জানা-অজানার জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

ঢাকা, বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৮,   ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

জানা-অজানার জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

শিল্প ও সাহিত্য ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৪ ১৪ নভেম্বর ২০২১  

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। তার পরিচয় শুধু এই বিশেষণেই নয়, এর বাইরে তিনি একজন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক।

১৯২৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি (১০ ফাল্গুন) জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ঝিনাইদহ জেলার দুর্গাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তখন ঝিনাইদহ বৃহত্তর যশোর জেলায় ছিল। তিনি মায়ের প্রথম সন্তান না হলেও একদিক দিয়ে প্রথম, কারণ তারও আগে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তার মা। সে মেয়েটি আতুড়েই মারা যায়। প্রথম ও চতুর্থ অবস্থানে তারা দুই ভাই, বাকি ছয়জন বোন।

তাদের একান্নবর্তী পরিবারের প্রধান ছিলেন দাদা। দাদী না থাকায় পরিবারে একটা শূন্যতা রয়েই গিয়েছিল। বাড়ির বড়ো বউ হিসেবে অনেকটা দায়িত্ব বর্তেছিল তার মায়ের। অন্দরমহল পরিচালনার এই দায়িত্ব তার মা ভাগ করে নিতেন তার ফুফুর সঙ্গে। তার বাবা থাকতেন কলকাতার একটি ভাড়া বাসায়। তিনি কলকাতার নর্মাল স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।

চাকরি সূত্রে বদলি হতেন তার বাবা, যেখানেই যেতেন সেখানেই বই খাতা নিয়ে যেতেন। সঙ্গে যেতেন ভাই-বোন, মা। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণি তিনি পড়েছিলেন বাঁকুড়া জেলা স্কুলে।

সেখানে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনের দুটি সংখ্যা বের হয়েছিল। প্রথমটিতে ‘প্রভাত’ শিরোনামে একটি কবিতা ছাপা হয়েছিলো। দ্বিতীয়টিতে ‘যুদ্ধ’ শিরোনামে তার প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিলো। এই দুটো লেখাতেই বাবার অবদান ছিলো অনেক। তিনি ছেলের লেখা ঘষা-মাজা করে ছাপার উপযোগী করেছিলেন। 

১৯৪০-৪১ সালে বাবা বদলি হলেন জলপাইগুড়ি। ১৯৪১ সালে জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেন যশোর জেলা স্কুলে। ১৯৪৫ সালে দিলেন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা। স্টার মার্কসসহ ১ম বিভাগ পেয়ে ভর্তি হলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে, আইএ ক্লাসে। তখন থাকতেন বউবাজার মোড়ে অবস্থিত টেইলর হোস্টেলে। ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে ভয়াবহ দাঙ্গা হলো কলকাতায়। অরক্ষিত হয়ে পড়লেন তারা। তখনকার ভয়াবহতা ও অসহায়ত্বের কথা এখনও ভুলতে পারেন না তিনি। হোস্টেল ছেড়ে কয়েকমাস নিরাশ্রয় জীবনযাপন শেষে মীর্জাপুর স্ট্রিটের মুসলমান ছাত্রদের কলেজ হোস্টেলে থাকলেন ৩ মাস।

আইএ পরীক্ষা দিলেন ১৯৪৭ সালে। লাভ করলেন প্রথম বিভাগ। দেশভাগের পর চলে এলেন ঢাকায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ অনার্স ক্লাসে ভর্তি হলেন। আর থাকতেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে।

১৯৫০ সালে অনার্স পরীক্ষায় ইংরেজি সাহিত্যে একমাত্র প্রথম শ্রেণি তিনিই পেয়েছিলেন। ১৯৫১ সালের এমএ পরীক্ষায়ও একমাত্র প্রথম শ্রেণি তার দখলে এলো। এমএ পাস করার পর ১৯৫২ সালে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে প্রোগ্রাম সহকারী হিসেবে কাজ করলেন ৩-৪ মাস। ১৯৫১ সালেই বিয়ে করেন তিনি। ময়মনসিংহ শহরের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, প্রাক্তন এমএলএ আবদুল মজিদের কন্যা কায়সারকে। এই দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ে।

১৯৫২ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডে গেলেন। পড়লেন অনার্স কোর্স। ১৯৫৪ সালে সমুদ্রপথে ফিরে এলেন দেশে। ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলেন। ঢাকা কলেজে তার নিযুক্তি ছিল সরাসরি প্রফেসর পদে অক্সফোর্ডের ডিগ্রির সুবাদে। ১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদানের পর পদোন্নতি পেয়ে বিভাগের রিডার ও বিভাগীয় প্রধান হলেন। ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিমন্ত্রণে দুইমাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সঙ্গে মিলে প্রকাশ করেন ত্রৈমাসিক ‘পূর্বমেঘ’। ১৯৬৭ সালে বাবা ফজলুর রহমান সিদ্দিকী মারা যান গ্রামের বাড়িতে। এ বছরই মিল্টনের বিখ্যাত গদ্যরচনা অ্যারিওপ্যাজিটিকার অনুবাদ করেন তিনি। ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের খণ্ডকালীন পরিচালক।

১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৪ সালে ৪ বছরের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সেখানেই ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে পুনর্বার যোগ দেন। ১৯৮৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর, ১৯৯৫ সালের জানুয়ারির সময়টা ছিলেন বিশ্বভারতীর ভিজিটিং প্রফেসর। ২০০০ সালে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন, ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একজন কর্মী।

তিনি মারা যান ২০১৪ সালের ১১ নভেম্বর।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম