দ্য প্লেগ (পর্ব -১২)  

ঢাকা, রোববার   ২৮ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৮,   ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (পর্ব -১২)  

মূলঃ  আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ  মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৩ ২০ জুন ২০২১   আপডেট: ১৮:১৪ ২০ জুন ২০২১

 আলবেয়ার কামু

 আলবেয়ার কামু

লক্ষণীয় যে, শহরের জনগণ খুব দ্রুতই লকডাউনের সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে চিন্তা করা বাদ দিয়ে দিয়েছিল। কারণ, প্লেগ শুরুর পর প্রাথমিক ছয় মাসেই তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে প্রতিরোধ করার সকল শক্তি ও সাহস হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে তাদের কাছে ছয় মাস, এক বছর বা তার চেয়েও বেশী সময়ের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না।   

এই সময়ে  তাদের সাহস, ইচ্ছাশক্তি ও সহ্য করার ক্ষমতা এতোটাই নীচে নেমে গিয়েছিল যে, এখান থেকে কখনোই তাদের উত্তরণ ঘটতে পারে, সেটাও তারা ভাবতে পারতো না। কাজেই এই বিপদ থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে তারা কখনোই  চিন্তা করছিলো  না। বলা যেতে পারে, তারা ভবিষ্যতের দিকে তাকানো বন্ধ করে  দিয়েছিলো। তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছিল  পায়ের নীচের  মাটিতে। তবে প্রতিরোধহীনতার এই বিষয়টি প্রকারান্তরে তাদের জন্যে মঙ্গলকরই হয়েছিলো। কারণ, পরিস্থিতির এই  আকস্মিক পরিবর্তন তাদের কাছে  এতোটাই অসহনীয় ছিলো যে, তারা প্লেগ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা  বাদ দিয়ে দিয়েছিল। তারা  শুধুমাত্র প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হবার বিষয়েই জল্পনা-কল্পনা করতো। সুতরাং নিষ্ফলা স্মৃতি নিয়ে লক্ষহীনভাবে  জীবন পার করাকেই  তারা অভ্যাসে পরিণত করেছিলো। 

তাদের লকডাউনের  জীবন হয়ে গিয়েছিল বন্দী ও নির্বাসিতদের জীবনের মতো। সংশোধনের অতীত ও দুঃখময়। তাদের সঙ্গী ছিলো শুধু স্মৃতি, যা তাদের কোন কাজেই লাগত না। এমন কি অতীত, যা নিয়ে তারা অবিরত ভাবত, তাও তাদেরকে অনুতাপ ছাড়া কিছুই দিতো না। কারণ,  অনুপস্থিত প্রিয়জনেরা তাদের কাছে কখনোই ফিরে আসতো না।  সারাক্ষণ তারা কিছু একটা জীবন থেকে মিস করতো। সার্বিকভাবে অতীতের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন, বর্তমানকে সহ্য করার ক্ষমতাহীন এবং ভবিষ্যৎ দ্বারা  প্রতারিত হয়ে তারা জেলখানার বন্দিদের মতো জীবন যাপন করছিলো।

তারপরেও শহরের অধিকাংশের  জন্যেই এই লকডাউন  ছিল নিজ বাড়িতে নির্বাসন। বর্ণনাকারী একে সাধারণ নির্বাসন বা লকডাউন  বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সাংবাদিক র‍্যামবার্ট ও আরো বেশ কয়েকজনের ক্ষেত্রে লকডাউনের  কারণে  ভোগান্তির আতিশয্য ছিলো কঠিনতর। কারণ, প্লেগের কারণে তাকে ও অন্যান্য ভ্রমণকারীদেরকে জোরপূর্বক এই শহরেই  অবস্থান করতে হচ্ছিলো। ফলে তারা তাদের নিজ শহরের  বাসস্থান ও প্রিয়জন দুটো থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। শুধু তাই নয়। সাধারণ লকডাউনেও  তারাই  সবচেয়ে বেশী ভোগান্তির শিকার হয়েছিলো। কারণ, অন্যান্য ভোগান্তির সাথে তাদের জন্যে দূরত্ব একটা বিশাল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বদ্ধ শহরের দেয়ালে মাথা কুটে মরলেও নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কোন সুযোগই তাদের ছিলো না। দিনের প্রায় সকল সময়েই তাদেরকে দেখা যেতো ধূলিময় শহরের আনাচে-কানাচে ঘোরাফেরা করতে। গন্তব্যহীনভাবে।  রাতগুলো কিভাবে তারা অতিক্রম করতো তা কেউ জানতো না। তারা হতাশা দূর করতে চাইতো অন্যদেরকে অনুকরণ করার মধ্য দিয়ে। বাইরের পৃথিবী, যা তাদের জন্যে মুক্তির বাহন ছিল, সেদিক থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। তাদের বিচরণ ছিল কল্পনার পৃথিবীতে। সেই পৃথিবীতে খেলা করতো আলো, পাহাড়, কোন প্রিয় গাছ বা কোন নারীর হাসি। অন্য কোনকিছুই এগুলোকে প্রতিস্থাপন করতে পারতো না।

সবশেষে আমরা পরস্পর থেকে আলাদা  হয়ে যাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাদের কথা বলবো। বর্ণনাকারী তাদের সম্পর্কেই সবচেয়ে বেশী উৎসুক ছিলেন।  এমনকি  সম্ভবত তাদের কথা বলতেই তিনি অধিকতর পারদর্শী ছিলেন। প্রেমিক প্রেমিকারা বিভিন্ন ধরনের  আবেগ ও বিমর্ষতার শিকার হতো। কারণ, বিরাজিত পরিস্থিতিতে তারাই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে নিজেদের অনুভূতিকে পরিমাপ করতে পারদর্শী ছিল। যদিও খুব কম সময়েই তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করতে অসমর্থ হতো। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অনুপস্থিত প্রেমিক বা প্রেমিকা কি করছে সে সম্পর্কে  স্বচ্ছ ধারণার অভাব। কারণ, ইতিপূর্বে তারা কখনোই চিন্তা করেনি যে, প্রেমিক বা প্রেমিকার পেশা বা অবস্থান তাদের জন্যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ বা বেদনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং তারা  ভালোবাসার সীমাবদ্ধতাগুলোকে অনুভব করতে শুরু করেছিলো।  স্বাভাবিক সময়ে আমরা জানি যে, ভালোবাসাকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করা সম্ভব। কিন্তু তখন  আমরা বিষয়টকে তেমন গুরুত্ব দিই না। কিন্তু স্মৃতি যেহেতু কখনোই সমঝোতা করে না, সেহেতু এই সময়ে বাইরে থেকে শহরের উপরে আপতিত  এই দুর্ভাগ্য  আমাদের জন্যে  অজানা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা আমাদেরকে প্ররোচনা দিয়েছল পরস্পরকে সন্দেহ করে  নিজেদের ভোগান্তি সৃষ্টি করতে এবং  হতাশাকে স্বাভাবিক অবস্থা হিসেবে মেনে নিতে। এভাবে  মনোযোগকে  অন্যদিকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করার জন্যে মহামারির এটা একটা কৌশল ছিল। ফলে শুধুমাত্র দিনের বেলায়  বিশাল উদাসীন আকাশের নীচে কিছুটা  শান্তিতে বাস করা সম্ভব ছিল।একাকী। ফলে প্রেমিক  প্রেমিকাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের  অভাব তাদের ব্যর্থতার অনুভূতিকে তীব্রতর করে তুলেছিলো। 

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শহরের কিছু নাগরিক নতুন ধরণের দাসত্বের শিকার হয়েছিলো । তাদের আচরণ সূর্য ও বৃষ্টির দয়ার উপরে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। তাদেরকে প্রথমবার দেখার পর আপনার কাছে মনে হতে পারতো যে, তাদের জীবন আবহাওয়া-সচেতন হয়ে গেছে। এক পলকা রোদ মুহূর্তের মধ্যে  তাদেরকে আনন্দিত করে তোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। অন্যদিকে বৃষ্টির দিন তাদের মুখ ও মেজাজের উপরে ঘন কালো ছায়া ফেলে দিত। অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ পূর্বেও আবহাওয়ার উপরে তাদের এই নির্ভরশীলতা ছিল না। কারণ, তখন তাদেরকে একাকীভাবে  জীবনের মুখোমুখি হতে হতো না। যাদের সাথে তারা বাস করতো, তারাও তাদের  সাথে  কিছুটা দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারতো। কিন্তু এখন সেটা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম । তাদেরকে দেখে মনে হতো তারা কৃপণ আকাশের দয়ার উপরে নির্ভরশীল। অন্য কথায় তারা অযৌক্তিকভাবে ভুগছিল,  এমনকি আশাও করছিলো।

এছাড়াও এই চরম একাকীত্বের সময়ে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা ছিল না কারুরই। প্রত্যেককেই নিজের সমস্যার ভার নিজেকেই বহন করতে হচ্ছিল। ঘটনাচক্রে কেউ যদি  নিজের  অনুভূতিকে অন্যদের নিকটে  প্রকাশ করতো, তাহলে উত্তর হিসেবে অন্যদের কাছ থেকে যা পেত, তা তার জন্যে সুখকর ছিল না। বরং তা মানসিকভাবে  তাকে আঘাত করতো। ফলে একবারের  পর  তারা কখনোই নিজেদের  বিষয় নিয়ে আর কথা বলতো না। কারণ, ব্যক্তিগত ক্ষতির বিবরণ প্রদানের  মধ্যদিয়ে আবেগ ও অনুতাপের যে প্রতিচ্ছবি তারা  ফুটিয়ে তুলতো, সেটার কোন অর্থই ছিল না, যারা  শুনছিল তাদের কাছে। তাদের  কাছে সেটা ছিল খুব  সাধারণ একটা আবেগ বা কষ্ট। ফলে বন্ধু বা শত্রু যেই হোক না কেন, তাদের উত্তর কখনোই বক্তার আবেগকে প্রশমিত করতো না। ফলে অন্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ করার স্পৃহাও  শেষ হয়ে যেতো। বিশেষ করে যারা নীরবতাকে সহ্য করতে পারতো না, অন্তত তাদের জন্যে বিষয়টা যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সার্বিকভাবে  নিজেদের  আবেগের বিপরীতে অন্যেরা সত্যিকারের উত্তর দিতে সক্ষম ছিল না বিধায় তারা এসকল বিষয় অন্যদের  নিকটে উপস্থাপনও করতো না।বরং এই সমস্ত ক্ষেত্রে  কঠিন ধরণের কষ্টের বিষয়েও তারা সাধারন আলাপচারিতার বাক্যাবলী ব্যবহার করতো। এভাবেই লকডাউনের বন্দিরা অন্যদের প্রতি তাদের সহানুভূতি ও আগ্রহের প্রকাশ দেখাতো।
ফলে নাগরিকেরা শুধুমাত্র বেদনাতুর হতো, যখন তাদের চিন্তাভাবনা কেন্দ্রীভূত হতো তাদের বিষয়ে,  যাদের সাথে তারা পুনরায় সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা পোষণ করতো। ভালোবাসার  অহমিকা তাদেরকে সাধারণ বিপদকে তুচ্ছ বলে ভাবতে শিখিয়েছিল। প্লেগ সম্পর্কিত ভাবনা তাদেরকে শুধুমাত্র তখনই ভীত করতো, যখন তা তাদের পৃথক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী করতো। সুতরাং প্লেগের কেন্দ্রে বাস করেও তারা এক ধরণের উদাসীনতা প্রদর্শন করতো। এই উদাসীনতাকে অন্যদের কাছে সমাহিত ভাব বলেই মনে হতো।        

হতাশা তাদেরকে আতঙ্কিত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। ফলে দুর্ভাগ্যেরও একটা ভালো দিক ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি মহামারীতে মৃত্যুবরণ করতো, তাহলে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সে তা বুঝতে সক্ষম হতো না। তার সহসা প্রস্থান, তাকে বিস্মৃতির আড়ালে ঠেলে দিতো।  সোজাসুজি তাকে ছুড়ে দিতো  গভীরতম নীরবতার মধ্যে। কোনরকম প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের জন্যে তার কোন সময়ই থাকতো না।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ