয়ও বটে। প্রাণীপ্রেমীদের যদি কুকুরের প্রতি এতই ভালোবাসা থাকে, তবে তারা কুকুরগুলোকে নিজ বাসায় নিয়ে রাখলেই পারেন। জনগণকে কষ্ট দেয়ার জন্য এদেরকে রাস্তায় দায়িত্বহীনভাবে ছেড়ে দেয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এদিকে প্রাণীপ্রেমীরা বলছেন, স্থানান্তর করে কুকুর নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। রাজধানীর কুকুরগুলো যে এলাকায় স্থানান্তর করা হবে, ওই এলাকায় নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হবে। তাই কুকুর স্থানান্তর না করে বন্ধ্যত্ব করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। আইনগতভাবেই কুকুর স্থানান্তর করা বেআইনি বলেও উল্লেখ করেছেন প্রাণীপ্রেমীরা।

বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন জয়া আহসান

এদিকে নগরপরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শহরের রাস্তা-ঘাটে বেওয়ারিশ কুকুর যত্র-তত্র ঘুরে বেড়ানোটা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি ডেকে আনতে পারে। কুকুর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের উল্লেখ করে তারা বলছেন, প্রয়োজনে পশুপ্রেমীসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বিশ্বের কোনো সভ্য দেশেই রাস্তা-ঘাটে যেখানে সেখানে কুকুর ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় না। এটা শিশু, নারী, বয়স্ক এমনকি প্রাপ্ত বয়স্ক পুরষদের জন্য অসুবিধার হতে পারে। তারা ভয় পেতে পারে। তবে কুকুরের বাঁচার অধিকার আছে। যে ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন তা হতে হবে, স্বাস্থ্যসম্মত এবং প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী।

এদিকে এ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। বৃহস্পতিবার অভিনেত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে জনস্বার্থে এ আবেদন করে প্রাণী কল্যাণ সংগঠন অভয়ারণ্য ও পিপলস ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার।

২০১৪ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে কুকুর নিধন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। ওই বছরই ঢাকার সিটি কর্পোরেশন কুকর নিধন কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে কুকুরকে ভ্যাক্সিনেশনের আওতায় আনার কাজ শুরু করে। পরে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন আলাদা করে ভ্যাকসিন দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারপরও প্রতিবছর কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে কুকুরের কামড়ে আহত ও মৃত ব্যক্তির সংখ্যাও বাড়ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে