‘সমুদ্রপারে তাদের পাড়ায় পাড়ায়’

ঢাকা, রোববার   ২৮ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৮,   ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘সমুদ্রপারে তাদের পাড়ায় পাড়ায়’

পর্ব: গডরিচের প্রস্তরময় উদ্যান ও সৈকত   

লেখক: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪৮ ১৭ জুন ২০২১   আপডেট: ১৫:৪৫ ১৯ জুন ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

লুমলে বীচ রোড সমুদ্রের সমান্তরালে প্রবাহিত হয়ে এক সময়ে পূবদিকে বেঁকে গিয়ে পেনিনসুলার মহাসড়কের সাথে মিলিত হয়েছে। মহাসড়ক হলে কি হবে, এটা মূলত একটা ধূলিধূসরিত উঁচুনিচু পথ। লালমাটির তৈরী। ডানপাশে সমুদ্র এবং বামপাশে ওয়েস্টার্ন এরিয়া ন্যাশনাল পার্কের বিশাল সবুজ পাহাড়গুলোকে রেখে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। এই রাস্তার ধারেই সিয়েরালিওনের সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর সৈকতগুলো অবস্থিত। গডরিচ, লাক্কা, হ্যামিলটন, সাসেক্স, রিভার-২, টোকেহ ইত্যাদি নাম। 

ফ্রিটাউনের কেন্দ্রস্থল হতে লুমলে বীচ রোড ও পেনিনসুলার মহাসড়ক হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর গডরিচ এলাকা। এখানেই পেনিনসুলার মহাসড়কের ডান পাশে একটি প্রস্তরময় কন্টকাচ্ছাদিত চতুষ্কোণ  মাঠের ভেতরে ব্যানসিগ এর সদরদপ্তর অবস্থিত। আটলান্টিকের বেলাভূমি  থেকে মাত্র ২০০ গজ পশ্চিমে। ওভারলুকিং দ্য সি। তবে বেলাভূমিতে যেতে হলে অন্যপথে ঘুরে যেতে হয়।

পুরো মাঠটিই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নুড়ি পাথরে ভর্তি। এর উপরেই বাংলাদেশ থেকে জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে ইউনিটের সৈনিক লাইন, মসজিদ, অফিসকক্ষ। সবগুলোই টিনশডের। এমনকি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের অফিস এবং অধিনায়কের বসবাসের কক্ষও। প্রস্তরময় মাঠের ভেতরে  কয়েকটা জীবিত গাছ এবং কতগুলো কাঁটাযুক্ত ফণীমনসা আছে। অবশিষ্ট সবুজ তৈরী হয়েছে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা ফুলের টব দিয়ে। জানা গেল, এই জায়গাটা পুরোই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। পরিষ্কার করে বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে।  ইউনিট এলাকার পশ্চিমাংশে বাঁশ ঘেরাও করা একটি অংশ। যার ভেতরে ছোট্ট একটা কৃত্তিম লেইক তৈরী করা হয়েছে। লেইকের জলে ভাসছে শাপলা ও পদ্মফুল। অধিনায়কের নির্দেশে সম্ভবত বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাঁশ দিয়ে ঘেরাও করা জায়গার ভেতরে তিনটা চিত্রা হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কামারা নামের সিয়েরালিওনের এক যুবক এদেরকে প্রতিপালন করে থাকে। হরিণগুলোকে কেউ সম্ভবত কর্ণেল সিদ্দিককে  ভালবেসে উপহার দিয়েছে। এলাকাবাসীদের কাছে কর্ণেল সিদ্দিক খুবই জনপ্রিয়।      

ইউনিটের অব্যবহিত পশ্চিম পাশে পেনিনসুলার রাস্তার ওপারে সবুজ বনের পাহাড়। আমাদের দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর মত। রিজলাইনগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। কাছের পাহাড়ের শরীরের ভাঁজে ভাঁজে বিভিন্ন উচ্চতায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘরবাড়ি। এই অঞ্চলের মানুষদের নান্দনিকতার বোধ অনুভব করার মত। যারা যত বেশী সামর্থবান, তাদের বাসস্থান ততবেশি উপরের দিকে। কারণ সমুদ্র বা জনপদের প্যানারোমিক বা বার্ডস আই ভিউটা ওপর থেকেই বেশী সম্ভব। যদিও জলের সংকট সেখানে বেশী।  ধুলোর কারণে পুরো এলাকাটা সারা দিনমান আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। আকাশের রঙ ধূসর।  

পূর্বের পাহাড়ের অন্তঃস্থল থেকে প্রবাহিত কয়েকটা জলধারা একত্রিত হয়ে গডরিচ থেকে কিছুটা উত্তরে পেনিনসুলার মহাসড়কের উপরে অবস্থিত একটা সাঁকোর নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে মিলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী ছরার মত।  সাধারণভাবে জলের অস্তিত্ব বা উৎস কোনটাই দৃশ্যমান নয়। তবে সাঁকোর উপরে দাঁড়ালে বা সাঁকো অতিক্রম করার সময়ে সারাক্ষণ জল পড়ার শব্দ শোনা যায়। উত্তর ভারতের মানালি অঞ্চলের জলপ্রপাতগুলোর অবিরাম শব্দের মত। শব্দে মাথা ঝিম ধরে যাবে আপনার। প্রতিনিয়ত জোয়ারভাটা হয় এই ছরার ভেতরে। সমুদ্রের সাথে গভীর আত্মীয়তার কারণে। 

সাইদুল স্যার এবং আমাকে থাকতে দেয়া হয়েছে নতুন লাগানো একটা তাবুর ভেতরে। বিশাল চতুষ্কোণ ঘরের মত তাবু। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তাবুগুলোর মত নয়।  ইতিপূর্বে আমি এমন তাবু দেখিনি। সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ থেকে সরবরাহ করা। মরুভূমিতে যেমনটা থাকে। ব্যানসিগ-১ এর অফিসাররা চলে যাবার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের দুজনকে এখানেই বসবাস করতে হবে। 

ক্লান্ত থাকার কারণে রাতের ডিনার করার পর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সমুদ্রের শীতল বাতাসে তাড়াতাড়িই ঘুম চলে এল। পরদিন সকাল বেলায় ঘুম থেকে জাগার পর আমি আর সাইদুল স্যার দুজনেই অবাক। রাতে প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির জল টেন্টের তলা দিয়ে এসে নীচের পাথরের নূড়িগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার কারণে দুজনের হ্যান্ডব্যাগ দুটোকেও নিয়ে চলে গেছে তাবু থেকে কয়েকগজ পশ্চিমে। মাঠের ভেতর। বৃষ্টি আরও কিছুক্ষণ হলে হয়ত আমাদের দুজনকেও ভাসিয়ে নিয়ে যেত। 

পরদিন সকাল থেকে শুরু হল আমাদের দৈনন্দিন জীবন।

(এই পর্বের সমাপ্তি)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ