দ্য প্লেগ (১০ম পর্ব) 

ঢাকা, রোববার   ২৮ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৮,   ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (১০ম পর্ব) 

মূলঃ  আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ  মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২৬ ১৩ জুন ২০২১   আপডেট: ২১:১৮ ১৪ জুন ২০২১

দ্য প্লেগ- আলবেয়ার কামু 

দ্য প্লেগ- আলবেয়ার কামু 

রিও কক্ষে প্রবেশ করতেই বৃদ্ধলোকটি বিছানায় উঠে বসল। সে শুকনো মটরশুঁটির দানা গুনে গুনে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে রাখছিল। এই কাজটি সে সকল সময়েই করে থাকে। তারপর ডাক্তারের দিকে তাকাল। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে। বলল, “ডাক্তার, এই রোগটির নাম কলেরা, তাই নয় কি?” “কে তোমাকে বলেছে?” “পত্রিকায় এসেছে। রেডিওতেও বলেছে।“ “সঠিক বলেনি। এটা কলেরা নয়।“ বৃদ্ধ লোকটি উত্তেজিতভাবে হাসল। “নিশ্চয়ই তাহলে বড় লোকেরা বিষয়টিকে অতিরঞ্জন করছে। তারা খুবই ভয় পেয়েছে। তাই নয় কি?” সে বলল। “তুমি কখনই এসব শোনাকথায় বিশ্বাস করবে না,” ডাক্তার বলল।

বৃদ্ধলোকটিকে পরীক্ষা শেষ করার পর রিও ডাইনিং কক্ষের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। সে নিজেও এখন ভীত হয়ে পড়েছে। এই উপশহরেই অন্তত আট থেকে দশজন রোগী বাগী বা ফোঁড়ারোগ নিয়ে রিও’র চিকিৎসার  অপেক্ষায় আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র দুই থেকে তিনটা রোগীকে অপারশন করে তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পেরেছে। এদেরকে এখন তার হাসপাতালে প্রেরণ করতে হবে। তবে তারা কেউই হাসপাতাল সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করে না।  “আমি চাই না হাসপাতালে আমার স্বামীর নিরীক্ষা বা গবেষণা করুক,” রোগীদের একজনের স্ত্রী তাকে বলেছে।

তবে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসলেই যে গবেষণা হবে, তাও নয়। এখানে সে শুধু মৃত্যুবরণ করবে। কারণ, হাসপাতালের প্রচলিত ব্যবস্থাদি চিকিৎসার জন্যে খুবই অপ্রতুল। ‘বিশেষ সরঞ্জামাদি দিয়ে সজ্জিত’ হাসপাতালগুলোও একইধরণের। মূলত হাসপাতালের বহির্বিভাগের দুটো বিল্ডিং থেকে রোগীদের সরিয়ে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। এদের জানালাগুলোকে নিশ্ছিদ্রভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাচীর দিয়ে এগুলোকে অন্য বিল্ডিংগুলো হতে পৃথক করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের একমাত্র ভরসা যে, মহামারীটি আপনা হতেই শেষ হয়ে যাবে।

প্রকৃত অবস্থা হলো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থাদি রোগ প্রতিরোধ করার জন্যে মোটেই যথেষ্ট নয়। তবে সরকারী ঘোষণাপত্রে সেগুলো সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচারণা করা হচ্ছে। পরেরদিন নগরকাউন্সিল হতে ঘোষণা করা হল যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত নীতিমালার সাধারণ অনুমোদন প্রদান এবং ইতিমধ্যেই ত্রিশ জন রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

ক্যাসেল রিও’কে রিং করল। “বিশেষ ওয়ার্ডে মোট কয়টা বেড আছে?” “আশিটি।“ “শহরের রোগীর সংখ্যা নিশ্চয়ই এর থেকে অনেক বেশী? “অবশ্যই। তবে শহরে দুই ধরণের রোগী আছে। কিছু আছে যারা ভীত। এদের সংখ্যা কম। অন্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভীত হবার সময় নেই তাদের,“ ক্যাসেল উত্তর করল। “তারা কি মৃতদেরকে সমাহিত করার ব্যবস্থা করছে?” “না। আমি রিচার্ডকে বলেছি যে, শুধু কথা বললেই হবে না। রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নতুবা কিছুই করার দরকার নেই।“ “কি বলল সে?” “কিছুই করছে না সে। বলল যে, তার কোন ক্ষমতাই নেই। কাজেই আমার মতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’’

বাস্তবেও তাই হল। তিনদিনের মধ্যে দুটো ওয়ার্ডই পরিপূর্ণ হয়ে গেল। রিচার্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী একটা স্কুলকে রিকুইজিশন করার করার আলোচনা চলছে। সেখানে একটি সহযোগী হাসপাতাল স্থাপন করা হবে। এই সময়কালে রিও বাগীগুলোর অপারেশন করার পাশাপাশি এন্টি-প্লেগ সিরামের আগমনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। ক্যাসেল পাবলিক লাইব্রেরীতে গেল এবং সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা প্লেগ সম্পর্কিত পুরনো বইপুস্তকগুলো পাঠ করল। “ইঁদুরগুলো প্লেগ অথবা একইধরণের ধরণের গুরুতর কোন রোগে মারা গেছে, “ ক্যাসেল উপসংহারে আসলো। সে আরো জানালো,” মৃত ইঁদুরগুলোর কারণে শহরে হাজার হাজার মাছি ছড়িয়েছে। ফলে আক্রান্তের সংখ্যাকে জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাবে, যদি যথাসময়ে আমরা সেগুলোকে ধ্বংস করতে না পারি।’’ রিও কিছুই বলল না।

এর অব্যবহিত পরেই আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়া শুরু করল। রৌদ্রের প্রখর তাপে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া ডোবাগুলো শুকিয়ে গেল। প্রতিদিন সকালে নির্মেঘ নীলাকাশ সোনালী আলোতে ভরে যেতে লাগল। প্রান্তরগুলো পুনরায় উত্তপ্ত হতে লাগল। পৃথিবীর সবকিছুকেই মনে হতে লাগল সুন্দরভাবে এগিয়ে চলছে। কিন্তু তারপরেও রোগের অবস্থার উন্নতি হলো না। অবাক গতিতে জ্বরের সংখ্যা বাড়তে লাগল। ষোলটি মৃত্যু, চব্বিশটি, আটাশটি, বত্রিশটি - এভাবে বাড়তে লাগল প্রতিদিন।

চতুর্থদিনে প্রাইমারী স্কুল প্রাঙ্গণে সহযোগী হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়টি সরকারীভাবে ঘোষণা করা হল। স্থানীয় জনগণ, যারা এতদিন ধরে রসিক ধরণের মন্তব্য করে নিজেদের উদ্বিগ্নতাকে গোপন করার চেষ্টা করছিল, তাদেরকে দেখা গেল নির্বাক হয়ে গেছে। রিও নগরপ্রধানকে টেলিফোন করল। জানালো, “রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা ও আরোপিত বিধিনিষেধ দুইই প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।“ “হ্যা,” নগরপ্রধান উত্তর করলেন। “আমি পরিসংখ্যান দেখেছি। বলতে পার সেগুলো খুবই দুশ্চিন্তা সৃষ্টিকারী।’’  
“তারচেয়েও উদ্বেগজনক হলো যে, এগুলো আসলে উপসংহারমূলক,“ রিও তাকে জানালো। “আমি সরকারকে বলব এ বিষয়ে দ্রুত আদেশজারী করতে,“ নগর প্রধান তাকে জানালেন।

এরপর রিও ক্যাসেলের সাথে দেখা করল। নগরপ্রধানের মন্তব্য তখনও তাকে পীড়া দিচ্ছিল। “আদেশজারী?” ক্যাসেল ঘৃণার সাথে উচ্চারণ করল। “কখন কি দরকার, তা বুঝতে প্রয়োজন কল্পনাশক্তির। এটা তার নেই। সিরাম সম্পর্কে কোন খবর আছে?” “ওটা এ সপ্তাহেই আসবে।’’

নগরপ্রধান রিচার্ডের মাধ্যমে রিও’কে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের আদেশজারীর জন্যে একটি প্রস্তাবনা তৈরী করতে বললেন। সেটিতে রিও তার ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস এবং মহামারীর পরিসংখ্যান অন্তর্ভূক্ত করল। চল্লিশটি মৃত্যুর কথাও লিখল। 
কঠোর নীতি প্রণয়ন করে নগর প্রধান (তার বক্তব্য অনুযায়ী) দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সব ধরণের জ্বর সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে নির্দেশ দিলেন। রোগীদেরকে পৃথিকীকরন করা বাধ্যতামূলক করলেন। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের বাসস্থানগুলোকে বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে জীবাণুমুক্ত করার জন্যে বললেন। একই বাসস্থানে বসবাসকারী ব্যক্তিদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে নির্দেশ দিলেন। মৃতদেরকে সমাধিস্থ করার দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উপরে ন্যস্ত করলেন। এবং আরও বললেন যে, এ সম্পর্কে পরবর্তীতে বিস্তারিত নির্দেশ প্রদান করা হবে। 

পরেরদিন বিমানযোগে সিরাম আসল। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে যথেষ্ট ছিল। তবে মহামারী বেড়ে গেলে তা যথেষ্ট ছিল না। রিও’র টেলিগ্রামের উত্তরে জানানো হল যে, ইমার্জেন্সী রিজার্ভ শেষ হয়ে গেছে। তবে নতুন সরবরাহের জন্যে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দুরবর্তী জেলাগুলো হতে বসন্তকাল শহরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। হাজার হাজার ঝুড়ি ভর্তি গোলাপ ফুল নিয়ে ফুলবিক্রেতারা বাজারে ও মহাসড়কে ভিড় করতে লাগল। ফুলের কটুগন্ধে বাতাস ভারী হয়ে গেল। এই বসন্তও ছিল পূর্বের বসন্তগুলোর মতোই। রাস্তাগুলো গাড়িদিয়ে পূর্বের মতো ব্যস্ত হয়ে উঠলো। জ্যা ত্যারু পূর্বের মতো বৃদ্ধলোকটিকে দেখলো বিড়ালগুলোর দিকে থুথু নিক্ষেপ করতে। গ্র্যান্ড আগের মতোই প্রতি বিকেলে ঘরে ফিরে এসে তার রহস্যময় সাহিত্য কর্মকান্ড চালাতে লাগল। কটার্ড পূর্বের মত সচরাচর রুক্ষ আচরণ করতে লাগল। ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ওথোন তার খোঁয়াড়ে বিভিন্ন লোকদের ধরে নিয়ে বন্দি করে রাখলেন। স্প্যানিশ  বৃদ্ধ লোকটি পূর্বের ন্যায় শুষ্ক মটরশুটির দানা এক পাত্র হতে অন্য পাত্রে স্থানান্তর করতে থাকল। কখনও কখনও রিওকে দেখা গেল নিবিড় দৃষ্টিতে কোনকিছুর দিকে তাকিয়ে থাকতে। বিকেলের রাস্তা পূর্বের মত জনাকীর্ণ হয়ে গেল। এবং সিনেমাহলের বাইরে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি দেখা গেল। 

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপাতভাবে মনে হলো যে, মহামারীর প্রকোপ  আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র দশ/বারোতে নেমে আসল। তারপরই আবার আকস্মিকভাবে এই সংখ্যা উলম্বভাবে উপরের দিকে উঠে গেল। এবং মৃত্যু সংখ্যা ত্রিশকে স্পর্শ করল। 

নগরপ্রধান অবশেষে একদিন তিনি খুব শঙ্কিত হয়েছেন মর্মে মন্তব্য করে ডাক্তার রিও’কে একটি টেলিগ্রাম হস্তান্তর করলেন।

টেলিগ্রামটিতে লেখা ছিলঃ “প্লেগের জরুরী অবস্থা জারী করুন এবং শহরকে বন্ধ করে দিন।“ 

(বইয়ের প্রথম খন্ডের সমাপ্তি)

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ