দ্য প্লেগ (পর্ব -১৩) 

ঢাকা, শনিবার   ২৭ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৩ ১৪২৮,   ২০ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (পর্ব -১৩) 

মূলঃ  আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ  মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৫৮ ২২ জুন ২০২১   আপডেট: ১৯:৫৯ ২২ জুন ২০২১

বিরাজমান পরিস্থিতিতে শহরের নাগরিকেরা তাদের উপরে আকস্মিকভাবে আপতিত একাকীত্ব ও প্লেগের সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল। নগরের গেইটগুলোতে পাহারাদার নিয়োগ করা হয়েছিল। ওরানে আগমনের জন্যে নির্ধারিত জাহাজগুলোকে পোতাশ্রয়ে ভিড়তে দেওয়া হচ্ছিলো না। প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়ার পর কোন যানবাহনকেই শহরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র শহরের ভেতরের কারগুলো বৃত্তাকারে আবর্তন করছিল। 

বুলেভার্ড থেকে পোতাশ্রয়টির চেহারাও দেখতে হয়েছিল অদ্ভুত। বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে পোতাশ্রয়টি এই উপকূলের অন্যতম বড় পোতাশ্রয় হিসেবে পরিগণিত হতো। কিন্তু হঠাত করে এর সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র কোয়ারেন্টাইনের কারণে আটকে পড়া কয়েকটি জাহাজ বে-তে নোঙর করা ছিল। কিন্তু ডকের উপরে বিশাল, অলস ক্রেনগুলো পড়ে ছিল। নিশ্চুপভাবে। সেগুলোর পাশে স্তূপীকৃত হয়ে পড়েছিল ছালা ও ব্যারেলগুলো। সবকিছুই  সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে, প্লেগের কারণে শহরের ব্যবসাবাণিজ্যও মরে গিয়েছিল।                    

এই ধরণের অস্বাভাবিক দৃশ্যের কারণে শহরের মানুষেরা অনুধাবন করতে সক্ষম ছিল না যে, তাদের ভাগ্যে আসলে  কী ঘটতে যাচ্ছে। তাদের ভেতরে শুধুমাত্র ভয় ও বিচ্ছেদের অনুভূতি কাজ করছিল। অবশ্য ব্যক্তিস্বার্থের বিষয়গুলোও  তাদের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় ছিল। তবে সেই সময় পর্যন্ত কেউই নিজেকে প্লেগ রোগের সাথে সম্পর্কিত বলে ভাবছিল না। 

অধিকাংশ মানুষই নিজেদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবার বিষয় নিয়ে সচেতন ছিল। সবাই চিন্তিত ও বিরক্ত হয়েছিল। তবে এগুলো প্লেগের মুখোমুখি হবার অনুভূতি ছিল না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। নগরপ্রধানকে তারা গালাগালি করছিল। একইভাবে নগরপ্রধানও সংবাদপত্রের মাধ্যমে নাগরিকদের অভিমতকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করছিলেন। তার আরোপিত নিয়মনীতিগুলোকে সংশোধন করে  সহজ না করে আরও কঠিন করছিলেন। সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল যে, সংবাদপত্র বা ইনফরমেশন ব্যুরো কেউই প্লেগ সম্পর্কিত কোন অফিশিয়াল পরিসংখ্যান প্রদান করছিল না। নগর প্রধান ইনফরমেশন ব্যুরোকে প্রতিদিন তথ্য সরবরাহ করতেন। কিন্তু একইসাথে নির্দেশ দিতেন মৃত্যুর পরিসংখ্যান সপ্তাহে একবারমাত্র প্রকাশ করার জন্যে। ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বিপরীতে নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া আশানুরূপ ছিল না।          

একারণে প্লেগের তৃতীয় সপ্তাহে তিনশত দুই জনের মৃত্যু সংক্রান্ত পরিসংখ্যান তাদের ধারণার উপরে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছিল। শহরের মানুষেরা ভেবেছিল যে, এই মৃত্যুগুলো সম্ভবত প্লেগের কারণে হয়নি।

এছাড়াও শহরের কোন ব্যক্তিরই সাধারণ সময়ে শহরের সাপ্তাহিক গড় মৃত্যুর হার সম্পর্কে ধারণা ছিল না। শহরের জনসংখ্যা ছিল দুই লাখের মতো। তারা কেউ জানতো না যে, বর্তমান মৃত্যুর হার আসলেই অস্বাভাবিক ছিল কিনা। আসলে এই পরিসংখ্যান নিয়ে কারো ভেতরেই কোন মাথাব্যাথা ছিল না। সংক্ষেপে নাগরিকদের কাছে তুলনা করার মতো কোন নির্ধারিত মান ছিল না। ফলে সময়ের পরিক্রমায় মৃত্যু হারের ক্রমাগত বৃদ্ধিই শুধুমাত্র নাগরিকদের মতামতকে কিছুটা প্রভাবিত করতো। পঞ্চম সপ্তাহে তিনশত একুশ এবং ষষ্ঠ সপ্তাহে তিনশত পঁয়তাল্লিশ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই সংখ্যাগুলো থেকে তারা এমনিতেই অনুভব করতে পারছিল যে, মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে।

তবে এই বর্ধিত মৃত্যুহার নাগরিকদের ভেতরে কোন বোধদয়ের সৃষ্টি করেনি। তারা ভাবছিল যে, যা ঘটেছে তা দুর্ঘটনা বা সাময়িক কোন ব্যাপার ছাড়া কিছুই নয়।     

সুতরাং তারা স্বাভাবিকভাবে শহরের ভেতরে ঘোরাফেরা করছিল। ক্যাফেগুলোর উঠোনে বসে ভিড় জমাচ্ছিল। সাধারণভাবে তাদের ভেতরে সাহসের কোন অভাব ছিল না। তারা দুঃখ করার চেয়ে কৌতুক বেশী করছিল, এবং আনন্দের সাথে বিরাজমান অপ্রীতিকর অবস্থাকে মেনে নিয়েছিল। এই ভেবে যে, এগুলো সাময়িক। সংক্ষেপে তারা তাদের বাইরে বের হওয়া ও চলাচলকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করছিল না। যাই হোক, মাসের শেষদিকে সাপ্তাহিক প্রার্থনার সময়ে (এবিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত বর্ণনা করা হবে) শহরের অবস্থা আসলেই ভীতিকর হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই পর্যায়ে নগর প্রধান নাগরিকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যানবাহনের জন্যে গ্যাসোলিন সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। খাদ্যদ্রব্য বিক্রির উপরে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। এমনকি বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে দেওয়ার জন্যেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।     

শুধুমাত্র অতিপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সড়কপথে বা বিমানে করে ওরানে নিয়ে আসা হচ্ছিল। ফলে ক্রমাগতভাবে শহরের ট্রাফিক  কমে গিয়েছিল। হাতেগোনা কিছু সংখ্যক প্রাইভেট কারকে শহরের বুকে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছিল।  শহরের সকল শৌখিন জিনিসের দোকানগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। রাতারাতি। অন্যেরা দোকানের সামনে “বিক্রয় শেষ” নোটিস টাঙিয়ে দিয়েছিল। ক্রেতারা দোকানের দরজায় ভিড় করা সত্ত্বেও।

এভাবে একসময়ে ওরান নতুন রূপ ধারণ করেছিল। শহরের রাস্তায় পথচারীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। দোকান ও অফিসগুলো বন্ধ  থাকার কারণে শহরের ক্যাফেগুলোতে লোকজনের ভিড় ছিল না। তাদের জন্যে এগুলো বেকার অবস্থা ছিল না; ছিল ছুটির দিন। সুতরাং দিনের উজ্জ্বল অংশে, বিশেষকরে বিকেল তিনটের দিকে শহরের লোকজন দল বেঁধে আনন্দিতভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কারণ, এই সময়ে দোকানগুলো বন্ধ থাকত এবং রাস্তায় কোন যানবাহন চলাচল করতো না।          

স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতে শুধুমাত্র সিনেমাহলগুলো লাভবান হয়েছিল। তারা মুঠ ভর্তি করে টাকা রোজগার করেছিল। তবে তাদের একটা সমস্যা ছিল। সেটা হল এই অঞ্চলে অন্য এলাকা হতে ছবি পাঠানো বাতিল করা হয়েছিল।ফলে শহরের সিনেমাহলগুলো নতুন কিছুর আয়োজন করতে পারছিল না। এক পক্ষকাল পর তারা অন্য সিনেমাহলগুলোর সংগে সিনেমা বদল করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এক সময়ে তাও শেষ হয়ে গিয়েছিল। তখন তারা  একই সিনেমা বারবার সিনেমা প্রদর্শন করতো। মজার ব্যাপার হলো এই অবস্থাতেও সিনেমাহলগুলোতে দর্শকদের  ভিড় কমতো না। কারণ, তাদের আসলেই কিছু করার ছিল না।      

ক্যাফেগুলো অবশ্য তাদের পূর্বাবস্থা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছিল। কারণ, এই শহরে মদ ও লিকারের বিশাল মজুদ ছিল। বলা যেতে পারে এগুলোর বাণিজ্য প্লেগের পূর্বে এই শহরের গর্ব ছিল। ফলে প্লেগের পুরো সময়কালে এই শহর পুরোপুরি মদ্যপ হয়ে উঠেছিল। একটা ক্যাফে অসাধারণ একটা শ্লোগানকে বিজনেস আইডিয়া হিসেবে প্রচার করেছিল। সেটা ছিলঃ “আক্রান্ত হবার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হলো এক বোতল ভালো মদ।“ বাস্তবেও  শহরের লোকজনের অধিকাংশই মনে করতো যে, এলকোহল সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হবার বিরুদ্ধে নিরাপদ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।

ফলে প্রতিরাতেই রাত দুটোর দিকে ক্যাফেগুলো হতে একদল মদ্যপ নরনারী বের হতো। তারা রাতের প্রায়ান্ধকারে শহরের রাস্তাগুলোতে প্রদক্ষিণ করতো। এবং উচ্চস্বরে চিৎকার করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করতো।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বাদশ পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ