এখানে কয়েকটি জীবন: নিখাদ জীবনের নিখুঁত চিত্রকল্প

ঢাকা, বুধবার   ০৬ জুলাই ২০২২,   ২২ আষাঢ় ১৪২৯,   ০৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

এখানে কয়েকটি জীবন: নিখাদ জীবনের নিখুঁত চিত্রকল্প

নুসরাত সুলতানা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১৯ ২০ মার্চ ২০২২  

সালাহ উদ্দিন মাহমুদের চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘এখানে কয়েকটি জীবন’ । ছবি : সংগৃহীত

সালাহ উদ্দিন মাহমুদের চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘এখানে কয়েকটি জীবন’ । ছবি : সংগৃহীত

সালাহ উদ্দিন মাহমুদের গল্প পড়েছি বিভিন্ন পত্রিকায়। লেখকের গভীর পর্যবেক্ষণে আগেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাই এবারের বইমেলা থেকে সংগ্রহ করেছিলাম তার গল্পগ্রন্থ ‘এখানে কয়েকটি জীবন’। বইটিতে মোট ১১টি গল্প রয়েছে। গল্পগুলোয় নিখাদ জীবনের নিখুঁত চিত্রকল্প ফুটে উঠেছে।

তার ‘জীবন’ গল্পে রিজিয়া-আনিস নামের নিঃসন্তান দম্পতির সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। গল্পের শুরুতে দেখা যায়, রিজিয়া-আনিস বিয়ের পর শুরুতেই সন্তান গ্রহণ করেনি। কারণ, তারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে সন্তান গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু এরপর বিয়ের সাত বছর অতিবাহিত হলেও তাদের আর বাচ্চা হয় না। আনিস একদিন এক বিজ্ঞাপন দেখতে পায়, যেখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা, প্রসবকালীন খরচ এবং প্রসবের পর আরো বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে বাচ্চা বিক্রি করবে ছুমাইয়া আর বারেক। কারণ, মহামারি করোনা কেড়ে নিয়েছে বারেকের চাকরি। কিন্তু বাচ্চার জন্মের পর রিজিয়া ছুমাইয়ার কোলেই বাচ্চা তুলে দেয়। কারণ, ছুমাইয়ার কোল খালি করে রিজিয়া নিজের কোল ভরতে চায় না। এমনই মানবতার গল্প ‘জীবন’।

বইয়ের দ্বিতীয় গল্প ‘সোনাবউ’। প্রেম-বিচ্ছেদের গল্প এটি। অনন্তের প্রতি গভীর প্রেম ছিল সোনাবউয়ের। কিন্তু জাগতিক প্রতিষ্ঠা আর কুটিল সমাজের কুটচালে অনন্ত আর সোনাবউয়ের প্রেমের নৌকাটা তীরে ভিড়তে পারে না। তাদের আর যাপন করা হয় না একটা প্রেমময় জীবন। সোনাবউ অনন্তকে লিখে যায় এক আবেগঘন চিঠি। চিঠিতে সোনাবউ অনন্তকে ঠিকমতো নামাজ পড়তে বলে, ঠিকভাবে খাবার খেতে বলে, চুল কাটতে বলে। কিন্তু সোনাবউয়ের বিচ্ছেদে অনন্ত পৃথিবীর তাবৎ অবহেলা নিজের ওপর চাপিয়ে দেয়। বিচ্ছেদের মূর্ত স্মারক ‘সোনাবউ’ গল্পটি।

‘শাড়ি’ গল্পে কৃষক মকবুল আর গৃহিণী মজিতনের ছেলে আজম বাড়ি আসার সময় বাবা-মায়ের জন্য নিয়ে এসেছে নতুন কাপড়। মকবুল আর মজিতন অনেক কষ্ট করে মকবুলকে পড়াশোনা করিয়েছে। এখন সে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী। ছেলে বাড়ি এলে মজিতন জবাই করেছে পোষা মোরগ। আজম বাজারে গিয়ে নিয়ে এসেছে ইলিশ মাছ। বেড়াতে এসেছে আজমের খালাতো বোন শিউলি আর তার বাবা-মা। শিউলির চোখেই আজম বুনে যায় সোনালি স্বপ্নের মিহি জাল। ছেলের আনা শাড়ি বুকে নিয়ে মজিতন ঘুমায়। এমনই একটা সুখ-সুখ গন্ধ ভেসে বেড়ায় ‘শাড়ি’ নামক গল্পটির শরীর আর মননজুড়ে।

রুবি আর সুজন নামের দুজন পথশিশুর গল্প ‘বিবস্ত্র’। সুজন রুবির খেয়াল রাখে কাছ থেকে এবং দূরে থেকেও। রুবিকে না দিয়ে সুজন কোনো ভালো খাবারও খায় না। এরকম একদিন এক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে আসে সুজন রুবির জন্য। সুজন খুনসুটি করে বলে, ‘টিএসসিতে দাদারা আপাগো মুখে খাওন তুইলা দেয়।’ রুবি বলে, ‘তুই কি আমারে খাওন মুখে তুইলা দিতে চাস? ফাজিল পোলাপান জানি কোনহানের!’ সুজন অভিমান করে চলে যায়। তারপর রুবি শিকার হয় নিষ্ঠুরতম নিয়তির। তিনটি দানব খুবলে খায় রুবির শরীর আর আত্মা। চাকচিক্যময় সভ্য সমাজের নগ্ন চেহারা দারুণভাবে উন্মোচন করেছেন লেখক এ গল্পে।

‘দায়ী’ গল্পটি একজন লেখকের মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার নিগূঢ় রহস্যে ভরপুর সুগভীর উচ্চারণ। লেখক তার লেখা যখন শেষ করে ফেলে; তখন আর বেঁচে থাকার কোনো মানে খুঁজে পায় না। শুধু ডায়েরিতে লিখে রেখে যায়, আমার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। সাংবাদিকরা হয়রান হয়ে খুঁজতে থাকে ক্লু। এও সমাজের এবং রাষ্ট্রের আরেক দিক।

‘জয়শ্রী’ গল্পে লেখক পরম মমতায় সংখ্যালঘুদের ঘন বেদনার নিবিড় চিত্রায়ন করেছেন। গ্রামের চেয়ারম্যান মতি মিয়ার তিন দোসর সম্ভ্রমহানি করে ইন্দ্রজিতের মেয়ে জয়শ্রীর। ইন্দ্রজিৎ বিচার চাইলে মতিমিয়া প্রত্যেককে দশ হাজার টাকা এবং দশবার কান ধরে ওঠবস করার শাস্তি দেয়। হতবিহ্বল ইন্দ্রজিৎ ভাবে, মানুষের ইজ্জতের দাম কি দশ হাজার টাকা! অর্ধমৃত ইন্দ্রজিৎ ভগ্ন শরীর এবং মন নিয়ে যখন পৌঁছায়, তখন দেখে সব হিসাব চুকিয়ে জয়শ্রী পাড়ি জমিয়েছে পরপারে। অথচ এই পতাকায় মিশে আছে ইন্দ্রজিতের পূর্বপুরুষের রক্ত।

‘কুমারী’ গল্পে রহিতন নামক মেয়েটি প্রেমের বলি হয়। প্রেমিক ফিরোজ আলী বিয়ের আশ্বাসে ভোগ করে রহিতনের কিশোরী শরীর। আর তার ফলশ্রুতিতে অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ রহিতনের। রহিতন পলে পলে মরে যায় মর্মবেদনায়। আর রহিতনের বাবা-মা যেন মুখ লুকাবার জায়গা পায় না। লেখক পরম মমতার সাথে এঁকেছেন কুমারী গর্ভবতীর যন্ত্রণা, বেদনা এবং কষ্ট। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সবটুকু দায় বহন করতে হয় রহিতন আর তার পরিবারকেই।

ভুল প্রেমে সজোরে ধাক্কা খেয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণের গল্প ‘নাকফুল’। কলেজ জীবনে গল্পকথক প্রেমে পড়েছিল এক সহপাঠীর। লজ্জায়, সংকোচে ভয়ে তাকে কিছু বলার আগেই গল্পকথক দেখতে পায় মেয়েটির নাকে নাকফুল। বহু বছর পর লেখক নিজের স্ত্রীর নাকফুল দেখে সেই রক্তক্ষরণ টের পায়। প্রেমের দহনের চমৎকার বর্ণনা সন্নিবেশিত হয়েছে এ গল্পে।

বিধবা আবেদা আর তার ছেলে স্বাধীনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে ‘কুকুর’ গল্পটি। ডাকাতের অতর্কিত আক্রমণে মৃত্যু হয় জাবেদ আলীর। তারপর থেকে ছেলে স্বাধীনকে নিয়েই বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা আবেদার। সব পুরুষের লালায়িত, লকলকে জিহ্বা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে আবেদা। স্বাধীন একটু একটু করে বড় হচ্ছে। সে সব কিছুই অনুধাবন করতে পারে। মায়ের আর তার নিরাপত্তার জন্য পুষতে চায় একটি কুকুর। অনেক কষ্টে একটা কুকুর জোগাড় করতে পারলেও ‘মানুষ কুকুরে’র অত্যাচারে আসল কুকুরকে ধরে রাখতে পারে না স্বাধীন। 

‘গোলেয়া’ গল্পটি এক মেয়েশিশুর বৈশাখী মেলায় যাওয়ার আনন্দের চিত্রায়ন। কলি নামের মেয়েটি বৈশাখী মেলায় গিয়ে খুঁজে পায় অপার আনন্দ। গ্রামবাংলা চিরায়ত মেলা এবং হালখাতার প্রাঞ্জল বর্ণনা রয়েছে এ গল্পে। যা সব পাঠককেই স্মৃতি তাড়িত করবে। শৈশবকে স্মরণ করিয়ে দেবে। 

‘মিঠু’ গল্পটি একটি পাখিকে ভালোবাসার গল্প। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া মিথিলা আর তার পোষা টিয়াপাখি মিঠুকে ঘিরে এ গল্প পরিণতির দিকে এগিয়েছে। মিঠু কথা বলতে শেখে কিন্তু উড়তে পারে না। তাই বারবার ছেড়ে দিলেও ফিরে এসেছে খাবার এবং মায়ার টানে। কিন্তু এক সময় মিঠু বন্যজীবনের স্বাদ বুঝে যায়। আর তখন খাঁচা কেঁটে নিজেই পালিয়ে যায়।

গল্পগুলোয় লেখকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যেমন- ‘কুকুর’ গল্পে লেখক আবেদার মর্মপীড়া বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘গ্রামের মেম্বার, মাতুব্বর, সুদি মহাজন, লম্পট মাস্টার সবাই কেমন লালায়িত থাকে। গায়ে পড়ে উপকার করার চেষ্টা করে, স্বপ্ন দেখায়, আশা জাগায়, যাতনা বাড়ায়, কামনা জাগায়।’ গল্পে আবেদা তার ছেলে স্বাধীনকে বলে, ‘অই কুত্তাগো জ্বালায় এই কুত্তাডা কেমনে থাকব বাপ? এই গ্রামে কি আর কুত্তার অভাব আছে?’ এমন আরও সংলাপে বা বিশ্লেষণে সমাজকে একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন লেখক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।

তবে কিছু স্থানে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের অভাব বোধ করেছি। সেসব বিষয়ের দিকে লেখক অবশ্যই যত্নবান হবেন। এ ছাড়া সব মিলিয়ে চমৎকার একটি গল্পগ্রন্থ ‘এখানে কয়েকটি জীবন’। কথাশিল্পী সালাহ উদ্দিন মাহমুদের বইটি আপনিও সংগ্রহ করতে পারেন। বইটি প্রকাশ করেছে কিংবদন্তী পাবলিকেশন। নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন আইয়ুব আল আমিন। বইটি সারাবছরই পাওয়া যাবে রকমারি ডটকমে।

আলোচক: কবি ও কথাসাহিত্যিক।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »