দ্য প্লেগ (পর্ব ১১)

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৪ ১৪২৮,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

দ্য প্লেগ (পর্ব ১১)

মূলঃ আলবেয়ার কামু  

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:১৭ ১৪ জুন ২০২১  

দ্য প্লেগ- আলবেয়ার কামু 

দ্য প্লেগ- আলবেয়ার কামু 

বলা যেতে পারে, এরপর থেকে প্লেগ আমাদের সবার জন্যে সার্বক্ষণিক ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এতোদিন পর্যন্ত চারপাশের অদ্ভুত ঘটনাপ্রবাহ সবাইকে অবাক করলেও প্রতিটা নাগরিকই যতদূর সম্ভব ব্যবসায়িক ও অন্যান্য  কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলো। সন্দেহ ছিল না যে, এভাবেই চালিয়ে যেতো। কিন্তু যেদিন নগরের গেইটগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হলো, সেদিন প্রত্যেকেই বুঝতে পারলো যে, তারা সবাই একই নৌকার যাত্রী। প্রত্যেককেই জীবনের এই নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে। ফলে, হঠাৎ করে সবার ভেতরে  প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা ছড়িয়ে পড়লো। সবাই অনুভব করতে লাগলো কী এক দীর্ঘ নির্বাসনের জীবন তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে!

নগরের গেইটগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সবচেয়ে খারাপ পরিণাম হলো প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্কহীনতা থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বিয়োগ-বেদনা। এমন পরিস্থিতির জন্যে শহরের কেউই প্রস্তুত ছিল না।

কয়েকদিন পূর্বেও প্রতিটি মা-সন্তান, প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী নিশ্চিত ছিল যে, পরবর্তী কয়েকদিন বা অন্ততপক্ষে  কয়েকসপ্তাহের  মধ্যেই তারা পরস্পরের সাথে মিলিত হতে পারবে। কিন্তু কোন ধরণের পূর্বসতর্কতা ছাড়াই তারা  দেখতে পেল যে, পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একজন অন্যজনের সাথে দেখাসাক্ষাৎ করা দূরে থাক, পরস্পরের সাথে যোগাযোগও করতে পারছে হচ্ছে না। কারণ, নগরের গেইটগুলো সরকারী আদেশ জনগণের কাছে পৌঁছানোর আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। ব্যক্তিপর্যায়ের অসুবিধাগুলোকে সেখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিষয়টিকে এভাবেও বলা যেতে পারে যে, নগর কর্তৃপক্ষের এই নিষ্ঠুর আদেশের মধ্যদিয়ে নাগরিকদেরকে ব্যক্তি-অনুভূতিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছিলো।

দিনের প্রথম অংশে যখন শহর ত্যাগ করার নিষেধাজ্ঞা কার্যকরী করা হয়েছিল, তখন নগরপ্রধানের অফিস জনাকীর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। আবেদকারীদের ভিড়ে। সবাই চাচ্ছিলো শহর ত্যাগ করে চলে যেতে। কিন্তু সংগত কারণেই সেগুলোকে বিবেচনায় নিতে পারেনি নগর কর্তৃপক্ষে।

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের কয়েকদিন সময় লেগেছিল বুঝতে যে, আমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছিলো। ফলে ‘বিশেষ ব্যবস্থাপনা’, আনুকূল্য, অগ্রাধিকার এই শব্দগুলোর আর কোন কার্যকরী অর্থ ছিল না।

এমনকি চিঠি লেখার মতো ছোট্ট অধিকারও আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিলো। অবস্থাটা হয়েছিলো এরকমঃ  প্রচলিত যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে অবশিষ্ট পৃথিবীর সাথে সংযুক্ত থাকা সম্ভব ছিলো না। শহর থেকে কোন চিঠি বাইরে পাঠানো যেতো না। কারণ চিঠির মধ্যদিয়ে সংক্রমণ শহরের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অবশ্য প্রাথমিক দিনগুলোতে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কিছু লোক গেইটের প্রহরীদেরকে তুষ্ট করে তাদের খবর বাইরের পৃথিবীতে পাঠাতে পারতো। কিন্তু সেটা ছিল শুধুমাত্র মহামারি শুরুর প্রথমদিকে। কারণ, তখনো প্রহরীরা তাদের স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিগুলোকে লালন করছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে এই একই প্রহরীরাই  সহযোগিতা প্রদান করতে অস্বীকার করলো। প্রাথমিক পর্যায়ে অন্য শহরে টেলিফোনও করা যেতো। কিন্তু টেলিফোন বুথগুলোতে সারাক্ষণ ভিড় লেগে থাকতো। একটা কল করতেই কয়েকদিন লেগে যেতো। একারণে এটিকেও নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। শুধুমাত্র মৃত্যু, বিয়ে, জন্ম - এই ধরণের খুব জরুরী কিছু বিষয়ে টেলিফোন করার অনুমতি দেওয়া হতো। সুতরাং আমাদেরকে পুরোনো মাধ্যম টেলিগ্রামে ফিরে যেতে হয়েছিলো।

ফলে আমাদের বন্ধুত্ব, মায়া-মমতা, শারীরিক ভালোবাসার সম্পর্ক সবকিছুই আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো টেলিগ্রামের দশ শব্দের মধ্যে। সীমিত শব্দের মধ্য দিয়ে প্রকাশের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা “ভালো আছি বা সারাক্ষণ তোমার কথা ভাবছি বা ভালোবাসা, “ এই সব লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

এরপরেও আমাদের কেউ কেউ চিঠিকেই একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এরা চেষ্টা করছিল বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে। কিন্তু তাদের এই পরিকল্পনা কোন কার্যকরী ফল দেয়নি। দুই একটা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করলেও বোঝা যেতো না। কারণ চিঠিগুলোর কোন উত্তরই আসতো না।  ফলে কয়েক সপ্তাহ পর পর আমরা একই চিঠি লিখতাম। সবগুলোতেই একই খবর বা আবেদন থাকতো। যান্ত্রিকভাবে মৃত বাক্যাবলী ব্যবহার করে আমরা আমাদের কঠিন সময়ের কথা জানাতাম। এক সময়ে মনে হতো যে, বারংবার বলা এই সব স্বগতোক্তির চেয়ে টেলিগ্রাম ব্যবহার করাই শ্রেয়তর।

কিছুদিন পর সবার কাছে সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো যে, শহর থেকে বাইরে যাওয়ার আর কোন আশাই আমাদের নেই। তখন আমরা চেষ্টা করলাম মহামারির পূর্বে যারা শহর থেকে চলে গিয়েছিল, তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে। নগর কর্তৃপক্ষের নিকটে আবেদন করলাম আমাদের প্রিয়জদের শহরে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে।  কয়েকদিন বিবেচনা করার পর নগর কর্তৃপক্ষ সম্মতি জ্ঞাপন করলো। উত্তর দিলো যে, তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে একবার কেউ শহর এলাআয় প্রবেশ করলে তাকে আর শহর ত্যাগ করতে দেওয়া হবে না। মহামারির পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। খুব কম সংখ্যক পরিবারই এই প্রস্তাব মেনে নিলো। কারণ তারা বুঝতে  পারছিলো যে, এভাবে ফিরে আসা প্রকারান্তরে তাদেরকে প্লেগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। সুতরাং দুঃখিত মন নিয়ে তারা  প্রিয়জনদের অনুপস্থিতিকে মেনে নিলো। মহামারির চূড়ান্ত সময়ে আমরা শুধু একটা কেইস দেখতে পেয়েছিলাম যেখানে মানুষের স্বাভাবিক আবেগ মৃত্যুভয়কে অতিক্রম করে গিয়েছিল। এটা দুইজন যুবক-যুবতীর কেইস ছিলো না, যেখানে তাদের আবেগ পরস্পরকে কাছে টেনে নিতে পারে। যত কষ্টই হোক না কেন। এই দুইজন ছিল বর্ষীয়ান  ডাক্তার ক্যাসেল ও তার স্ত্রী। বহুবছর পূর্বে তাদের বিয়ে হয়েছিলো। মহামারি শুরু হবার কয়েকদিন পূর্বে মিসেস ক্যাসেল পার্শ্ববর্তী শহরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তারা কখনোই ডারবি ও জোয়ান ধরণের (Darby-and-Joan pattern) দৃষ্টান্তমূলক দম্পত্তি ছিলেন না। বরং বর্ণনাকারীর মতে, এই দম্পত্তির কেউই নিশ্চিত ছিল না যে, তাদের বিবাহ তাদের জন্যে খুব সুখকর হয়েছিল। কিন্তু এই নিষ্ঠুর দীর্ঘ বিচ্ছেদ তাদেরকে বুঝিয়েছিল যে, তাদের পক্ষে আলাদা হয়ে বাস করা সম্ভব ছিল না। ফলে প্লেগ সৃষ্ট বিপদ তাদের কাছে খুবই অগুরুত্বপূর্ন মনে হয়েছিলো।

ওটা ছিল একটা ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ মানুষই মেনে নিয়েছিলো যে, মহামারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে আলাদাভাবে বাস করতে হবে। ফলে নগরের প্রায় প্রতিটা মানুষ জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছিল। যেসকল স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বস্থতা সম্পর্কে সম্পূর্ন বিশ্বাসী ছিল, তারা অবাক হয়ে দেখতে পেয়েছিলো যে, তারা ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েছে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের অভিজ্ঞতাও ছিলো একইরকমের। বরং যারা নিজেদেরকে ডন জুয়ান্স ভাবতো, তারাই বিশ্বস্থতা বা আনুগত্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে লাগলো। যে ছেলেরা নিজের মায়ের দিকে তাকিয়েও দেখতো না, তারা এখন মায়ের আঁচলের নীচে বাস করতে লাগলো। ফলে আকস্মিক বিয়োগবেদনা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা আমাদেরকে নিজেদের অজ্ঞাতসারেই দখল করে নিলো। আমরা পরস্পরের কাছে উপস্থিত থাকতে পারার আবেদনকে অস্বীকার করতে অসমর্থ হলাম। যদিও বিরহ আমাদেরকে সারাদিনমান ধরে আক্রান্ত করতে থাকলো। মনে হতে লাগলো যে, খুব কাছে থেকেও আমরা পরস্পর থেকে দূরে চলে গিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে আমাদের ভোগান্তি ছিল দুই প্রকারের। প্রথমত আমরা যা ভুগছিলাম। দ্বিতীয়ত সন্তান, মা, স্ত্রী বা প্রেমিকাদের নিয়ে আমাদের কাল্পনিক ভোগান্তি।

অন্যকোন ধরণের পরিস্থিতিতে শহরের জনগণেরা সম্ভবত বেশী কাজ ও অধিকতর সামাজিক জীবন যাপনের মধ্যদিয়ে নিজেদেরকে মুক্ত করার চেষ্টা করতো। কিন্তু প্লেগ সবার ভেতরে কর্মহীনতা ঢুকিয়ে দিলো। নাগরিকদের সকল চলাচলকে সীমিত করে দিলো শহরের ও দৈনন্দিন নিরানন্দতার মধ্যে। তাদেরকে বাধ্য করলো প্রাত্যহিকভাবে স্মৃতি হতে সান্ত্বনা খুঁজতে। গন্তব্যহীন ভ্রমণে তারা বারবার একই রাস্তায় ফিরে আসতে লাগলো। শহরটি ছোট হবার কারণে এই রাস্তাগুলোতেই সুখের দিনগুলোতে তারা প্রিয়জনদের নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতো।

সুতরাং প্রথম যে জিনিসটা প্লেগ আমাদের শহরে নিয়ে আসলো, তা হলো নির্বাসন। বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত ভাবনায় ও তার অধিকাংশ বন্ধুদের স্বীকারোক্তিতে এটাই ছিল শহরের বাস্তব অবস্থা। নিঃসন্দেহে সেটা ছিল নির্বাসনের অনুভূতি। শূন্যতার অনুভূতি কখনোই আমাদেরকে ছেড়ে যেতো না। আমরা অযৌক্তিভাবে অতীতে বা স্মৃতিকে অতিক্রম করে দ্রুত ভবিষ্যতে চলে যাওয়ার চিন্তা করতাম। কিছু কিছু সময়ে কল্পনা নিয়ে খেলা করতাম। অপেক্ষা করতাম কোন ঘণ্টাধ্বনি শোনার জন্যে, যা কারো আগমনীবার্তাকে ঘোষণা করবে। অপেক্ষা করতাম বাসস্থানের সিঁড়িতে কারো পদশব্দ শোনার। পরিকল্পিতভাবে বাসায় অবস্থান করে অপেক্ষা করতাম বিকেলের ট্রেনে আগমনকারী কোন আগন্তুকের অপেক্ষায়। ভুলে যেতাম যে, এই সময়ে কোন ট্রেনই চলাচল করছে না। ফলে বিশ্বাস স্থাপনের এই খেলা স্থায়ী হতো না। কারণ, সবসময়েই সেই মূহূর্ত আসতো, যখন ট্রেন আসবে না এই সত্যের মুখোমুখি হতাম আমরা এবং অনুভব করতাম যে, আমাদের পৃথক থাকা চলতে থাকবে। সামনের দিনগুলোর সাথে মানিয়ে চলা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করনীয় নেই। সংক্ষেপে, আমরা আমাদের জেল-বাড়িতে ফিরে আসতাম। অতীত ছাড়া আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। অবশ্য, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ভবিষ্যতে বাস করার জন্যে তাড়িত হতো। কিন্তু খুব দ্রুতই তাদেরকে সেই ভাবনা পরিত্যাগ করতে হতো। কারণ, কল্পনার ক্ষত তাদেরকেও ছাড়তো না। আক্রমণ করে আহত করতো।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ