দ্য প্লেগ (পর্ব -১৫)

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (পর্ব -১৫)

মূল: আলবেয়ার কামু

অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৪৪ ২৯ জুন ২০২১   আপডেট: ১৯:৪৫ ২৯ জুন ২০২১

(রেয়মন্ড র‍্যাম্বার্ড। প্যারিসের একটি পত্রিকার ফিচার লেখক। সে একটা এসাইনমেন্ট নিয়ে ওরান শহরে এসেছিল। শহরকে কোয়ারেন্টাইনে স্থাপন করা হলে সে চেষ্টা করে যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন শহর থেকে চলে গিয়ে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে। কিন্তু পারেনি। তবে প্লেগের কারণে র‍্যাম্বার্ট অস্থিরচিত্তের একজন সাংবাদিক হতে দায়িত্ববান একজন মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিল। নিজ থেকেই ওরানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ডাক্তার রিও’কে সহযোগিতা করার জন্যে। ব্যক্তিগত সুখের উপরে সে নৈতিক দায়িত্বকে স্থাপন করেছিল।)      

শহরের গেইট বন্ধ করে দেওয়ার তিন সপ্তাহ পরের একদিন। বিকেলে রিও হাসপাতাল থেকে চলে যাচ্ছিল। রাস্তার উপরে সে দেখতে পেল এক যুবক তার জন্যে অপেক্ষা করছে। 

“আমাকে কি তোমার মনে আছে?” 

রিও’র মনে হলো তাকে চেনে। তবে কোথায় দেখেছে তা মনে করতে পারল না।  

“এই সমস্যা শুরুর কয়েকদিন আগে আমি তোমার সাথে দেখা করেছিলাম,” যুবকটি বলল,”আরবদের বাসস্থানগুলোতে বসবাসের অবস্থা জানতে। আমার নাম রেয়মন্ড র‍্যাম্বার্ট।'' 

“হ্যা, হ্যা, মনে পড়ছে। তোমার পত্রিকার জন্যে এখন তুমি একটা ভালো গল্প তৈরি করতে পারো।”

র‍্যাম্বার্টকে পূর্বের সাক্ষাতের সময় থেকে কম আত্মবিশ্বাসী মনে হলো। রিও’কে জানাল যে অন্য কারণে এসেছে। সে এসেছে ডাক্তারের কাছে একটি সাহায্য চাইতে।

“আমি দুঃখিত,” সে বলল, “কিন্তু এখানে আমি তেমন কোন মানুষকেই চিনি না। এছাড়া এখানে আমার  পত্রিকার যে স্থানীয় প্রতিনিধি, সে একটা অপদার্থ ধরণের মানুষ।”

রিও তাকে জানালো যে, সে শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত ডিসপেনসারিতে যাচ্ছে। র‍্যাম্বার্ট চাইলে তার সাথে হাঁটতে পারে। তারা যাচ্ছিল নিগ্রো জেলার একটি সরু রাস্তা অনুসরণ করে। বিকেল হচ্ছিল। কিন্তু শহরটি যা এই সময়ে আগে  উচ্চ শব্দে ভরে থাকত, সেটিকে মনে হচ্ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত ও নির্জন। শুধুমাত্র কয়েকটি বিউগলের শব্দ বাতাসের ভেতরে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। দিনশেষের আলোকে মনে হচ্ছিল সোনালি। শুধু সেনাবাহিনীর সদস্যেরা তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।
 
তারা শহরের উঁচুনিচু ছোট্ট রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। রাস্তার পাশে ছিল নীল, বেগুনি ও জাফরান-হলুদ রঙের দেয়াল। র‍্যাম্বার্ট অনবরত কথা বলছিল। মনে হচ্ছিল সে স্নায়ুর উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।

সে জানাল যে, স্ত্রীকে সে প্যারিসে রেখে এসেছে। আসল স্ত্রী নয়। কিন্তু তার কাছে আসল। শহরকে কোয়ারেন্টাইনে স্থাপন করার মুহূর্তে সে তাকে শেষবার টেলিফোন করেছিল। ভেবেছিল যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি খুবই অস্থায়ী হবে। পরবর্তীতে একটা চিঠিও পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পোস্টঅফিসের লোকেরা তা পাঠায়নি। স্থানীয় প্রেসে সহকর্মীরাও তাকে বলেছিল যে, তাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। এমনকি নগর-প্রধানের অফিসের করণিক অবজ্ঞাভরে তার মুখের উপরে হেসে দিয়েছিল। ফলে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর শুধুমাত্র একটা টেলিগ্রামই সে পাঠাতে পেরেছিল। সেখানে সে লিখেছিলঃ সবকিছুই ভালো চলছে। আশা করছি খুব তাড়াতাড়িই তোমাকে দেখতে পাব।       
কিন্তু পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে জাগার পর সে অনুভব করেছিল যে, এই পরিস্থিতির শেষ সে একেবারেই জানে না। সুতরাং সে শহর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পেশাগত পরিচয়ের কারণে নগর প্রধানের অফিসের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার সাথে একটি ইন্টার্ভিউয়ের ব্যবস্থা করতেও সে সক্ষম হয়েছিল। তাকে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিল যে, ওরানে তার আগমন ছিল কাকতালীয়। এই শহরের সাথে তার কোনই সংযোগ না থাকায় এই শহরে থাকার কোন যৌক্তিক কারণ নেই তার। এই শহরের বাইরে যেখানে সে যাবে, সেখানেও তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে কোয়ারেন্টাইন পালন করতে হবে। সুতরাং নগর কর্তৃপক্ষ তাকে শহর ত্যাগ করে চলে যাবার অনুমতি দিতে পারে। কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছিল যে, যদিও তার কথায় যুক্তি আছে, তথাপি তাকে নিয়ে কোন ব্যতিক্রম করতে তারা সক্ষম নয়। তবু সে তার জন্যে চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছিল। এটাও বলেছিল যে, বিরাজমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কোন সিদ্ধান্তের আশা করে না, কারণ কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতিকে আসলেই জরুরী বলে ভাবছে।

“কিন্তু আমার বিষয়টা তো অন্যরকম,” র‍্যাম্বার্ট উচ্চস্বরে বলেছিল, “আমি তো এই জায়গার মানুষ নই।”

“অবশ্যই। তবে আমরা আশা করছি যে, মহামারী খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। “পরিশেষে সে র‍্যাম্বার্টকে এই বলেও  সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, সাংবাদিক হিসেবে তার একটা অসাধারণ সুযোগ এসেছে কাজ করার জন্যে।  আসলে বিষয়টাকে আমরা যতই খারাপ মনে করি না কেন, সেটারও একটা ভালো দিক রয়েছে। এরপর র‍্যাম্বার্ট বিরক্ত হয়ে ঘাড় নাড়িয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিল।

কথা বলতে বলতেই রিও আর র‍্যাম্বার্ট তারা শহরের কেন্দ্রস্থলে চলে এসেছিল। 

“এই ধরণের কথা অসহনীয়। আমার কি শুধুমাত্র খবরের কাগজের আর্টিক্যাল লেখার জন্যে পৃথিবীতে জন্ম হয়েছে? অবশ্যই হয়নি। বরং আমি নিশ্চিত যে, আমাকে এই পৃথিবীতে আনা হয়েছে কোন নারীর সাথে একত্রে বাস করার জন্যে। আমি কি অযৌক্তিক কিছু বলছি, ডাক্তার?”

রিও সতর্কভাবে তাকে উত্তর দিল। এই ভেবে যে, তার কথার ভেতরে এমনকিছু থাকা সম্ভব যা র‍্যাম্বার্টকে আঘাত করতে পারে।  
সেন্ট্রাল বুলেভার্ডটি অন্য সময়ের মতো জনাকীর্ণ ছিল না। শুধু কিছু লোকজন তাড়াহুড়ো তাদের দূরের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিল। তাদের কারো মুখেই হাসি ছিল না। রিও’র অনুমান যে, এটা নগর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ ঘোষণার ফল। তারা বলেছিল পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার ভেতরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সেই সময়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান সম্পর্কে শহরের সবাই অবহিত ছিল।     

“সত্য হলো,” র‍্যাম্বার্ট হঠাৎ করে মন্তব্য করল,” সে আর আমি একসাথে ছিলাম খুবই অল্প সময়। কিন্তু আমাদের  পরস্পরের খুব মিল হয়ে গিয়েছিল। “রিও কোন মন্তব্য না করায় সে আবার বলতে লাগল,”মনে হয় আমি তোমাকে বিরক্ত করছি। দুঃখিত। তবে আমি যে জিনিসটা জানতে চাইছি, তা হলো, আমার প্লেগ হয়নি, এই মর্মে তুমি আমাকে কোন সার্টিফিকেট দিতে পারো কিনা। এটা পেলে আমার চলে যাবার কাজটা সহজ হতে পারে।”

রিও মাথা নাড়ল। একটা ছোট্ট বালক হঠাত দৌড়ে এসে তার পায়ের সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে গেল। সে ছেলেটিকে হাত দিয়ে ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে তারা ডি’আরমেস নামক একটি জায়গায় পৌঁছাল। এখানে  ধূলিতে ঢাকা পাম গাছ এবং ডুমুর গাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রান্তরের ভেতরে একটা প্রজাতন্ত্রের মূর্তি। সেটির উপরেও ধূলির আস্তরণ জমে গেছে। তারা মূর্তিটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। রিও টালি পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে ঝাঁকি দিয়ে তার কোটের উপরে জমা হয়ে থাকা সাদা ধুলো ঝাড়ল। র‍্যাম্বার্ট কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিল। তার মন খুবই খারাপ। 

“আমি তোমাকে সম্পূর্ণ বুঝতে পারছি,” রিও বলল,”তবে তোমার যুক্তি ধোপে টিকবে না। আমি তোমাকে সার্টিফিকেট দিতে পারব না। কারণ, আমি জানি না যে, তোমার আসলেই রোগ আছে কিনা। এমনকি আমি তোমাকে সার্টিফিকেট দিলেও আমার রুম থেকে নগর প্রধানের অফিসে যাবার পথে তুমি যে সংক্রামিত হবে না, তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে?”  
         
“তারপরেও তুমি চাইলে আমাকে সার্টিফিকেট দিতে পারো।”

“সেটাও তোমার কোন কাজে আসবে না।”

 “কেন?” 

“কারণ, তোমার মতো শহরের অজস্র মানুষ অপেক্ষা করছে। তাদেরকে শহরের বাইরে যেতে দেওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না।  
“যদি তাদের প্লেগ না হয়ে থাকে, তারপরেও?” 

“হ্যা। এই কারণ তাদেরকে বাইরে যেতে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়। আমি জানি যে পরিস্থিতি কতটা অস্বাভাবিক। কিন্তু এর সাথে আমরা সবাই জড়িয়ে গিয়েছি। আমাদের সকলকে এভাবেই মেনে নিতে হবে।”
 
“কিন্তু আমি তো এই শহরের মানুষ নই।”

“দুঃখজনকভাবে এখন থেকে তুমি এই শহরেরই একজন। অন্য সবার মতো।” 

র‍্যাম্বার্ট তার কণ্ঠস্বর কিছুটা উচ্চকিত করল। 

“কিন্তু ডাক্তার, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে, এটা একটি সাধারণ মানবিক অনুভূতির ব্যাপার? নাকি তুমি মনে করো যে প্রিয়জনদের পরস্পর থেকে দূরে থাকাই স্বাভাবিক?”

রিও মুহূর্তের জন্যে নীরব থাকল। তারপর বলল যে, বিষয়টি সে খুব ভালোভাবেই বোঝে। সে নিজেও চায় যে র‍্যাম্বার্টকে তার স্ত্রীর কাছে ফিরে যাক এবং আলাদা হয়ে যাওয়া সকল প্রিয়জনেরা আবার একত্রিত হোক। কিন্তু প্লেগের এই সময়ে সে শুধু তাই করতে পারে, যা করতেই হবে।

“না,” র‍্যাম্বার্ট তিক্ততার সাথে বলল,” তুমি বুঝতে পারছ না। তুমি যুক্তির কথা বলছ, হৃদয়ের কথা বলছ না। তুমি এক বিমূর্ত পৃথিবীতে বাস করছ।”

ডাক্তার প্রজাতন্ত্রের মূর্তির দিকে তাকাল। তারপর বলল যে, সে যুক্তির ভাষা বলছে কিনা তা সে জানে না। তবে সে এইটুকু জানে যে, সে সত্য বলছে।

সাংবাদিক হাত গুঁজে তার টাইকে সোজা করল। 

“সুতরাং আমি ধরে নিচ্ছি যে, আমি তোমার কাছ থেকে কোন সাহায্য আশা করতে পারি না। খুব ভালো।“ তারপর তার কণ্ঠস্বর চ্যালেঞ্জের মতো শোনাল,”আমি এই শহর ছেড়ে যাবই।”

ডাক্তার পুনরায় বলল যে, সে বুঝতে পেরেছে। তবে সেটিতে তার করণীয় কিছু নেই। 

“অবশ্যই তোমার করণীয় আছে,” র‍্যাম্বার্ট পুনরায় তার কণ্ঠস্বরকে উঁচু করল। “আমি তোমার কাছে এসেছিলাম এই কারণে যে, আমাকে বলা হয়েছে যে, শহরে আদেশগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বেশীরভাগ তোমার পক্ষ হতেই দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমি ভেবেছিলাম যে, হয়ত বা একটামাত্র ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করার জন্যে তুমি ছাড় দিতে পারবে। কিন্তু তুমি মানুষের কষ্ট বোঝ না। তুমি বিবেচনাই করতে পারছ না যে, যারা প্রিয়জনদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে, তাদের আসল অবস্থাটা কি।”

রিও স্বীকার করল যে, অভিযোগটা একটা পর্যায় পর্যন্ত সত্য; এই বিষয়গুলো সে বিবেচনায় নিতে চায়নি। 

“বুঝতে পারছি,” র‍্যাম্বার্ট চিৎকার করে উঠল। “আমি জানি তুমি এখন সাধারণ জনগণের স্বার্থ নিয়ে বলবে। কিন্তু জানো তো সাধারণের স্বার্থ তো প্রত্যেক ব্যক্তির স্বার্থের যোগফল মাত্র।

ডাক্তারের মনে হলো সে হঠাত করে স্বপ্নাচ্ছন্নতা থেকে বেরিয়ে এল।  
 
“অবশ্যই তুমি ঠিক,” সে বলল। “তবে এর ভেতরে আরও ব্যাপার আছে। এই সব ক্ষেত্রে কখনোই এত দ্রুত উপসংহারে পৌঁছা যায় না। তবে বিষয়টি নিয়ে তোমার রাগান্বিত হবারও কারণ নেই। তুমি যদি এই সমস্যা থেকে বের হবার কোন উপায় বের করতে পারো, তাহলে আমি খুবই খুশী হব। আমার অফিশিয়াল অবস্থানই এক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে।    
   
র‍্যাম্বার্ট  বিরক্তি সহকারে মাথা নাড়ল।  

“হ্যা, তোমার সাথে রাগ করা আমার উচিৎ হয়নি। আমি ইতিমধ্যেই তোমার অনেক সময় নিয়ে নিয়েছি।”

রিও তাকে জিজ্ঞেস করল কিভাবে তার প্রোজেক্ট নিয়ে এগোচ্ছে। সে তাকে তার উপরে মন খারাপ না করতে অনুরোধ করল। শেষে বলল যে, দুজনের পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটা বিষয়ে সে তার সাথে পরে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছুক। র‍্যাম্বার্টকে হতবাক দেখালো।  
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর  র‍্যাম্বার্ট বলল, “আমার মনে হয় তুমি এতক্ষণ আমাকে যা বলেছ, তা ঠিকই বলেছ। যদিও আমি এখনও তোমার সাথে একমত নই। এরপর মাথার হ্যাটকে চোখের উপর পর্যন্ত নামিয়ে দিয়ে সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। রিও তাকে কাছের একটি হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখল। এই হোটেলেই ত্যারু থাকত।    

একটা চিন্তা রিও’র মাথার ভেতরে ঘুরছিল। সাংবাদিক তাকে বলেছে যে, রিও বিমূর্ত পৃথিবীতে বাস করছে। এটা কি আসলেই সত্য? সেকি বিমূর্ততা বলতে রিও’র হাসপাতালে অবস্থানের কথা বুঝিয়েছে, যখন সারা শহর মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে এবং মৃত্যু সংখ্যা সপ্তাহে পাঁচ শত ছাড়িয়ে গেছে? হ্যা, এর ভেতরে বিমূর্ততার উপাদান অবশ্যই আছে। কিন্তু এই বিমূর্ততা নিয়ে ব্যস্ত হবার যৌক্তিকতাও তার আছে। রিও’র জানামতে সে সহজ কিছু করছিল না। পরিচালক হিসেবে একটি অক্সিলারি হাসপাতাল পরিচালনা করা চাট্টিখানি কথা নয়। এই হাসপাতালে সার্জারি কক্ষের আগে একটি এন্টিরুম আছে। যেখানে রোগীদেরকে অপারেশনের পূর্বে রাখা হয়ে থাকে। এই রুমের মেঝে খনন করে সেখানে পানি ও এসিডের দ্রবণ দিয়ে জলাশয় তৈরি করা হয়েছে। এর কেন্দ্রে ইটের তৈরি একটা দ্বীপের মতো জায়গা তৈরি করা আছে। রোগীদেরকে এই দ্বীপে এনে দ্রুত কাপড়চোপড় খুলে ফেলা হয়। অতঃপর সেগুলোকে জীবাণুনাশক পানির ভেতরে নিক্ষেপ করা হয়। শেষে রোগীকে পরিষ্কার করে ধুয়ে, শুকিয়ে ও হাসপাতালের মোটা কাপড় পড়িয়ে রিও’র পরীক্ষার জন্যে নিয়ে যাওয়া হয়। অপারেশন বা চিকিৎসা শেষে তাদেরকে ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। এই হাসপাতাল মূলত একটি রিকুইজিশন করা স্কুল ঘর। এটিতে বর্তমানে পাঁচশত বেড থাকলেও কয়েকটি ছাড়া সবগুলোতেই রোগী আছে। 

রোগীদেরকে গ্রহণ করার পর রিও ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে দেখাশুনা করে। সিরাম ইনজেকশন দেয়। ফোঁড়াগুলোর অপারেশন করে। তাদের পরিসংখ্যান চেক করে। এরপর সে বিকেলের দিকে শহরের রোগীদের কনসাল্টেশন করার জন্যে বাসস্থানে ফিরে আসে। রাত শুরু হবার পর তার পরিদর্শন শুরু হয়। রাত গভীর হবার পূর্ব পর্যন্ত সে বাসায় ফিরতে পারে না। বিগত রাতে তার মা তাকে স্ত্রীর টেলিগ্রাম হস্তান্তর করার সময়ে বলেছিল যে, তার হাত কাঁপছে।    

“হ্যা,” সে মাকে বলেছিল। “এটা সম্ভবত ব্যস্ততার কারণে হচ্ছে। দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে।”

রিও’র শারীরিক গঠন ছিল খুবই শক্ত-সামর্থ্য। এখন পর্যন্ত সে সত্যিকার অর্থে ক্লান্ত হয়নি। তবে বিকেলের রোগী দেখতে যাওয়ার বিষয়টি তার সহ্যক্ষমতার উপরে আসলেই চাপ সৃষ্টি করছিল। রোগী দেখার সময়ে রোগ শনাক্ত  হবার অব্যবহিত পরেই তাকে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হতো এবং সে সময়েই শুরু হতো র‍্যাম্বার্টের  বলা সেই abstraction বা বিমূর্ততা। নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীকে তার পরিবারের সদস্যরা দেখতে আসতে পারত না। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে অথবা মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু রোগীর আত্মীয়স্বজন তা মানতে চাইত না। তারা রোগীকে দেখার জন্যে বা তার কাছে থাকার জন্যে রিও’র কাছে এসে আবেদন, অনুরোধ, এমনকি  কান্নাকাটিও করত। কিন্তু রিও’র করার কিছুই থাকত না। রোগটি সংক্রামক হবার কারণে। ফলে পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, শনাক্ত হবার পরেও লোকজন রোগীদেরকে হাসপাতালে পাঠাতে চাইত না। এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনলেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত। রিও’কে তখন পুলিশ, এমনকি পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে হতো রোগীদেরকে জোর করে ছিনিয়ে এনে হাসপাতালে ভর্তি করতে। রিও’র জন্যে এটাই ছিল প্রতিদিনের দৃশ্য। নতুন করে বারংবার ঘটত। ফলে প্লেগ তার সমস্ত বিমূর্ততা দিয়ে রিও’কেই ক্রমশ পরিবর্তন করে ফেলেছিল। প্রজাতন্ত্রের মূর্তির পাদদেশে দাঁড়িয়ে রিও বিমূর্ততাকেই অনুভব করল এবং একটা অস্পষ্ট উদাসীনতা ক্রমশ তাকে গ্রাস করতে লাগল।

প্রতি সপ্তাহের শেষে সন্ধ্যার পর শহরের লোকেরা রাস্তায় নেমে আসত। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করত। এই  সময়ে রিও’র ভেতরে একটা বোধ জন্ম নিত। মনে হতো যে, কারও দয়ার দরকার নেই। শুধুমাত্র অপদার্থরাই দয়ার আশা করে। এই বোধ তার ভেতরে এক ধরণের  সান্ত্বনার সৃষ্টি করত। সে জানত যে, এটা তার কাজকে সহজ করবে। কারণ, বিমূর্ততার সাথে যুদ্ধ করার জন্যে নিজের চরিত্রের ভেতরেও কিছুটা বিমূর্ততা থাকতে হয়।

কিন্তু র‍্যাম্বার্ট তার এই ব্যাপারগুলো অনুভব করবে কি করে? তার কাছে বিমূর্ততা হলো সুখের পথে অন্তরায়। রিও নিজেও স্বীকার করেছিল যে, এক অর্থে সাংবাদিক চিন্তাই করত। কিন্তু সে এটাও জানত যে, বিমূর্ততা কোন কোন সময়ে সুখের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে থাকে। শুধুমাত্র তখনই সেটাকে বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ঠিক এটাই ঘটেছিল র‍্যাম্বার্টের জীবনে। অনেক পরে র‍্যাম্বার্ট তাকে বলেছিল যে, ব্যক্তিগত সুখ ও বিমূর্ততার মধ্যে বিমূর্ততাকেই তাকে শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছিল। প্লেগের কারণে। কারণ এই প্লেগ ওরান শহরের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল দীর্ঘকাল ধরে।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( ত্রয়োদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( চতুর্দশ পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ