‘সমুদ্রপারে তাদের পাড়ায় পাড়ায়’

ঢাকা, শনিবার   ১৯ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৫ ১৪২৮,   ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

‘সমুদ্রপারে তাদের পাড়ায় পাড়ায়’

পর্ব- যুদ্ধযাত্রা 

লেখকঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৬ ৩১ মে ২০২১   আপডেট: ১৯:৫৭ ৮ জুন ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

“In war, not everything goes as it’s supposed to, and with such regularity as on parade.” – Leo Tolstoy (War and Peace)

২০০১ সালের ডিসেম্বর মাস। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল। ঢাকা সেনানিবাসের প্রায় উত্তর প্রান্তে  সিগন্যাল গেট (বা বর্তমানের ১৯৭১ সরণি)। এই গেইটে খোদিত রয়েছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়া তৎকালীন সিগন্যাল কোরের সকল সদস্যগণের নাম। গেইট অতিক্রম করলেই আর্মি সিগন্যাল ব্রিগেড। মাত্র কয়েক একর আয়তনের চতুষ্কোণ একটি জায়গার ভেতরে কয়েকটা ইউনিট চাপাচাপি করে বসবাস করে। যুগ যুগ ধরে। অন্তত আমি তাই দেখেছি। সৈনিকদের জন্যে সাম্প্রতিক অতীতে নির্মিত কয়েকটা নতুন ব্যারাক ইমারত ছাড়া বাকী সকল ব্যারাক বা অফিসই টিন শেডের তৈরি। সবগুলোই যথেষ্ট পুরনো। তবে এই জায়গার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রায় পুরো এলাকাই বিশাল বিশাল আম ও কাঁঠাল গাছে ভর্তি। বেশ কিছু লিচু গাছও আছে। গাছের ঘনত্বের কারণে দিনের বেলাতেও জায়গাটা প্রায়ান্ধকার থাকে। আমি ইতিপূর্বে দুইবার এই ব্রিগেডে চাকুরী করেছি।

এলাকার ঠিক মধ্যখানে একটা পরিত্যক্ত টিন শেড বিল্ডিং। আয়তনে বিশাল। ইতিপূর্বে ইউনিটের সৈনিক লাইন ছিল। নতুন ব্যারাক হবার কারণে সৈনিকরা সেখানে চলে গেছে। সম্ভবত কিছুদিন পর এই বিল্ডিংটিকে ভেঙ্গে ফেলা হবে। বিল্ডিংটির কেন্দ্রে একটি এবং চারকোণার দিকে চারটি টেবিল লাগানো আছে। প্রতিটা টেবিলকে ঘিরেই বেশ কয়েকটা করে চেয়ার। সবচেয়ে পূবদিকের টেবিলটি অধিনায়কের জন্যে নির্ধারিত। অবশিষ্টগুলো কোম্পানি কমান্ডারদের জন্যে। প্রতিটা কোম্পানি কমান্ডারের টেবিলের চারপাশে কয়েকজন করে অফিসার উপবিষ্ট। বিভিন্ন বয়সী। ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবীর। সবার মুখ টেবিলের কেন্দ্রের দিকে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে গোল হয়ে শীতের সকালে আগুন পোহাচ্ছে তারা। বিল্ডিংটি হতে প্রায় ৫০ গজ উত্তরে একটা বিশাল মাঠ। বিভিন্ন পদবীর সৈনিকরা সেই মাঠের ভেতরে দৌড়াদৌড়ি করছে। কয়েকটা ট্রেনিং শেডও রয়েছে। সেখানে সৈনিকদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। জ্যেষ্ঠদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে। প্রবল ব্যস্ততা চারদিকে।

এটাই বাংলাদেশ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন-২ বা ব্যানসিগ-২ এর অফিস ও প্রশিক্ষণ এলাকা। বাংলাদেশের বিভিন্ন সিগন্যাল ইউনিট থেকে অফিসার, জুনিয়র কমিশন অফিসার এবং অন্যান্য পদবীর সৈনিকরা এখানে এসেছে। সিয়েরালিওনে বর্তমানে ব্যানসিগ-১ রয়েছে। ব্যানসিগ-২ উক্ত ইউনিটকে প্রতিস্থাপন করবে। আগামী এক বছর সময়ের জন্যে। সেই নিমিত্তেই এই পূনর্গঠণ কার্যক্রম। ইউনিট অধিনায়ক হিসেবে নিয়োজিত হয়েছেন কর্নেল আসিফ। উপ অধিনায়ক হিসেবে লেঃ কর্নেল মইন। মইন স্যারের সাথে আমি ইতিপূর্বেও আর্মি স্ট্যাটিক সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে চাকুরী করেছি। ইউনিটে অফিসারের সংখ্যা অনেক । সবমিলে প্রায় অর্ধ শতক। এদেরকে সিয়েরালিওনে কিভাবে নিয়োগ বা নিয়োজিত করা হবে সেই সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। ইউনিটের জনবল আনুমানিক ৮০০। সৈনিক ছাড়াও ধুপি, নাপিত, টেইলর, মুচি, ঝাড়ুদার - সবাই যাচ্ছে।

সেনাসদর মিলিটারি সেক্রেটারি শাখা (এম এস ব্রাঞ্চ) কর্তৃক ব্যানসিগ-২ এর এডজুট্যান্ট হিসেবে বদলী করা হয়েছে মেজর সরকার নজরুল ইসলাম সরকারকে। সে আমার অব্যবহিত পরের কোর্সের। অধিনায়ক, উপধিনায়ক, এডজুট্যান্ট এবং অধিনায়ক ফোর্স হেডকোয়ার্টার কোম্পানি ছাড়া অন্য সকল অফিসারদের বদলী হয়েছে অনির্ধারিত দায়িত্বে। কিন্তু এডজুটেনট সরকার নজরুল ইসলাম সরকারকে অজ্ঞাত কোন কারণে তার পূর্বতন ইউনিট থেকে ছাড়া হয়নি। প্রথম ফ্লাইটের পূর্বে কোনোভাবেই তার পক্ষে ব্যানসিগ-২ তে যোগদান করা সম্ভব হবে কিনা, তা বোঝা যাচ্ছে  না।

এডজুট্যান্ট বিহীন যে কোন মিলিটারি ইউনিট আসলে রাখাল হীন গরুর পালের মত। সুতরাং একজন প্রক্সি এডজুট্যান্ট নিয়োগ দেয়া খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ালো। ইউনিট কর্তৃপক্ষের জন্যে। প্রথমে দায়িত্ব দেয়া হল জ্যেষ্ঠ একজন অফিসারকে। মেজর মিয়াজি স্যারকে। কিন্তু তিনি বাসস্থান স্থানান্তরের মত মৌলিক চাহিদা বিষয়ক কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে এডজুটেন্টের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হলেন না। দায়িত্ব গ্রহনের দ্বিতীয় দিনেই তাকে অব্যাহতি দেয়া হল।

আমি এসেছি যমুনার অপর পারের বগুড়া সেনানিবাস থেকে। আমার বাসস্থান সমস্যা নেই। অর্থাৎ আমি চাইলেও আগামী কয়েক মাসের পূর্বে ঢাকা সেনানিবাসে আমার বিপরীতে কোন বাসস্থান বরাদ্দ দেয়া হবে না। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে, প্রক্সি এডজুট্যান্ট হিসেবে আমাকে নিয়োগ প্রদান করাই যৌক্তিক ও সহজ হবে। কারণ অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে নিজের সমস্যা আমি পারতপক্ষে কারো কাছে প্রকাশ করি না। এছাড়াও সাধারণভাবে জ্যেষ্ঠ অফিসারগণের কাছে আমি ম্রিয়মাণ বা ভদ্র অফিসার অফিসার হিসেবে পরিচিত, সর্বংসহা ধরিত্রীর মত যে পার্থিব সকল জ্বালাতন নীরবে সহ্য করতে সক্ষম।

শৈশবকাল থেকেই শারীরিকভাবে আমি কিছুটা স্থুল প্রকৃতির। বংশানুক্রমে। শুধুমাত্র ১৯৮৮ সনে পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকুরী করার সুবাদে দশবার পূর্বাপর ম্যালেরিয়া জ্বরে ভোগার পর কয়েক মাসের জন্যে জীবনে একবার ‘আন্ডার ওয়েট’ হয়েছিলাম। বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর তাবৎ সেনাবাহিনীসমূহে ‘ওজন’ শব্দটা অতীব প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটা শব্দ। এর মূল্যমান  পেশাগত দক্ষতা, এমনকি প্রতিভারও ওপরে। সুতরাং নিজের পরিবারের জন্যে বাসা ভাড়া করা ও ওজন কমানোর প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয় লুকিয়ে রেখে আমি ব্যানসিগ-২ এর প্রক্সি এডজুটেনট এর দায়িত্বভার গ্রহন করলাম। উল্লেখ্য, নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে ওজন কমিয়ে উচ্চতা ও বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত স্কেলের ভেতরে নিয়ে আসতে না পারলে আমাকে মিশনে গমনের জন্যে আনফিট ঘোষণা করা হবে।

আমি যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে অন্তর্জালের মাধ্যমে যোগাযোগ করা সবার জন্যে তেমন সহজলভ্য হয়নি। আমাদের ইউনিটের হাতে গোণা কয়েকজন কনিষ্ঠ অফিসার মাত্র এই বিষয়ে পারঙ্গম ছিল। এর ভেতরে ক্যাপ্টেন সাব্বির একজন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যে কয়েকজন অফিসার সেই সময়ে বিলং টু ‘জেনারেশন ওয়াই’ সাব্বির তাদের অন্যতম। আমার লেখায় পরবর্তীতে সাব্বিরের প্রসঙ্গ আসবে কয়েকবার। একদিন সাব্বির ব্যানসিগ-১ হতে পাওয়া একটা ই-মেইল অধিনায়কের জন্যে উপস্থাপন করল। সেখানে লেখা ছিল যে, ব্যানসিগ-১ সিয়েরালিওনে যোগাযোগ প্রদানে তেমন  কোন ধরণের সমস্যার মুখোমুখি না হলেও ইংরেজী ভাষায় পারদর্শীতার অভাবে সৈনিক অপারেটররা ভুল মানুষজনদেরকে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে।

আমাদের অধিনায়ক কর্নেল আসিফ পুরো দীর্ঘ মেইল থেকে নীচের দুই লাইনকে আন্ডারলাইন করলেন এবং তার অবশ্য করণীয় হিসেবে গ্রহন করলেন। পরদিন ইউনিট দরবারের ভেতরে  তিনি ঘোষণা দিলেন যে, ব্যানসিগ-২ এর সকল সদস্যদেরকে বাধ্যতামুলকভাবে একমাসের ইংরেজি শিক্ষা দেয়া হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষা নেয়া হবে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারা সদস্যদের কাউকেই মিশনে নিয়ে যাওয়া হবে না।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রশিদ সফদারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সৈনিকদের প্রশিক্ষন পরিকল্পনা তৈরী করার জন্য। তিনি তার সমস্ত আনন্দমুখরতা দিয়ে কোর্স কারিকুলাম নির্মাণ করলেন। একই সঙ্গে অনেকগুলো কারিকুলাম। এদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক দেখে আমি রীতিমত বিস্মিত। জিয়া স্যারের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার কারণে মাঠের ভেতরে শত দলের উত্তেজনাকর দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেলো। সুশৃঙ্খল পিঁপড়ের দলের মতন প্রতিটা দল পরস্পরকে প্রতি তিরিশ মিনিট অন্তর অন্তর প্রতিস্থাপন করছে। মাত্র এক মাস সময়ের ভেতরে তাদেরকে সকল প্রয়োজনীয় পার্থিব বিষয়সমূহ নিজেদের জ্ঞান এবং দক্ষতার ভেতরে আনতে হবে। শারিরিক যোগ্যতা, ওজন কমানো, ফায়ারিং দক্ষতা, গাড়ি চালনা দক্ষতা এবং পরিশেষে ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা - সবকিছু।

জিয়া স্যার ইংরেজী শিক্ষার প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ও তার প্রশিক্ষণ পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত করলেন। আমরা অফিসাররাও প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সেনাসদস্যদেরকে ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে তাদের কমিউনিকেশন স্কিল উন্নত করার জন্য। কয়েকদিনের মধ্যেই সবাই ভুলে গেলাম যে, আমরা কোন একদিন মাতৃভাষার জন্যে প্রাণ  দিয়েছিলাম। প্রশিক্ষণ শেষে একমাস পর যথারীতি পরীক্ষা নেয়া হল। অবিস্মরণীয় ফলাফল। প্রায় ৮০০ জনের ব্যাটালিয়নে মাত্র জনা বিশেক সৈনিক ইংরেজীতে পাশ করেছে। অধিনায়ক কর্নেল আসিফ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এই ফলাফল দেখে। তবে পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হলেন যে, যুদ্ধে অংশগ্রহণ ড্রিল প্যারেডের মত কখনই মসৃণ হয় না। সুতরাং ইংরেজীতে প্রায় অশিক্ষিত ব্যাটালিয়ন নিয়েই তাকে সিয়েরালিওনে যেতে হবে।

পরবর্তী বছরের জানুয়ারী মাস পার হয়ে ফেব্রুয়ারী মাস চলে এলেও মেজর নজরুল ইসলাম সরকার ব্যানসিগে যোগ দিল না। সুতরাং ইউনিটের অগ্রগামী দলে তার পরিবর্তে আমার স্থান হল। ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকের এক সোনালী সকালে কর্ণেল আসিফের নেতৃত্বে ব্যানসিগ-২ এর অগ্রগামী দল ইউএন কর্তৃক চার্টার করা একটা উড়োজাহাজে চড়ে বসলাম। অধিনায়ক ছাড়া এই দলে অফিসারদের মধ্য হতে অন্তর্ভূক্ত করা হল লেফটেন্যান্ট কর্নেল মামুন খালেদ, মেজর দিদার, মেজর সৈয়দ কামরুজ্জামান, মেজর সাইদুল ইসলাম এবং আমাকে। আমাদের সাথে যাবে   কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ জেসিও/এনসিও দায়িত্বধারী।

(এই পর্বের সমাপ্তি)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ