শিশু-কিশোরদের অমর কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষ 

ঢাকা, সোমবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৮,   ১৮ সফর ১৪৪৩

শিশু-কিশোরদের অমর কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষ 

শিল্প ও সাহিত্য ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৬ ২৪ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১২:২৮ ২৪ জুলাই ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

শিশু-কিশোরদের সুপাঠ্যের তালিকায় কোনো একটি কিশোর কবিতার সম্পর্কে জানতে চাইলে মনের মাঝে অকপটেই চলে আসবে ‘পারিব না’ কবিতাটি। আশির দশক বা নব্বই দশকের সময় ধরে এই কবিতাটি বাঙালির ঘরে ঘরে শিশু-কিশোরদের পড়ানো হতো। 

কবিতাটির কবি ছিলেন কালীপ্রসন্ন ঘোষ। তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে ১২ মাইল দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ভরাকর গ্রামে ১৮৪৩ সালের ২৩ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম শিবনাথ ঘোষ।
   
‘পারিব না এ কথাটি বলিও না আর
কেন পারিবে না তাহা ভাব এক বার’
করোনাতে ঘরে থাকে
তুমি ফলো করে তাকে
ঘরে থাকা চেষ্টাটা করো তো আবার
‘এক বারে না পারিলে দেখ শত বার’।

ঘরে থাকা যন্ত্রণা? ভেবে মুখ ভার!
‘ও কথাটি মুখে যেন না শুনি তোমার’,
বিরক্ত হলে খুবই
পড় বই, দেখ মুভি
ভালোবেসে কাছে টানো দারা-পরিবার
‘ঘরে থাকি’, ‘ঘরে থাকি’ বল বার বার।

তুমি মরে গেলে ভাবো ক্ষতি হবে কার!
বাইরের ঘোরাঘুরি ছাড়ো হে এবার।
ঘরে থাকা খুবই সোজা
লাগে উপকার বোঝা
নিজ লাভ নিজে বোঝো, খেয়ো না আছাড়
কালী প্রসন্ন ঘোষে বলিছে আবার।

কালীপ্রসন্ন ঘোষের প্রাথমিক ধাপের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছেন মক্তব, চতুষ্পাঠী ও ইংরেজি স্কুলে। এরপর ভর্তি হন ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে। এখানে থেকেই এসএসসি পাস করেন তিনি। তৎকালীন সময়ে যে ডিগ্রিকে বলা হতো এন্ট্রান্স। ছোটোবেলা থেকে তার দখলে ছিলো সংস্কৃত, ফারসি ও বাংলা ভাষা। এরপর রপ্ত করেছেন ইংরেজি ভাষাও। 

মাত্র বিশ বছর তখন তিনি কলকাতার ভবানীপুরে খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশংসা পেয়েছিলেন। এরপর থেকেই ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপিত হয় এবং পরবর্তীতে তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন।

তিনি সাংবাদিক জীবন শুরু করেন ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা শুভসাধিনী সভার’ মুখপত্র ‘শুভসাধিনী’ সম্পাদনার মাধ্যমে। এ সাপ্তাহিক পত্রিকাটি তিনি প্রকাশ করেছিলেন ঢাকার ব্রাহ্মযুবকদের জন্য। চার বছর পর ১৮৭৪ সালে তিনি সম্পাদনা করেন সেই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পত্রিকা ‘বান্ধব’।

বাইশ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে ঢাকার নিম্ন আদালতে পেশকার হিসেবে কালীপ্রসন্ন ঘোষের কর্মজীবন শুরু হয়। এখানে এগারো বছর চাকরি করার তিনি ভাওয়াল এস্টেটের প্রধান দেওয়ান হিসেবে যোগ দেন এবং তিনি ভাওয়ালের প্রভূত উন্নতি সাধন করেন।

সেখানে তিনি দীর্ঘ পঁচিশ বছর যুক্ত ছিলেন। এ সময় তিনি ‘সাহিত্য-সমালোচনী সভা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। কালীপ্রসন্ন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর সদস্য (১৮৯৪) এবং সহ-সভাপতির (১৮৯৭-১৯০০) পদ অলঙ্কৃত করেন। এছাড়াও তিনি সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সদস্য এবং সদর লোকাল বোর্ডের সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

তার লেখার মধ্যে রয়েছে দর্শন ও সমাজ। প্রবন্ধ রচনাবলীর হলো প্রভাত-চিন্তা (১৮৭৭), নিভৃত-চিন্তা (১৮৮৩), নারীজাতিবিষয়ক প্রস্তাব (১৮৯৬) ও নিশীথ-চিন্তা (১৮৯৬)।

বইগুলো হচ্ছে, ভ্রান্তিবিনোদ (১৮৮১), প্রমোদলহরী (১৮৯৫), ভক্তির জয় (১৮৯৫), মা না মহাশক্তি (১৯০৫), জানকীর অগ্নিপরীক্ষা (১৯০৫), ছায়াদর্শন (১৯০৫) প্রভৃতি।

এছাড়া সঙ্গীতমঞ্জরী (১৮৭২) নামে একটি আধ্যাত্মিক সঙ্গীতসংগ্রহ এবং কোমল কবিতা (১৮৮৮) নামে একটি শিশুপাঠ্য গ্রন্থও তিনি রচনা করেন।

ইংরেজ সরকার তাকে পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৯৭ সালে রায়বাহাদুর এবং ১৯০৯ সালে সিআইই উপাধি প্রদান করে। বাংলার পণ্ডিতরা তাকে বিদ্যাসাগর উপাধিতে অভিষিক্ত করেন।

১৯১০ সালের ২৯ অক্টোবর মারা যান।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম