কাজী মোতাহার হোসেনের ১২৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১৪ ১৪২৮,   ১৯ সফর ১৪৪৩

কাজী মোতাহার হোসেনের ১২৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

শিল্প ও সাহিত্য ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৫১ ৩০ জুলাই ২০২১  

কাজী মোতাহার হোসেন: জন্ম ৩০ জুলাই ১৮৯৭, মৃত্যু ৯ অক্টোবর ১৯৮১।

কাজী মোতাহার হোসেন: জন্ম ৩০ জুলাই ১৮৯৭, মৃত্যু ৯ অক্টোবর ১৯৮১।

তার নামের আগে পরে অনেক বিশেষণ যোগ করা যায়। এসব যোগ্যতা এমন করেই আসেনি তার নামে। তিনি একাধারে বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সঙ্গীত, দাবা, জ্ঞানতাপস, জাতীয় অধ্যাপক, দাবাগুরু ও বিভিন্ন সংগঠনের সংগঠক। মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনেও ছিলেন পুরোধা।

এতোসব বিশেষণ যার নামের সঙ্গে যায় তিনি কাজী মোতাহার হোসেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে নানার বাড়িতে ১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই তার জন্ম। তার বাবার বাড়ি ফরিদপুর জেলার পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে।

তার নামের শুরুতে কাজী লেখার একটি ইতিহাস রয়েছে। পূর্বপুরুষ ছিলেন মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে দিল্লি-দরবারে ধর্মীয় উপদেষ্টা ও বিচারক। যাকে সবাই কাজী বলেই ডাকতো। তার বাবা কাজী গওহরউদ্দীন আহমদ ও মা তসিরুন্নেসার আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। 

কাজী গওহরউদ্দীন সরকারি চাকরিজীবী হলেও সংসারে ছিলো অসচ্ছলতা। তাই মোতাহার হোসেনের পড়াশোনার খরচ জোগানো সম্ভব ছিলো না। তবে মোতাহার থেমে যান নি। বৃত্তির মাধ্যমে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। গ্রীষ্ম কিংবা পূজার ছুটিতে টিউশনি করেছেন। সেই টাকা দিয়েও পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। সেময় খরচ চালাতে শিক্ষকতাও করেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। 

ছাপার অক্ষরে তাঁর প্রথম লেখা ছাপা হয় ‘সওগাত’ পত্রিকায়। সেটা ছিল এক বিজ্ঞানবিষয়ক নিবন্ধ- ‘গ্যালিলিও’। এরপর আর থেমে থাকেননি মোতাহার হোসেন। লেখালেখির প্রথমদিকে তিনি বিদ্যাসাগরীয় ও বঙ্কিমী স্টাইলে লিখতেন; রবীন্দ্রনাথের প্রভাবও ছিল তাঁর উপর। কিন্তু পরবর্তীতে লেখালেখির জগতে তিনি তাঁর নিজস্ব স্টাইল নিয়ে আসেন, যা ছিল প্রাঞ্জল এবং সহজবোধ্য। নিজের লেখা নিয়ে তিনি বলেছেন, “আমার রচনায় যা কিছু জটিলতা তা ভাবের, ভাষার নয়।”  তাঁর ভাষার এই স্পষ্টতাই তাঁর স্বকীয়তা। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে 'সঞ্চায়ন' (১৯৩৭; প্রবন্ধ সংকলন), 'নজরুল কাব্য পরিচিতি' (১৯৫৫), 'সেই পথ লক্ষ্য করে' (১৯৫৮), 'সিম্পোজিয়াম' (১৯৬৫), 'গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস' (১৯৭০), 'আলোক বিজ্ঞান' (১৯৭৪), 'নির্বাচিত প্রবন্ধ' (১৯৭৬), 'প্লেটোর সিম্পোজিয়াম' (অনুবাদ; ১৯৬৫) অন্যতম।

তার সংসারে তিন কন্যা ও দুই ছেলে রয়েছে। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সনজীদা খাতুন, জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ ‘মাসুদ রানা’র রচয়িতা কাজী আনোয়ার হোসেন, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী এবং প্রয়াত কনিষ্ঠ পুত্র কাজী মাহবুব হোসেনও অনুবাদ সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

সাহিত্য জগতেও সরব উপস্থিতি ছিলো মোতাহার হোসেনের। ছিলো তার সময়কালের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের সঙ্গে চলাফেরা। তিনি বাংলা সাহিত্যের অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দাবা খেলার সঙ্গী ছিলেন। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু ছিলেন। কবি নজরুল সম্পর্কে তিনি অনেকগুলো প্রবন্ধ ও একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

শিক্ষাজীবনে ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় বাংলা ও আসাম জোনে প্রথম স্থান দখল করে মাসিক ত্রিশ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধীনে পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করে এমএ পাস করেন। উল্লেখ্য ওই বছর কেউ প্রথম শ্রেণি পাননি।

এমএ ক্লাসের ছাত্র থাকাকালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ডেমোনেস্ট্রেটর পদে চাকরিতে যোগ দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ। তারপর এমএ পাস করে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার পদে যোগ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন ১৯৩৮ সালে তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাধক প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আগ্রহ ও পরামর্শে কলকাতায় ড. প্রশান্তচন্দ্র মহলনবীশের অধীনে স্ট্যাস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে সংখ্যাতত্ত্ব বিষয়ে লেখাপড়া করে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যাতত্ত্ব পড়ানোর ভার নেন এবং সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন।

দেশে সংখ্যাতত্ত্ব পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে তিনিই ১৯৫০ সালে ‘ডিজাইন অফ এক্সপেরিমেন্টস’ বিষয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। কাজী মোতাহার হোসেন উদ্ভাবিত পদ্ধতি ‘হোসেইনস্ চেইন রুল’ নামে অভিহিত হয়েছে।

১৯৫৪ সালে তিনি ‘প্রফেসর’ পদ লাভ করেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ‘ডিন’ ছিলেন। ১৯৬৪ সালে কাজী মোতাহার হোসেন সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

পরে তাকে ‘সুপারনিউমেরারি প্রফেসর অব স্ট্যাটিস্টিক’ পদে নিযুক্ত করা হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (আইএসআরটি) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ছিলেন।

১৯৬৯ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর এমিরিটাস’ পদে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন উৎসবে তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ (ডিএসসি) ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ সালে তাঁকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় অধ্যাপক’ এর মর্যাদা দেয়া হয়।

পাশাপাশি কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু। দাবাগুরু মোতাহার হোসেন ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত একনাগাড়ে প্রায় ৩০ বছর অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানে একক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন।

১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর ৮৪ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় নিজ বাড়িতেই মারা যান।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম