দ্য প্লেগ (পর্ব ২১)

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (পর্ব ২১)

মূলঃ আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫৬ ১১ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৫:৩৬ ১৮ অক্টোবর ২০২১

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ত্যারু ডাক্তার রিও’র সাথে তার একটি লম্বা আলাপচারিতা লিপিবদ্ধ করেছিল। স্মৃতি থেকে এই আলাপচারিতার ফলাফলকে সে ‘ভালো’ বলে মন্তব্যও করেছিল। এই প্রসঙ্গে তার নোটবইতে রিও’র মায়ের চোখের  রঙের বর্ণনা দেওয়া ছিল। বর্ণনা অনুযায়ী চোখ দুটো ছিল স্বচ্ছ বাদামী, যা ভিন্ন ধরণের অনুভূতির সৃষ্টি করত। মনে হতো যে, এমন ভালো হৃদয়ের মানুষ আর হয় না এবং এই হৃদয় কখনই প্লেগের কাছে পরাজিত হতে পারে না। সে রিও’র এজমা রোগীকে নিয়েও অনেককিছু লিখেছিল। একবার সে ডাক্তারের সাথে তাকে দেখতে গিয়েছিল। রিও’র সাথে আলাপচারিতার পরে। বৃদ্ধ লোকটি ত্যারুকে হাসিমুখে সম্ভাষণ জানিয়েছিল এবং আনন্দিতভাবে তার সাথে করমর্দন করেছিল। সেদিনও সে দুটো সসপ্যান (saucepan) সামনে নিয়ে বসেছিল, যার একটিতে ছিল শুকনো মটরদানা। “এই দ্যাখো আরেকজন এসেছে,” ত্যারুকে দেখে সে চিৎকার করে বলেছিল,“এটা হলো উল্টা ধরণের দুনিয়া। এখানে রোগীর চেয়ে ডাক্তারের সংখ্যা বেশী। কারণ, রোগীরা সব মরে যাচ্ছে। ফাদার ঠিকই বলেছেন যে, এই শাস্তি আমাদের প্রাপ্য ছিল।“  পরেরদিন ত্যারু তাকে দেখতে এসেছিল না জানিয়েই। 

ত্যারুর নোটবই থেকে আমরা জানতে পারি যে, বৃদ্ধ লোকটি  শুকনো পণ্যের ব্যবসায়ী ছিল। পঞ্চাশ বছর বয়সে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, জীবনে প্রচুর কাজ করেছে। সুতরাং সে কাজ করা বাদ দিয়ে বিছানা নিয়েছিল, যা সে কখনই ত্যাগ করেনি। এমন নয় যে, এজমার কারণে নড়াচড়া না করতে পারার কারণে সে বিছানা নিয়েছিল। প্রথম জীবন থেকে সে কম কিন্তু  নির্দিষ্ট পরিমাণে আয় করত। ফলে কখনই সে অভাবে পড়েনি এবং পচাত্তুর বছর বয়সও তার ভেতরে আনন্দহীনতার সৃষ্টি হয়নি। সে ঘড়ি সহ্য করতে পারত না। তার সারাবাড়িতে একটাও ঘড়ি ছিল না। বলত, “ঘড়ি হলো খুবই অপ্রয়োজনীয় একটা জিনিস।” সে তার খাবারের সময়গুলো  নির্ধারন করত সেই দুটো সসপ্যান দিয়ে। প্রতিদিন সকালে যখন সে ঘুম থেকে উঠত, তখন একটি সসপ্যান মটরদানা ভর্তি থাকত। সেটি থেকে অন্যটিতে সে সতর্কতার সাথে নির্ধারিত গতিতে সেই মটরদানাগুলো ফেলত। সারাদিনে খালি সস প্যানটি যতবার সে মটরদানা দিয়ে ভরতে পারত, সেই সংখ্যা থেকে সে বুঝতে পারত দিনের কোন সময় কোনটি। “প্রতি পনেরোটি প্যান ভরার পর খাওয়ার সময় হয়। জীবনে এর চেয়ে সহজ-সরল  আর কি ব্যবস্থা হতে পারে?”

স্ত্রীকেও সে প্রাথমিক জীবনেই প্রেষণা দিয়ে রেখেছিল, যাতে তার সাথে কোনো ধরণের মতপার্থক্য না হয়। জীবনের সবকিছু সম্পর্কেই সে উদাসীন ছিল। কাজ, বন্ধুত্ব, ক্যাফেতে খাওয়া-দাওয়া করা, গান, নারী, বাইরে বেড়ানো – কোনোকিছু সম্পর্কেই তার আগ্রহ ছিল না। জীবনে শুধুমাত্র একবার সে তার শহরের বাইরে গিয়েছিল, যখন একটা পারিবারিক বিষয় নিয়ে  কর্তৃপক্ষ তাকে আলজিয়ার্সে ডেকেছিল। ট্রেনে করে সে সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারেনি। পরের ট্রেনেই ফিরে এসেছিল।                   

ত্যারু তার নিভৃত জীবন সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করলে সে ঠিক নীচের ব্যাখ্যাটি দিয়েছিল। ধর্ম অনুসারে, মানুষের জীবনের প্রথম অর্ধাংশ হলো উত্তরণ এবং পরের অর্ধাংশ হলো অবতরণ। অবতরণের দিনগুলোতে তার কোনো চাহিদা ছিল না। কারণ,  থাকলেও স্রষ্টা চাইলেই সেগুলো যেকোনো মুহূর্তেই ছিনিয়ে নিতে পারতেন। কাজেই তার জন্যে সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা  ছিল কোনোকিছুই না করা। নিজের সম্পর্কে তার কোনো অন্তর্দন্দ্ব ছিল না। কয়েকমিনিট পর সে ত্যারুকে বলেছিল যে, ঈশ্বর বলতে কিছু নেই। থাকলে পাদ্রিদের কোনো দরকার হতো না। কিন্তু পরবর্তী পর্যবেক্ষন হতে ত্যারু বুঝতে পেরেছিল যে, তার দর্শন পাদ্রীদের কর্তৃক শহরের বিভিন্ন বাসস্থান হতে দানখয়রাতের অর্থ সংগ্রহ করার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। তারা সারাক্ষণই অর্থ সংগ্রহ করত শহরের এই এলাকা হতে। এটা সে কখনই পছন্দ করত না।  এর বাইরে বৃদ্ধ লোকটির একটা গভীর ইচ্ছে ছিল এবং  ইচ্ছেটা  সার্থক হোক তা সে মনেপ্রাণে চাইত। ইচ্ছেটি ছিল কম বয়সে মৃত্যবরণ করার।          

“সেকি একজন সন্ন্যাসী?” ত্যারু নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিল, এবং পরক্ষণেই উত্তর দিয়েছিল,” হ্যা, যদি সন্ন্যাসব্রত তার অভ্যাসগুলোর সমষ্টি হয়ে থাকে।“ 

এই সময়ে ত্যারু প্লেগ আক্রান্ত শহরের একটি দীর্ঘ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল সেই  গ্রীষ্মে শহরের মানুষদের একটা পূর্ণ ও সঠিক চিত্র উপস্থাপন করা। “কেউ হাসে না,” ত্যারু তার পর্যবেক্ষনে লিখেছিল,” শুধুমাত্র মদ্যপরা ছাড়া। তারা আবার অনেক বেশী হাসে।“ এরপর সে তার বর্ণনাটি দিয়েছিল। 

“সকালে সূর্য উঠার পর হালকা বাতাসের নিঃশ্বাস স্থির খালি রাস্তাগুলোতে ঘুরতে থাকে। রাতের শিকার ও আগমনী দিনের মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যবর্তী এই সময়ে প্লেগ চুপ করে থাকে। শুধু নিশ্বাসপ্রশ্বাস নেয়। সবগুলো দোকান বন্ধ থাকে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, কিছু দোকান কখনই খোলে না। অন্যেরা দোকান খুললেও। সকালে সূর্যোদয়ের আগে আধোঘুমের মধ্যে খবরের  কাগজের হকাররা চিৎকার করে না। রাস্তার কোণে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম করতে থাকে। নিশাচরদের মতো। একটু পরেই কারের শব্দে তারা জেগে যাবে এবং পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়বে। তাদের হাতে তখন  থাকবে খবরের কাগজের পাতা। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে প্লেগ। শিরোনামগুলো হবে এরকমঃ ‘শরৎকালে কি এই শহরে প্লেগ থাকবে? প্রফেসর ‘বি’ বলেছেনঃ ‘না’,  অথবা ‘ ৯৪তম দিনে প্লেগে মৃত্যুর সংখ্যা ১২৪'।”            

“কাগজের সল্পতার কারণে কিছু পত্রিকা পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছিল। তারপরেও শহরে  একটা নতুন পত্রিকা যাত্রা শুরু করেছিল। সেটির নাম ছিল ‘দ্য প্লেগ ক্রনিকল’। পত্রিকাটির বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য ছিল। যেমনঃ ‘শহরের মানুষদের মধ্যে প্লেগ বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো; নাগরিকদেরকে আক্রান্ত বা মৃত্যু সংখ্যার দৈনিক বৃদ্ধি বা কমার তথ্য অবহিত করা; তাদেরকে প্লেগের ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী কর্তৃত্বপূর্ণ মতামত জানানো; জনগণের মনোবল ধরে রাখার জন্যে সবাইকে একই আতিথেয়তা সেবার নীচে একত্রিত করা; কর্তৃপক্ষের পক্ষ হতে দেওয়া সকল নির্দেশাবলী প্রকাশ করা এবং যারা জরুরী পরিস্থিতিতে কার্যকরী ও আন্তরিক সহযোগিতা প্রদান করতে ইচ্ছুক তাদের সকল প্রচেষ্টাকে কেন্দ্রীভূত করা। বাস্তবক্ষেত্রে এই পত্রিকা কয়েকদিনের মধ্যেই একটি কলাম উতসর্গ করেছিল বিজ্ঞাপনের জন্যে। বিজ্ঞাপনটি ছিল ‘প্লেগের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিষেধক'।”

“প্রতিদিন সকাল ছয়টার দিকে এই পত্রিকাগুলোর বিক্রি শুরু হতো। দোকান খোলার ঘন্টাখানেক আগেই দোকানের বাইরে মানুষজনের লম্বা সারি জমে যেত। এছাড়াও শহরতলী হতে কয়েকটা কার আসত। সেগুলো ভর্তি করে পত্রিকাগুলো পাঠানো হতো। কারণ, কার ছাড়া শহরে পরিবহণের জন্যে আর কোনো যানবাহন ছিল না।”

“কারগুলো চলে যাওয়ার পর শহর ক্রমশ জেগে উঠত। ক্যাফেগুলো দরজা খুলত। ক্যাফের কাউন্টারের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত অনেকগুলো কার্ড। সেগুলোতে লেখা থাকতঃ কফি নেই, নিজেরা চিনি আনবেন, এবং ধরণের শব্দাবলী। এরপর দোকানগুলো খুলত। রাস্তাগুলো জীবন্ত হয়ে উঠত। তাপমাত্রা বাড়তে থাকত। যাদের কাজ নেই তারা এই সময়ে প্রধান সড়ক ধরে হাঁটত। তাদেরকে দেখে মনে হতো তারা  সাজসজ্জা ও বিলাসিতার প্রদর্শন দিয়ে প্লেগকে প্রতিহত করতে যাচ্ছে। প্রতিদিন আনুমানিক এগারটার দিকে যুবক-যুবতীদের এই ধরণের পোশাক প্রদর্শনী চলত। তাদেরকে দেখে বোঝা যেত যে, দুর্যোগের হৃদয়ের ভেতরেও জীবনের জন্যে উন্মত্ততা কাজ করে। মনে হতো মহামারীর প্রাদুর্ভাব বাড়লে সবার মনোবল আরও বৃদ্ধি পাবে, এবং আমরা আবার ‘মিলানের শনির উৎসব’ দেখতে পাবো। সেখানে কবরগুলোর চারপাশ ঘিরে আনন্দিত নরনারীরা নাচবে।”

“দুপুরে শহরের সকল রেস্টুরেন্টগুলো পূর্ণ হয়ে যেত। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেগুলোর দরজার কাছেও জায়গা পাওয়া যেত না। প্রবল উত্তাপের কারণে আকাশ উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলত। তখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে দুপুরের রোদে পুড়তে পুড়তে লোকজন খাবারের টার্নের জন্যে অপেক্ষা করত। রেস্টুরেন্টগুলোতে বেশী ভিড় হওয়ার কারণ ছিল যে, সেগুলো অনেকের জন্যেই খাবারের সমস্যা দূর করতে সমর্থ ছিল।  কিন্তু সেগুলোতে সংক্রমণের ভয় এড়ানোর জন্যে কোনো ব্যবস্থা ছিল না।”                                          

“খাবার খেতে আসা অনেক ক্রেতাই কয়েক মিনিট ধরে পদ্ধতিগভাবে তাদেরকে দেওয়া প্লেটগুলো মুছত। কিছুদিন পূর্বে রেস্টুরেন্টগুলোতে নোটিশও টাঙানো হয়েছিল। সেগুলোতে লেখা ছিলঃ ‘প্লেট, ছুরি ও কাটা চামচগুলো নিশ্চিতভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে।‘ তবে কিছুদিনের মধ্যেই তারা নির্দেশগুলো প্রচার করা বাদ দিয়ে দিয়েছিল। কারণ, নির্দেশগুলো না মানলেও তাদের ক্রেতার সংখ্যা কম হতো না। বরং ক্রেতারা খুশী হতো এই ভেবে যে, এখানে কেউ তাদের আচরণের উপরে নজরদারী করছে না, এবং তারা মুক্তমানুষ হিসেবে সময় পার করতে পারছে।”

“দুপুর দুইটার দিকে শহর ক্রমশ খালি হয়ে যেত। এই সময়ে নির্জনতা, সূর্যালোক, ধূলি ও প্লেগ - সবকিছুই রাস্তার উপরে চলে যেত। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতো। বিকেলের দীর্ঘ নিষ্প্রভ সময়ে শহরের লম্বা বাদামি বাড়িগুলোর উপর দিয়ে উষ্ণতার ঢেউ বয়ে যেত। ধীরে ধীরে শহরের উপরে সন্ধ্যা নেমে আসত। কিন্তু  তখনও কোনো অনিশ্চিত কারণে সন্ধ্যার রাস্তাগুলো শূন্য  থাকত। তবে খুব বেশিক্ষণ নয়। একটু পরেই  অপেক্ষাকৃত শীতল বাতাসের সাথে শহরবাসীদের  ক্লান্তি উবে যেত। যদিও তা তাদের মনে আশার সঞ্চার করতে ব্যর্থ হতো। তবে এই সময়ে তারা শহরের  খোলা মাঠে নেমে আসত। নিজেদেরকে মত্ত করত পারস্পারিক আলাপচারিতায়। যুগল প্রেমিক-প্রেমিকারা হাত ধরে মার্কেটগুলোতে যেত। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে। শুধুমাত্র উৎসাহী ধর্মপ্রচারকরা বৃথাই চিৎকার করতে থাকতঃ  ‘ঈশ্বর মহান ও মঙ্গলময়। তোমরা তার কাছে আসো।‘ কিন্তু কেউই তাদের কথা শুনত না। তুচ্ছ  লক্ষ্য ও অর্জনগুলোই তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিত।  ঈশ্বরের চেয়ে। তারা সেগুলোর দিকেই ধাবিত হতো।”

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( ত্রয়োদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( চতুর্দশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষোড়শ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ  (ঊনবিংশ পর্ব)

দ্য প্লেগ  (বিংশ পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ