অনুসন্ধিৎসা

ঢাকা, বুধবার   ০৩ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৮ ১৪২৭,   ১৮ রজব ১৪৪২

অনুসন্ধিৎসা

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৬ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

"You see, I want a lot.
Perhaps I want everything
the darkness that comes with every infinite fall
and the shivering blaze of every step up.” –  Rainer Maria Rilke 

৫/৬ বছর বয়স থেকেই খরকা পাড়ের ঘরটিতে রাত্রিকালে একাকী বাস করে আসছে আমিনুল। দক্ষিণমুখী ছনের চালের তৈরি ঘর। ঘরের সামনে এক চিলতে উঠোন। পেছনে খরকা বিল। আমিনুলের ঘর থেকে প্রায় ৩০ গজ দক্ষিণে আমজাদের ঘর। সেখানে সে আমিনুলের মা ও বোন মরিয়মকে নিয়ে থাকে। এক বাড়ি হলেও ঘর দুটোর মধ্যে দূরত্বের কারণে দূর থেকে আসা কোন আগন্তুকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে যে, এই বাড়িতে দুটো পরিবার বা শরীক বসবাস করছে।

আমিনুলদের ঘরের পেছনদিকের পাড় ক্রমশ ঢালু ও বিস্তৃত হয়ে খরকা বিলের সাথে মিলে গেছে। বিলের জল এই ঢালুর শেষপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। একটা অদৃশ্য সরলরেখা বাড়িটিকে বিল হতে পৃথক করেছে। অনেকটা সুবহে সাদেকের সন্ধিক্ষণে আলো ও অন্ধকারের মধ্যকারের দ্বন্দ্বের মতো। এই অঞ্চলের সমস্ত বাড়িগুলো সমতল থেকে অন্তত পাঁচ/সাত সাত ফুট উঁচু শক্ত মাটির উঠোনের উপরে স্থাপিত হয়ে থাকে। কারণ, প্রতিবছর বর্ষাকালে যমুনার পাড় উপচিয়ে বানের ঘোলা জল খরকা বিলের স্বচ্ছ জলের সঙ্গে মিশে বিলের জলকেও ঘোলা করে ফেলে। তখন খরকা বিলকেও মনে হয় কোন নদী। এই ঘোলা জলের সাথে প্রচুর মাছ এসে খরকা বিলে প্রবেশ করে। মাছগুলোর মধ্যে বাঁশবাতারী, চাপিলা, রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, চিতল, বাইম, পুঁটি, চিংড়ি, টেংরা, কই আর পাবদা অন্যতম। একই সময়ে হাজারো শিকারী পাখি যেমন, মাছরাঙা, ডাহুক, পানকৌড়ি, বক ইত্যাদি এসে বিল পাড়ের গাছগুলোর মাথা মুখরিত করে তোলে।

শুধু তাই নয়, এই সময়ে গ্রামের সকল লোকেরা বিলের নতুন জলে মাছ ধরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে একজন গফুর চাচা। আমিনুলদের নিকটতম প্রতিবেশী। আমিনুলদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে তার বাড়ি। ছোট্ট একটা কুড়ে ঘরে। তিনি আমিনুলকে প্রবল স্নেহ করেন। বর্ষার অব্যবহিত পূর্বে গফুর চাচার ব্যস্ততা বেড়ে যায় বহুগুণে। সারা দিনমান তিনি কখনো দিনের আলোতে কখনো বা রাতে চাঁদের আলোতে চরকা দিয়ে সুতো কাটেন। তারপর সেই সুতা দিয়ে ঠ্যালাজাল, ছিপজাল, ঝাঁকিজাল ইত্যাদি তৈরি করে বাড়ির উত্তরের গাব গাছ থেকে গাব পেড়ে এনে জালগুলোকে রঙিন করেন। কখনো বা  বাঁশ ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে ধুমার (মাছ ধরার বিশেষ ধরনের টোপ) অথবা পুরনো ছাতার লোহার চিকন চিকন শিক দিয়ে মাছ শিকারের কোঁচ তৈরি করেন। আমিনুল অবাক বিস্ময়ে তার ফাঁদ ও অস্ত্র তৈরী করা দেখে। গফুর চাচার একটা ডিঙি নৌকা আছে। এটাই আমিনুলের মূল আকর্ষণ। প্রায়ই সে আমজাদের দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে নৌকায় করে তার সাথে খরকা বিলে মাছ ধরতে যায়। তবে এই উৎসবের সময় দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় না। বানের জল প্রতিনিয়ত বাড়তে বাড়তে এক সময়ে পুরো এলাকাকে প্লাবিত করে ফেলে। কখনো কখনো  বিলের জলের উচ্চতা বেড়ে যায় অন্তত পক্ষে চার থেকে পাঁচ ফুট। আমিনুলদের উঠোনে তখন থাকে হাঁটুজল। আমিনুলের জন্যে এটা মহানন্দের সময়।

রাতের বেলায় বিলের দিক হতে সারাক্ষণ বাতাস বইতে থাকে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলেও আমিনুলের ঘুম আসে না। উত্তরের জানালা দিয়ে রাতের খরকা বিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। খরকা বিলের অন্ধকার জল থেকে অশরীরী কোন দৈত্য বা দেও উঠে আসে কিনা কিনা তা দেখার জন্যে। কখনো কখনো সে দেখে যে, অন্ধকার আকশের ভেতর থেকে তীরের মতো আলো ছুটে এসে বিলের উত্তরপাড়ের তাত্তাপাড়া গ্রামের পেছনে মিলিয়ে যায়।  মরিয়মের জন্মের পূর্বে বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করার সময়ে মায়ের কাছে গল্প শুনেছে যে, শয়তানকে তাড়ানোর জন্যে ফেরেশতারা তীর ছুড়ে মারেন। সেই তীরের গতিপথই বিদ্যুতের আলোর মত উজ্জ্বল  হয়ে উঠে।

আমিনুলের পর্যবেক্ষণ শিশুর ঔৎসুক্য ও ভীতি দুটো দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। গভীর রাতে বিল থেকে আসা বাতাসে আমিনুলের ঘরের উত্তর পাশের কলাগাছগুলোর পাতা  মুহুর্মুহু কাঁপতে থাকে। পত পত শব্দ করে। একই সময়ে একদল রাতজাগা বাদুড় অদ্ভুত কিচিরমিচির শব্দ করতে করতে বিলের জলের উপর দিয়ে উত্তর দিক থেকে উড়ে আসে। তাত্তাপাড়া গ্রাম থেকে। সেই গ্রামে অনেকগুলো তালগাছ আছে। একটা গ্রামে এতগুলো তালগাছ কে লাগালো আমিনুল ভেবেই পায় না। কখনও কখনও  উড়ন্ত বাদুড়গুলো পাখা ঝাপটিয়ে এসে পড়ে আমিনুলের বাড়ির উত্তর পাশের সেই কলাগাছ গুলোর উপরে। রাতের আঁধার গাঢ় হয়ে আসে। আমিনুলের তখন মনে হয় রাতের কলাগাছগুলো প্রাণহীন নয়। শুধু কলাগাছ নয়। বিল পাড়ের গাছপালা, জলের নিচের মৎস্যকুল, জলের ভেতরের অশরীরী আত্মা বা দেও – কেউই প্রাণহীন নয়। সবাই দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে। কবরের নিস্তব্ধতা নিয়ে। জেগে উঠে গভীর রাতে যখন মানুষেরা ঘুমিয়ে পড়ে। তবে আমিনুল পারতপক্ষে চারপাশের প্রকৃতির ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না। মৃতবৎ শুয়ে থাকে।

সম্প্রতি আমিনুল তার বাবার আলমারির ভেতর থেকে ‘হারিয়ে যাওয়া জগত’ নামে একটা বই খুঁজে পেয়েছে। আমাজন বনের ভেতরের একটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। আমিনুলের চেয়ে কিছু বড় বয়সের এক বাঙালী কিশোর এবং এক পাগল ধরণের বৈজ্ঞানিক প্রফেসরের গল্প যিনি প্রবলভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাজন বনের গভীরে এখনো বাস করে বিভিন্ন ধরণের ডাইনোসর ও টেরোডাকটিল পাখিরা।  রাতের অন্ধকারে খরকা বিলের উপর দিয়ে উড়ে আসা বাদুড়গুলোকে আমিনুলের ভাবনায় মনে হয় সেইসব প্রাগৈতিহাসিক টেরডাকটিল। উড়ে চলেছে খরকা বিলের জলের ওপর দিয়ে, দক্ষিণের সাগরপানে। অথবা আরও দূরে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে আমাজন বনের গহীনে।

পূর্ব থেকেই আমরা জানি যে, আমিনুলদের বাড়ির খুবই সন্নিকটে একটা ঘন জঙ্গল বিদ্যমান। আমিনুলদের উঠোন পেরিয়ে একটা মেঠো পথ দিয়ে ২০০ গজ দূরত্ব পেরুলেই। প্রাচীন সময় হতে। আমিনুলের পিতা বা পিতামহের জন্মেরও পূর্ব হতে। অন্তত তিন শতাব্দীকাল তো হবেই। প্রকৃতি খরকা বিল পারের এই অঞ্চলকে সমস্ত মমতা দিয়ে গড়ে তুলেছে। এলাকাবাসীরা এই থেকে গাছ কাটে না। ফলে মানুষ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হবার কারণে এই জঙ্গল ফুলে ফেঁপে পল্লবিত হয়েছে সিন্দাবাদ জাহাজীর সপ্তম অভিযানের সেই তিমির পিঠের উপরের সবুজ দ্বীপের মত। খালি চোখে এই বৃদ্ধি দৃশ্যমান নয়। খুবই ধীর গতিতে এই বেড়ে উঠা। হিমবাহ বা শামুকের গতির সাথে যা তুলনীয়।

সারাদিনমান সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকার বিরাজ করে এই জঙ্গলের গভীরে। হরেক রকমের পাখি এই বনের বাসিন্দা। শালিক পাখি থেকে শুরু করে টিয়ে, হুতুম-প্যাঁচা, তিতির, কাঠঠোকরা, মাছরাঙা, সুইচোরা, কোকিল, চোখগ্যালো, গাঙচিল, বাজ, চিল, ঈগল, শকুন, হাঁড়িচাচা, ফিঙে, ফটিকজল, দোয়েল, ময়না-শালিক, বুলবুল – কোন পাখিরই কমতি নেই এখানে। পশুদের ভেতরে শিয়াল ও বাগডাশদের জন্যে নিরাপদ এই আবাস্থল। আঁধার চিরে রাতের বিভিন্ন প্রহরে ভেসে আসে এদের সমবেত আনন্দ ধ্বনি। একদা বাঘ বসবাস করতো বলেও শোনা যায়। এ বিষয়ে একটা বীরত্বের কাহিনীও প্রচলিত আছে আমিনুলের এক পূর্বপুরুষকে নিয়ে। আমজাদের এক ফুফাতো বোন ফাতেমার মাকে তিনি উদ্ধার করেছিলেন বাঘের মুখ থেকে। এখনো এই নিবিড় বনে কেউ পারতপক্ষে প্রবেশ করে না। আমিনুল শুধুমাত্র একবার তার পোষা গিনিপিগকে কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে এই নিবিড় অরণ্যের ভেতরে প্রবেশ করেছিল। কিছুক্ষণের জন্যে। সেটা এক ভিন্ন কাহিনী।

সেদিন রাতে পিতা আমজাদকে বিল পাড় থেকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে তার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে এসেছিল আমিনুল। আমিনুল যখন আমজাদকে ঘরে নিয়ে যায়, তখন আমিনুলের মা ও ছোটবোন বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল। আমিনুল তাদেরকে জাগানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।

পরেরদিন সকালে আমিনুল বাবার সাথে স্কুলে যাবার পথে জিগ্যেস করেছিল, “বাবা, কাল রাতে বিলের পাড়ে তুমি কি কারো জন্যে অপেক্ষা করছিলে?”

আমজাদ অবাক হয়েছিলো আমিনুলের প্রশ্নে। ঘুনাক্ষুরেও সে স্মরণ করতে পারেনি বিগত রাতে অথবা তৎপূর্বে নিজ গৃহ থেকে তার নিষ্ক্রমণের কথা বা আগন্তুক কোন মানুষের সাথে তার সাক্ষাতের কথা। পিতার বিস্মৃতির বিষয়টি লক্ষ্য করে আমিনুলও খুব অবাক হয়েছিলো। ফলে বিগতরাতেও যখন আমিনুল প্রত্যক্ষ করলো গভীর রাতে আমজাদ ঘর থেকে বের হয়ে,উঠোন পেরিয়ে বাড়ির দক্ষিণের ঘন জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করেছিল, তখন সে আর নিজের অনুসন্ধিৎসাকে চেপে রাখতে পারেনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাকে অনুসরণ করতে। কিন্তু কিছুদূর অনুসরণ করার পর ফিরে এসেছিল। ইতিপূর্বে  গিনিপিগ উদ্ধার অভিযানের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তাকে নিবৃত করেছে। তবে পিতার প্রত্যাবর্তন করা পর্যন্ত সে জেগে ছিল। শেষ রাতে সুবহে সাদেকের পূর্বেই তার পিতা জঙ্গলের ভেতর থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। নিজ গৃহে। প্রত্যাবর্তনকালেও  ডান বাম কোনোদিকেই তাকাননি তিনি। আমিনুলের মনে হচ্ছিল অদৃশ্য কোন শক্তি নিয়ন্ত্রণ করছে আমজাদের সকল অঙ্গ-সঞ্চালন। দূর নিয়ন্ত্রিত কোন রোবট বা যন্ত্রমানবের মত।

আমিনুল নিশ্চিত যে, বনের ভেতরে কেউ একজন বাবার জন্যে অপেক্ষা করছিল। বাবা তার ডাকেই গিয়েছিলেন। আমিনুলের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে মাত্র কিছুদিন পূর্বে রাতের অস্পষ্ট আঁধারে শ্মশ্রুমণ্ডিত দরবেশ রুপ ধারী সেই আশ্চর্য বর্ষীয়সী মানুষের সাথে আমজাদের নিঃশব্দ আলাপচারিতা। সুতরাং সকালের  উজ্জ্বল সূর্যের আলোতে খরকা বিলের জলে স্নান করার সময়ে আমিনুল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। আজ দুপুরের পূর্বেই সে বনের ভেতরে প্রবেশ করবে। সমগ্র বন অনুসন্ধান করে দেখবে যে, আমজাদ রাতে কার কাছে গিয়েছিলো?

শুক্রবার। আশেপাশের বাড়ির পুরুষেরা সবাই জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছে। আমিনুলদের বাড়ির হতে দুই বাড়ি উত্তরে বিশাল জামে মসজিদ। খরকা বিলের পাড়ে। আমিনুলের দাদা এই মসজিদে ইমামতি করতেন। পুরো সুখ নগরী গ্রামের মানুষেরা এই মসজিদেই জুমার নামাজ আদায় করে। দুই শতাব্দী যাবত। আমিনুলের পিতা আমজাদ এই মসজিদেই কুরআন শিক্ষা করেছিল। শুধুমাত্র আমিনুলই এই মসজিদে কায়দা, আমপারা এবং কুরআন শরীফ পড়া শিখেনি। কারণ সে শব্দ করে উচ্চারণ করতে পারে না। জন্ম থেকেই বোবা।

আমিনুল জুমার নামাজের সময়ে বাড়ির পূর্বদিক থেকে জঙ্গলের ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত মেঠো পথ ধরে ঢুকে পড়ে জঙ্গলের ভেতর। বনের ভেতরে অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গুল্ম থেকে শুরু করে লম্বা লম্বা গাছ। ভেতরের দিকে হয়তো আরও বড় বড় গাছ আছে তা আমিনুল জানে না। গ্রামের নবীনদের কেউই এই বনের গভীরে প্রবেশ করেনি। মেঠো পথটা গাছগুলোর ফাঁকফোকর দিয়েই এঁকে বেঁকে বনের গভীরে চলে গেছে। আমিনুল লক্ষ্য করে ঝরাপাতায় ঢাকা মেঠো পথটা প্রাথমিকভাবে কিছুটা প্রশস্ত থাকলেও ক্রমশ এটা বিলীন হয়ে যেতে থাকে। বন ঘন হয়ে আসে। সেই সাথে কমে আসে দিনের আলো। বনের প্রায়ান্ধকারে কয়েকটা বাদুড় উড়োউড়ি করছে। জন্মান্ধ উইপোকাদের মত। ঠিক যেমন ভাবে আমিনুল জন্মলগ্ন থেকেই মূক। 

যেতে যেতে আমিনুল পিছন ফিরে তাকায়। দূরে আমিনুলদের বাড়ির উঠোনে আলোর ছড়াছড়ি। উঠোনে বাঁশের চাটাইয়ের ওপরে মরিচ শুকোতে দেয়া হয়েছে। টকটকে লাল। খরকা বিলের পানি দুপুরের উজ্জল রোদে কাঁচের আয়নার মতন চকচক করছে। কোন স্নিগ্ধতা নেই। চোখ ধাধিয়ে যাচ্ছে। পুনরায় সে  বনের প্রায়ান্ধকারের দিকে দৃষ্টি ফেরায়। একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।  আলো থেকে অন্ধকারের দিকে।  আমিনুলের চোখেমুখে সম্মোহনের আবেশ।

বনের ভেতর দিয়ে সে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকে। ছোট গুল্ম ধরণের গাছের কাঁটায় তার ডান হাতের বাহুর চামড়া ছিঁড়ে যায়। আমিনুল ব্যাথায় অস্পষ্ট শব্দ করে ওঠে। নিবিড়ভাবে চারদিকে তাকায়। দেখার চেষ্টা করে কেউ তাকে খেয়াল করছে কিনা। একটা কাঠবিড়ালি স্বচ্ছ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আর কোন পরিচিত দৃশ্য নেই। এখানেই মেঠো পথের শেষ। সামনেই অজস্র আন্দিজ ফার্ন। পৃথিবীর আদি উদ্ভিদ। টেরিডফাইড প্রজাতির। দু’শ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসর যুগের অব্যবহিত পরে পাওয়া যায় প্রাচীন এই উদ্ভিদের অস্তিত্ব। আন্দিজ পর্বতমালার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সর্বপ্রথম এই ফার্নের খোঁজ পায় বিজ্ঞানীরা। হাঁটু উচ্চতার। দূর থেকে সবুজ পাটক্ষেতের মতো  মনে হয়। আমিনুল ভেবেই পায় না আন্দিজ পর্বত থেকে যমুনা তীরবর্তী এই খরকা বিলের পাশে এগুলো এলো কি করে?

ঘন বন। দৃষ্টি খুব বেশি দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবার অবকাশ নেই। ফার্ন বনের সামনে এসে মেঠো পথটা শেষ হয়ে গেছে। অথবা অন্ধকারের কারণে এর অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে না। আমিনুল ফার্ন বনের ভেতর দিয়ে এগোতে থাকে। গ্রীষ্মকালে হাঁটুজলের ভেতর দিয়ে যমুনার জল অতিক্রম করার মত। তার ইচ্ছে বনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত অনুসন্ধান করবে। সন্ন্যাসী বা কাপালিকরা এই ধরণের জায়গাতেই অবস্থান করে বলে সে বইপত্রে পড়েছে। বনজঙ্গলে আবৃত, অথচ  জলের পাশে, জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন স্থানে তারা বসবাসের জায়গা বেছে নেয়।

ফার্নের বন পেরুতেই সামনে বিশাল বিশাল গাছের সারি। আমিনুল এদের নাম জানে না। এ ধরনের বিশালাকৃতির বৃক্ষ আমিনুল গ্রামের ভেতরে কখনোই দেখেনি। ধারণাও করেনি যে, তাদের বাড়ির অতি নিকটেই এদের অবস্থান। আমিনুলের মনে হয় প্রায়ান্ধকারের ভেতরে গাছগুলো তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। অবাক দৃষ্টিতে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে। আমিনুল বিচলিত। এই প্রথম তার মনে হল গাছের প্রাণ আছে। সত্যিকার অর্থেই। শুধুমাত্র তাই নয়। এরা মানুষের মতনই ক্রোধ, হিংসা, ভালবাসা ইত্যাদি প্রাণীজ ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম। এমনকি নড়াচড়া, শিকার ইত্যাদি করতেও।

অন্ধকারের ভেতরে আমিনুলের মনে হয় প্রতিটা বৃক্ষই সজীব প্রাণের অধিকারী।  বিশাল দৈহিক আকৃতি ও সক্ষমতার অধিকারী। হয়ত বা মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীদের ওপরে প্রভাব খাটাতেও সক্ষম এরা। নিজেদের এলাকায় অনাহূত ভাবে প্রবেশকারীকে তারা নিমেষেই গ্রাস করে ফেলতে পারে।  আবার চাইলে উগড়েও ফেলে দিতে পারে। যেমনটা হয়েছিল হজরত ইউনুস (আঃ) এর ক্ষেত্রে। তিন দিন পর তিনি তিমির পেট থেকে সমুদ্র সৈকতে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। আমিনুল নিশ্চিত যে, বনের ভেতরে তার সমস্ত চলাচল গাছগুলো এতক্ষণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলো। একটা প্রবল ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা আমিনুলকে ক্রমশ গ্রাস করতে থাকে।

ছবি কৃতজ্ঞতা:  সাইফুল আলম এবং জিয়া মাহমুদ খান রাতুল

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ