কৈবর্ত পুরুষ

ঢাকা, সোমবার   ১৭ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৪ শাওয়াল ১৪৪২

কৈবর্ত পুরুষ

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:০২ ২১ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১১:১২ ২১ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

“বাস্তবে অস্তিত্বশীল থাকা কোন সত্ত্বার জন্য একটি আকস্মিক ঘটনা মাত্র। থাকলেও চলে, আবার না থাকলেও চলে। ইতরবিশেষ হয় না।” - ইবনে সিনা

পূর্ণিমার রাত। খরকা বিলের সমান্তরালে আমিনুলদের বাড়ির উঠোনও উজ্জ্বল ও মনোহর হয়ে উঠেছে। মধ্য আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদের আলোর বন্যা বয়ে যাচ্ছে সেখানে।

আমিনুলের ঘরের উত্তর দিকে বিল পাড় ঘেষে অনেকগুলো কলাগাছ। পাশাপাশি থাকার কারণে এগুলোকে দেখতে প্রাচীরের মতো মনে হয়। যেহেতু বাড়ির এই ঢালুটি খুব খাঁড়া এবং সরাসরি খরকা বিলে নেমে গেছে, সেহেতু বাড়ির এই প্রান্তে বাঁশের চাটাই অথবা টিনের কোন প্রাচীর দেয়া হয়নি। সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে কলাগাছগুলোর ভেতরে অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে আসে। এই অন্ধকারের ভেতরে হাজার হাজার জোনাকি পোকা এদিক-সেদিক উড়তে থাকে। আমিনুলের মন-প্রাণ ভরে যায়।

তবে কলাগাছগুলোকে আমিনুলের কাছে দিনের আলোতে দেখতে এক রকম লাগে। আবার রাতের বেলায় লাগে ভিন্ন রকমের।  চাঁদের আলোতে বা নিকষ অন্ধকারে এরা আরো রহস্যময়ী হয়ে ওঠে। কলার পাতাগুলো তিরতির করে কাঁপতে থাকে বিল থেকে আসা বাতাসে। তখন কলাগাছগুলো একটা ভিন্ন ভাব ধারণ করে। দিনের বেলার বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবের সাথে যার কোনই মিল নেই।

শিশুকালে রাতের কলাগাছগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে মুহূর্তের ভেতরেই চোখ বন্ধ করে ফেলত আমিনুল। মনে হতো কোন অশরীরী স্বত্বার প্রভাবে গাছগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাতাসে দুলতে থাকা কলা গাছের দীর্ঘ পাতাগুলো তার ভেতরে অভিনব চিন্তার উদয় ঘটাত। সে চোখ বন্ধ করেই বুঝতে পারতো সেগুলো বঙ্কিম চন্দ্রের কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের কাপালিক সন্ন্যাসীর মতো তার মুখের সামনে এসে উদ্বাহু নৃত্য করছে। কেউ একজন হয়ত আছে বিলের জলের নীচে, যে প্রস্তুতি নিচ্ছে তাকে কপালকুণ্ডলার মতো বিসর্জন দেয়ার।

শৈশবে প্রথম যখন তাকে এই ঘরে স্থানান্তর করা হয়েছিলো, তখন সন্ধ্যা আসলেই ভয়ে শিটিয়ে যেতো আমিনুল। কিন্তু এই বাড়িতে এটাই নিয়ম। কোন নবজাতকের জন্মের পর অব্যবহিত পূর্বের সন্তানকে বাবা-মার সাথে থাকতে পারে না। সদ্য চলতে ফিরতে শেখা শিশুকে তার শোবার ঘর ছেড়ে দিয়ে পৃথক ঘরে অবস্থান নিতে হয়। ফলে ছোটবোন মরিয়মের জন্মের জন্মের পর মাত্র চার বছর বয়স থেকে উত্তরের বিল পাড়ের এই ঘরটাতে একাকী নিভৃত জীবন যাপন করে আসছে আমিনুল। যেমন করেছিলেন হয়তো তার বাবা। এবং তারও তার দরবেশ দাদা।

আজ কোন অজ্ঞাত কারণে আমিনুলের ঘুম আসছে না। রাতের তৃতীয় প্রহর অতিক্রান্ত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দও ক্রমশ নিস্প্রভ হয়ে এসেছে। শুধুমাত্র একটা রাতজাগা পাখি থেকে থেকে চিৎকার করে উঠছে। এই পাখির ডাকেই আমিনুলের ঘুম কেটে যায়। বুঝতে চেষ্টা করে ডাকটির উৎপত্তিস্থল কোথায়? কি পাখি সেটা? কিন্তু বদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে বোঝা যায় না। সে তখন বিছানা থেকে উঠে পূর্বদিকের জানালার দিকে এগিয়ে যায়।  কপাট একটু খুলে বোঝার চেষ্টা করে কি পাখির ডাক এটা এবং কোনোদিক হতে আসছে শব্দটি।

পাখি বিষয়ে আমিনুলের আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই প্রবল। আমিনুলদের বাড়ি হতে প্রায় পাঁচশত গজ পূর্বদিকে একটা জঙ্গলাকীর্ণ জায়গা। বিশাল বিশাল গাছপালা ও আগাছায় ভর্তি। এই জঙ্গলের পরিধিতে কয়েকটা শিমুল গাছে।   একবার আমিনুল সেই  শিমুল গাছের কোটর থেকে দুটো টিয়ে পাখির বাচ্চা সংগ্রহ করতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। বুকে ও হাতে।  শিমুল গাছের কাটা ও মা টিয়ের ঠোকর দিয়ে। তবুও দমেনি। চোখ না ফোটা দুটো টিয়ের বাচ্চাকে উড়তে শেখা পর্যন্ত তো বটেই, উড়তে শেখার পরও প্রতিপালন করেছিল অপত্য স্নেহ দিয়ে। অবশ্য পাখি দুটো নিয়ে আসার পর সে বুঝতে পেরেছিলো যে, ওদেরকে এভাবে মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসা উচিৎ হয়নি। ফিরিয়ে নিয়েও গিয়েছিল সে বাচ্চা দুটোকে শিমুল গাছের কোটরের বাসায়। কিন্তু ততদিনে মা টিয়ে চলে গেছে নীড় ছেড়ে অন্য কোথাও। অতঃপর বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ফিরে এসেছিলো নিজ বাড়িতে। বাচ্চা দুটো উড়তে শেখার পরই আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিল জঙ্গলের কাছে গিয়ে। এক ঝাঁক সবুজ টিয়ের দলে মুহুর্তেই ওরা মিশে গিয়েছিল। আমিনুলের মন খারাপ হয়েছিলো। কিন্তু সেদিন গোধূলির সময়ে দুটো টিয়ে পাখিই ফিরে এসেছিল আমিনুলদের ঘরের চালে। আমিনুলকে অবাক করে দিয়ে। সেদুটোর সাথে ছিলো আরো কয়েকটা টিয়ে পাখি।  আমিনুল একটা কাঁসার বাঁটিতে চামচ দিয়ে টুং টুং শব্দ করতেই সবগুলো টিয়ে পাখিই আমিনুলের বাহুতে এসে বসেছিল। মহা আনন্দ পেয়েছিলো আমিনুল। এর পর থেকে প্রতিদিন সকালে টিয়ে পাখিগুলো খরকা বিলের ওপর দিয়ে উড়ে চলে যেত উত্তরের দিকে।  সন্ধায় প্রত্যাবর্তন করত আমিনুলদের টিনের চালে। জালালি কবুতরদের মতো। প্রতিনিয়ত এই প্রস্থান ও প্রত্যাবর্তনের পুনরাবৃত্তি হতো। এভাবে তিনমাস। অতঃপর বর্ষাকাল এলো। শুরু হলো অবিরল অবিরাম বর্ষণ। এক নাগাড়ে সাত দিন। আমাদের এলাকায় এই বৃষ্টিকে বলে ‘জাপকা বৃষ্টি’। খরকা বিলের পানি ফুলে ফেঁপে কলাগাছের প্রাচীর পেরিয়ে আমিনুলের ঘরের তলা পর্যন্ত চলে এলো। আমিনুল অপেক্ষা করতে লাগলো টিয়ে পাখিগুলোর ফিরে আসার। সাতদিন পর যখন বর্ষণ থামলো এবং আকাশে মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠলো, আমিনুল এক সারা বিকেল অপেক্ষা করলো টিয়ে পাখিগুলোর জন্যে। কিন্তু সেগুলো আর কখনোই ফিরে এলো না। হয়তো তারা অন্য কোথাও চলে গেছে অথবা তাদের পূর্বস্মৃতি লোপ পেয়েছে। ঠিক যেমন করে লোপ পায় মানুষের পূর্বজন্মের স্মৃতি অথবা ‘লৌহ মাহফুজ’-এ অবস্থানের স্মৃতি। মানবাত্মার পৃথিবীতে আগমনের পর। মাঝেমধ্যেই আমিনুলের মনে হয়, আসলে কোন জগতটা সত্য?  যে জগতে সে বাস করে, নাকি যে জগত থেকে তার আগমন হয়েছিল?

আজ রাতে আমিনুল নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলো পাখিটা কোন টিয়ে পাখি কিনা। সে মনঃস্থ করলো দরজা খুলে বাইরে যাবার। কিন্তু অকস্মাৎ পাখিটার ডাক থেমে গেল। আমিনুলের মনে হল পাখিটার ডাক সে ছাড়া আর কেউ কি শুনেছে? তার বাবা আমজাদ? তার মা? অথবা তার ছোট বোন মরিয়ম? একবার যদি সে দেখতে পারত পাখিটা দেখতে কিরকম, তাহলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সবাইকে সে বলতে পারত। কিন্তু পাখিটার ডাক আর শোনা গেলো না। আমিনুলের মনে হতে থাকলো যে পাখির ডাকের বিষয়টা বাস্তব ছিল না। হয়ত বা আধো ঘুমের ভেতরে পাখির স্বপ্ন দেখেছে। আমিনুল পুনরায় ঢুলতে ঢুলতে থাকলো।

শেষ রাতের দিকে অকস্মাৎ আমিনুলের ঘুম ভেঙ্গে যায় পুনরায়। অস্পষ্ট কথোপকথনের শব্দে। প্রাথমিকভাবে আমিনুলের মনে হয় যে সে আধোঘুমের ভেতরে উদ্ভট কোন স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু পরক্ষনেই সে কান খাড়া করলো। তার ঘরের প্রাচীরের বাইরে দুইজন মানুষ নিম্নস্বরে কথা বলছে। একজনের কণ্ঠস্বর সে চেনে। তার পিতা আমজাদ। কিন্তু অন্যজনের কথা সে স্পষ্ট বুঝতে পারে না। এত রাতে তার ঘরের বাইরে সদর বাড়ির উঠোনে তার পিতা কার সাথে কথা বলছে তা তার বোধগম্যতার ভেতরে আসে না। সে কোন ধরনের শব্দ সৃষ্টি করা ব্যতিরেকেই দরজার খিল খুলে ফেলে। বাড়ির প্রাচীরের ভেতরে গিয়ে দাঁড়ায়। এই জায়গাটা থেকে সদর বাড়ির সব কথোপকথন শ্রবণ করা সম্ভব। আমিনুলের মা এভাবেই বহির্পৃথিবী সম্পর্কিত যাবতীয় জ্ঞান আহরণ করে থাকেন।

শুধু শ্রবণ নয়, নিজ চোখে দেখার বিষয়েও আমিনুলের আকর্ষণ সমপরিমাণে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে যতদুর নিকটবর্তী যাওয়া সম্ভব, সে যায়। দুইজন ব্যক্তির অবয়ব দেখতে পায় সে। অন্ধকারের ভেতরেও সে বুঝতে পারে অন্যজনকে সে ইতিপূর্বে সে দেখে নাই। গাঢ় আলখেল্লা জড়ানো শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত একজন বর্ষীয়সী মানুষ। গভীর অন্ধকারের ভেতরেও তার শরীর থেকে উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আমিনুলের মনে হয় এই মানুষটিকে ইতিপূর্বে না দেখে থাকলেও ভালভাবেই চিনে!

“বহু যুগ আগে, পদ্মা নদীর বুকে, আমার এক পূর্বপুরুষ--
এক কৈবর্ত পুরুষ--এক বলিষ্ঠ ও উদাসীন ইলিশ-শিকারী মাঝি
শেষ রাতে, টিপ টিপ বৃষ্টির ভিতরে,
প্রবল ঘুর্ণিময় নদীজলে শক্ত হাতে বৈঠা টেনে টেনে ...” -  রণজিৎ দাশ

ছবি কৃতজ্ঞতা: জিয়া মাহমুদ খান রাতুল

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ