দ্য প্লেগ (৯ম পর্ব) 

ঢাকা, শনিবার   ২৭ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৩ ১৪২৮,   ২০ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্য প্লেগ (৯ম পর্ব) 

মূলঃ  আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ  মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৭ ৩০ মে ২০২১   আপডেট: ১৪:০১ ৩০ মে ২০২১

আলবেয়ার কামু

আলবেয়ার কামু

কমিটি মিটিং এর পরদিন থেকে জ্বরের প্রকোপ বেড়ে গেল। সেগুলো খবরের কাগজেও জায়গা করে নিল। তবে গোপনভাবে। সংক্ষিপ্ত বরাত হিসেবে। 

রিও দেখতে পেল যে, শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট নোটিশ টাঙানো হয়েছে। এমন সব জায়গায়, যেখানে সেগুলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না। এই নোটিশগুলো থেকে নগর কর্তৃপক্ষ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে, সে সম্পর্কে ইংগিত পাওয়া কঠিন। কারণ, নোটিশগুলোতে অন্তর্ভূক্ত নির্দেশাবলী কর্তৃপক্ষের কঠোরতাকে নির্দেশ করছিল না। প্রতিফলিত করছিল জনগণ যাতে ভীতসন্ত্রস্ত না হয় সেই ইচ্ছেকে। নোটিশটি শুরু হয়েছিল সাদামাটাভাবে। কোন ব্যাখ্যা প্রদান ছাড়াই। সেখানে বলা হয়েছিল যে, উরান শহরে কয়েকটি  মারাত্মক ধরণের জ্বরের কেইস সম্পর্কে জানা গেছে। তবে বর্তমান পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে, এই জ্বর সংক্রামক কিনা। এর লক্ষণগুলোও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট বা উদ্বেগ সৃষ্টিকারী নয়। এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে জনগণের সামর্থ ও সচেতনতাই যথেষ্টই। তারপরেও নগরপ্রধান ইতিমধ্যেই নিজের দূরদর্শিতা থেকে কিছু পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এই ব্যবস্থাগুলো যদি সবাই মেনে চলে, তবে মহামারীর সম্ভাবনা পরিহার করা সম্ভব হবে। এমতাবস্থায়, নগরপ্রধান মনে করেন যে, শহরের প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ বিবেচনা সাপেক্ষে তার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাগুলোকে সহযোগিতা করবে। 

নোটিশটিতে কর্তৃপক্ষের সাধারণ পরিকল্পনার একটা রূপরেখাও দেয়া ছিল। এর মধ্যে ছিল নর্দমাগুলোতে বিষপ্রয়োগ করে শহরের সকল ইঁদুর মেরে ফেলা।  শহরর পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে তত্ত্বাবধান করা। এছাড়াও এতে শহরের লোকজনকে উপদেশ দেয়া হয়েছিল  কঠোর পরিচ্ছন্নতা অনুশীলন করতে এবং যে কেউই আক্রান্ত হলে মিউনিসিপ্যাল ডিসপেনসারিতে যেতে। প্রতিটি গৃহকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কোন জ্বরের কেইস সনাক্ত করা হলে দ্রুততম সময়ে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। পরিবারের অসুস্থ সদস্যদেরকে হাসপাতালের বিশেষ ওয়ার্ডে আইসোলেশনে রাখতেও  নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল  যে, এই ওয়ার্ডগুলোকে তাৎক্ষনিক চিকিৎসার সকল সরঞ্জামাদি দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে। চিকিৎসা কক্ষ এবং যানবাহনগুলোকে (যেগুলোতে রোগী বহন করা হয়) বাধ্যতামূলকভাবে জীবাণুমুক্ত করার জন্যে কিছু সম্পূরক নীতিমালাও দেয়া হয়েছিল।  পরিশেষে নগরপ্রধান রোগীর সংস্পর্শে আসা নাগরিকদের উপদেশ দিয়েছিলেন  স্যানিটারি পরিদর্শকের সাথে আলোচনা করে তার দেয়া  উপদেশগুলোকে কঠোরভাবে মানতে। 

রিও পোস্টারগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। তারপর সার্জারি বিল্ডিং এর দিকে হাঁটতে লাগলো। গ্র্যান্ড সেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল। রিওকে আসতে দেখে নাটকীয়ভাবে হাত তুলল। ‘আমি জানি,’ রিও বলল। ‘সংখ্যা বাড়ছে। আগেরদিন মৃত্যু সংখ্যা ছিল দশ।’ ডাক্তার গ্র্যান্ডকে বলল সে বিকেলে কটার্ডকে দেখতে যাবে। সেখানে তার সাথে আবারও দেখা হতে পারে। গ্র্যান্ড জানালো গত কয়েকদিনে কটার্ডের আচরণ বদলে গেছে। ‘কি রকম?’ ‘সে আগের চেয়ে অনেক নম্র ও ভদ্র আচরণ করছে।’ ‘আগে কি সে বদমেজাজী ছিল?’

গ্র্যান্ডকে কিছুটা বিভ্রান্ত মনে হল। কটার্ডকে পূর্বে বদমেজাজী মনে না হলেও তার চুপচাপ ও লুকানো স্বভাবের ভেতরে এমনকিছু ছিল, যা তাকে বন্য শূকরের কথা মনে করিয়ে দিত। শোবার কক্ষ, সস্তা হোটেলে খাওয়া,  রহস্যজনক চলাচল – সবকিছু মিলিয়ে আসলেই অন্য ধরণের জীবন যাপন করতো কটার্ড। নিজেকে পরিচয় দিতো মদের চালান-ব্যবসায়ী হিসেবে। প্রায়ই তার কাছে  দুই তিন জন মানুষ দেখা করতে আসত। সম্ভবত তার খদ্দের। কখনও কখনও সে রাস্তার ওপারে সিনেমা দেখতে যেতো। গ্র্যান্ডের ধারণা কটার্ড গ্যাংস্টার ধরণের সিনেমা দেখতে পছন্দ করতো। তবে কটার্ডের দুটো বিষয় সবচেয়ে বেশী তাকে অবাক করেছিল। সেগুলো হলো একাকী বসবাস করার স্বভাব এবং মানুষ সম্পর্কে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। গ্র্যান্ড কটার্ডের পরিবর্তনগুলোকে ব্যাখ্যা করল এভাবেঃ

‘আমি জানি না কীভাবে বিষয়টা বলা উচিৎ। তবে আমার কাছে মনে হয় যে, সে চেষ্টা করছে সবার নিকটে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে। চাচ্ছে প্রত্যেকের কাছে ভাল মানুষ হতে। ইদানীং সে প্রায়ই আমার সাথে কথাবার্তা বলে। তার সাথে বেড়াতে যেতে বলে। আমিও তার অনুরোধকে উপেক্ষা করতে পারি না। কারন, যেহেতু আমি তার জীবন রক্ষা করেছি, সেহেতু সে আমাকে পছন্দ করে।’

কটার্ড আত্নহত্যার চেষ্টা করার পর থেকে নতুন কেউ তাকে দেখতে আসেনি। এই সময়কালে রাস্তায়, দোকানে – সবখানেই সে লোকজনের সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর চেষ্টা করেছে। পাশের মুদির দোকানদারের কাছেও সে খুবই প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছে। তামাক-দোকানের আসরেও সে মধ্যমণি। একবার গ্র্যান্ড তাকে বলেছিল যে, তামাক দোকানের মহিলা একজন ভয়ঙ্কর ধরণের মানুষ। কিন্তু কটার্ড উল্টো তাকে বলেছে, ‘তুমি পক্ষপাতমূলক চিন্তা করছ। মহিলার অনেক গুণ আছে। তোমাকে শুধু খুঁজে বের করতে হবে।’

দুই বা তিনদিন কটার্ড গ্র্যান্ডকে শহরের বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফেতে আমন্ত্রণ করেছে। বর্তমানে সে এগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাও করে থাকে। ‘এগুলোতে খুবই আনন্দময় পরিবেশ এবং ভাল সাহচর্য পাওয়া যায়,’ সে বলে।  গ্র্যান্ড খেয়াল করেছে যে, কটার্ডের সঙ্গীরা তাকে দিয়ে যথেষ্ট লাভবান হয় এবং তাকে প্রচুর বখশিশ প্রদান করে থাকে। বিনিময়ে কটার্ড তাদের সাথে নম্র আচরণ করে থাকে। একদিন হোটেলের প্রধান ওয়েটার তাকে দরজায় পৌঁছে দেয়ার সময়ে কটার্ড গ্র্যান্ডকে বলল, ‘এই ওয়েটার একজন খুবই ভাল মানুষ। আমার জন্যে সে একজন   ভাল সাক্ষীও।’ ‘একজন ভালো সাক্ষী? বুঝতে পারলাম না,’ গ্র্যান্ড বলল। কটার্ড কৌতুক করে বললো, ‘আমি যে একজন ভাল মানুষ, সেই সাক্ষ্যই সে দেবে। প্রয়োজনের সময়ে।’ তবে তার এই কৌতুকবোধ সব সময়ে একরকম থাকে না। একদিন সেই ওয়েটার তাকে একটু কম তোষামোদি করলে সে খুব রেগে গজগজ করতে করতে ঘরে ফিরে আসলো। ‘সে অন্যদের দলে চলে গেছে।বদমাইশ একটা!’ ‘অন্যরা কারা?’ গ্র্যান্ড জিজ্ঞেস করলো। ‘ওরা সবাই,’ কটার্ড বললো।  

সম্প্রতি গ্র্যান্ড নিজ চোখেও তামাক বিক্রেতার দোকানে অদ্ভুত এক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। একটা প্রাণবন্ত আলাপচারিতার সময়ে কাউন্টারের পেছন হতে তামাক-বিক্রেতা মহিলা আলজিয়ার্সে ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকান্ড সম্পর্কে নিজের মতামত দিচ্ছিল। এই ঘটনাটিতে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের এক যুবক কর্মচারী নিহত হয়েছিল। ‘আমি সব সময়েই বলি, এই মাস্তানগুলোকে যদি জেলখানায় ঢুকিয়ে রাখা হতো, তাহলে ভাল মানুষগুলো সমাজে সহজভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করতে পারত।’ মহিলার এই কথায় কটার্ড তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে কোন কথা না বলেই হনহন করে দোকান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। গ্র্যান্ড ও মহিলা কটার্ডের রাগ দেখে  হতবাক হয়ে গিয়েছিল। তার যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে ছিল।

এভাবেই গ্র্যান্ড ডাক্তারের কাছে কটার্ডের চরিত্রের বিভিন্ন পরিবর্তনগুলো বর্ণনা করলো। জানালো যে, ইতিপূর্বে কটার্ড সবসময়েই উদারনৈতিক ধারণা প্রচার করত। তার প্রধানতম অর্থনৈতিক অনুশাসন বাক্য ছিল, ‘বড় মাছেরা ছোট মাছ খায়।’ কিন্তু বর্তমানে সে ওরান শহরে প্রকাশিত একমাত্র কট্টরপন্থী পত্রিকা কিনছে। শুধু তাই নয়। সবার সামনেই তা পড়ছে।  

একদিন গ্র্যান্ড পোস্ট অফিসে যাচ্ছিল। কটার্ড সেদিন সিক-বেড ত্যাগ করছিল। এই সময়ে কটার্ড গ্র্যান্ডকে  অনুরোধ করলো দূরে বাস করে তার এমন এক বোনের কাছে তার পক্ষ হতে এক’শ ফ্রাঙ্কের একটা মানি-অর্ডার করতে পারবে কিনা। সে তার এই বোনকে সে প্রতিমাসেই কিছু অর্থ পাঠিয়ে থাকে। কিন্তু গ্র্যান্ড রুম থেকে বেরিয়ে যাবার পর মূহুর্তেই  সে তাকে পুনরায় ডেকে পাঠালো এবং বলল,  ‘না। তুমি দুই’শ ফ্রাঙ্কই পাঠাও। কারণ আমি তাকে যথেষ্টই স্নেহ করে থাকি।’

এমনকি সে গ্র্যান্ডকে ক্রমাগতভাবে জ্বালাতন করতে লাগল জানার জন্যে যে, কি সেই রহস্যময় ‘ব্যক্তিগত কাজ’ যার জন্যে গ্র্যান্ড প্রতিটি বিকেল উৎসর্গ করে থাকে। ‘আমি জানি,’ কটার্ড চিৎকার করে বলে বলল, ‘তুমি নিশ্চয়ই একটা বই লিখছ, তাই নয় কি?’ ‘সেধরণেরই কিছু একটা করছি,’ গ্র্যান্ড উত্তর দিল। ‘আহা,’ কটার্ড  বেদনার্ত কন্ঠে বলে উঠলো, ‘আমার যদি লেখার ক্ষমতা থাকত, তাহলে কতই না ভালো হতো!’ গ্র্যান্ড তার কথায় বিস্ময় প্রকাশ করলে কটার্ড ব্যাখ্যা করলো যে, একজন সাহিত্যমনা মানুষ যে কোন বিষয়কে সহজে সমাধান করতে পারে। কিভাবে? গ্র্যান্ড জিজ্ঞেস করল। ‘একজন লেখকের সাধারণ মানুষ থেকে যোগ্যতা থাকে বেশী। ফলে লোকজন তার কাছ থেকেই শেখে,’ কটার্ড বলল। প্রতিউত্তরে রিও বলল, ‘মনে হয়, ইঁদুরের বিষয়টি তার মাথা ঘোলা করে দিয়েছে। শুধু সে নয় অন্যদের মাথাও ঘোলা হয়ে গেছে। আমি নিশ্চিত যে, কটার্ড জ্বরের ভয়ে খুবই ভীত হয়ে আছে।’ ‘আমার অবশ্য এ বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে, ডাক্তার। তুমি কি আমার মতামত শুনতে চাও?’ এই টুকু বলে গ্র্যান্ড থামলো। কক্ষের বাইরেই ইঁদুর ধ্বংস করার ভ্যান হতে মেশিনগানের ঘর্ঘর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রিও কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলো। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে স্পষ্ট শোনা যায়। তারপর সে কটার্ড সম্পর্কে তার মতামত শুনতে চাইলো। ‘কটার্ড মূলত নীতিবান একজন মানুষ,’ গ্র্যান্ড গম্ভীরভাবে বললো। ডাক্তার কাঁধ নাড়িয়ে তার সাথে একমত প্রকাশ করলো।

সেদিন বিকেলে রিও পুনরায় ক্যাসেলের সাথে কথা বলল। জানালো যে, জীবাণুনাশক আসেনি। এটাও বললো যে, মনে হয় না জীবাণুনাশকগুলো কোন কাজে দেবে। কারন এই জীবাণুটা আসলেই অদ্ভুত ধরণের। ‘আমি তোমার সাথে একমত নই। অণুজীবগুলোকে সব সময়েই মনে হয় সম্পূর্ণ নতুন ধরণের। কিন্তু বাস্তবে তারা সবসময়েই একই জিনিস,’ ক্যাসেল বলল। ‘ওটা তোমার ধারণা। কিন্তু বাস্তবে এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না,’ রিও উত্তর দিল।

সারাদিন ধরে ডাক্তার উপলব্ধি করল যে, যখনই প্লেগ তীব্রতা পায়, এমন ভাবনা তার মাথায় ভর করে,  তখনই সে এক ধরণের তন্দ্রালু ভাব অনুভব করে। তবে শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারল যে, তন্দ্রা নয়, আতঙ্কগ্রস্ত হবার কারণে এরকম হচ্ছে তার। সুতরাং দুটোর সময়ে একটি জনাকীর্ণ ক্যাফেতে প্রবেশ করল এবং কটার্ডের মত অনুভব করল বন্ধুদের সংস্পর্শ ও মানবিক উষ্ণতা।

কটার্ড ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ডাক্তার তার কক্ষে প্রবেশ করল। একটা ডিটেকটিভ গল্পের বই টেবিলক্লথের উপরে খুলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রায়ান্ধকারের কারণে সেটির লেখাগুলো পড়া যাচ্ছিল না। রিও দরজায় বেল বাজানোর সময়ে কটার্ড গোধূলির আলোতে বসে চিন্তায় মগ্ন ছিল। রিও তাকে জিজ্ঞেস করল, সে কেমন অনুভব করছে। কটার্ড রুক্ষভাবে উত্তর দিল। জানালো যে, সে মোটামুটি ভাল অনুভব করছে। তবে সে আরও ভাল থাকতো, যদি তাকে একাকী শান্তিতে বাস করতে দেয়া হত। রিও মন্তব্য করল যে, একজন মানুষ কখনই একাকী থাকতে পারে না। ‘আমি ওটা বুঝাইনি। আমি ভাবছিলাম যে, যারা তোমার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়, তারা প্রকারান্তরে তোমার জন্যে সমস্যারই সৃষ্টি করে,’ কটার্ড বললো।

রিও নিরুত্তর থাকলে সে পুনরায় বলতে শুরু করলঃ

‘এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আমি একবার একটা ডিটেকটিভ গল্প পড়ছিলাম। গল্পটি একটা বেচারা ধরণের শয়তান সম্পর্কে। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল কোন একটি সুন্দর সকালে। আকস্মিকভাবে লোকজনেরা তার সম্পর্কে আগ্রহ দেখানো শুরু করেছিল। এবং তারা সবাই তার সম্পর্কে আলাপচারিতায় মেতে উঠেছিল। তুমি কি মনে কর যে, তাদের এই ধরণের কাজ যৌক্তিক ছিল? মানুষের কি অধিকার আছে অন্য কোন মানুষের সাথে এমন আচরণ করার?’ ‘ব্যাপারটা আসলে আপেক্ষিক,’ রিও বলল। ‘একভাবে চিন্তা করলে আমি তোমার সাথে একমত যে, কারুরই এধরণের আচরণ করার অধিকার নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে তোমার চিন্তা করার দরকার নেই।তোমার জন্যে এখন  গুরুত্বপূর্ণ হলো মাঝে-মধ্যেই বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং কোথাও থেকে ঘুরে আসা। একাধারে ঘরের ভেতরে দীর্ঘসময় থাকা খুবই অনুচিত।’

কটার্ডকে দেখে মনে হল সে যথেষ্টই বিরক্ত হয়েছে এই কথায়। সে বলল যে, সে বাইরে যায় না, এটা সঠিক নয়। প্রায় সময়েই সে বাইরে গমনাগমন করে থাকে। শহরের অনেক মানুষই এ বিষয়ে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এমনকি সে শহরের অন্য অংশের অনেক লোকজনের সাথেও সে পরিচিত। ‘তুমি কি আর্কিটেক্ট মশিয়ে রিগাডকে চেন? সে আমার একজন বন্ধু,’ সে বললো।

কক্ষটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে আবৃত হয়ে গিয়েছিল। বাইরে রাস্তার উপরে লোকজনের কোলাহল শোনা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর স্ট্রীট ল্যাম্পগুলো একসাথে জ্বলে উঠলো। সাথে সাথে এক ধরণের মুক্তির মর্মর ধ্বনি সেই মূহুর্তকে স্বাগত জানাল। রিও কক্ষ থেকে বের হয়ে ব্যালকনিতে গেলে কটার্ড তাকে অনুসরণ করল। বাইরের জেলাগুলো থেকে প্রতিটি বিকেলের মত মৃদু বাতাসের প্রবাহ আসছিল। এরসাথে মানুষের কণ্ঠস্বরের গুঞ্জন ও ঝলসানো মাংশের গন্ধ একদল মুক্ত যুবকদের আনন্দিত কোলাহলকে বয়ে আনছিল। এরা সবাই অফিস অথবা দোকান থেকে ফিরছিল। রাত্রির আগমনের সাথে সাথে দূরের উপসাগরের অদৃশ্য জাহাজগুলো ও রাস্তার উপরের আনন্দিত জনাকীর্ণতা থেকে জনরব ভেসে আসছিল। অতীতে এর সবটাই রিও’কে ভীষণভাবে আকর্ষন করত। কিন্তু আজ সকল কিছুই তার কাছে তিক্ত মনে হচ্ছিল। এর কারণও রিও’র অজানা ছিল না। 

‘আলো জ্বালিয়ে দিলে কেমন হয়?’ দুজনে কক্ষে ফিরে আসার পর রিও বলল। আলো জ্বালানোর পর ক্ষুদ্র মানুষটি পিটপিট করা চোখে রিও’র দিকে তাকাল। বলল, ‘বল তো ডাক্তার, আমি যদি কখনও অসুস্থ হয়ে পড়ি, তাহলে কি তোমার হাসপাতালের ওয়ার্ডে আমাকে স্থান দেবে?’ ‘কেন নয়?’ রিও বলল। তারপর কটার্ড তাকে জিজ্ঞেস করল যে, হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে চিকিৎসাধীন কাউকে গ্রেফতার করা হয় কিনা। রিও তাকে জানাল যে, এটা হয়ে থাকে, তবে তা নির্ভর করে অসুস্থ মানুষটির অবস্থার উপরে। ‘তুমি তো জান, ডাক্তার,’ কটার্ড বলল,‘যে তোমার উপরে আমার প্রবল আস্থা আছে।’

পরিশেষে সে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল যে, শহরে ফেরার পথে তাকে লিফট দিতে পারবে কিনা। শহরের কেন্দ্রস্থলে রাস্তাগুলো তখন ক্রমেই জনহীন হয়ে পড়ছিল। আলোও কমে আসছিল। শিশুরা তাদের দরজার সামনে খেলছিল। কটার্ডের অনুরোধে ডাক্তার একদল শিশুর পাশে কার থামাল। তারা কুতকুত খেলছিল ও চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল। একটা শীর্ণদেহী বালক, সুন্দর আঁচড়ানো চুল, অপরিচ্ছন্ন মুখমণ্ডল নিয়ে উজ্জ্বল ও সাহসী দৃষ্টিতে রিও’র দিকে তাকাল। ডাক্তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ফুটপাথের উপরে দাঁড়িয়ে কটার্ড তার মাথা নাড়াল। তারপর কর্কশ ও কঠিন স্বরে অপ্রস্তুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,‘সবাই মহামারীর কথা বলছে। এই কথাগুলো কি সত্য, ডাক্তার?’ ‘লোকজন সবসময়েই এধরণের কথা বলে থাকে,’ রিও উত্তর দিল। ‘তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী আশা করতে পার না তুমি।’ ‘ঠিক বলেছ। দশটা মৃত্যু দেখলেই তার মনে করে থাকে যে, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে,’ কটার্ড বলল।

কারের ইঞ্জিন ঘর্ঘর শব্দ করছিল। রিও’র হাত স্থাপিত ছিল ক্লাচের উপরে। কিন্তু সে পুনরায় সেই বালকটির দিকে তাকাল, যে তাকে অদ্ভুত অভিনিবেশ সহকারে দেখছিল। কঠিন দৃষ্টিতে। হঠাৎ করে শিশুটি হেসে উঠল। সকল দাঁত বের করে। ‘আমাদের এখানে কি দরকার?’ রিও বালকটির হাসি ফিরিয়ে দিতে দিতে কটার্ডকে বলল। কটার্ড আকস্মিকভাবে কারের দরজা আঁকড়ে ধরল। রাগান্বিত ও আবেগী কন্ঠে বলল, ‘একটা ভূমিকম্প! বিশাল একটা ভূমিকম্প দরকার!’

কিন্তু কোন ভূমিকম্প হল না। পরের কয়েকদিন রিও শহরের প্রতিটি কোণায় গাড়ি চালিয়ে গেল। অসুস্থ রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে বাক্যালাপ ও বিতর্ক করল। কখনই নিজের পেশাকে এত ভারী বলে মনে হয়নি ইতিপূর্বে তার কাছে। রোগীরা তার কাজকে সহজ করতে সাহায্য ও খুশীমনে নিজেদেরকে তার হাতে সমর্পন করল। এই প্রথম ডাক্তার অনুভব করল যে, তারা তাকে এড়িয়ে চলছে। রোগে আক্রান্ত হবার পরেও তারা তার প্রতি শত্রুতামূলক মনোভাব পোষণ করছে। রিও’র জন্যে এটা ছিল সম্পূর্ণই নতুন ধরণের সংগ্রাম। এই সংগ্রামের সাথে সে ইতিপূর্বে পরিচিত ছিল না। ফলে, সেদিন রাত দশটায় সর্বশেষ যখন সে তার পুরনো এজমা রোগীকে দেখার জন্যে তার বাড়ির সামনে পৌঁছাল, তখন নিজেকে খুবই পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছিল। এমনকি গাড়ির আসন থেকে নিজেকে টেনে তুলতেও তার কষ্ট হচ্ছিল। সুতরাং উঠার পূর্বে কিছুক্ষণ গড়িমসি করল সে। অতঃপর অন্ধকার সড়কের দিকে তাকাল। সেখানে রাতের অন্ধকারে তারারা আসা-যাওয়া করছিল।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ