যদি বন্ধু যাইবার চাও

ঢাকা, শনিবার   ১৯ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৫ ১৪২৮,   ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

যদি বন্ধু যাইবার চাও

মুহাম্মদ মনিরুল হক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৮ ৮ জুন ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একটা সময় ছিল যখন মানুষ নিজের দু:খের চেয়ে অন্যের দু:খে বেশি কাতর হতো। বিভিন্ন যাত্রাপালায়, পুথিঁগানের আসরে অন্যের গল্প শোনে, দেখে কেঁদে বুক ভাসাত। রহিম বাদশা রূপবানকে ছেড়ে যাওয়ার বেদনায় যে নারী কান্নায় ভেঙে পড়তো সে হয়তো ভাবারই সময় পেত না যে বাস্তব জীবনে সে রূপবানের চেয়ে আরো বেশি বঞ্চিত। 

অথবা রূপবান যাত্রা পেন্ডেলের যে খুঁটিটায় ধরে কেঁদেছিল সেই খুঁটিকে গভীর মমতা এবং আবেগ নিয়ে স্পর্শ করা পুরুষটি হয়তো নিজের জন্য কাঁদেনি কোনোদিন। বা সে হয়তো ভাবেনি তার জন্যও কেউ কাঁদতে পারে। এসব মানুষগুলোর সঙ্গে আমার নিজের খুব একটা পার্থক্য পাই না। আমার জন্য কেউ কাঁদবে এমন কোনো বাসনা আমার মনে জেগেছিল কিনা পড়ে না। তবে একজনের জন্য অন্যজনের মন কেমন করে কেঁদে উঠে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। আমি যখন বলতাম, নীলু আপা শান্ত ভাই আজ একটু ব্যস্ত। সময় করে তোমার সঙ্গে পরে দেখা করবে। তখন নীলু আপা ছোট্ট করে বলতো ‘ও’। নীলু আপা অভিমান করে ‘ও’ বলার সঙ্গে সঙ্গে যেন রাতটাও কেমন স্তব্দ হয়ে যেত। 

নীলু আপাদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ি খুব বেশি দূরে ছিল না। মন খারাপ করা খবরটা দিয়ে যখন ফিরে আসতাম কাঁচা মাটির পথটাও যেন আমাদের সঙ্গে মন খারাপ করতো। নীলু আপার জন্যই আমি বুঝতে পারি সন্ধ্যায় পূর্ব আকাশে উঠা ভরা হলুদ চাঁদটাও কেমন বিষন্ন লাগে।অথচ এক সময় শান্ত ভাই নিজেই নীলু আপার জন্য পাগলপ্রায় ছিল। শান্ত ভাইয়েরও অপেক্ষা ছিল, প্রতীক্ষা ছিল, কষ্ট ছিল নীলু আপার জন্য। তবে নীলু আপা আর শান্ত ভাইয়ের কষ্টের মধ্যে একটা পার্থক্য ছিল। নীলু আপার জন্য শান্ত ভাইয়ের অপেক্ষা, প্রতীক্ষা আর কষ্টের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। 

অন্যদিকে নীলু আপার কষ্টগুলো কেমন যেন বিষন্ন ছিল। ঠিক যেনো সন্ধ্যার কঙ্কা নদীর মতো। আসলে এটা শুধু শান্ত ভাইয়ের ব্যাপার না।

পুরুষের হলো জয় করা বা অর্জন করা। অর্জন করার চেষ্টার সময়ের পুরুষ আর অর্জন করার পরের পুরুষের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। এটাই হয়তো পুরুষের প্রকৃতি। 

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই সেখানেও একই চিত্র দেখতে পাব। রাধাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কৃষ্ণের মরণপ্রায় অবস্থা। একসময় রাধা কৃষ্ণের ডাকে সাড়া দিল। শেষ পর্যন্ত কি হয়েছে। রাধা নিভু নিভু প্রদীপ নিয়ে যমুনা পাড়ে কৃষ্ণের জন্য অসহনীয় প্রতীক্ষা করেছে। আমার কথা কি আপনার কাছে কিছুটা মেয়েলি মনে হচ্ছে। 

নীলু আপা প্রায়ই রাগ করে বলে, তোর নামটা যেমন মেয়েলি তোর কথাবার্তাও মেয়েদের মতো। নীলু আপা রাগ করে বলুক আর যেভাবেই বলুক নীলু আপার বলার ভঙ্গিতে ভালোবাসা ছিল, আদর ছিল। কিন্তু আমার হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গি নিয়ে পরিচিতজনরা আমাকে ক্ষেপাতো। সহপাঠীরা আড়ালে আমাকে বিশ্রী কিছু নামে ডাকতো। কখনো বিশ্রী নামগুলো আমার সামনেই ব্যবহার করতো। কখনও হাসির ছলে কখনও গালির পরিবর্তে। 

এজন্য সমবয়সীদের সঙ্গে আমার তেমন বন্ধুত্ব হয়নি। বিশ্রী নাম ধরে ক্ষেপানোর তালিকায় মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি ছিল বলেই মেয়েদের সঙ্গে আমার সখ্যতা বেশি ছিল। আমার ক্লাসের মেয়েরাও প্রায়ই ওই নামগুলো ব্যবহার করতো। এজন্যই উপরের ক্লাসের আপাদের সঙ্গে আমার চলাফেরা ছিল বেশি। 

স্কুলে যাওয়া আসা করতাম নীলু আপা, মিনু আপা, নীপা আপাদের সঙ্গে। আমি যখন ক্লাস সেভেনে ওনারা ক্লাস নাইনে। আমাদের গ্রামের পূর্বদিকে যে নদীটা আছে ওটাকেও আমার নারী বলেই মনে হয় জানেন। আমরা ওকে কঙ্কা নামেই ডাকি। কঙ্কা প্রায়ই কাঁদে জানেন। কঙ্কার কান্না আমি বুঝতে পারতাম। 

শীতের সকালে যখন কেউ নদীর ঘাটে পা রাখেনি তখন কুয়াশার আড়ালে কঙ্কা কাঁদে। আবার সন্ধ্যায় যখন সবাই নদীটাকে নির্জনে রেখে বাড়ি ফিরে আসে তখনও কঙ্কা কাঁদে। আমি বহুদিন ভোরে কঙ্কার কান্নার সময়টাতে তার পাশে থেকেছি। কঙ্কাও হয়তো নীলু আপার মতো আমাকে আপন করে নিয়েছিল। এজন্যই হয়তো আমার সামনে কাঁদতে তার আপত্তি ছিল না। নীলু আপাও প্রায়ই আমার সামনে কাঁদত আর কিসব বলতো। যেভাবে মানুষ একা কাঁদে আর যেসব আবেগের কথা মানুষ শুধু নিজের সঙ্গে বলে। আমার কি মনে হয় জানিস মনি, দুইটা মানুষ কখনও একসঙ্গে প্রেমে পড়ে না।

“দুজন কখনও দুজনকে সমানভাবে ভালোবাসে না। দুজনের মধ্যে একজন প্রেমে পড়ে আর অন্যজন দূর থেকে আনন্দ নিয়ে তার কর্মকাণ্ড দেখে মজা পায়। দুজনের মধ্যে একজনের ভালোবাসা বাড়তে থাকে অবহেলা পেতে পেতে আর অন্য জনের বাড়ে অহং”।

নীলু আপার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হতো, নীলু আপার মতো মেয়েদের কারও প্রেমে পড়তে নেই। এদের খুব অল্প বয়সেই এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাওয়া উচিৎ যাকে একমনে শুধু ভালোবেসে যাওয়া যায়। প্রেম হলো ওই মেয়েদের জন্য যারা বুঝে যে ছেলেদের প্রেমে কখনও পুরোপুরি সাড়া দিতে নেই। ছেলেরা প্রেমে পড়ে থাকবে, ওদের ধরে তোলার দরকার নেই। তুলতে গেলেই উঠে গিয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটির চেষ্টা করবে। না তোললে একজনের নাম জপতে জপতেই জীবন পাড়। 

পুরোপুরি সত্যটা অবশ্য নীলু আপাকে আমি কখনও বলিনি। আমি যেদিন নীলু আপাকে গিয়ে বললাম, শান্ত ভাই আজ অনেক ব্যস্ত, বলেছে পরে দেখা করবে সেদিন হয়তো শান্ত ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলারই সুযোগ পাইনি। পরিস্থিতিটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে এখানে হয়তো সুযোগ পাইনি বলাটা ঠিক হচ্ছে না। 

শান্ত ভাইয়ের প্রথম সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর সে গ্রামে এলে তাকে নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হতো ওখানে নীলু আপাকে নিয়ে কিছু বলাটা বড়ই বেমানান ছিল। এর মধ্যে কোনদিন নীলু আপার কথা বললে শান্ত ভাই একটা আমুদে ভাব নিয়ে বলতেন, তা নীলু আছে কেমন রে মনি? মেয়েটার সাথে একবার দেখা করা দরকার। আমি ইতস্তত করে বলতাম, একবার চলেন না শান্ত ভাই। নীলু আপা সবসময়ই আপনার কথা বলে। শান্ত ভাই খুব একটা হাসি দিয়ে বলতেন, নীলু মেয়েটা আগের মতোই আছে তাইনা। 

শান্ত ভাইয়ের কথায় কেনো যেনো আমার গা জ্বলে যেত। কি এমন হয়ে গেছো তুমি যে এভাবে কথা বলছো। মাত্রতো একটা সিনেমায় নায়কের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেছো। এতেই এই অবস্থা! অথচ এই রূপখালি গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার সময় তোমার কি অবস্থা ছিল এটাতো আমি ভুলে যাইনি। তখনতো নীলু আপা ছাড়া তোমার গতি ছিল না। দিনরাত শুধু নীলু আর নীলু। নীলু, এখন আমি কি করব রে নীলু। রূপখালি ছেড়ে, তোকে না দেখে আমি ক্যামনে থাকবো। তুমি একদিন কি দুইদিন একটু কাঁদো কাঁদো হয়েছো আর মন খারাপ করেছো। আর নীলু আপার কান্নারতো শেষ নাই। শান্ত ভাইকে আমি কিছু বলতে পারিনি। শান্ত ভাইয়ের রাগ আমি নীলু আপার উপর ঝেড়েছি। 

নীলু আপা তুমি তোমার ফ্যাচফ্যাচানি বাদ দাওতো। যে লোকটা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায় না, যার সামনে তোমার কথা বলার সুযোগই পাওয়া যায় না তার জন্য অপেক্ষা করা বাদ দাও। আমি ভেবেছিলাম এই কথা শোনার পর নীলু আপা হাউমাউ করে কাঁদবে। এমন কিছু হলো না। নীলু আপার চোখ দুটো কেমন যেন জ্বলে উঠলো। কি! সে আমার সঙ্গে দেখা করতে চায় না! 

তখন আমার মনে হলো নীলু আপার প্রতি শান্ত ভাইয়ের অবহেলার কথা এমন করে হয়তো আগে কখনও বলা হয়নি। নীলু আপা আমার দিকে দৃষ্টি রেখে বলল, ঠিক আছে আর কোনোদিন আমি ওকে দেখা করতে বলবো না। তার কথা জানতেও চাইবো না কোনদিন। নীলু আপার কণ্ঠ কিন্তু তার চোখের মতো জ্বলে উঠেনি। বরং কেমন যেন রুদ্ধ হয়ে আসছিল। আমি নীলু আপার কাছ থেকে সরে এলাম তখন। বুঝতে পারছিলাম নীলু আপার বুকের ভিতর কান্না জমে আসছে।

নীলু আপা প্রাণপণ চেষ্টা করছে কান্নাটা আড়াল করতে। এই প্রথমবারের মতো নীলু আপা আমার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাচ্ছে, তার কষ্ট লুকাতে চাচ্ছে। ব্যাপারটা এমন হয়ে যাবে ভাবিনি। আশ্চর্যের কথা কি জানেন, নীলু আপা কিন্তু আর কোনোদিন শান্ত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেনি। নিজ থেকে কোনোদিন শান্ত ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসও করেনি। একদিনের ছোট্ট একটা অভিমান থেকে নিজেকে এভাবে বদলে ফেলা যায়! আমি নীলু আপার পিছে ঘুরঘুর করতাম, একবার শান্ত ভাইয়ের কথা বলুক, মনটা হাল্কা হোক। সে নিজ থেকেতো কোনদিন শান্ত ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাস করেইনি বরং আমি নিজ থেকে কিছু বললেও শোনেনি বা বুঝতে পারেনি এমন একটা ভাব করে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতো। এমন কি বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও খুবই স্বাভাবিক এবং নির্লিপ্ত ছিল তার চলাফেরা। 

আমি নীলু আপাকে না জানিয়েই ঢাকায় চলে গেলাম শান্ত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। এর মধ্যে শান্ত ভাইয়ের ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে গেছে। প্রচুর সিনেমায় কাজ করছেন। তার দেখা পাওয়াটা মোটামুটি কষ্টই হয়েছিল। দেখা পেতে কষ্ট হলেও শান্ত ভাইয়ের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সুযোগ পেয়েছি যা রূপাখালি গ্রামেও অতটা পাই না। আমার থেকে শান্ত ভাইই বেশি কথা বললেন যেন অনেক দিনের জমানো কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন বা এভাবে কথা বলার মতো কাউকে পান না। তিনি রূপখালির কথা এমনভাবে জানতে চাইলেন যে হঠাৎ করে রূপখালির একটা চিত্র মনের মধ্যে ভেসে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে বুকটা হু হু করে উঠল। 

আমি রূপখালির কথা বললাম। রূপখালির অনেক অনেক কথার ভিতর থেকে বেরিয়ে আলাদাভাবে বললাম, ভাই নীলু আপার বিয়ে ঠিক হয়েছে। শান্ত ভাইয়ের কাছে যেন এই ব্যাপারটা আলাদা কিছু মনে হলো না। মনে হলো যেন নীলু আপাকে মনে করতে একটু সময় লেগেছে এমন একটা ভাব করে বললেন, নীলুর বিয়ে ঠিক হয়েছে? নীলুর বিয়ে হয়নি এখনও? শান্ত ভাইয়ের কথা শুনে মনে মনে বড় একটা বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু মুখে গোছিয়ে এমন কিছু এলো না। ছোট্ট করে শুধু বলতে পারলাম, শান্ত ভাই নীলু আপা যে আপনার উপর অভিমান করে আছে। 

শান্ত ভাই হেয়ালি ভাবে ছোট্ট করে হেসে বললেন, অভিমান; আমার উপর! আমার উপর অভিমান কেন? কি কারণে অভিমান আমাকে ব্যাখ্যা করতে হলো না। শান্ত ভাই নিজেই নীলু আপার সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রসঙ্গ  নিয়ে এলেন। শান্ত ভাইয়ের কথা শুনে আমার নিজেরও মনে হচ্ছিল, জীবনের একটা পর্যায়ে মানুষের কিছু পাগলামি থাকেই। এসব ছেলেমানুষি পাগলামিকে প্রশ্রয় দিলে জীবন চলে না। কিন্তু শান্ত ভাইয়ের ওখান থেকে বেরিয়ে মনে হলো শান্ত ভাই হয়তো তার জীবনীতে বা কোন টিভি সাক্ষাৎকারে হেসে হেসে তার প্রথম প্রেমের কথা কৌতুক করে বলতে পারবে। কিন্তু আমার নীলু আপা? 

নীলু আপা আমাকে শান্ত ভাইয়ের কাছে পাঠায়নি বা আমার কাছে শান্ত ভাইয়ের কথা কিছু জানতেও চাইবে না। তবুও আমার মনে হতো নীলু আপা যদি আমার কাছে জবাব চাইতো, আমাকে যদি একটু দোষী করতো তাহলে হয়তো আমার যাতনা কিছুটা কমতো। নীলু আপা আমাকে কিছু বলেনি। খুবই সাধারণভাবে তার বিয়ে হয়ে গেল। সে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। তার কিছুদিন পর আমি চলে এলাম ঢাকায়। এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় ঢাকার একটা পত্রিকা অফিসে কাজ পেয়েছিলাম। তাছাড়া নীলু আপার বিয়ের পর রূপখালি গ্রামটা কেমন যেন ফাকা ফাকা লাগতো।

ঢাকায় আসার পরও প্রথম প্রথম অনেক খারাপ লেগেছিল। কঙ্কার জন্য অনেক কষ্ট হতো। মাঝে মাঝে বাড়ি যেতাম খুবই অল্প সময়ের জন্য। কঙ্কার সঙ্গেও সেভাবে দেখা করার সুযোগ পাইনি। এর মধ্যে একবার কাকতালীয়ভাবে নরসিংদীতে নীলু আপার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নীলু আপা প্রায় জোর করেই আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেল। অনেক অনেকদিন পর যেন আমি আবার আগের নীলু আপাকে দেখতে পেলাম। আমার ধারণা ছিল যদি হঠাৎ কোনদিন চলার পথে নীলু আপার সামনে পড়ে যাই সে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। 

রূপখালির বাইরে এমন করে দেখা হয়ে গেছে বলেই হয়তো এমনটা করেনি। নীলু আপার বাসায় গিয়ে আমার অস্বস্তি লাগছিল। আমি নীলু আপার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। অস্বস্তি কাটাতেই কৌতুক করে বললাম, আচ্ছা নীলু আপা শান্ত ভাই যদি এখন তোমাকে বিয়ে করতে চায় তুমি কি করবে? কথাটা বলেই আমি চমকে উঠলাম। এটা আমি কি বললাম! পরিস্থিতি হাল্কা করতেই বললাম, আমাদের প্রতি তোমার অনেক রাগ তাই না নীলু আপা?
 
নীলু আপা ছোট্ট করে হেসে বলল, রাগ থাকবে কেন? কিছুক্ষণ চুপ থেকে শ্লেষমাখা গলায় বলল, মনি কোনদিন যদি তার সঙ্গে দেখা হয় বলিস তার উপর আমার কোনো রাগ নেই। শুধু একটাই চাওয়া সে যেন আমার আগে পৃথিবী থেকে চলে না যায়। তার আগে যেন আমার মরণ হয়। সে যে পৃথিবীতে আছে আমিও সেখানে বেঁচে আছি এটাইবা কম কিসে। যেখানেই থাকুক এই পৃথিবীতেতো আছে। যেই পৃথিবীতে সে থাকবে না সেখানে যেন আমার এক মুহূর্তও না বাঁচতে হয়। 

নীলু আপার সঙ্গে দেখা হওয়ার তিনমাস পর তার মৃত্যু হলো। নরসিংদীর একটা হাসপাতালে পুত্র সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নীলু আপার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। হাসপাতালে জন্মের আনন্দ মৃত্যু শোক দুটাই বড় বেমানান এবং একঘেয়ে। 

আচ্ছা নীলু আপার মৃত্যুর সময় কেউ কি কেঁদেছিল। আমি মনে করতে পারছি না। আপনিতো একজন লেখক। আপনি কি নীলু আপার কথাগুলো একটু গুছিয়ে লিখবেন যেন কেউ না কেউ নীলু আপার জন্য একটু কাঁদে। নীলু আপার জন্য একবার হলেও আহারে বলে দুফোটা চোখের জল ফেলে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম