দ্য প্লেগ (পর্ব -১৪)

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (পর্ব -১৪)

মূলঃ  আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ  মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:২৯ ২৩ জুন ২০২১  

একভাবে চিন্তা করলে, পরিবর্তনগুলো এতোটাই উদ্ভট ও পলায়নপর ছিল যে, এগুলোকে স্থায়ী ভাবার কোন যৌক্তিকতা ছিল না। ফলে আমরা সবাই ব্যক্তিগত অনুভূতিকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছিলাম। শহরের গেইট বন্ধ করে দেওয়ার দুইদিন পর রিও’র সংগে কটার্ডের দেখা হলো। হাসপাতালের পাশের রাস্তায়। তাকে আনন্দিত ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। রিও তার অবস্থার উন্নতি দেখে তাকে  স্বাগত  জানালো।

“হ্যা,” কটার্ড বললো, “আমি খুবই ভালো আছি। আগে কখনোই এতোটা ভালো ছিলাম না। তবে ডাক্তার, প্লেগের খবর কি? আসলেই তো ওটা কঠিন পরিস্থিতি ধারণ করছে, তাই নয় কি?” ডাক্তার মাথা নেড়ে সায় দিলে সে উচ্ছ্বসিতভাবে বলতে লাগল, “আমার ধারণা ওটা আর থামবে না। এই শহর একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।’’
         
তারা কিছুদূর একসাথে হেঁটে এগিয়ে গেল। কটার্ড রাস্তার পাশের এক মুদীর গল্প বলল, যে টিনজাত খাবার মজুদ করছিল। পরে বেশী লাভে বিক্রি করার জন্যে। হাসপাতাল থেকে এ্যাম্বুলেন্সের লোকেরা যখন তাকে নিতে এসেছিল, তখন তার খাটের নীচ থেকে কয়েক ডজন মাংশের ক্যান পাওয়া গিয়েছিল।

“সে হাসপাতালেই মারা গিয়েছিল। কোন টাকাই তাকে প্লেগ থেকে রক্ষা করতে পারেনি।“ মহামারী সম্পর্কে কটার্ড   এই ধরণের গল্পের ভাণ্ডার ছিল। সত্য বা মিথ্যা যাই হোক না কেন। একটা গল্প ছিল একজন সম্পর্কে যার ভেতরে প্লেগের লক্ষণ ছিল। প্রবল জ্বর নিয়ে লোকটি রাস্তার উপরে পড়ে যেতে যেতে সে একটি মহিলাকে আঁকড়ে ধরে আলিঙ্গন করেছিল।    

“ব্যাপারটা তার জন্যে আনন্দকরই হয়েছিল,” কটার্ড মন্তব্য করেছিল। তবে তার পরবর্তী মন্তব্য ছিল বিপরীতমুখী,  ”আর বেশী দেরী নেই। আমাদের সবার অবস্থাই সেই লোকটির মতো হবে। যদি আমার ধারণা ভুল না হয়ে থাকে।’’ 

সেদিন বিকেলেই গ্র্যান্ড রিও’র কাছে তার মনের কথা খুলে বলেছিল। ডেস্কের উপরে রিও’র স্ত্রীর ছবি দেখে সে রিও’র দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। রিও তাকে জানিয়েছিল যে, তার স্ত্রী শহর থেকে কিছুদূরের একটা স্যানিটরিয়ামে চিকিৎসাধীন আছে। “এক হিসেবে বলতে গেলে এটাই ভালো হয়েছে,“ গ্র‍্যান্ড  বলেছিল। ডাক্তারও স্বীকার করে নিয়েছিল  যে, এক অর্থে সে ভাগ্যবান ছিল। তবে এটাও বলেছিল যে, তার স্ত্রীর সুস্থতা অর্জনই তার কাছে বড় ব্যাপার।     

“ ঠিক,” গ্র্যান্ড বলেছিল,” আমি বুঝি।’’

তারপর রিও’র সাথে দেখা হবার পর প্রথমবারের মতো সে অনর্গল কথা বলেছিল। যদিও কথা বলার সময়ে পূর্বের মতো সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে তার কষ্ট হচ্ছিল। তবুও এগুলোই ছিল সেই কথা, যেগুলো সে বছরের পর বছর চিন্তা করছিল।     

কিশোর অবস্থায় সে একটি মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। তার বাড়ির কাছের এক গরীব পরিবার হতে। সত্যি হলো এই বিয়ে করার জন্যে তাকে পড়াশুনা ছাড়তে এবং বর্তমান চাকুরী নিতে হয়েছিল। বিয়ের পর সে অথবা তার স্ত্রী জেনি শহরের এই অংশ ছেড়ে আর কোথাও যায়নি। বিয়ের আগে প্রেম করার সময়ে গ্র্যান্ড জেনিদের বাড়িতে যেত তাকে দেখার জন্যে। জেনির পরিবারের সদস্যরা তার লজ্জিত ও চুপচাপ স্বভাবের প্রেমিককে নিয়ে কৌতুক করত। জেনির  বাবা ছিলেন একজন রেলের একজন কর্মচারী। ডিউটি না থাকার সময়ে তিনি বাসার কোণের একটি জানালার পাশে বসে, হাত-পা ছড়িয়ে পথচারীদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তার স্ত্রী সারাক্ষণ গৃহস্থালির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। জেনি তাকে সাহায্য করতো। জেনি আকৃতিতে খুবই ছোট ছিল। সে যখনই রাস্তা পার হতো, তখন গ্র্যান্ড খুবই ভয় পেয়ে যেত। তার মনে হতো যে, বিশালাকৃতির গাড়িগুলো যেকোন সময়েই তাকে চাপা দিয়ে যেতে  পারে। খ্রিস্টমাসের আগে একদিন তারা দুজনে হাঁটতে বেরিয়েছিল। পথে থেমে রাস্তার পাশে খুব সুন্দরভাবে সাজানো একটা দোকানের জানালা দেখছিল। মুগ্ধভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর জেনি তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,” কী সুন্দর, তাই না?” এভাবেই তাদের বিয়ে এগিয়ে এসেছিল।                   

গল্পের বাকি অংশ, গ্র্যান্ডের মতে ছিল খুবই সরল। সাধারণ বিবাহিত দম্পতিদের মতো। বিয়ে করো। স্ত্রীকে বেশী বেশী ভালবাসতে শুরু করো। এটা করতে গিয়ে তোমাকে কাজ করতে হবে। এক সময়ে তোমাকে এতোই কাজ করতে হবে যে, তুমি ভালোবাসতে ভুলে যাবে। যেহেতু গ্র্যান্ডের অফিসের বড় কর্তা তার অঙ্গিকার রাখেননি, সেহেতু জেনিকেও বাইরে কাজ করতে হতো। এই সময়ে গ্র্যান্ড আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছিল, সে সম্পর্কে কিছুটা কল্পনার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, জেনির পক্ষ হতে। কারণ, অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে গ্র্যান্ড ক্রমশ নিজের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। ফলে সে কথা বলছিল কম এবং স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছিল। একজন অতিরিক্ত পরিশ্রম করা স্বামী, দারিদ্র, ভবিষ্যতের প্রতি আশাহীনতা, বাড়ির নিশ্চুপ বিকেল – এগুলোর ভেতরে তার আবেগ মরে গিয়েছিল। সম্ভবত জেনি কষ্ট পাওয়ার পরেও তার সাথে থেকে গিয়েছিল। অবশ্য কেউ কেউ হয়ত অনেক সময় পার করে দেয় কষ্ট বুঝতে না পেরেই। ফলে বছরের পর বছর এভাবেই কেটে গিয়েছিল। তারপর একদিন জেনি তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই একা যায়নি। গ্র্যান্ডের শান্তি কেড়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। যাবার আগে চিঠিতে লিখে গিয়েছিল, “আমি তোমাকে খুবই ভালবাসতাম। কিন্তু এখন আমি খুবই ক্লান্ত। যেতে আমার ভালো  লাগছে না। এমনকি নতুন করে জীবন শুরু করতেও।’’          

গ্র্যান্ড নিজেও খুব কষ্ট পেয়েছিল। সেও চেয়েছিল নতুন করে শুরু করতে। কিন্তু নিজের উপরে সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। শুধুমাত্র জেনিকে চিন্তা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেনি সে। সে যা চাচ্ছিল, তা হলো জেনিকে একটা চিঠি লিখতে। নিজের যুক্তিসঙ্গতা প্রমাণ করার জন্যে। 

“কিন্তু বিষয়টা সহজ নয়,” সে রিও’কে বলেছিল। “আমি বিষয়টা নিয়ে অনেক বছর থেকে চিন্তা করেছি। আমরা দু’জন যখন পরস্পরকে ভালোবাসতাম, তখন নিজেদেরকে বোঝানোর জন্যে আমাদের শব্দের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু মানুষেরা চিরকাল ভালোবাসে না। একটা সময় এসেছিল, যখন আমার উচিৎ ছিল কিছু শব্দ খুঁজে বের করা, তাকে আমার সাথে রাখার জন্যে। কিন্তু আমি পারিনি।“ গ্র্যান্ড তার পকেট থেকে ডাস্টারের মতো কিছু একটা বের করলো এবং শব্দ করে নাক ঝাড়ল। তারপর গোঁফ আঁচড়াল। রিও তার দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকাল। “আমাকে মাফ করে দিও ডাক্তার,” গ্র্যান্ড দ্রুততার সাথে বললো। “কিভাবে বিষয়টা বলা যায়? আমি মনে করি যে, তোমাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি বলেই তোমার সাথে এই কথাগুলো বলেছি। এবং তোমাকে বলতে পেরে আমার মন কিছুটা হলেও শান্ত হয়েছে।’’     

নিঃসন্দেহে গ্র্যান্ডের চিন্তাগুলো প্লেগ হতে অনেক দূরের বিষয় ছিল। 

সেদিন বিকেলে রিও তার স্ত্রীকে টেলিগ্রাম পাঠালো। জানালো যে, শহরে লকডাউন দেওয়া হয়েছে। সে যেন তার খুব যত্ন নেয়। সেই সাথে এটাও জানাতে ভুলল না যে, সে তার সমস্ত চিন্তা জুড়ে আছে।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( ত্রয়োদশ পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ