কলিকাল (One of These Days)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৭ ১৪২৭,   ১৭ রজব ১৪৪২

কলিকাল (One of These Days)

মূলঃ Gabriel García Márquez

অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩০ ১৯ জানুয়ারি ২০২১  

(১)
সোমবারের সকালটা ছিল উষ্ণ ও বৃষ্টিহীন। অরেলিও এসকোভার নামের একজন খুবই প্রত্যূষে জাগরণকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন এক ডেন্টিস্ট (দাঁতের ডাক্তার) সকাল ছয়টায় অফিস খুলে বসেছিল। সে একটা কাঁচের বাক্সের ভেতরের ছাঁচ হতে কয়েকটা নকল দাঁত বের করে টেবিলের উপরে আকৃতির ক্রম অনুসারে সাজিয়ে রাখা সরঞ্জামাদির পাশে রাখছিল। দেখে মনে হচ্ছিল সেগুলোকে প্রদর্শনীর জন্যে সাজানো হয়েছে। সে একটা বিবর্ণ ডোরাকাটা শার্ট পরেছিল। তার গলায় সে একটা সোনালী রঙের ফিতে বাঁধা ছিল এবং সাসপেন্ডার দিয়ে তার পরনের প্যান্টকে শরীরের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিলো। তার শরীর ছিল খাঁড়া ও চর্মসার। তার চোখের দৃষ্টি কখনোই পরিবেশের সাথে খাপ খেতো না। দেখে মনে হতো যে, একজন অন্ধমানুষ তাকিয়ে আছে। জিনিসগুলো টেবিলের উপরে সাজিয়ে রাখার পর সে ড্রিল যন্ত্রটিকে ডেন্টাল চেয়ারের দিকে টানলো এবং চেয়ারটিতে বসে নকল দাঁতগুলোকে পরিষ্কার করতে লাগলো। মনে হচ্ছিলো না যে সে তার কাজ সম্পর্কে কোন চিন্তা করছিলো। তবে ড্রিলকে পা দিয়ে পাম্প করতে করতে সে বিরতিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছিলো। সকাল আটটার পর সে কিছুক্ষণের জন্যে থামল। জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। দেখতে পেলো দুটো বিমর্ষ বাজপাখি পাশের বাসার দুটো লম্বা খুঁটির উপরে বসে রোদ পোহাচ্ছে। কাজ করতে করতে সে ভাবছিল যে, দুপুরের লাঞ্চ সময়ের পূর্বে আবার বৃষ্টি শুরু হবে। এগারো বছর বয়সের পুত্রের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর তার একাগ্রচিত্ততায় ছেদ টানল।

“বাবা।“

“কি?”

“মেয়র জানতে চাচ্ছেন যে, তুমি তার দাঁত তুলতে পারবে কিনা।“

“তাকে বলে দাও যে, আমি নেই।“

সে একটা সোনার তৈরি দাঁতকে মসৃণ করছিলো। সেটিকে সে এক বাহু দূরে স্থাপন করে চোখ অর্ধেক বন্ধ করে নিরীক্ষা করল। তার পুত্র পুনরায় ছোট্ট অপেক্ষাগার হতে চিৎকার করল।

“তিনি বলছেন যে, তুমি আছ, কারণ তিনি তোমাকে শুনতে পাচ্ছেন।

দন্ত চিকিৎসক দাঁতটিকে নিরীক্ষা করতেই থাকল। কাজ শেষ করার পর সেটিকে টেবিলের উপরে স্থাপন করে সে বলল,”ভালই হয়েছে।“ ড্রিলটিকে সে পুনরায় চালু করল। একটা কার্ডবোর্ড হতে কয়েকটা ব্রিজ তুলে নিল এবং সেগুলোর স্বর্ণ পরিষ্কার করতে শুরু করল।

“বাবা।“

“কি?”

এখন পর্যন্ত তার অভিব্যক্তিতে কোনোরূপ পরিবর্তন আসেনি।

“তিনি বলছেন, তুমি যদি তার দাঁত তুলে না দাও, তাহলে তিনি তোমাকে গুলি করবেন।“

কোনোরূপ তাড়াহুড়া না করে খুবই শান্তভাবে সে ড্রিলে প্যাডেল করা থামাল এবং সেটিকে চেয়ার হতে দূরে ঠেলে দিলো। তারপর সে তার নীচের ড্রয়ারটকে খুলল। সেখানে একটি রিভলভার ছিল।

“ঠিক আছে,” সে বলল। তাকে বলো, এসে আমাকে গুলি করতে।

চেয়ারটিকে সে তারপর বিপরীত দিকের দরজার দিকে ঠেলে দিলো। নিজের হাতটিকে ড্রয়ারের প্রান্তে রেখে। মেয়র দরজার সামনে উপস্থিত হলেন। তিনি তার মুখমণ্ডলের বাম দিক শেইভ করা। কিন্তু অন্যদিক ব্যাথায় ফুলে আছে। এইদিকে তার দাঁড়ির বয়স পাঁচদিন।

(২)

ডেন্টিস্ট তার চোখে এক ধরণের মরিয়া ভাব দেখতে পেল। সে আঙুল দিয়ে ড্রয়ার বন্ধ করে মৃদু স্বরে বললঃ

“বসুন।“

“শুভ সকাল,” মেয়র বললেন।

“শুভ সকাল।“ ডেন্টিস্ট বলল।

যন্ত্রগুলো সিদ্ধ করার সময়ে, মেয়র তার মাথার খুলিকে চেয়ারে হেলান দিলেন এবং কিছুটা ভাল অনুভব করলেন। তার নিঃশ্বাস ছিল বরফের মতো শীতল। ডেন্টিস্টের অফিসটি ছিল খুবই জীর্ণ ধরণের। সেখানে ছিল একটি পুরোনো কাঠের চেয়ার, একটি প্যাডেলওয়ালা ড্রিল, একটা কাঁচের বাক্স ও কয়েকটি সিরামিকের বোতল। চেয়ারের বিপরীতদিকে ছিল একটা জানালা, যার উপরে কোমর সমান উঁচু একটা কাপড়ের পর্দা লাগানো ছিল। ডেন্টিস্ট সামনের দিকে এগিয়ে আসতেই মেয়র তার পায়ের গোড়ালিকে শক্ত করে মেঝের সাথে আঁকড়ে নিয়ে তার মুখ খুললেন। অরেলিও এসকোভার তার মুখকে আলোর দিকে ফিরাল। তারপর অসুস্থ দাঁতকে পরীক্ষা করার পর সে মেয়রের চোয়ালকে সতর্কভাবে চাপ দিয়ে বন্ধ করল।

“এটা আমাকে এনাস্থেশিয়া ছাড়াই করতে হবে।“

“কেন?”

“কারণ ওখানে একটি ফোঁড়া আছে।

মেয়র তার চোখের দিকে তাকালেন।

“ঠিক আছে,” বলে একটু হাসার চেষ্টা করলেন। ডেন্টিস্ট তার হাসির বিনিময়ে কোন প্রতি-হাসি দিলো না। সে স্টেরিলাইজ করা যন্ত্রগুলোর বেসিনকে তার অপারেশন টেবিলের কাছে আনল। তারপর সেগুলোকে চিমটি দিয়ে ঠাণ্ডা জলের ভেতর থেকে বের করল। তার কাজে কোনই ব্যস্ততা বা তাড়াহুড়া ছিল না। পিকদানিটাকে জুতার সামনের অংশ দিয়ে ঠেলে দিয়ে বেসিনে হাত ধুতে চলে গেল। এই সমস্ত কাজগুলোই করলো সে মেয়রের দিকে না তাকিয়ে। যদিও মেয়র তার দিক হতে কখনোই তার দৃষ্টিকে অন্যত্র সরালেন না।

সেটি ছিল নীচের চোয়ালের আক্কেল দাঁত। ডেন্টিস্ট তার পা ছড়িয়ে দিল এবং উত্তপ্ত ফোরসেপ দিয়ে দাঁতটিকে শক্ত করে ধরল। মেয়র বাহু দিয়ে চেয়ারটিকে আঁকড়ে ধরলেন, তার পাদ্বয়কে ভূমির সাথে চেপে রাখলেন সর্বশক্তি দিয়ে। বরফের মতো শুন্যতা অনুভব করলে তার কিডনির ভেতরে, কিন্তু কোনরূপ শব্দ করলেন না। ডেন্টিস্ট শুধু তার হাতের কব্জি নাড়াল। বিরক্তি সহকারে নয়, বরং নম্রভাবে বললঃ

“এখন আপনি আমাদের বিশজন মৃতের মূল্য পরিশোধ করবেন।”

মেয়র তার চোয়ালের ভেতরে হাড়ের মর্মর ধ্বনি শুনতে পেলেন এবং তার চোখ অশ্রুতে পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু তিনি নিঃশ্বাস ফেললেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি দেখতে পেলেন যে, তার দাঁতটি বের করে আনা হয়েছে। ব্যাথাটি এতোটাই তীব্র ছিল যে, পূর্বের পাঁচদিনের কষ্টকে তিনি স্মরণই করতে পারলেন না। পিকদানির উপরে নীচু হয়ে ঘর্মাক্ত কলেবরে হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি তার পরিচ্ছদের বোতাম খুললেন এবং প্যান্টের পকেটের রুমাল বের করলেন।

“আপনার চোখের অশ্রু মুছে ফেলুন,” সে বলল।

মেয়র তাই করলেন। তিনি কাঁপছিলেন। ডেন্টিস্ট তার হাত ধোয়ার সময়ে তিনি খেয়াল করলেন যে, ডেন্টিস্টের অফিসের ছাঁদটি খুবই ভঙ্গুর হয়ে আছে। সেখানে মাকড়শা জাল বুনেছে এবং জালের ভেতরে মরা পোকা ও মাকড়শার ডিম দেখা যাচ্ছে। হাত ধোয়ার পর ডেন্টিস্ট ফিরে আসল।

“বিছানায় যান।“ সে বলল, “এবং লবন পানি দিয়ে গড়গড়া করুন।“

মেয়র দাঁড়ালেন, হঠাৎ সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে লম্বা পদক্ষেপে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন, নিজের জামার বোতাম বন্ধ না করেই।

“বিলটা পাঠিয়ে দিও,“ তিনি বললেন।

“কার কাছে, আপনার, না নগর কর্তৃপক্ষের কাছে?”

মেয়র তার দিকে তাকালেন না। তিনি দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং পর্দার ফাঁক দিয়ে বললেন, “দুটোই আসলে এক।“

সমাপ্ত

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ