ঝড়া ফুল অথবা এলোমেলো স্বপ্নের শব্দহীন বিলাপ

ঢাকা, বুধবার   ২৮ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৩ ১৪২৮,   ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

ঝড়া ফুল অথবা এলোমেলো স্বপ্নের শব্দহীন বিলাপ

মুহাম্মদ মনিরুল হক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৪০ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মুনিম আমি মরে পড়ে আছি আর তুই এভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিস! আমার শরীরে যে পচন ধরে যাচ্ছে রে মুনিম। তুই একটা ব্যবস্থা কর না। নাকের উপর দিয়ে সবসময় একটা মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে নাকের উপর বসে যাচ্ছে। যদিও মাছির স্পর্শ আমি কিছুই টের পাই না তবুও কেমন যেনো অস্বস্তি লাগে। তুই একটা ব্যবস্থা কর না ভাই। 

মুনিম, ও মুনিম। একটা ব্যবস্থা করনারে ভাই। দরকার হয় এখান থেকে আমায় নিয়ে মাটিচাপা দে। মাটিচাপা পড়ে থাকতে কেমন লাগবে জানি না। হয়তো এখনকার চেয়ে আরো বেশি কষ্ট হবে। তবুও আমাকে এই অবস্থা থেকে নিয়ে যা। 

জল-কাদায় মাখামাখি হয়ে কবে থেকে পড়ে আছি।  প্রচণ্ড রোদ যখন উঠে আমার খুব ভয় হয়। এই বুঝি পচা-দুর্গন্ধ ছড়াবে আমার শরীর থেকে। অবশ্য আমার এখন রঙ, গন্ধ অনুভূতি নেই। তবুও কেন যেন মনে হচ্ছে শরীরের দুর্গন্ধে মানুষের কষ্ট আমি অনুভব করতে পারব। তুই একটা কিছু কর মুনিম। এভাবে মরার মতো ঘুমিয়ে থাকিস না। 

মুনিম কি ঘুমিয়ে আছে। তার ঘুম ভাঙছে না কেন। সেই কখন থেকে মানুষটা কথা বলেই যাচ্ছে। কে এই লোক, তাকে এতো আন্তরিকভাবে ডাকছে। তার আশপাশে কি কেউ নেই যে তাকে ডেকে তুলবে। ছোট্ট বাচ্চাটা গেল কই। 

মুনিমের ধারণা যত দুষ্টু বাচ্চাই হোক ধমক দিয়ে কাঁদিয়ে ফেলার ক্ষমতা তার আছে। সমস্যা হলো ক্ষমতাটা সব সময় কাজ করে না। যেমন পিচ্চি মেয়েটার ক্ষেত্রে কাজ করছিল না। মুনিম ঘুমের জন্য শুয়ে আছে আর পিচ্চিটা কিছুক্ষণ পরপর তার পিঠে খামছি দিয়ে খিলখিল করে হাসছে। মুনিম ধমক দেয়ার সাথে সাথে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই হাসির শব্দ কয়েক ধাপ বাড়িয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গি ঢেকে ফেলছে। 

মুনিম আপসে চলে আসার চেষ্টা করল। গলার স্বর যথাসম্ভব মোলায়েম করে আদুরে গলায় বলল, চকলেট খাবে বাবু? 
না, চকলেট খাব না বলে আবার খিলখিল করতে লাগল। পিচ্চিটা কি একসময় চলে গিয়েছিল। মুনিম কি এখন ঐ ঘুমেই আছে। 

মুনিমের হঠাৎ মনে হলো একটা জটলার শব্দ তার কানে আসছে। একসাথে কিছু মানুষ একসাথে কথা বলছিল। হঠাৎ কোলাহলটা থেমে গেল। স্পষ্ট গলায় কেউ একজন বলল, ভাই এগুলো আপনি কি করেন! আপনি এত এত গল্প লিখেন, উপন্যাস লিখেন। আজ পর্যন্ত আপনার গল্পের কোন নায়ক ‘ভালোবাসি’ শব্দটা বলতে পারল না। এতদিন ভাবতাম আমার অবস্থাই বুঝি এমন। এখন দেখি আপনার সৃষ্ট প্রতিটা প্রেমিকের একই অবস্থা। লোকটার কথা শেষ হতে না হতেই অন্য একজন বলে উঠল, ভাই আপনি আছেন ভালোবাসাবাসি নিয়ে। 

আমার যা অবস্থা, আমারতো মনে হয় বাসর রাতে বউ আমাকে বলবে, বড় ভাই হিসেবে যদি কিছু বলতে চান তো বলতে পারেন আর নয়তো চুপ করে থাকেন। মুনিম মানুষ দুইটার কথা শুনছে। দুইটা কণ্ঠস্বরই ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। একটু নড়ার চেষ্টা করল। প্রাণপণ চেষ্টা করেও সে নড়তে পারছে না। হাত পা ছুড়ার চেষ্টা করছে। এতে যদি ঘুম ভাঙে। আচ্ছা সে কি একজন লেখক বা গল্পকার। সে কি প্রচুর গল্প লিখেছে। 

একজন আক্ষেপ করে বলছিল, তার সৃষ্ট প্রেমিকরা নাকি কখনও কাউকে ভালোবাসি বলতে পারেনি। আচ্ছা সে নিজে কি কখনও কাউকে ভালোবাসি বলেছে? সে কি সত্যি সত্যিই একজন লেখক। বাস্তবিক সে কে? মনে পড়ছে না, কিছুই মনে পড়ছে না। অবশ্য মনে না পড়ারই কথা। ঘুমন্ত অবস্থায় যে এতো প্রশ্ন মনে আসছে এটাইতো বেশি। আচ্ছা নিজের ঘুম নিজে ভাঙার উপায় কি? এই ব্যাপারে কেউ কোনো গবেষণা করেছে। এই বিষয়ে কি কেউ কোন বই লিখেছে, ‘ঘুম ভাঙ্গার একশোটি উপায়’ বা ‘ঘুম থেকে জেগে উঠার উপায় সমূহ’। আচ্ছা আজ পর্যন্ত কেউ কি স্বপ্নের মাঝে বন্দী হয়েছে নাকি সেই প্রথম ব্যক্তি। তবে আশার কথা হলো সে ঘুম থেকে উঠতে চাইছে কিন্তু তার তেমন অস্থিরবোধ হচ্ছে না। মানবজীবনের অন্যতম সমস্যা এবং সম্ভাবনার নাম হলো অস্থিরতা। 

আচ্ছা সে কি আসলেই ঘুমিয়ে আছে নাকি কোথাও মরে পড়ে আছে। এমনকি হতে পারে কাদাপানিতে পড়ে থাকা লাশটা সে নিজেই। তাকে কেউ মেরে ফেলে গেছে। এগুলো কি ভাবছে সে! এটা কিভাবে হয়। সে মরে গেলেতো তার চেতনাও মরে যাবে। সে এতোকিছু ভাববে কি করে। 

আচমকা তার কানে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল। মুনিম, টুম্পার লাশ পাওয়া গেছেরে। ধীনাইতলী খালের পাড়ে নাকি পড়ে আছে। অনেক মানুষের জটলা নাকি জমেছে ওখানে। কাদাপানিতে টুম্পার শরীরটা মাখামাখি হয়ে আছে। লোকজন গিয়ে দেখে আসছে। আমার সাহস হয়নারে মুনিম। এতোটুকু বাচ্চা...। মহিলা আর কিছু বলছে না। 

আচ্ছা টুম্পা কি সেই মেয়েটা যে তার ঘুমের সময় খিলখিল করে হাসছিল। মুনিম ঠিক মিলাতে পারছে না। তবে টুম্পা বা অন্য একটা বাচ্চা নিয়ে একটা ঘটনাপ্রবাহ তার স্মৃতিতে জমাট হচ্ছে। সে স্বপ্নের ভিতর আছে বলেই হয়তো ব্যাপারটা সম্ভব হচ্ছে। যেন টুম্পা মেয়েটা তার পরিবারের একমাত্র আনন্দের উৎস। পরিবারের প্রতিটা মানুষকে মেয়েটা বিভিন্নভাবে মাতিয়ে রাখতো। মুনিমও মেয়েটার সাথে কোন একভাবে জড়িত ছিল। কিন্তু সে মেয়েটার সাথে তার সম্পর্ক ঠিক মনে করতে পারছে না। তবে টুম্পার পরিবারের সাথে মধ্যবয়স্ক একটা লোকের ঘনিষ্ঠ যাতায়াত ছিল। 

সে প্রায়ই টুম্পা মেয়েটার সাথে দুষ্টুমি করতো। লোকটা দুষ্টুমির ছলে প্রায়ই টুম্পাকে বলতো, এই বিয়া বইবি আমার কাছে। ব্যাপারটা মুনিমের কখনও ভালো লাগতো না। পিচ্চি একটা মেয়ের সাথে এগুলো কি ধরনের দুষ্টুমি। কিন্তু মুনিম লোকটাকে কখনও কিছু বলেনি। এই লোকটাই কি কোনভাবে টুম্পাকে খালের পাড়ে নিয়ে গিয়েছিল। মুনিমের এখন নিজের প্রতি বিরক্ত লাগছে। তার হয়তো অন্য কোন কারনে লোকটার প্রতি বিরক্তি ছিল। এজন্যই হয়তো লোকটাকে নিয়ে একটা বাজে ভাবনা তার মাথায় আসছে। মুনিম কিছুটা অস্থির বোধ করছে। 

তার মনে হচ্ছে এখন তার মাথায় শুধু নেতিবাচক চিন্তাভবনা আসবে। তার এখনই জেগে উঠা দরকার। তার ঘুম ভাঙ্গছে না কেন। পিচ্চি মেয়েটা কোথায় গেল। তবে কি সত্যিই সত্যিই সে কোনো কুৎসিত পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। ভয়ংকর সেই পরিস্থিতির পর খুন? তার ঘুম ভাঙছে না কেন। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আসছে। তার নিজেকে কখনও মনে হচ্ছে কাদায় পড়ে থাকা লাশ, মধ্যবয়স্ক এক রশিক, আহত কণ্ঠের নারী, পিচ্চি মেয়েসহ পৃথিবীর সকল মানুষের অস্তিত্ব যেন তার নিজের মাঝে টের পাচ্ছে। তার ঘুম ভাঙ্গা দরকার। পৃথিবীতে কি একটি শিশুও নেই যে তার ঘুম ভেঙে দিবে। যে তাকে জাগিয়ে তুলবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম